
খাঁচায় বন্দি কপোতী তার স্বামীর বিলাপ শুনে গৃহলক্ষ্মীর মতোই প্রজ্ঞার পরিচয় দিল। নিচ থেকে স্বামীকে আশ্বস্ত করে সে বলল, “প্রাণনাথ! এই ব্যাধ আমাকে খাঁচায় বন্দি করেছে বলে তুমি এর প্রতি অকারণ বিদ্বেষ দেখিও না। আজ আমি যে বন্দি, তা আমারই প্রাক্তন কর্মফল—স্বকৃতৈরেব বদ্ধ্যাঽহং প্রাক্তনৈঃ কর্মবন্ধনৈঃ। জীবনে দারিদ্র্য, রোগশোক কিংবা এই ব্যাধের হাতে বন্দিত্ব—এ সবই নিজের কৃতকর্মের পরিণাম। আজ যা কিছু অনিষ্ট হচ্ছে, তা আমারই পাপের ফসল—আত্মাপরাধবৃক্ষস্য ফলান্যেতানি দেহিনাম্। অর্থাৎ, প্রতিটি প্রাণী তার নিজের রোপণ করা অপরাধবৃক্ষের ফলই ভোগ করে। আমার এই দশার জন্য ব্যাধ দায়ী নয়, আমার ভাগ্যই দায়ী। তাই এই সত্য মেনে নিয়ে তুমি মন থেকে ক্রোধ দূর করো এবং গৃহস্থের ধর্ম পালন করো। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরা যেমন বিধান দিয়েছেন, ঠিক সেইভাবে এই বিপন্ন অভ্যাগত অতিথির সেবা করো।”
এখানে পঞ্চতন্ত্রকার কপোতীর মুখ দিয়ে ভারতীয় দর্শনের সেই চিরন্তন ‘কর্মফলবাদ’-এর কথাটিই কী সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন! অর্থাৎ, বর্তমানের চরম সংকটময় মুহূর্তেও অন্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে, পরিস্থিতিকে নিজের পূর্বকৃত কর্মের ফল বলে মেনে নাও এবং অবিচল চিত্তে বর্তমান কর্তব্য পালন করে যাও।
এখানে পঞ্চতন্ত্রকার কপোতীর মুখ দিয়ে ভারতীয় দর্শনের সেই চিরন্তন ‘কর্মফলবাদ’-এর কথাটিই কী সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন! অর্থাৎ, বর্তমানের চরম সংকটময় মুহূর্তেও অন্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে, পরিস্থিতিকে নিজের পূর্বকৃত কর্মের ফল বলে মেনে নাও এবং অবিচল চিত্তে বর্তমান কর্তব্য পালন করে যাও।
স্ত্রীর মুখে এমন সারগর্ভ ও যুক্তিপূর্ণ ধর্মকথা শুনে কপোত শান্ত হল। সে তখন গাছের ডাল থেকে নেমে ব্যাধের সামনে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, “হে ভদ্র! আপনাকে স্বাগত। আপনি নির্দ্বিধায় বলুন, আমি আপনার কী সেবা করতে পারি? আপনি কোনও কুণ্ঠাবোধ করবেন না, মনে করুন আপনি নিজের বাড়িতেই আছেন—সন্তাপং ন কর্তব্যঃ স্বগৃহে বর্ততে ভবান্।” পায়রাটির এমন আন্তরিক আপ্যায়নে ব্যাধ বিস্মিত হলো। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হে কপোত! শীতে আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে। দয়া করে আমাকে এই হাড়কাঁপানো শীতের হাত থেকে রক্ষা করো—হিমত্রাণং বিধীয়তাম্।”
ব্যাধের কথা শোনামাত্র কপোতটি উড়ে গিয়ে কোনও এক স্থান থেকে একটি জ্বলন্ত অঙ্গার বা আগুনের টুকরো ঠোঁটে করে নিয়ে এল এবং জড়ো করা শুকনো পাতার স্তূপের মধ্যে ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দিল। তারপর সে দ্রুত বিভিন্ন জায়গা থেকে শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে এনে সেই আগুনকে আরও প্রজ্জ্বলিত করে তুলল। আগুনের তাপে পরিবেশ কিছুটা উষ্ণ হলে সে ব্যাধকে বলল, “হে অতিথি! আপনি নির্ভয়ে এই আগুনে আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেঁকে নিন, শীত দূর হোক।”
কিন্তু এরপরই কপোতটি এক গভীর বিষাদে ডুবে গেল। সে ব্যাধের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন, আমরা বনবাসী প্রাণী, আমাদের কোনও সঞ্চয় নেই, দৈবক্রমে যা জোটে তাতেই আমরা দিন গুজরান করি। তাই আমার কাছে এমন কিছুই নেই যা দিয়ে আপনার ক্ষুধা আমি নিবারণ করতে পারি। এই জগতে বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রতিদিন হাজার জনকে, বা অন্তত দশ জনকেও অন্নদান করেন। কিন্তু আমি এমনই হতভাগ্য যে, নিজের উদরপূর্তির খাবারটুকুও সবসময় জোটে না।
ব্যাধের কথা শোনামাত্র কপোতটি উড়ে গিয়ে কোনও এক স্থান থেকে একটি জ্বলন্ত অঙ্গার বা আগুনের টুকরো ঠোঁটে করে নিয়ে এল এবং জড়ো করা শুকনো পাতার স্তূপের মধ্যে ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দিল। তারপর সে দ্রুত বিভিন্ন জায়গা থেকে শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে এনে সেই আগুনকে আরও প্রজ্জ্বলিত করে তুলল। আগুনের তাপে পরিবেশ কিছুটা উষ্ণ হলে সে ব্যাধকে বলল, “হে অতিথি! আপনি নির্ভয়ে এই আগুনে আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেঁকে নিন, শীত দূর হোক।”
কিন্তু এরপরই কপোতটি এক গভীর বিষাদে ডুবে গেল। সে ব্যাধের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন, আমরা বনবাসী প্রাণী, আমাদের কোনও সঞ্চয় নেই, দৈবক্রমে যা জোটে তাতেই আমরা দিন গুজরান করি। তাই আমার কাছে এমন কিছুই নেই যা দিয়ে আপনার ক্ষুধা আমি নিবারণ করতে পারি। এই জগতে বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রতিদিন হাজার জনকে, বা অন্তত দশ জনকেও অন্নদান করেন। কিন্তু আমি এমনই হতভাগ্য যে, নিজের উদরপূর্তির খাবারটুকুও সবসময় জোটে না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৩ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৩: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫১: সাইকেল মাহাতো অ্যান্ড কোং

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল
সত্যি বলতে, যে গৃহ স্থ তার দুয়ারে আগত একজন অতিথিকেও ভোজন করাতে পারে না, তার এই দুঃখময় সংসারে বেঁচে থেকে লাভ কী? অতিথি সেবা করাই গৃহস্থের পরম ধর্ম। কিন্তু সেই অতিথিকে যদি সামান্য অন্নও নিবেদন করা না যায়, তবে তার গৃহবাস আর বনবাসের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। তাই, ‘ঘরে কিছু নেই’—এই লজ্জার কথাটি যাতে আর কোনো প্রার্থীর সামনে উচ্চারণ করতে না হয়, তার জন্য এই অসার দেহটাকেই আমি বিসর্জন দেব—যথা ভূযো ন বক্ষ্যামি নাস্তীত্যর্থিসমাগমে। হে অতিথি, আমি আমার এই নশ্বর শরীর দিয়েই আপনার সেবা করব, আমার এই আতিথ্য আপনি গ্রহণ করুন।”
অতিথিকে ভোজন করাতে না পারার গ্লানিতে কপোত কেবল নিজেরই নিন্দা করল, নিজের অক্ষমতাকে ধিক্কার দিল; কিন্তু যে ব্যাধ তার স্ত্রীকে বন্দি করেছে, তার প্রতি বিন্দুমাত্র ঘৃণা প্রকাশ করল না। বরং সে ব্যাধকে আশ্বস্ত করে বলল, “হে ভদ্র! আপনি আর মুহূর্তকাল অপেক্ষা করুন, শীঘ্রই আমি আপনাকে তৃপ্ত করব—তর্পয়িষ্যে ত্বাং মুহূর্তং প্রতিপালয়।” এই বলে সেই মহাত্মা কপোতটি প্রফুল্ল চিত্তে জ্বলন্ত আগুনের চারদিকে প্রদক্ষিণ করল এবং তারপর কোনো এক যজ্ঞকুণ্ডে প্রবেশের মতো নির্ভীকভাবে সেই আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিল। যেন সে আগুনের মধ্যে নয়, পরম শান্তিতে নিজের ঘরে প্রবেশ করল।
অতিথিকে ভোজন করাতে না পারার গ্লানিতে কপোত কেবল নিজেরই নিন্দা করল, নিজের অক্ষমতাকে ধিক্কার দিল; কিন্তু যে ব্যাধ তার স্ত্রীকে বন্দি করেছে, তার প্রতি বিন্দুমাত্র ঘৃণা প্রকাশ করল না। বরং সে ব্যাধকে আশ্বস্ত করে বলল, “হে ভদ্র! আপনি আর মুহূর্তকাল অপেক্ষা করুন, শীঘ্রই আমি আপনাকে তৃপ্ত করব—তর্পয়িষ্যে ত্বাং মুহূর্তং প্রতিপালয়।” এই বলে সেই মহাত্মা কপোতটি প্রফুল্ল চিত্তে জ্বলন্ত আগুনের চারদিকে প্রদক্ষিণ করল এবং তারপর কোনো এক যজ্ঞকুণ্ডে প্রবেশের মতো নির্ভীকভাবে সেই আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিল। যেন সে আগুনের মধ্যে নয়, পরম শান্তিতে নিজের ঘরে প্রবেশ করল।
আরও পড়ুন:

ডাক দিয়েছ কোন সকালে?

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
নিজের চোখের সামনে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে ব্যাধ স্তম্ভিত হয়ে গেল। অগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকা সেই ছোট্ট প্রাণীটির ত্যাগের মহিমা দেখে তার পাষাণ হৃদয়ে হঠাৎ করুণার উদ্রেক হল।
পঞ্চতন্ত্রের পাতায় কপোতের এই আত্মাহুতির দৃশ্যটিকে আজকের পাঠকের কাছে নিছক ‘কবির কল্পনা’ বা ‘গল্পকথা’ বলে মনে হতে পারে। জীবজন্তু কি আর সত্যি সত্যি আগুনের লেলিহান শিখায় ওমন শান্তভাবে ঝাঁপ দিতে পারে? কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখি, এই দৃশ্য কেবল গল্প নয়, বরং প্রাচীন ভারতের এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে পাঠককে স্মরণ করতে বলবো সেই বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারের কথা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ অব্দে তিনি যখন ভারত থেকে পারস্যের সুসা নগরীতে ফিরে যাচ্ছেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন এক ভারতীয় দিগম্বর সাধু, যাঁকে গ্রিকরা বলত ‘কালানস’ (সম্ভবত তাঁর মূল নাম ছিল ‘কল্যাণ’)। বার্ধক্য আর অসুস্থতায় জরাজীর্ণ দেহকে যখন সেই সাধু আর বহন করতে চাইলেন না, তখন তিনি স্থির করলেন অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করবেন।
দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার সেদিন স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলেন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। রাজকীয় আড়ম্বরে চিতা সাজানো হল। গ্রিক সৈন্যরা তূর্যবাদন আর জয়ধ্বনি করতে লাগল। আর সেই কোলাহলের মাঝে ভারতীয় যোগী কালানস শান্ত, ধীর লয়ে চিতার ওপর গিয়ে পদ্মাসনে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, নেই কোনো কম্পন। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা যখন তাঁর শরীর স্পর্শ করল, তখনও তিনি অচল, অটল।
গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুতার্কতাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লাইফ অফ আলেকজান্ডার’ (Life of Alexander)-এ, আরিয়ানতাঁর ‘অ্যানাব্যাসিস অফ আলেকজান্ডার’ (Anabasis of Alexander) গ্রন্থে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি বিখ্যাত ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক স্ট্রাবো, যিনি মূলত আলেকজান্ডারের সমসাময়িক নাবিক ও ঐতিহাসিক ওনেসিক্রিটাস (Onesicritus)-এর বিবরণকে ভিত্তি করে লেখা তাঁর ‘জিওগ্রাফিকা’ (Geographica) গ্রন্থ লিখেছিলেন সেখানেও এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ডায়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) তাঁর লেখা বিশ্ব-ইতিহাস ‘বিবলিওথিকা হিস্টোরিকা’ (Bibliotheca historica)-তেও এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
পঞ্চতন্ত্রের পাতায় কপোতের এই আত্মাহুতির দৃশ্যটিকে আজকের পাঠকের কাছে নিছক ‘কবির কল্পনা’ বা ‘গল্পকথা’ বলে মনে হতে পারে। জীবজন্তু কি আর সত্যি সত্যি আগুনের লেলিহান শিখায় ওমন শান্তভাবে ঝাঁপ দিতে পারে? কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখি, এই দৃশ্য কেবল গল্প নয়, বরং প্রাচীন ভারতের এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে পাঠককে স্মরণ করতে বলবো সেই বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারের কথা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ অব্দে তিনি যখন ভারত থেকে পারস্যের সুসা নগরীতে ফিরে যাচ্ছেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন এক ভারতীয় দিগম্বর সাধু, যাঁকে গ্রিকরা বলত ‘কালানস’ (সম্ভবত তাঁর মূল নাম ছিল ‘কল্যাণ’)। বার্ধক্য আর অসুস্থতায় জরাজীর্ণ দেহকে যখন সেই সাধু আর বহন করতে চাইলেন না, তখন তিনি স্থির করলেন অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করবেন।
দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার সেদিন স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলেন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। রাজকীয় আড়ম্বরে চিতা সাজানো হল। গ্রিক সৈন্যরা তূর্যবাদন আর জয়ধ্বনি করতে লাগল। আর সেই কোলাহলের মাঝে ভারতীয় যোগী কালানস শান্ত, ধীর লয়ে চিতার ওপর গিয়ে পদ্মাসনে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, নেই কোনো কম্পন। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা যখন তাঁর শরীর স্পর্শ করল, তখনও তিনি অচল, অটল।
গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুতার্কতাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লাইফ অফ আলেকজান্ডার’ (Life of Alexander)-এ, আরিয়ানতাঁর ‘অ্যানাব্যাসিস অফ আলেকজান্ডার’ (Anabasis of Alexander) গ্রন্থে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি বিখ্যাত ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক স্ট্রাবো, যিনি মূলত আলেকজান্ডারের সমসাময়িক নাবিক ও ঐতিহাসিক ওনেসিক্রিটাস (Onesicritus)-এর বিবরণকে ভিত্তি করে লেখা তাঁর ‘জিওগ্রাফিকা’ (Geographica) গ্রন্থ লিখেছিলেন সেখানেও এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ডায়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) তাঁর লেখা বিশ্ব-ইতিহাস ‘বিবলিওথিকা হিস্টোরিকা’ (Bibliotheca historica)-তেও এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৮: পরবাস প্রস্তুতি (চার)

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
গ্রিক ঐতিহাসিকরা সকলেই বিস্ময়ের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, আগুনের তীব্র দহনেও কালানসের একটি পেশিও কাঁপেনি, তাঁর মুখমণ্ডল ছিল গভীর ধ্যানে মগ্ন—যেন তিনি আগুনের মাঝে বসে নেই, বসে আছেন নিজেরই গৃহের শান্ত ছায়ায়। ঠিক আমাদের গল্পের এই কপোতটির মতোই— “যেন সে আগুনের মধ্যে নয়, পরম শান্তিতে নিজের ঘরে প্রবেশ করল।”
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পঞ্চতন্ত্র যখন রচিত হচ্ছে, তখন (বা তারও আগে থেকে) ভারতে শ্রমণধর্ম (বৌদ্ধ, জৈন বা আজীবক) বা কঠোর তপস্বীদের মধ্যে দেহ সম্পর্কে এক চরম অনাসক্তি বা নির্মোহ ভাব প্রচলিত ছিল। শরীরকে তাঁরা কেবল একটি ‘জীর্ণ বস্ত্র’ বা ‘পুরোনো পোশাক’ মনে করতেন, যা প্রয়োজন ফুরালে আগুনে পুড়িয়ে বা ত্যাগ করতে তাঁদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হতো না। কপোতের এই আত্মদান তাই কেবল গল্প নয়, এটি সেই যুগের ভারতীয় ঋষি-মানসেরই এক রূপক—যেখানে নশ্বর দেহের মায়া ত্যাগ করে দেওয়াটা ছিল পরম বীরত্বের ও শান্তির লক্ষণ।
সেদিনও সেই ব্যাধটিসেই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে নিজের মনেই ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল, “পণ্ডিতেরা যথার্থই বলেন, যে মানুষ পাপ কাজ করে, সে আসলে নিজেকে ভালোবাসে না। কারণ নিজের কুকর্মের ফল তো দিনশেষে নিজেকেই ভোগ করতে হয়। পাপের পরিণাম শুধুই দুঃখ। যে ব্যক্তি দুঃখ চায় না, তাকে পাপ থেকেও বিরত থাকতে হয়। হায়! আমি সারাজীবন কেবল দুষ্টবুদ্ধি আর দুষ্কর্মের জালেই জড়িয়ে ছিলাম। এই মহাত্মা কপোতটি নিজের মাংস আমাকে ভোজনের জন্য উৎসর্গ করে আমার মতো নির্দয় ব্যাধের চোখের সামনে ত্যাগের এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেল। আর আমি? আমার গন্তব্য যে নিশ্চিত মহানরক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই!”
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পঞ্চতন্ত্র যখন রচিত হচ্ছে, তখন (বা তারও আগে থেকে) ভারতে শ্রমণধর্ম (বৌদ্ধ, জৈন বা আজীবক) বা কঠোর তপস্বীদের মধ্যে দেহ সম্পর্কে এক চরম অনাসক্তি বা নির্মোহ ভাব প্রচলিত ছিল। শরীরকে তাঁরা কেবল একটি ‘জীর্ণ বস্ত্র’ বা ‘পুরোনো পোশাক’ মনে করতেন, যা প্রয়োজন ফুরালে আগুনে পুড়িয়ে বা ত্যাগ করতে তাঁদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হতো না। কপোতের এই আত্মদান তাই কেবল গল্প নয়, এটি সেই যুগের ভারতীয় ঋষি-মানসেরই এক রূপক—যেখানে নশ্বর দেহের মায়া ত্যাগ করে দেওয়াটা ছিল পরম বীরত্বের ও শান্তির লক্ষণ।
সেদিনও সেই ব্যাধটিসেই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে নিজের মনেই ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল, “পণ্ডিতেরা যথার্থই বলেন, যে মানুষ পাপ কাজ করে, সে আসলে নিজেকে ভালোবাসে না। কারণ নিজের কুকর্মের ফল তো দিনশেষে নিজেকেই ভোগ করতে হয়। পাপের পরিণাম শুধুই দুঃখ। যে ব্যক্তি দুঃখ চায় না, তাকে পাপ থেকেও বিরত থাকতে হয়। হায়! আমি সারাজীবন কেবল দুষ্টবুদ্ধি আর দুষ্কর্মের জালেই জড়িয়ে ছিলাম। এই মহাত্মা কপোতটি নিজের মাংস আমাকে ভোজনের জন্য উৎসর্গ করে আমার মতো নির্দয় ব্যাধের চোখের সামনে ত্যাগের এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেল। আর আমি? আমার গন্তব্য যে নিশ্চিত মহানরক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই!”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
অনুতপ্ত ব্যাধ তখন প্রতিজ্ঞা করল, “আজ থেকে আমিও সমস্ত রকম সুখভোগ ত্যাগ করলাম। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ যেমন জলাশয়ের জল শুকিয়ে দেয়, তেমনই আমিও কঠোর তপস্যায় আমার শরীরের সমস্ত মেদ-মাংস শুকিয়ে ফেলব—তোয়ং স্বল্পং যথা গ্রীষ্মঃ শোষয়িষ্যাম্যহং পুনঃ। এখন থেকে আমি শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুকে উপেক্ষা করে, শরীরের মায়া ত্যাগ করে কেবল উপবাসের মাধ্যমেই পরম ধর্মের আচরণ করব—উপবাসৈর্বহুবিধৈশ্চরিষ্যে ধর্মমুত্তমম্।”
গল্পের এই অংশে এসে পাঠক হিসেবে আমাদের একটু থামতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নিছক ত্যাগের গল্প মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতের এক বিরাট দার্শনিক পালাবদলের ইঙ্গিত।
গল্পটিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখানে দুটি ভিন্ন জীবনদর্শনের সংঘাত ও সমন্বয় ঘটেছে। একদিকে রয়েছে ‘ব্যাধ’, যে আদতে হিংস্রতার প্রতীক, আর অন্যদিকে ‘কপোত’, যে আত্মত্যাগের প্রতীক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ব্যাধের চরিত্রটি এখানে তৎকালীন বৈদিক যজ্ঞ-সংস্কৃতির একটি নেতিবাচক বা স্থূল রূপক হিসেবেওকাজ করছে, যেখানে প্রাণিবলি বা হিংসার স্থান ছিল। অন্যদিকে কপোতের আত্মাহুতি এবং পরবর্তীকালে ব্যাধের ‘উপবাস’ ও কৃচ্ছ্রসাধনের সংকল্প—এগুলি মূলত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের (শ্রমণ সংস্কৃতির) মূল সুর।
বৈদিক আর্য সংস্কৃতিতে ‘গৃহস্থ’ জীবন এবং ‘যজ্ঞ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ‘অগ্নিষ্টোম’ বা সোমযাগের মতো অনুষ্ঠানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়ার নিয়ম আছে, এবং যজ্ঞশেষে সেই প্রসাদ গ্রহণেরও বিধান আছে। বৈদিক ধর্মে শরীরকে কষ্ট দিয়ে শুকিয়ে ফেলা বা ‘উপবাস’ করে মৃত্যুকে বরণ করাকে খুব একটা সমর্থন করা হয়নি, বরং একে অনেক ক্ষেত্রে পাপ বা অকর্তব্য মনে করা হতো। বৈদিক ঋষিরা দীর্ঘায়ু ও সুস্থ শরীরের কামনা করতেন।
কিন্তু এই গল্পে আমরা কী দেখছি? অনুতপ্ত ব্যাধ যখন ধর্মের পথে ফিরতে চাইল, সে কিন্তু যজ্ঞ করল না, সে বেছে নিল ‘উপবাস’ ও শরীর শোষণের পথ। সে বলল, “উপবাসের মাধ্যমেই আমি উত্তম ধর্ম আচরণ করব।” এই যে সুখভোগ ত্যাগ করে, শরীরকে কষ্ট দিয়ে, উপবাসের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তির সন্ধান—এটি নির্ভেজাল শ্রমণ (বৌদ্ধ ও জৈন) প্রভাব। অর্থাৎ, পঞ্চতন্ত্রকার অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে গল্পের ছলে এমন এক সন্ধিক্ষণের ছবি এঁকেছেন, যেখানে বৈদিক কর্মকাণ্ডের (হিংসা বা বলির) চেয়ে অহিংসা এবং ত্যাগের আদর্শকে ‘পরম ধর্ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ব্যাধের কণ্ঠে উপবাসের জয়গান আসলে তৎকালীন ভারতীয় সমাজে শ্রমণ মতাদর্শের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই এক সাহিত্যিক দলিল। যেখানে দেখানো হচ্ছে, ভোগ বা যজ্ঞ নয়, ত্যাগ ও সংযমই হলো চিত্তশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।—চলবে।
গল্পের এই অংশে এসে পাঠক হিসেবে আমাদের একটু থামতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নিছক ত্যাগের গল্প মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতের এক বিরাট দার্শনিক পালাবদলের ইঙ্গিত।
গল্পটিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখানে দুটি ভিন্ন জীবনদর্শনের সংঘাত ও সমন্বয় ঘটেছে। একদিকে রয়েছে ‘ব্যাধ’, যে আদতে হিংস্রতার প্রতীক, আর অন্যদিকে ‘কপোত’, যে আত্মত্যাগের প্রতীক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ব্যাধের চরিত্রটি এখানে তৎকালীন বৈদিক যজ্ঞ-সংস্কৃতির একটি নেতিবাচক বা স্থূল রূপক হিসেবেওকাজ করছে, যেখানে প্রাণিবলি বা হিংসার স্থান ছিল। অন্যদিকে কপোতের আত্মাহুতি এবং পরবর্তীকালে ব্যাধের ‘উপবাস’ ও কৃচ্ছ্রসাধনের সংকল্প—এগুলি মূলত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের (শ্রমণ সংস্কৃতির) মূল সুর।
বৈদিক আর্য সংস্কৃতিতে ‘গৃহস্থ’ জীবন এবং ‘যজ্ঞ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ‘অগ্নিষ্টোম’ বা সোমযাগের মতো অনুষ্ঠানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়ার নিয়ম আছে, এবং যজ্ঞশেষে সেই প্রসাদ গ্রহণেরও বিধান আছে। বৈদিক ধর্মে শরীরকে কষ্ট দিয়ে শুকিয়ে ফেলা বা ‘উপবাস’ করে মৃত্যুকে বরণ করাকে খুব একটা সমর্থন করা হয়নি, বরং একে অনেক ক্ষেত্রে পাপ বা অকর্তব্য মনে করা হতো। বৈদিক ঋষিরা দীর্ঘায়ু ও সুস্থ শরীরের কামনা করতেন।
কিন্তু এই গল্পে আমরা কী দেখছি? অনুতপ্ত ব্যাধ যখন ধর্মের পথে ফিরতে চাইল, সে কিন্তু যজ্ঞ করল না, সে বেছে নিল ‘উপবাস’ ও শরীর শোষণের পথ। সে বলল, “উপবাসের মাধ্যমেই আমি উত্তম ধর্ম আচরণ করব।” এই যে সুখভোগ ত্যাগ করে, শরীরকে কষ্ট দিয়ে, উপবাসের মাধ্যমে মোক্ষ বা মুক্তির সন্ধান—এটি নির্ভেজাল শ্রমণ (বৌদ্ধ ও জৈন) প্রভাব। অর্থাৎ, পঞ্চতন্ত্রকার অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে গল্পের ছলে এমন এক সন্ধিক্ষণের ছবি এঁকেছেন, যেখানে বৈদিক কর্মকাণ্ডের (হিংসা বা বলির) চেয়ে অহিংসা এবং ত্যাগের আদর্শকে ‘পরম ধর্ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ব্যাধের কণ্ঠে উপবাসের জয়গান আসলে তৎকালীন ভারতীয় সমাজে শ্রমণ মতাদর্শের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই এক সাহিত্যিক দলিল। যেখানে দেখানো হচ্ছে, ভোগ বা যজ্ঞ নয়, ত্যাগ ও সংযমই হলো চিত্তশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















