কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয় মহাযজ্ঞে যুধিষ্ঠিরপ্রদত্ত অর্ঘ্যর গ্রহীতা কে হবেন? কুরুকুলের প্রবীণতম, পিতামহ ভীষ্মের মতে, কৃষ্ণ এই অর্ঘ্যদানের সুযোগ্য পাত্র। কৃষ্ণকে অর্ঘ্যদান করা হল। উপস্থিত রাজবৃন্দের মধ্যে চেদিরাজ শিশুপালের এই বিষয়ে প্রবল আপত্তি। তিনি কৃষ্ণকে অর্ঘ্যদানের যোগ্য পাত্র বলে মনে করেন না। বহু সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাঁদের উপেক্ষা করে কৃষ্ণকে এই সম্মানপ্রদান কেন? এর প্রতিবাদে শিশুপাল স্বপক্ষের রাজাদের সঙ্গে নিয়ে সভা পরিত্যাগ করতে উদ্যত হলেন। আহ্বায়ক রাজা যুধিষ্ঠির দ্রুত শিশুপালকে অনুসরণ করলেন এবং তাঁকে মধুরবচনে অনুনয়সহকারে বললেন, শিশুপালের বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত নয়। কটুকথা বলা (হৃদয়বিদারক) অধর্ম এবং অর্থহীন। রাজা, রাজধর্ম বোঝেন না, এমন হয় না। ইনি শান্তনুপুত্র ভীষ্ম, তাঁকে অন্যথা করে (ইতরব্যক্তির মতো) অবমাননা করবেন না। ন হি ধর্ম্মং পরং জাতু নাববুধ্যেত পার্থিবঃ। ভীষ্মঃ শান্তনবস্ত্বেনং মাবমংস্থাস্ত্বমন্যথা।।

যুধিষ্ঠির চেদিরাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, শিশুপাল দেখুন, উপস্থিত তাঁর থেকেও প্রবীনতম বহু রাজা কৃষ্ণের এই সম্মানযোগ্য পূজা সহ্য করছেন, তাঁদের মতো শিশুপালও সহ্য করতে পারেন। যুধিষ্ঠিরের মতে ভীষ্ম কৃষ্ণকে যথার্থরূপে গভীরভাবে জানেন। এই কুরুমুখ্য(ভীষ্ম) যেমন তাঁকে (কৃষ্ণকে) জানেন, আপনি তাঁকে তেমন জানেন না। নহ্যেনং ত্বং তথা বেদ যথৈনং বেদ কৌরবঃ।

পিতামহ ভীষ্ম, যুধিষ্ঠিরের বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তিজাল বিস্তার করলেন। শিশুপালকে অনুনয় করা ঠিক নয়, সে সান্ত্বনাদানেরও যোগ্য নয়। কারণ, পৃথিবীর প্রবীণতম ব্যক্তিত্ব তিনি কৃষ্ণের পূজায় যিনি সহমত নন। কৃষ্ণের গুরুত্ব কেন?ভীষ্ম ব্যাখ্যা করলেন, যে যুদ্ধজয়ী শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়, যুদ্ধে, ক্ষত্রিয়কে জয় করে এবং বশে এনেও মুক্ত করে, তিনিই গুরু।
এই সভায় উপস্থিত এমন কোনও রাজা নেই যিনি যুদ্ধে কৃষ্ণের শৌর্যে অপরাজিত থেকেছেন এমন। ভীষ্ম জানালেন, অচ্যুত কৃষ্ণ শুধু তাঁদের অর্চনীয় নয়, মহাবাহু কৃষ্ণ ত্রিলোকের পূজ্য। কৃষ্ণ কেন পূজনীয়? ভীষ্ম তাঁর বক্তব্য যুক্তি-সহ প্রতিষ্ঠিত করলেন। তাঁর মতে, কৃষ্ণ, যুদ্ধে বহু ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠদের জয় করেছেন। সমগ্র জগৎ বৃষ্ণিবংশীয় কৃষ্ণে সার্বিকভাবে অবস্থানরত। তাই প্রবীণরা আছেন,তবুও আমি কৃষ্ণের অর্চনা করছি,অন্য কাউকে নয়। জগৎ সর্ব্বঞ্চ বার্ষ্ণেয়ে নিখিলেন প্রতিষ্ঠিতম্। তস্মাৎ সৎস্বপি বৃদ্ধেষু কৃষ্ণমর্চ্চামি নেতরান্।। চেদিরাজকে সতর্ক করলেন ভীষ্ম। এমন কথা বলা শিশুপালের সাজে না। এমন বুদ্ধিও যেন তাঁর না হয়।ভীষ্ম জানালেন, (কৃষ্ণের স্বরূপ উপলব্ধির জন্যে) ভীষ্ম বহু জ্ঞানবৃদ্ধ মানুষের সেবা করেছেন। সমাগত জ্ঞানবৃদ্ধদের কথায়, গুণবান কৃষ্ণের বহু প্রশংসিত গুণবৃত্তান্ত ভীষ্ম শুনেছেন।মানুষের মুখে বুদ্ধিমান কৃষ্ণের জন্মাবধি বহু কীর্তিকলাপের বৃত্তান্ত তিনি শুনেছেন। ভীষ্ম অকপটে জানালেন, কৃষ্ণের প্রতি এই আন্তরিক শ্রদ্ধার কারণ যথেচ্ছ নয়, (বৈবাহিক) সম্বন্ধহেতু নয়, (শত্রুবধ করে) কৃতার্থ করেছেন বলে নয়, পৃথিবীতে প্রাণীদের জন্যে সুখকর তাই সজ্জনদের পূজ্য কৃষ্ণকে আমরা অর্চনা করি। ন সম্বন্ধং পুরস্কৃত্য কৃতার্থং বা কথঞ্চন। অর্চ্চামহেঽর্চ্চিতং সদ্ভির্ভুবি ভূতসুখাবহম্।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৭০: রাবণ কে? রামায়ণের রাবণ কী আজও নেই?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

ভীষ্ম বিশদে জানালেন, কৃষ্ণের যশ, শৌর্য এবং বিজয়সম্বন্ধে বিশেষভাবে জেনে তাঁকে তাঁরা পূজা করেছেন। অতিবালকের পরীক্ষা না নিয়ে এমন নয়, গুণের জন্যে জ্ঞানবৃদ্ধদের অতিক্রম করে, হরিকেই পূজনীয় মনে করেছেন। ব্রাহ্মণদের মধ্যে যিনি জ্ঞানবৃদ্ধ, ক্ষত্রিয়দের মধ্যে বলাধিক্য আছে যাঁর তিনি, বৈশ্যদের মধ্যে ঐশ্বর্য ও ধান আছে যাঁর এবং শূদ্রদের মধ্যে জন্ম হতে যিনি বয়সে বৃদ্ধ, তাঁরা সকলেই বৃদ্ধ বলে পরিগণিত হন। কৃষ্ণের আছে বেদবেদাঙ্গের জ্ঞান এবং অপরিমিত বল। ইহলোকে কেশব ছাড়া আর কে বিশিষ্ট ব্যক্তি আছেন? দানধর্ম, কর্মকুশলতা, শাস্ত্রজ্ঞান, শৌর্য, লজ্জা, কীর্তি, উত্তম বুদ্ধি, বিনয়, সমৃদ্ধি, ধৈর্য, পুষ্টি ও তুষ্ট এই সব সর্বদাই অচ্যুত কৃষ্ণের আছে। ভীষ্ম, সমবেত সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন— লোকাচারসম্পন্ন কৃষ্ণ আচার্য, পিতা, গুরু, অর্ঘ্যদানের যোগ্য। তাঁকে অর্চনা করেছেন। সর্ব্বে সংক্ষন্তুমর্হথ। তাঁর এই কাজ ক্ষমার যোগ্য। কৃষ্ণ ঋত্বিক, গুরু, আত্মীয়তায় সম্বন্ধযুক্ত, স্নাতক, রাজা, শুভাকাঙ্খী ও প্রিয়জন। এই সবকিছুই মিলিয়ে হৃষীকেশ কৃষ্ণ। তাই অর্চিত হয়েছেন অচ্যুত কৃষ্ণ।
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

কৃষ্ণই জগতের উৎপত্তিস্থান, কৃষ্ণ লয়স্থান, কৃষ্ণ এই বিশ্বচরাচরের নিমিত্ত বা কারণ। কৃষ্ণই অপ্রকাশিতা প্রকৃতি, তিনি চিরন্তন কর্তা বা স্রষ্টা। কৃষ্ণ সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে সর্বোত্তম তাই তিনি শ্রেষ্ঠ পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। বুদ্ধি অর্থাৎ অহঙ্কার, মননোপযোগী একাদশ ইন্দ্রিয়, বায়ু, তেজ,জল, আকাশ, পৃথিবী—এই সব কিছু কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত। সূর্য,চন্দ্র, নক্ষত্রগুলি, গ্রহসমূহ, দিগ্বিদিক সমস্ত কৃষ্ণেই স্থিত। বেদবিধিতে অগ্নিহোত্রযাগের বিধি মুখ্য, বেদের মুখ হল গায়ত্রীছন্দ, রাজা হলেন মানুষের মুখ, নদীদের মুখ সাগর। নক্ষত্রগুলিতে মুখ্য হলেন চন্দ্র, তেজগুলির মুখ সূর্য, পর্বতগুলির মুখ মেরুপর্বত, বিহঙ্গদের প্রধান গরুড়। পৃথিবীর ঊর্ধ্ব, মধ্য ও নীচ এবং দেবলোকের যাবতীয় পদার্থের মধ্যে প্রধান হলেন কেশব কৃষ্ণ। সবখানে সতত কৃষ্ণ বিরাজমান — এটাই এই বালক পুরুষ (শিশুপাল) অবগত নয়, তাই সে এমন কথা বলছে। যে বুদ্ধিমান মানুষ শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসন্ধানরত তিনি ধর্মকে যেভাবে জানেন তেমনভাবে জানেন না এই চেদিরাজ শিশুপাল। বৃদ্ধ ও বলবান-সহ মহান রাজাদের মধ্যে কে কৃষ্ণকে যোগ্য মনে করেন না? কেই বা এনাকে পূজা করেন না? শিশুপাল যদি এই পূজা ন্যায়সঙ্গত হয়নি বলে মনে করেন, তবে শিশুপাল যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে পারেন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮১ : আকাশ এখনও মেঘলা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

আয়োজক যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়মহাযজ্ঞে উপস্থিত রাজবৃন্দের মধ্যে চেদিরাজ শিশুপাল মহা গোলযোগ শুরু করলেন। কারণ, কুরুকুলের প্রবীণতম পুরুষ, পিতামহ ভীষ্ম।তাঁর পরামর্শ-অনুযায়ী যুধিষ্ঠির বৃষ্ণিবংশীয় কৃষ্ণকে পূজার্ঘ্য নিবেদন করে বরণ করেছেন। এই বিষয়ে চেদিরাজের ঘোর আপত্তি। সভাপরিত্যাগে উদ্যত শিশুপালকে বাধা দিলেন রাজা যুধিষ্ঠির। যুধিষ্ঠির কোমল ভাষায় তাঁকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন। কর্কশভাষার প্রয়োগ অধর্ম এবং নিরর্থক। যুধিষ্ঠির বাক্যপ্রয়োগের সংযমের ওপরে গুরুত্ব আরোপ করলেন। বস্তুত যে কঠোর বচন, স্থিতাবস্থা ব্যাহত করে, তা অধর্ম, যা যুক্তিযুক্ত নয় অথচ অপরের মনে কষ্ট দেয়, মর্ম ভেদ করে তা সঙ্গত নয়। নেদং যুক্তং মহীপাল! যাদৃশং বৈ ত্বমুক্তবান্। অধর্ম্মশ্চ পরো রাজন্! পারুষ্যঞ্চ নিরর্থকম্।। অর্থহীন অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক দুর্বাক্যপ্রয়োগবিষয়ে যুধিষ্ঠিরের অভিমত বর্তমানযুগের রাজনৈতিক আবহে প্রাসঙ্গিক বললে বোধ হয় ভুল হবে না। যুধিষ্ঠিরের মতে, শান্তনুপুত্র ভীষ্ম, কৃষ্ণকে যথার্থরূপে গভীরভাবে জানেন, তাঁর এই জ্ঞান, শিশুপালের অজ্ঞাত। বেদ তত্ত্বেন কৃষ্ণং হি ভীষ্মশ্চেদিপতে! ভৃশম্। নহ্যেনং ত্বং তথা বেত্থ যথৈনং বেদ কৌরবঃ।। মাননীয় ভীষ্মের সেই জ্ঞান কেমন? শিশুপালের প্রতিটি যুক্তি নস্যাৎ করে নিজের বক্তব্যের যৌক্তিকতা যেন প্রমাণ করলেন প্রবীণতম কৌরব ভীষ্ম। যথার্থজ্ঞান— তাত্ত্বিকজ্ঞান ও প্রত্যক্ষজ্ঞানের সমন্বয় যদি মনে করা হয় তবে শিশুপালের প্রথম যুক্তি ছিল, কথং হ্যরাজা দাশার্হো মধ্যে সর্ব্বমহীক্ষিতাম্। অর্হণামর্হতি তথা যথা যুষ্মাভিরর্চ্চিতঃ।।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৮ : পথে এবার নাম সাথী

রাজা না হয়েও কৃষ্ণ কেন অর্চিত হল? ভীষ্মের যুক্তি হল, একজন ক্ষত্রিয় যিনি অপর ক্ষত্রিয়কে জয় করে, আনুগত্য আদায় করবার পরে বিজিতকে মুক্তি দান করেন, তিনি গুরুর সম্মান লাভ করেন। সভায় এমন কোন রাজা নেই যিনি কৃষ্ণের কাছে পরাজিত হননি। তাই তিনি ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠদের বিজেতা। ত্রিলোকের পূজ্য তিনি। বাহুবলের শ্রেষ্ঠত্বের নিরিখে, বিশ্বজয়ী শক্তিমান যিনি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদী, প্রশ্নাতীত। তাই বাহুবলের আধার যদি ক্ষত্রিয় হন তবে কৃষ্ণ শুধু রাজপদের যোগ্য নন, তিনি অদ্বিতীয় বটে। যিনি বিশ্বজগতের সুস্থিতির ধারক ও বাহক, তিনি এমন নির্ভরতার আশ্রয়। ভীষ্ম জানিয়েছেন, তাই বহু প্রবীণ উপস্থিত থাকলেও আমিকৃষ্ণের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত ভীষ্ম, নিজের বক্তব্যের সমর্থনে ঘোষণা করেছেন অর্চ্চামহেঽর্চ্চিতং সদ্ভির্ভুবি ভূতসুখাবহম্। জগতের সকল প্রাণীদের কল্যাণকামী ভীষ্মের মতে, সমস্ত প্রাণীদের জন্যে মঙ্গলকর কৃষ্ণ, সজ্জনদের পূজ্য। তাই আমি কৃষ্ণের পুজো করি। শিশুপাল বয়োবৃদ্ধ গুরুজনের উল্লেখ করে বলেছিলেন, কৃষ্ণপিতা বসুদেব কেন পূজনীয় নন? ভীষ্মের বিবেচনায়, ক্ষত্রিয়দের জন্যে বলের আধিক্য বৃদ্ধত্বের মাপকাঠি। ক্ষত্রিয়াণাং বলাধিকঃ ক্ষত্রিয়দের বৃদ্ধত্বের পরীক্ষায় কৃষ্ণ সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। যশঃ শৌর্য্যং জয়ঞ্চাস্য বিজ্ঞায়ার্চ্চাং প্রযুঞ্জ্মহে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

ভীষ্ম, বৃদ্ধত্বের নিরিখে কৃষ্ণের যোগ্যতা প্রতিপাদন করেছেন। তাঁর মতে যশ, শৌর্য ও জয়লাভের ক্ষমতা এই তিনটির বিচারে অর্ঘ্যগ্রহণের পাত্ররূপে কৃষ্ণ যোগ্যতম। ভীষ্ম, গুণৈর্বৃদ্ধানতিক্রম্য হরিরর্চ্চ্যতমো মতঃ। গুণাধিক্যের কারণে হরিকে প্রধান অর্চনীয় বলে মনে করেন। পূজনীয় কারা?তার সংজ্ঞা ভীষ্মের বর্ণনায় আরও স্বচ্ছ হয়েছে। কৃষ্ণ জ্ঞানী এবং অসীম শক্তির আধার, এই দুটি পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাপক। তাই কেশব বিশিষ্ট অনন্য। ভীষ্ম এই দুটি ছাড়াও কৃষ্ণের যে গুণগুলির উল্লেখ করেছেন সেগুলি যে কোন মহান ব্যক্তিত্বের চারিত্রিক ভূষণ। দানং দাক্ষ্যং শ্রুতং শৌর্য্যং হ্রীঃ কীর্ত্তির্বুদ্ধিরুত্তমা। সন্নতিঃ শ্রীর্ধৃতিঃ পুষ্টিস্তুষ্টিশ্চ নিয়তাচ্যুতে।। কৃষ্ণের মতো দান, দক্ষতা, জ্ঞান, শৌর্য, লজ্জাবোধ, কীর্তি, শ্রেষ্ঠবুদ্ধি, বিনয়, সমৃদ্ধি, ধৈর্য, পুষ্টি, তুষ্টি নিয়ত উপস্থিত যাঁদের মধ্যে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ। কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পথপ্রদর্শক, পিতৃতুল্য শুভাকাঙ্খী, গুরুতুল্য ক্ষমাশীল, তাই তিনি সম্মানীয়। যজ্ঞের ব্যবস্থাপক, গুরুতুল্য সদুপদেশদাতা, আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ, স্নাতক গার্হস্থ্যজীবনের সঙ্গী, তিনি রাজার রাজা অর্থাৎ মনোজগতের অধীশ্বর, প্রিয় সখা, তিনি এই সব কিছু, তাই তিনি পূজ্য। যেন ভারতের অন্তরাত্মার কৃষ্ণপ্রীতির মর্মবাণী ঘোষণা করলেন ভীষ্ম। কৃষ্ণের মানবিক রূপ অতিক্রম করে অতিলৌকিক সত্তা বর্ণনা করে ভীষ্ম বললেন, তিনি বৃদ্ধতম, লোকবৃদ্ধতমে কৃষ্ণে যোঽর্হণাং নাভিমন্যতে। কৃষ্ণের নিজের আত্মপ্রকাশের উদ্ভাসের আলোয় তিনি ভবিষ্যতে স্বীকার করেছেন, কালোঽস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধঃ। আমি সেই লোকক্ষয়কারী প্রবীণতম কাল। ভীষ্ম কৃষ্ণের দেবত্ব বর্ণনা করেছেন, তিনিই সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়। বিশ্বচরাচর কৃষ্ণতেই লীন হয়ে আছে যে। কৃষ্ণ এব হ লোকানামুৎপত্তিরপি চাপ্যয়ঃ। কৃষ্ণস্য হি কৃতে বিশ্বমিদং ভূতং চরাচরম্।। লৌকিক, অতিলৌকিক, জাগতিক, পারমার্থিক বস্তুজগত এবং অনুভববেদ্য যা কিছু সমস্ত ব্যাপ্ত করে আছেন যিনি তিনিই পরমশক্তির আধার কৃষ্ণ।

ভীষ্মের কৃষ্ণপ্রীতি বা কৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা যেন আপামর ভরতবংশীয়দের গভীর প্রেমময় অনুভবে জারিত প্রিয়র প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির প্রকাশ। ভীষ্মের নির্দ্ধারিত এই শ্রেষ্ঠত্বের মান এখনও প্রাসঙ্গিক।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content