রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
খুকু অন্দরের চাপা নৈঃশব্দে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে। চিরকালই চুপচাপ। আর এখন যেন বোবা। কার থেকে কিসের থেকে যে নিজেকে আড়াল করতে চায় খুকু! আসলে হয়তো আসন্ন পরবাসের শব্দহীন প্রস্তুতি ওর ধমনীতে ত্রাস সঞ্চার করেছে। সুনীতি মেয়েকে পাশে নিয়ে ছাদে ওঠেন মাঝে মাঝে। আশেপাশের বাড়ি আর ছাদ থেকে জোড়া জোড়া চোখ বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। মা-মেয়ে দু’জনেই চুপচাপ। লাজুক স্বভাবের। গায়ে পড়ে আলাপ করতে পারে না। খুকু তো একদমই না। বলে—
মা চলো নিচে যাই…

সুনীতি যেতে চান না। বলেন—
খাড়্যা ত মাইয়া, ভিজা চুল জড়ায়া রাখিস না। মিঠা রোদ। শুকায়্যা নে।
চুল খুলতে খুকুর সংকোচ। ওই একরাশ কোমর ছাপানো কেশদাম। ঢেউয়ের মতো লুটিয়ে পড়বে। আর সবাই হাঁ করে তাকাবে। সুনীতির টানা চুল।

খুকুর ঘন কোঁকড়া। মা শ্যামলা, মেয়ে দুধে আলতা। মায়ের লম্বা মুখ, ছিপছিপে গড়ন। মেয়ের নিটোল অবয়ব। খুকুর দিকে তাকায় সবাই। সুনীতির ভারী গর্ব। সকলেই বলে মেয়ে বাপের মতো হয়েছে। জমিদার তনয়া তাঁর খুকু।

আর সে রকম ব্যবহার। তবে মেজাজও কম নয়! একবার যদি রেগে যায় কারও সাধ্য নেই সহজে সেই জেদ ভাঙে। এমনিতে ভারী লক্ষী মেয়ে। সারাদিন বাবার দেখাশোনা করে, মায়ের হাতের কাজ টেনে করে দেয়। স্কুলে ভর্তি হয়েছে সদ্য। কিন্তু সুনীতি বোঝেন কিছুদিনের মধ্যেই এখানকার পাট চুকিয়ে তাঁদের চলে যেতে হবে। অন্য কোথাও। তাই খুকু ভর্তি হয়েও স্কুলে যেতে চায় না। সুনীতি বোঝান, যতদিন আছো স্কুলে যাও। এই করতে করতে একদিন খুকু জানান দেয় সে কাল থেকে স্কুলে যাবে।
সুনীতি বাইরে হাসেন। কিন্তু ভেতরে দুশ্চিন্তা মেঘ হয়ে আসে। মুহূর্তের জন্য বুকটা কেমন খালি লাগে।
—কতক্ষণ হইবো স্কুল?
—ঠিক জানিনা মা, হইবো পাঁচ ছয় ঘণ্টা।
—কয়ডায় যাইতে হইবো?
—দশটা
—ক ও কী?
সুনীতির ভুরু কুঁচকেছে।
—দশডার কথা তো হয় নাই, স্যার যে কইলেন এগারোডা?
খুকু হেসেছে। সুনীতির তথৈবচ অবস্থা তো ও বোঝে সবচেয়ে বেশি! সংসারে দশটার ব্যস্ততা সাংঘাতিক। তখন খুকু সামলায় রান্নাঘর আর মা দাদাদের অফিস কাছারি, ভাইদের স্কুল কলেজ, খাওয়া-দাওয়া, ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন দরকারে। এরই মধ্যে আছে বাবার স্নানের জোগাড়। মধ্যে মধ্যে সেলাইয়ের মেশিন টেনেও বসেন সুনীতি।

গৌরীটা পড়াশুনায় ভালো। স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর জলপানির ব্যবস্থা হয়েছে। ওকে ভাত মেখে দিতে হয়। রাম কত কাল ধরে ভুগছে। মনীন্দ্র ডাক্তারবাবুর ট্রিটমেন্টে আছে। লিভার খারাপ। কোনও খাবার হজম হয় না। আবার ওষুধ খেলে মাঝে মাঝে খিদে হয় খুব। তখন সে মায়ের পেছন পিছন ঘ্যানঘ্যান করে ঘোরে। মা চিনি বাতাসা দিয়ে মুড়ি দেন। ফলের মধ্যে বাতাবি, পাকা পেঁপে আর শসা খেতে বলেছেন ডাক্তার। দেওয়াই হয় না ঠিকমতো। মা আর কত দিক সামলাবে! তবে মানু ভাইকে একটু শাসনে রাখা দরকার। ভয়ংকর বেয়ারা আর আড্ডাবাজ হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে থাকেই না। সাড়ে নটা দশটায় থালা ভর্তি ভাত খেয়ে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু খুকু জানে ওই বাউন্ডুলে অর্ধেক দিন স্কুলে যাচ্ছে না। ক’টা উড়নচণ্ডী জোয়ান বন্ধু জুটিয়েছে। স্কুল থেকে আসবার পর খুকু লুকিয়ে লুকিয়ে ওর বই খাতাপত্র চেক করে। খাতায় কিছু লেখা নেই। রেজাল্ট তো লাল কালিতে বোঝাই। বাবার সই নকল করতে শিখেছে। এমনকি বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে সিনেমার টিকিট। মায়ের এ’সব দিকে হুঁশ নেই। উপরন্তু বাবা দাদা ছোড়দা মনি ভাইয়ের খোঁজ নিলে মা লুকোনোর চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)

রোমহর্ষক গল্প : দেবী

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ

মায়ের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে খুকু সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে নেমে আসে। চুল টেনে দুটো বিনুনি করে নেয় চটপট। ট্রাঙ্ক খুলে স্কুলের নতুন শাড়ি সেমিজ ব্লাউজ বের করে। কেমন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে হাত-পা! কিসের জন্য! ভয় পাচ্ছে নাকি ও স্কুলে যেতে? পথে একা যেতে ভয় নাকি স্কুলের অত ছাত্রীদের ভিড়ে বোকা বনে যাবে বলে অস্বস্তি!

খুকুর শরীরের দুধে আলতা রংয়ের সঙ্গে স্কুলের সাদা শাড়ির মিশেল যেন ফোটা গোলাপের ওপর শিশিরের আস্তরণ। দালানের বড় আয়নায় নিজেকে গুছিয়ে নিলো। বড় বৌদি অপালা নিজের শোবার ঘর থেকে ওকে দেখছে। অপালাও বেরোবে একটু পরে। কলেজে যাবে। বেথুন কলেজ। অপালা গাড়িতে যায়। বিডন স্ট্রিট থেকে বেথুনে হেঁটে গেলে মিনিট দশকের বেশি লাগে না। তবু সে নিজেকে রোদে মেলেনা। পথ আর পথচারীদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কম। ফিলোজফির স্কলার। বেথুন স্কুল কলেজের ছাত্রী। বর্তমানে সেখানকারই অধ্যাপিকা। খুকুকে কি আজকে গাড়িতে নিয়ে যাবে অপালা? বলবে একবার? খুকুর স্কুল দীনেন্দ্র স্ট্রিটে। রাসসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়। গাড়িতে গেলে বড়জোর পাঁচ ‘ছ মিনিট। নামিয়ে দিয়ে কলেজ চলে যেতে কোনও অসুবিধা হবার কথাই নয়। অপালার ইচ্ছা করছিল না তাও নয়। খুকু মেয়েটা একদম অন্যরকম। যেন সংজ্ঞা মেনে ভালো। আর অলংকার শাস্ত্র সম্মত সুন্দরী। খুকুর দিকে তাকালে কোথায় যেন নিজেকে অপালার মতো লেডি কুইনের ও নিজেকে কেমন একটু খেলো লাগে। যদিও অপালার আভিজাত্যের কাছে খুকু কিছুই না। কোনও তুলনাই চলে না উভয়ে। তবু অপালা খেয়াল করেছে, যারাই খুকুকে প্রথম দেখে.. তারাই কেমন অবাক হয়ে যায়। ওর সম্ভ্রান্ত ছাপটায় একটা আশ্চর্য অহংকার আছে।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

অপালা কি কম যায় নাকি? বরং অনেকটাই বেশি, কি চাকরি! কি শিক্ষা! পার্সোনালিটি! অপালা সিদ্ধান্ত নিল যাবে না। খুকুকে নিয়ে ও যাবে না। নিজের মতো করে যুক্তি সাজিয়ে নিয়েছে সে, খুকুর গাড়িতে চড়লে অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। আজ নয়তো দশটা তিরিশে অপালা বেরোচ্ছে। রোজ তো একই সময় যায় না। তখন তো খুকুকে একলাই বেরোতে হবে। আর তার চেয়েও বড় কথা, একেবারে নিজের কানে কানে অপলা বলে, ক’ দিনই বা এরা এখানে। চলেই তো যাবে ডায়মন্ড হারবার, তখন সেখানে কোথায় পাবে গাড়ি..!

খুকুর খাওয়া হয়ে গিয়েছে। কিছুই না একটুখানি ভাত আর আগের দিনের মাছের ঝোল। আগের রাতের মাছের ঝোল কেউ খেতে চায় না। খুকুর কিছুতেই না নেই। সুনীতি দু’বেলা রান্না করেন না। এক বেলাতেই দু’ বেলার ব্যবস্থা সেরে রাখেন। রাতে শুধু রুটি আর দুধ গরম। সে দায়িত্ব মেজ বউয়ের। কিন্তু সুনীতির কাছেই তো সকলের খেতে চাওয়া। বিশেষ করে শিবতোষ আর মানু। ওদের যেটা পছন্দ হয়ে যাবে সেটা সবচেয়ে বেশি ওরা খাবে। সকলের খাওয়া হলে মা-মেয়ে দুজন মুখোমুখি বসে। তখন ওরা একে অপরকে খাওয়াতেই ব্যস্ত। কারণ সেখানে তরকারি একজনের বেশি নেই। অবশ্য দুধ থাকে। হরি ঘোষের খাটাল থেকে রোজ খাঁটি দুধ আসে চার সের করে। ছানা হয়। তাছাড়া দই পাতা আর চুমুক দিয়ে খাবার জন্য। আদিনাথ ছানা আর দই খান। অপালাও তাই। সুনীতি ফোটানো ঠান্ডা দুধের ওপরকার ঘন সর তুলে মাখন বানান। সুধা গৌরী রাম তখন মায়ের সঙ্গে একেবারে লেপটে। সে মাখন ওরা তিনজন ছাড়া আর কেউ পাবে না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

আর সকলের চোখের আড়ালে ওই খাঁটি দুধের একটুখানি সর বেসন মধু দিয়ে গুলে রান্নাঘরের নির্জন কোণায় খুকুর নরম গালে মাখিয়ে দেন সুনীতি। একটু পরে মুখ ধুয়ে নিলে যেন একটা সাদা পদ্ম পাপড়ি মেলে ফুটে ওঠে।

খুকু একটু তাড়াতাড়ি পা চালিয়েছে। দেরি হয়নি একদমই। এগারটা থেকে স্কুল। এখন বাজে দশটা পনেরো। লাল সিমেন্টের সিঁড়ি পেরিয়ে রাস্তায় পা, সরু পিচের গলি। দুধারে দোতলা তিন তলা বাড়ি। পিচ রাস্তা পেরিয়ে গেলেই বিবেকানন্দ রোড। রাস্তা পার হয়ে ওপারের সরু গলির ভিতরে ঢুকে পড়েছে খুকু। ভিতরের রাস্তা ধরে দ্রুত পা চালিয়ে স্কুলে পৌঁছে যাবে এখনই। এখানেও সরু পিচ রাস্তা। দুধারে বাড়ি। বাড়ির সামনে লাল কালো রোয়াক। তবে এ পাড়াটা খানিকটা নির্জন। ওপাশে আরেকটু হেঁটে গেলে শরৎচন্দ্র পাঠাগার। পাঠাগারের পেছনে ইয়ং স্টার ক্লাব। মা আর সোনাদা’ র সঙ্গে যেদিন স্কুলে ভর্তি হবার জন্য এসেছিল ক্লাব ঘরের অবস্থান দেখেছে।ওখানে উঠতি ছেলেদের হুল্লোড় চলে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওই তল্লাট পেরোতে পারলে বাঁচে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটার জন্য হাঁটতে যেন দেরি হচ্ছে। কাপড়ের হাতল দুটো টেনে বইখাতা ভর্তি ব্যাগটা বুকের কাছে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটছে খুকু। কোনওদিকে না তাকিয়েও টের পাচ্ছে ক্লাব ঘর এসে গিয়েছে। অনেকগুলো ছেলের নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি শুনতে পাচ্ছে। আড়চোখে দেখেছে, কয়েকজন হেঁটে আসছে পিছনে।

ভাদ্র মাসের ঝা চকচকে রোদ । রাস্তায় আলো পিছলোচ্ছে। সেই পিছলোনো আলোর উপর দিয়ে কালো স্ট্রাপের একজোড়া লাল চটি লক্ষীর পদচিহ্ন ফেলতে ফেলতে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। কিন্তু ভীষণ ভয় পিছন থেকে যেন ওকে তাড়া করছে। ঠিকমতো পৌঁছতো কিনা কে জানে, তার আগেই কোথা থেকে ধূমকেতুর মতো পাশে এসে পড়ল নবীন। এক বুক দম ছেড়ে নতমস্তকে ফিসফিসিয়ে বলল,
—আগায় চলেন বড়দি, আমি সঙ্গে থাকতাছি, কুনো ডর নাই।
খুকুর প্রাণে মুহূর্তে সমুদ্রের বল। নবীনের দিকে দেবীর মতো পূর্ণ চোখে তাকিয়ে সম্মতি দিল খুকু। —ঠিক আছে সঙ্গে চল, ভালোই হইল। স্কুল ছুটির সময় খাড়া থাকবি।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content