
সেই খুকুর স্কুলে যাওয়ার সূচনা। সূচনা হতে না হতেই শেষের ঘণ্টা বাজবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে। কলকাতার পাট চুকিয়ে খুকুরা চলে যাবে অন্য কোনও পরবাসে। তবু যে কটা দিন কলকাতায় তাদের থাকা, তারই মধ্যে নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করেছে খুকু।
নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছে গিয়েছে। আর ছুটির সময়, চারটে বাজবার সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয়েছে স্কুলের গেটে। অন্য মেয়েদের সঙ্গে এই দিন সাতেকে কথা হয়নি বিশেষ। দু-একজন অবশ্য নিজে থেকেই আলাপ করেছিল। একজন বলেছিল, এই তোমার নাম কী গো?
অন্য একজন, তুমি কোথা থেকে আসো?
খুকু প্রায় আধফোটা গলায় উত্তর দিয়েছে। ব্যস এটুকুই। ফার্স্ট বেঞ্চে বসে মন দিয়ে দিদিমণিদের পড়া শুনতেই ওর একমাত্র আগ্রহ। বন্ধু পাতানোয় নয়।
ক্লাস টিচার ছিলেন রেবা দিদিমণি। দু’ একদিন পরেই তিনি টিফিনে দেখা করতে বলেছিলেন খুকুকে। এত ভালো লেগেছিল ওর দিদিমণির ব্যবহার, কি সুন্দর উচ্চারণ, থেমে থেমে আস্তে আস্তে স্পষ্ট গলায় কি অপূর্ব কবিতা বলতেন ক্লাসে দিদিমণি! সত্যি বলতে কি, ওঁর আশেপাশেই থাকতে ইচ্ছে করত খুকুর। একদিন খুকুকে বললেন, মাধবী কাল আমার কাছে টিফিনে ইংরেজি গ্রামারটা ভালো করে বুঝে নিও। সব বইপত্র আছে তোমার?
নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছে গিয়েছে। আর ছুটির সময়, চারটে বাজবার সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয়েছে স্কুলের গেটে। অন্য মেয়েদের সঙ্গে এই দিন সাতেকে কথা হয়নি বিশেষ। দু-একজন অবশ্য নিজে থেকেই আলাপ করেছিল। একজন বলেছিল, এই তোমার নাম কী গো?
অন্য একজন, তুমি কোথা থেকে আসো?
খুকু প্রায় আধফোটা গলায় উত্তর দিয়েছে। ব্যস এটুকুই। ফার্স্ট বেঞ্চে বসে মন দিয়ে দিদিমণিদের পড়া শুনতেই ওর একমাত্র আগ্রহ। বন্ধু পাতানোয় নয়।
ক্লাস টিচার ছিলেন রেবা দিদিমণি। দু’ একদিন পরেই তিনি টিফিনে দেখা করতে বলেছিলেন খুকুকে। এত ভালো লেগেছিল ওর দিদিমণির ব্যবহার, কি সুন্দর উচ্চারণ, থেমে থেমে আস্তে আস্তে স্পষ্ট গলায় কি অপূর্ব কবিতা বলতেন ক্লাসে দিদিমণি! সত্যি বলতে কি, ওঁর আশেপাশেই থাকতে ইচ্ছে করত খুকুর। একদিন খুকুকে বললেন, মাধবী কাল আমার কাছে টিফিনে ইংরেজি গ্রামারটা ভালো করে বুঝে নিও। সব বইপত্র আছে তোমার?
খুকু মাথা নেড়েছিল। নেই। তখন উনি অফিস ঘর থেকে নিজের লকার খুলে নিয়ে এসেছিলেন বাংলা ইংরেজি গদ্যপদ্যের একখানা করে বই। বলেছিলেন, পড়বে কেমন, তারপর বই কেনা হলে ফেরত দেবে। ধন্য হয়ে গিয়েছিল খুকু। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল এই অযাচিত স্নেহে। চোখের জল গোপন করে পা ছুঁয়েছিল দিদিমনির। অনেক পড়াশুনা করতে চায় খুকু। উদ্বেল কণ্ঠে বলেছিল—
সত্যি দিদিমণি আমি কোনদিন পড়াশোনায় এতটুকু ফাঁকি দিব না।
মায়ের নীল নীল শিরাওলা হাত দুটোর কথা মনে পড়েছিল। হেড দিদিমণির কাছে খুকুর ভর্তির জন্য সেই পাঁচ সিকে সহ বাড়িয়ে দেওয়া হাত। উদ্বাস্তু কন্যা সন্তানের শিক্ষা এরপর ফ্রি স্টুডেন্টশিপে চলবে ভেবেছিল তার মা। যেমন করেই হোক, মায়ের ফাঁকা বুকখানা খুকু ভরিয়ে দেবে পড়াশুনা করে।
সত্যি দিদিমণি আমি কোনদিন পড়াশোনায় এতটুকু ফাঁকি দিব না।
মায়ের নীল নীল শিরাওলা হাত দুটোর কথা মনে পড়েছিল। হেড দিদিমণির কাছে খুকুর ভর্তির জন্য সেই পাঁচ সিকে সহ বাড়িয়ে দেওয়া হাত। উদ্বাস্তু কন্যা সন্তানের শিক্ষা এরপর ফ্রি স্টুডেন্টশিপে চলবে ভেবেছিল তার মা। যেমন করেই হোক, মায়ের ফাঁকা বুকখানা খুকু ভরিয়ে দেবে পড়াশুনা করে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৮: পরবাস প্রস্তুতি (চার)

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৪ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫১: সাইকেল মাহাতো অ্যান্ড কোং

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল
কিন্তু কখন পড়বে? সে নয় ঠিক সময় বার করে নেবে। কিন্তু কোথায় পড়বে? তার যে কলকাতায় থাকবার প্রহর ক্রমশ কমে আসছে, কষ্ট করতে ওর কোন অসুবিধা নেই। যে সময় ঘুম থেকে ওঠে তার থেকে আরও একটু ভোরে উঠলেই হল। সাড়ে পাঁচটার বদলে সাড়ে চারটেতে। সকালেই অনেকখানি পড়াশুনোর কাজ সেরে ফেলা যাবে। তারপর রান্নাবান্না করে স্কুল। বিকালে ফিরে বাড়ির দায়িত্ব অনেক কম থাকে। টুকটাক যা কাজ সেরে কেবল পড়াশোনা করবে সে। কিন্তু সে সবই সম্ভব হতো যদি এখানে থাকতে পারতো। সে তো হবার নয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮১ : খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
নানা কিছু ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গিয়েছিল স্কুলের গেটে। নবীন দাঁড়িয়ে। ওকে দেখলে এত হাসি পায়, আর রাগও ধরে মাঝে মাঝে। সব দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে গাধার মত খাটে। অথচ দাঁড়িয়ে থাকে নত মস্তকে যেন আসামি, চুরির দায়ে ধরা পড়া এক কয়েদি। বিরাট চেহারায় কাচু মাচু মুখ নিয়ে। গম্ভীর গলায় খুকু বলেছিল—
—কতক্ষণ খাড়ায়া আছস?
—এইতো সামাইন্য
—চল তবে।
—আমারে আপনের ব্যাগখান দ্যান।
—ক্যান, তরে দিমু ক্যান
স্বরের তীক্ষ্ণতায় ভয় পায় নবীন। সব সময়।
আমতা করে বলেছিল—
—আপনের ভার লইয়া চলবার অভ্যাস নাই।
—সে আমি বুঝুম।
হন হন করে হাঁটছিল খুকু। সেভাবেই সে হাটে। আর হাত খানেক পিছনে নিঃশব্দ প্রহরী নবীন।
এমন করেই দিন যায়। খুকুর একদিন খিদে পেয়েছিল খুব। গলির ধারে তেলেভাজা মুড়ির সার দেওয়া দোকান। জলপানির পয়সা তো থাকেই ব্যাগে, কিন্তু সে ভেঙে খাওয়া কখনো হয় না। কিন্তু সেদিন ইচ্ছে হল। সারাদিনের ক্লান্তিতে ব্যাগটা ও সত্যিই ভারি বোধ হচ্ছিল।
—ল, ব্যাগ খান ধর।
কৃতার্থ নকুল বলে—
—দ্যান দ্যান।
খুকু তো এই মুহূর্তে উদ্বাস্তু মেয়ে নয়। জমিদার তনয়া। বিকেলের সোনা গলানো রোদ ওর চাঁদ শরীর অলঙ্কারে মুড়ে দিয়েছে। নবীনের সামনে দিয়ে হেঁটে চলেছিল এক রাজেন্দ্রানী। উঠেছিল এক মিষ্টির দোকানে।
রে রে করে উঠেছিল নবীন।
—ওদিকে কই যান, কই যান দিদি।
—উঠ্ দোকানে উঠ্.. তর খিদা পায় নাই?
মাথা নত করে ঘাড় নাড়ে নবীন। অস্ফুটে বলে—
—নাহ্
গম্ভীর গলায় খুকু বলে—
—কিন্তু আমার পাইছে, এই পয়সা ধর এক প্লেট।
কইরা দুই জায়গায় কচুরি আর একখান কইরা জিলাপির অর্ডার দে দেহি। পালিত হয়েছে আজ্ঞা। নবীন খাচ্ছিল না প্রথমে। খুকুর ধমকে আস্তে আস্তে খেয়েছে। বসেনি খুকুর মুখোমুখি। পিছনের বেঞ্চে বসে খেয়েছে সাবধানে। দোকানের ক্রেতা বিক্রেতা সকলেই খুকুকে ফিরে ফিরে দেখছিল। নবীন আছে বলে খুকুর কোনও অস্বস্তি ছিল না। শক্তি সাহস আর সুখ তিনটিই একসঙ্গে সে-দিন খুকুর উজান বুকে মিঠে ঝড় তুলছিল। শক্তি আর সাহস নবীনের জন্য। আর সুখ পড়াশুনোর বিভোর স্বপ্নে। সেই আলো আর আবেগ কাউকে না পেয়ে নবীনের সঙ্গেই ভাগ করে নিচ্ছিল খুকু।
—জানস আইজ ইস্কুলে দিদিমণি আমারে বই দিছেন, এক্কেরে নিজে ডাইকা।
খুকুর পিছনের বেঞ্চিতে বসে নিঃশব্দ বিস্ময়ে অভিভূত নবীন। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে খুকু বলে চলে—
—বুঝলি নবীন, আমি লেখাপড়া শিখ্যা অনেক বড় হইব। সুধা গৌরীরেও ভালো কইরা পড়াশুনা শিখাইমু। পারুম না নবীন? তুই কি কস, তোর মতামতখান দে দেহি!
তাগড়া ভীম শরীরের সঙ্গে একেবারে খাপ না খাওয়া কাঁপা গলায় মধু মিশিয়ে নবীন বলে,
—পারবেনই তো দিদি, আপনে লিশ্চয় পারবেন। চল নবীন, চল, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। ফিরাই অঙ্ক করুম। অনেক হোম টাস্ক আছে।
—কতক্ষণ খাড়ায়া আছস?
—এইতো সামাইন্য
—চল তবে।
—আমারে আপনের ব্যাগখান দ্যান।
—ক্যান, তরে দিমু ক্যান
স্বরের তীক্ষ্ণতায় ভয় পায় নবীন। সব সময়।
আমতা করে বলেছিল—
—আপনের ভার লইয়া চলবার অভ্যাস নাই।
—সে আমি বুঝুম।
হন হন করে হাঁটছিল খুকু। সেভাবেই সে হাটে। আর হাত খানেক পিছনে নিঃশব্দ প্রহরী নবীন।
এমন করেই দিন যায়। খুকুর একদিন খিদে পেয়েছিল খুব। গলির ধারে তেলেভাজা মুড়ির সার দেওয়া দোকান। জলপানির পয়সা তো থাকেই ব্যাগে, কিন্তু সে ভেঙে খাওয়া কখনো হয় না। কিন্তু সেদিন ইচ্ছে হল। সারাদিনের ক্লান্তিতে ব্যাগটা ও সত্যিই ভারি বোধ হচ্ছিল।
—ল, ব্যাগ খান ধর।
কৃতার্থ নকুল বলে—
—দ্যান দ্যান।
খুকু তো এই মুহূর্তে উদ্বাস্তু মেয়ে নয়। জমিদার তনয়া। বিকেলের সোনা গলানো রোদ ওর চাঁদ শরীর অলঙ্কারে মুড়ে দিয়েছে। নবীনের সামনে দিয়ে হেঁটে চলেছিল এক রাজেন্দ্রানী। উঠেছিল এক মিষ্টির দোকানে।
রে রে করে উঠেছিল নবীন।
—ওদিকে কই যান, কই যান দিদি।
—উঠ্ দোকানে উঠ্.. তর খিদা পায় নাই?
মাথা নত করে ঘাড় নাড়ে নবীন। অস্ফুটে বলে—
—নাহ্
গম্ভীর গলায় খুকু বলে—
—কিন্তু আমার পাইছে, এই পয়সা ধর এক প্লেট।
কইরা দুই জায়গায় কচুরি আর একখান কইরা জিলাপির অর্ডার দে দেহি। পালিত হয়েছে আজ্ঞা। নবীন খাচ্ছিল না প্রথমে। খুকুর ধমকে আস্তে আস্তে খেয়েছে। বসেনি খুকুর মুখোমুখি। পিছনের বেঞ্চে বসে খেয়েছে সাবধানে। দোকানের ক্রেতা বিক্রেতা সকলেই খুকুকে ফিরে ফিরে দেখছিল। নবীন আছে বলে খুকুর কোনও অস্বস্তি ছিল না। শক্তি সাহস আর সুখ তিনটিই একসঙ্গে সে-দিন খুকুর উজান বুকে মিঠে ঝড় তুলছিল। শক্তি আর সাহস নবীনের জন্য। আর সুখ পড়াশুনোর বিভোর স্বপ্নে। সেই আলো আর আবেগ কাউকে না পেয়ে নবীনের সঙ্গেই ভাগ করে নিচ্ছিল খুকু।
—জানস আইজ ইস্কুলে দিদিমণি আমারে বই দিছেন, এক্কেরে নিজে ডাইকা।
খুকুর পিছনের বেঞ্চিতে বসে নিঃশব্দ বিস্ময়ে অভিভূত নবীন। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে খুকু বলে চলে—
—বুঝলি নবীন, আমি লেখাপড়া শিখ্যা অনেক বড় হইব। সুধা গৌরীরেও ভালো কইরা পড়াশুনা শিখাইমু। পারুম না নবীন? তুই কি কস, তোর মতামতখান দে দেহি!
তাগড়া ভীম শরীরের সঙ্গে একেবারে খাপ না খাওয়া কাঁপা গলায় মধু মিশিয়ে নবীন বলে,
—পারবেনই তো দিদি, আপনে লিশ্চয় পারবেন। চল নবীন, চল, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। ফিরাই অঙ্ক করুম। অনেক হোম টাস্ক আছে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১১৮: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৭

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
স্বপ্ন নদীর সীমা অসীমের জ্ঞান নেই। সীমা ভেঙে বয়ে যাওয়াতেই তার গৌরব। ভাঙনের সময় কুলের খেয়াল থাকলে চলে না। খুকু সেদিন নিদ্রায় এই প্রথম একখানা সুখের স্বপ্ন দেখল। কিন্তু খুকুর কপাল মন্দ। তার স্বপ্নে রাজপুত্তুর কোটালপুত্তুর নেই। হায় ভগবান! আছে নোকরপুত্র নবীন।
খুকু যখন স্বপ্ন দেখছিল ঠিক তখন সেই শব্দহীন রাতে নিভৃত নক্ষত্র সংগীতের মধ্যে তারা ভরা কালো আকাশের দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে ছিলেন সুনীতি। তাঁর দর্শন পথ বেয়ে শ্রবণেন্দ্রিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অলীক সুরের ধারা। ঘ্রাণপথে আসছিল গন্ধরাজের সুবাস। শরীর জুড়ে রোমাঞ্চ ।
দুশ্চিন্তার কাঁটাতার একটা একটা করে কোন অজ্ঞাতসারে ভেঙে যাচ্ছিল। কেন যেন মনেই পড়ছিল না সুনীতির তাঁর নিজের জীবনের দুঃস্বপ্নের বৃত্তটা কী কঠিন, কী প্রকাণ্ড!
খুকু যখন স্বপ্ন দেখছিল ঠিক তখন সেই শব্দহীন রাতে নিভৃত নক্ষত্র সংগীতের মধ্যে তারা ভরা কালো আকাশের দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে ছিলেন সুনীতি। তাঁর দর্শন পথ বেয়ে শ্রবণেন্দ্রিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অলীক সুরের ধারা। ঘ্রাণপথে আসছিল গন্ধরাজের সুবাস। শরীর জুড়ে রোমাঞ্চ ।
দুশ্চিন্তার কাঁটাতার একটা একটা করে কোন অজ্ঞাতসারে ভেঙে যাচ্ছিল। কেন যেন মনেই পড়ছিল না সুনীতির তাঁর নিজের জীবনের দুঃস্বপ্নের বৃত্তটা কী কঠিন, কী প্রকাণ্ড!
আরও পড়ুন:

৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস : জনগণপথপরিচায়ক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
সুনীতি জানেন ডিএল রায় স্ট্রিটের বাস তাদের তুলতেই হবে। বাস্তব কারণ একটা আছে। রাম ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ওকে হাওয়া বদলানোর জন্য সুনীতিদের বাক্স প্যাটরা পাত্তারি গুটিয়ে এবার রওনা হতে হবে কোনও অজানা সমুদ্রের মোহনায়। ঠিক আছে। যেতে যখন হবে তখন যাবেন। চিন্তা কীসের! আছেন তো তাঁর স্বামী মাথার ওপরে। আছে তো বড় বড় ছেলেরা। না হোক নিজের পেটের তাতে কী! মাতৃহারা সন্তান ওরা। শঙ্কু গোরা রাম মানুর থেকে সুনীতি দেবু শিবুকে কোনওদিন তো আলাদা করে দেখেননি। আর আছেন গুরুদেব! আকাশের নক্ষত্রমন্ডলীর রেখায় রেখায় তিনি মিশে আছেন। সপ্তর্ষিমণ্ডল কালপুরুষ নীহারিকার অখণ্ড মণ্ডল জুড়ে গুরুদেবের ধ্রুবতারা দৃষ্টি। মধ্য রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে সুনীতি গুরুর উদ্দেশ্যে প্রণতা হন ‘তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ’।
গুরু আছেন। তিনি ইষ্ট দেব। তাঁর পরম দেবতা। ঠিক রক্ষা করবেন! চাটাই পেতে হয়তো বা সেই শেষবারের মতো দোতলার ছাদে বসেছিলেন সুনীতি। ফুরফুরে বাতাস বইছিল। চারপাশ ব্যাপ্ত করে কৃষ্ণা অষ্টমীর অপার্থিব অন্ধকার। কোথাও আলো নেই, তবু এত আলো আসে কোথা থেকে কোন উৎস ভেদ করে! একলা সুনীতি নিঃশব্দে বসে থাকেন সেই জ্যোতির্বলয়ের মধ্যে।—চলবে।
গুরু আছেন। তিনি ইষ্ট দেব। তাঁর পরম দেবতা। ঠিক রক্ষা করবেন! চাটাই পেতে হয়তো বা সেই শেষবারের মতো দোতলার ছাদে বসেছিলেন সুনীতি। ফুরফুরে বাতাস বইছিল। চারপাশ ব্যাপ্ত করে কৃষ্ণা অষ্টমীর অপার্থিব অন্ধকার। কোথাও আলো নেই, তবু এত আলো আসে কোথা থেকে কোন উৎস ভেদ করে! একলা সুনীতি নিঃশব্দে বসে থাকেন সেই জ্যোতির্বলয়ের মধ্যে।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।
















