রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সুধা কিৎকিৎ খেলছিল আনমনে। মনটা ভারাক্রান্ত। ইদানিং ফুলদিকেও সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায় না। পাড়ার দু’ পাঁচটা ছেলে-মেয়ের সঙ্গে সখা সখী বানিয়ে নিয়েছে। এ-বাড়ি ও-বাড়ির ছাদে চড়ে কখনও ঘুড়ি ওড়ায়, মাঞ্জা বানায়, তালুতে রক্ত চিহ্ন লিখে আনে। গা শিউরে উঠলেও সেই সুধাকেই তখন খুঁজে পেতে লাল ওষুধ লাগাতে হয়। বরিক তুলো বুলিয়ে দিতে হয়। কলকাতায় এসে ফুল দি-র সাহস খুব বেড়েছে। সুযোগ পেলেই চলে যায় ঋষিকেশ পার্কে। ঝিনু এসে খবর দিয়েছে। ঝিনু বারণ করেছিল।

ফুল দি-কে চলে আসতে বলেছিল বারবার। বলেছিল, সুধাকে বলে দেবে। তো তাই শুনে নাকি ফুল দি মুখ বাঁকিয়ে বলেছে, ওই দুধ ভাতকে আমি কেয়ার করি না। হাডুডু খেলা পার্কের মাঠ ছাড়া হবে না!
সুধার কিছু করার নেই। ফুলদি তাকে তো আর ভয় পায় না। কিন্তু চিন্তার কথা হল সে কাউকেই ভয় পায় না। নমো নমো ভয় পায় শঙ্কর দাদাকে। আর বাবাকে। মাকে তো পাত্তাই দেয় না।
সুধার এখন বয়স নয়। কিন্তু বুঝে গিয়েছে মায়ের শরীরে এক ফোঁটা রাগ নেই। যে যা বলবে তাই করে দেবে চুপচাপ। মাকে তাই কেউই ভয় পায় না, আর সেই কারণেই আজকাল সুধার মায়ের উপরে ভারি রাগ হয়। সারাদিন ধরে রান্নাঘরে কি যে কাজ করছে কে জানে। মনিদা স্কুলের নাম করে ইস্টবেঙ্গল মাঠে খেলা দেখতে চলে যায়। দিদি বলছিল ক্লাসের পরীক্ষায় মনি দা ফেল করেছে। কত কষ্ট করে স্কুলে পাঠানো হল! শুধু এখনও ভর্তি হতে পেল না সুধা।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৭: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৬

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়

সব মিলিয়ে সুধার মন খারাপ। খারাপ মনের মধ্যে গুমড়ে উঠছে রাগ। একলা একলা কিৎকিৎ খেলায় ঠিক ঠিক করে দান পর্যন্ত পড়ছে না! মায়ের ওপর রাগটা ক্রমশ বাড়ছে। মায়ের আঁচল ধরা ওই মেয়ের কী যে হয়েছে! সুনীতি হাজার কাজের মধ্যেও টের পাচ্ছেন তাল ভঙ্গ হয়েছে কোথাও। আশেপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে যে মেয়ে সে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ছে! ধরাই দিচ্ছে না! এমনিতে সুনীতি জোর গলায় কথা বলেন না। দু’ চার বার ডাকলেন। অনুভব করলেন, আশেপাশেই আছে, কিন্তু আসছে না। কী হল মেয়েটার!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৯: রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, অনুক্ত কৈলাসচন্দ্র

সত্যিই লুকিয়ে আছে সুধা। এখন যেমন মায়ের থেকে কয়েক হাত পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে অপলকে দেখছে মাকেই। স্নান করা চুল গোছা ধরে নেমে এসেছে নিচে পিঁড়ি পর্যন্ত। একেবারে ডগাটা মুড়িয়ে গিঁট দেওয়া। লাল পাড় শাড়িটা কদিন আগেই ছোট মামা দিয়ে গিয়েছে। ছোট মামা কত কি যে দেয়! সব্জি-মিষ্টি-মাছ। যখন আসে তখনই ব্যাগ ভর্তি করে বাজার আনে। আর মাঝেমধ্যেই মায়ের দু’খানা করে শাড়ি। মা যাকে বলে মিলের শাড়ি। ধবধবে সাদা মেঝেতে টকটকে লাল পাড়। সেই পড়ে রান্নাঘরে তরকারি কাটছে মা। কত সুন্দর দেখাচ্ছে। ঝিনুর বাড়িতে উপেন্দ্রকিশোরের রঙিন ছবিওয়ালা বইতে ছড়ার পাশাপাশি এমন সুন্দর মায়েদের ছবি আঁকা ছিল দেখেছে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৯: সত্যব্রতের মুখোমুখি

সুধার মনখারাপ দিনের এক সন্ধেবেলাতে একটা আশ্চর্য খবর শোনা গেল। রোয়াকের লাল রঙটা তখন সন্ধের শ্যামলা রঙে মিশে কেমন যেন বর্ণহীন। তখনও লম্বা পোস্টের লাইট জ্বলেনি। ঘরে ঘরে শঙ্খ বাজছে সবে। সুধা রোয়াকের একধারে চুপ করে বসে ছিল। বাড়ির সামনের পিচ রাস্তা সটান মিশেছে বাস রাস্তায়। সুধা হাঁটুতে মুখ গুঁজে দেখলো একটা বাস থেকে রাঙা কাকা নামছেন। ওনাকে দেখলেই কেমন যেন খারাপ লাগা তৈরি হয় সুধার মনে। বোঝে এই লোকটা ওদের নিজেদের নয়। ওদের মানে তার মায়ের। বাবার কেমন এক ভাই। তবে বাবার চাইতে ভালোবাসে বেশি বড়দা ছোড়দাকে। খেয়াল করে দেখেছে সুধা। ওদের সঙ্গেই বেশি কথা বলে। সুধাদের দিকে এমন চোখে তাকায়!
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

বিশেষ করে সেদিন বড়দার ঘরে বসে কথা বলছিল। আর সুধা ঢুকতেই কি জোরে বললো—
—এই ছেমড়ি যা এহান থিক্যা কী চাই তোগো বুইনে বুইনে?
সুধাকে কেউ কোনওদিন এমন করে কথা বলেনি। বড়দাও আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল—
—কেন কাকা আসুক না, ও তো আমাদের ডল পুতুল।
কিন্তু সুধা চোখের জল গোপন করে দৌড়ে চলে গেল নিজেদের ঘরে। সব মিলিয়ে মন খারাপ আর মন খারাপ। এত মন খারাপ নিয়ে কী করবে সুধা! বুঝতে পারছে এ বাড়ির পাট এবার উঠে যাবে। রাঙা কাকা মূল ফটক দিয়ে ঢুকে গেলেন। সুধাকে দেখতে পাননি। সুধা রোয়াক ছেড়ে নেমে গলির অন্ধকারে লুকিয়ে পড়েছিল।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content