
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত ।
রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজনে উদ্যোগী হলেন রাজা যুধিষ্ঠির। এ বিষয়ে তিনি কৃষ্ণের অনুমোদনপ্রার্থী। কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের পরম আত্মীয়। পাণ্ডবজননী কুন্তী কৃষ্ণের পিতার ভগিনী। কৃষ্ণ তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের প্রিয়সখা। এ ছাড়াও যুধিষ্ঠিরের জানেন, কেউ সম্প্রীতিবশত প্রীতিভাজনের ত্রুটি দেখেন না। স্বার্থহেতু (অর্থলাভেচ্ছায়) কেউ শুধু মনোমত কথা বলেন। কারও আবার নিজের জন্য যেটি হিতকর সেটাই তাঁদের লক্ষ্য হয়ে থাকে। সুপরামর্শদানের বিষয়ে, লোকসমাজের এটাই প্রচলিত বিশ্বাস। কেচিদ্ধি সৌহৃদাদেব ন দোষং পরিচক্ষতে। স্বার্থহেতোস্তথৈবান্যে প্রিয়মেব বদন্ত্যুত।। প্রিয়মেব পরীপ্স্যন্তে কেবলাত্মনি যদ্ধিতম্। এবং প্রায়াশ্চ দৃশ্যন্তে জনবাদাঃ প্রয়োজনে।।
যুধিষ্ঠিরের গভীর বিশ্বাস, এই সব কারণের ঊর্দ্ধে, কৃষ্ণ ।তিনি নিজের স্বার্থচিন্তা ও ষড়রিপুর অন্যতম ক্রোধ পরিত্যাগ করে, লোকহিতকর পরামর্শ দান করতে পারেন। ত্বন্তু হেতূন্ ব্যতীত্যৈতান্ কামক্রৌধৌ ব্যুদস্য চ। যৎ ক্ষেমং পরমং লোকে যথাবদ্বক্তুমর্হসি।।
কৃষ্ণ অকপটে বললেন, সর্বগুণান্বিত রাজা যুধিষ্ঠির, রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের যোগ্য। যুধিষ্ঠির এ কথা জানেন। তবু তিনি তাঁকে কিছু বলতে ইচ্ছুক। কৃষ্ণ তাঁর বক্তব্যবিষয়ের সূচনা করলেন। তাঁর মতে জমদগ্নিপুত্র পরশুরাম, ক্ষত্রিয়কুল বিনাশ করবার পরে যাঁরা বেঁচেছিলেন, সেই তথাকথিত ক্ষত্রিয়নামধারীদের মধ্যে যাঁরা পৃথিবীপতি তাঁরা নিজের নিজের কৃতিত্বানুসারে এই (সার্বভৌমবিষয়ক) সম্রাটপদটির সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। এই শ্রেণির রাজারা সকলে এবং অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ, সকলেই ঐল অর্থাৎ চন্দ্রবংশীয় পুরূরবার বা সূর্যবংশীয় ইক্ষ্বাকুর বংশজাত। তাঁরা একশতবংশে বিভক্ত হয়েছেন। যযাতির বংশধর, মহান গুণবান ভোজরাজারা অধুনা চতুর্দিক ভোগ করছেন। সেই ভাবেই তাঁরা (ভোজবংশীয়রা) তাঁদের (পূর্বপুরুষদের) রাজসম্পদ ভোগ করে চলেছেন অর্থাৎ সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেননি।
যুধিষ্ঠিরের গভীর বিশ্বাস, এই সব কারণের ঊর্দ্ধে, কৃষ্ণ ।তিনি নিজের স্বার্থচিন্তা ও ষড়রিপুর অন্যতম ক্রোধ পরিত্যাগ করে, লোকহিতকর পরামর্শ দান করতে পারেন। ত্বন্তু হেতূন্ ব্যতীত্যৈতান্ কামক্রৌধৌ ব্যুদস্য চ। যৎ ক্ষেমং পরমং লোকে যথাবদ্বক্তুমর্হসি।।
কৃষ্ণ অকপটে বললেন, সর্বগুণান্বিত রাজা যুধিষ্ঠির, রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের যোগ্য। যুধিষ্ঠির এ কথা জানেন। তবু তিনি তাঁকে কিছু বলতে ইচ্ছুক। কৃষ্ণ তাঁর বক্তব্যবিষয়ের সূচনা করলেন। তাঁর মতে জমদগ্নিপুত্র পরশুরাম, ক্ষত্রিয়কুল বিনাশ করবার পরে যাঁরা বেঁচেছিলেন, সেই তথাকথিত ক্ষত্রিয়নামধারীদের মধ্যে যাঁরা পৃথিবীপতি তাঁরা নিজের নিজের কৃতিত্বানুসারে এই (সার্বভৌমবিষয়ক) সম্রাটপদটির সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। এই শ্রেণির রাজারা সকলে এবং অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ, সকলেই ঐল অর্থাৎ চন্দ্রবংশীয় পুরূরবার বা সূর্যবংশীয় ইক্ষ্বাকুর বংশজাত। তাঁরা একশতবংশে বিভক্ত হয়েছেন। যযাতির বংশধর, মহান গুণবান ভোজরাজারা অধুনা চতুর্দিক ভোগ করছেন। সেই ভাবেই তাঁরা (ভোজবংশীয়রা) তাঁদের (পূর্বপুরুষদের) রাজসম্পদ ভোগ করে চলেছেন অর্থাৎ সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেননি।
সম্প্রতি রাজা জরাসন্ধ, রাজ্যলক্ষ্মীকে অধিকার করে তাঁদের রাজ্যে অভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি শৌর্য প্রকাশ করে, সমস্ত ভূপতিদের অবদমিত করে, পৃথিবীর মধ্যবর্তী ভূভাগ (মথুরাদেশ) ভোগ করছেন এবং তাঁদের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়েছেন। যে রাজা প্রধান নিয়ন্তা,জগৎ যাঁর অধীন, তিনি যুক্তিসঙ্গতভাবে সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়ে থাকেন। শৌর্যশালী রাজা শিশুপাল, রাজা জরাসন্ধকে আশ্রয় করে, সেনাপতি হয়েছেন। করূষদেশের অধিপতি,বক্র নামে মহাবলশালী মায়াযোদ্ধা, জরাসন্ধের কাছে শিষ্যবৎ হাজির হতেন। মহাবীর্যশালী ও মহান, হংস ও ডিম্বক নামের অপর দু’জন, মহাপ্রতাপশালী, জরাসন্ধের আশ্রিত ছিলেন, এমন কি দন্তবক্র, করূষ, করভ ও মেঘবাহন রাজা, যাঁরা মাথায় অদ্ভুত দিব্য মণি ধারণ করেন তাঁরাও এর ব্যতিক্রম নন। বরুণ যেমন দক্ষিণদেশ শাসন করেন, তেমনই মুর ও নরকের শাসক, অপরিসীম সৈন্যবলের অধিকারী, বৃদ্ধ যবনরাজ ভগদত্ত, যিনি ছিলেন যুধিষ্ঠিরপিতা পাণ্ডুর সখা, তিনি কথায় ও কাজে বিশেষভাবে জরাসন্ধের অনুগত ছিলেন।
কৃষ্ণ জানালেন, যিনি স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ, মনে মনে যিনি যুধিষ্ঠিরের পিতৃতুল্য অনুরাগী, তিনি ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণপ্রান্তের রাজা, পাণ্ডবদের মাতুল, বীর, কুন্তিবংশবর্দ্ধনকারী, সেই পুরুজিৎ নামে শত্রুহন্তা রাজা, স্নেহবশত যুধিষ্ঠিরের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধসম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য বর্ণনা করলেন। সেই দুর্মতি জরাসন্ধ, যিনি স্বয়ং প্রচার করে চেদিদেশে পুরুষোত্তমরূপে বিজ্ঞাত, সেই জরাসন্ধকে কৃষ্ণ হত্যা করেননি। মোহবশত, যিনি কৃষ্ণের চিহ্নগুলি (যেমন, শঙ্খ চক্র প্রভৃতি) ধারণ করে থাকেন এবং নিজেকে এই পৃথিবীতে পুরুষোত্তম বলে পরিচয় দেন, বঙ্গ, পুণ্ড্র ও কিরাতদেশের সেই রাজা, বাসুদেব নামে লোকখ্যাত, বলশালী, পুণ্ড্রক, জরাসন্ধের পক্ষ অবলম্বন করেছেন।
কৃষ্ণ জানালেন, যিনি স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ, মনে মনে যিনি যুধিষ্ঠিরের পিতৃতুল্য অনুরাগী, তিনি ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণপ্রান্তের রাজা, পাণ্ডবদের মাতুল, বীর, কুন্তিবংশবর্দ্ধনকারী, সেই পুরুজিৎ নামে শত্রুহন্তা রাজা, স্নেহবশত যুধিষ্ঠিরের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধসম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য বর্ণনা করলেন। সেই দুর্মতি জরাসন্ধ, যিনি স্বয়ং প্রচার করে চেদিদেশে পুরুষোত্তমরূপে বিজ্ঞাত, সেই জরাসন্ধকে কৃষ্ণ হত্যা করেননি। মোহবশত, যিনি কৃষ্ণের চিহ্নগুলি (যেমন, শঙ্খ চক্র প্রভৃতি) ধারণ করে থাকেন এবং নিজেকে এই পৃথিবীতে পুরুষোত্তম বলে পরিচয় দেন, বঙ্গ, পুণ্ড্র ও কিরাতদেশের সেই রাজা, বাসুদেব নামে লোকখ্যাত, বলশালী, পুণ্ড্রক, জরাসন্ধের পক্ষ অবলম্বন করেছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪২: রামায়ণে মহর্ষি অগস্ত্যের তপস্যালব্ধ শুভশক্তির আবেদন চিরন্তন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৬: কবির টুপি, কবির জোব্বা
ভারতভূমির চতুর্থাংশের ভোক্তা, বলশালী, ইন্দ্রসখা, ভোজকুলজাত, যিনি বিদ্যা, বল অর্থাৎ সমরনৈপুণ্যহেতু পাণ্ড্যদেশ ও ক্রথকৈশিকদেশ জয় করেছিলেন, যাঁর ভাই ‘অকৃতি’ জমদগ্নিপুত্র পরশুরামতুল্য বীর ছিলেন, সেই শত্রুহন্তা রাজা ভীষ্মক,জরাসন্ধের ভক্ত ছিলেন। কৃষ্ণ, আরও বিশদে জরাসন্ধের কীর্তিকলাপ ব্যাখ্যা করলেন। রাজা ভীষ্মক প্রিয় আচরণকারী পরমাত্মীয় অনুগতদের প্রতি অপ্রিয় ব্যবহার করে থাকেন। ভীষ্মক কুল, বল, স্বাভিমান, উজ্জ্বল যশের পরোয়া না করে,জরাসন্ধের আশ্রয়ে রয়েছেন। উত্তরের আঠারটি ভোজবংশ, জরাসন্ধের ভয়ে পশ্চিমে আশ্রয় নিয়েছেন। শূরসেন, ভদ্রক, বৌধ, শাল্ব পটচ্চর, সুস্থল, সুকুট্ট, কুলিন্দ, কুন্তি এবং শাল্বায়নদশের রাজারা, দক্ষিণের পাঞ্চালরাজগণ, কোশল এবং মৎস্যদেশের রাজবৃন্দ জরাসন্ধের ভয়ে উত্তরদিক পরিত্যাগ করে দক্ষিণে আশ্রয় নিয়েছেন। স্বরাজ্যত্যাগী পাঞ্চালদের একই অবস্থা হয়েছে। এর কিছুদিন পরে, মতিভ্রষ্ট কংস, যাদবদের উৎপীড়ন করে জরাসন্ধের কন্যা ও জরাসন্ধপুত্র সহদেবের দুই ভগিনী, অপূর্ব, অস্তি ও প্রাপ্তিকে বিবাহ করেন। জরাসন্ধের দুষ্টবুদ্ধি আত্মীয় (শ্বশুরমশাই কংস) অন্যান্য জ্ঞাতিদের অবদমিত করে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন, সেটাই হয়েছে অতিরিক্ত অত্যাচারের কারণ। দুরাত্মার (কংসের) দ্বারা অত্যাচারিত ভোজরাজের বৃদ্ধ জ্ঞাতিবর্গ পরিত্রাণের উপায় খুঁজে, কৃষ্ণের মধ্যে তার সম্ভাবনা দেখতে পেলেন।
কৃষ্ণ তাঁদের রক্ষা করেছিলেন কিভাবে? কৃষ্ণ জানালেন, বলরামের সঙ্গে একযোগে তিনি, আহুককন্যা সুতনুকে অক্রূরের হাতে অর্পণ করে, জ্ঞাতিবর্গের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম, দু’জনে মিলে কংস ও সুনামাকে হত্যা করেন। কংসবিদায় হলে, জরাসন্ধ, যুদ্ধে উদ্যত হলেন। তখন কৃষ্ণের আঠারটি কুল একত্রিত হয়ে মন্ত্রণা করলেন। কী সেই মন্ত্রণা? তাঁরা, শত্রুনিধনের লক্ষ্যে যাবতীয় মহাস্ত্র নিরন্তর প্রয়োগ করে, তিনশত বছরেও জরাসন্ধের সৈন্যবল ধ্বংস করতে পারবেন না। কৃষ্ণ মনে করেন, দেবতুল্য প্রতিপত্তিশালী ও বলশালীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, যাঁদের অস্ত্রের সাহায্যে বধ করা সম্ভব নয় এমন জরাসন্ধের সহায় হংস ও ডিম্ভক নামে দু’জন বীর ও শৌর্যবান জরাসন্ধ স্বয়ং, এই তিনজনে মিলিত হয়ে, লোকসমূহ উচ্ছেদ করতে সক্ষম। এই ধারণা শুধু কৃষ্ণের নয়, অন্যান্য রাজাদের সেইরকমই অনুমান ছিল। হংস নামে এক প্রখ্যাত, মহান রাজা ছিলেন, যাঁকে আঠার বারের বেশি যুদ্ধ করে বলরাম বধ করেন। লোকমুখে হংসের নিধনবার্তা শুনে ডিম্ভক যমুনায় ডুব দিলেন। হংসকে ছাড়া এই জগতে আমি বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই—এই মনে করে ডিম্ভক প্রাণত্যাগ করলেন।
কৃষ্ণ তাঁদের রক্ষা করেছিলেন কিভাবে? কৃষ্ণ জানালেন, বলরামের সঙ্গে একযোগে তিনি, আহুককন্যা সুতনুকে অক্রূরের হাতে অর্পণ করে, জ্ঞাতিবর্গের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম, দু’জনে মিলে কংস ও সুনামাকে হত্যা করেন। কংসবিদায় হলে, জরাসন্ধ, যুদ্ধে উদ্যত হলেন। তখন কৃষ্ণের আঠারটি কুল একত্রিত হয়ে মন্ত্রণা করলেন। কী সেই মন্ত্রণা? তাঁরা, শত্রুনিধনের লক্ষ্যে যাবতীয় মহাস্ত্র নিরন্তর প্রয়োগ করে, তিনশত বছরেও জরাসন্ধের সৈন্যবল ধ্বংস করতে পারবেন না। কৃষ্ণ মনে করেন, দেবতুল্য প্রতিপত্তিশালী ও বলশালীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, যাঁদের অস্ত্রের সাহায্যে বধ করা সম্ভব নয় এমন জরাসন্ধের সহায় হংস ও ডিম্ভক নামে দু’জন বীর ও শৌর্যবান জরাসন্ধ স্বয়ং, এই তিনজনে মিলিত হয়ে, লোকসমূহ উচ্ছেদ করতে সক্ষম। এই ধারণা শুধু কৃষ্ণের নয়, অন্যান্য রাজাদের সেইরকমই অনুমান ছিল। হংস নামে এক প্রখ্যাত, মহান রাজা ছিলেন, যাঁকে আঠার বারের বেশি যুদ্ধ করে বলরাম বধ করেন। লোকমুখে হংসের নিধনবার্তা শুনে ডিম্ভক যমুনায় ডুব দিলেন। হংসকে ছাড়া এই জগতে আমি বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই—এই মনে করে ডিম্ভক প্রাণত্যাগ করলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৪: মহিষ-জাতক : চাতুর্যের ফল
ডিম্ভকের মৃত্যুসংবাদ শুনে, শত্রুপুরীজয়ী হংস, যমুনাতীরে নদীর জলে নিমজ্জিত হয়ে, আত্মবিসর্জন দিলেন।হংস ও ডিম্ভক জলে নিমজ্জিত হয়ে মারা গিয়েছেন শুনে, জরাসন্ধ সসৈন্যে ফিরে গেলেন স্বরাজ্যে। কৃষ্ণ স্বস্তিরবার্তা দিলেন—জরাসন্ধ ফিরে গেলে আমরা আবার সানন্দে মথুরায় বাস করতে লাগলাম। ততো বয়মমিত্রঘ্ন! তস্মিন্ প্রতিগতে নৃপে। পুনরানন্দিতাঃ সর্বে মথুরায়াং বসামহে।। পতির প্রয়াণে দুঃখিতা, পদ্মনয়না, জরাসন্ধের কন্যা, কংসপত্নী, দেবী অস্তি, শত্রুহন্তা মগধাধিপতি পিতা জরাসন্ধকে বারে বারে এই বলে উত্তেজিত করতে লাগলেন—আমার স্বামীর হত্যাকারীকে বধ করুন পতিঘ্নং মে জহতীতি।
কৃষ্ণ নিজেদের মনের অবস্থা বর্ণনা করে বললেন, তাঁরা তখন পূর্বের মন্ত্রণা স্মরণ করে, বিরসমনে, বিশাল সম্পদ পৃথক পৃথক ভাগে ভাগ করে (মথুরা হতে), সেখান হতে প্রস্থান করলেন। তাঁরা সেই জরাসন্ধের ভয়ে, কর্তব্যবিষয়ে স্থির করে, পুত্র, জ্ঞাতি, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে,পশ্চিম দিক বরাবর পালিয়ে গেলেন। রৈবতকপর্বত যাঁর শোভা সেই কুশস্থলী নামে মনোরম নগরীতে তাঁরা বাস করতে লাগলেন। কৃষ্ণ জানালেন, তাঁরা এমনভাবে দুর্গসংস্কার করলেন যেন সেটি দেবতাদের দুরাভিগম্য হয় এবং সেখানে অবস্থান করে নারীরাও যুদ্ধ করতে পারে, বৃষ্ণিবংশীয় মহাবীরের কথা আর কি বলবেন। সেখানে তাঁরা অকুতোভয়ে বাস করতে লাগলেন। তথৈব দুর্গসংস্কারং দেবৈরপি দুরাসদম্। স্ত্রিয়োঽপি যস্যাং যুধ্যেয়ুঃ কিমু বৃষ্ণিমহারথাঃ। তস্যাং বয়মমিত্রঘ্ন! নিবসামোঽকুতোভয়াঃ।।
রৈবতকপর্বত একটি গিরিদুর্গে পরিণত হওয়ায় মগধরাজ জরাসন্ধের ত্রাসমুক্ত যাদবরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। কৃষ্ণ, অকপটে স্বীকার করলেন, তাঁরা জামাতা কংসকে হত্যা করে, জরাসন্ধের প্রতি অপরাধ করেছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও,জরাসন্ধের ভয়ে, তাঁরা মথুরা হতে রৈবতকপর্বতে আশ্রয় নিয়েছেন। রৈবতকপর্বতের বৈশিষ্ট্য কী? তিন যোজন বিস্তৃত, একুশটি শৃঙ্গবিশিষ্ট পর্বতটির একেক যোজনান্তে রয়েছে একশটি করে দ্বারযুক্ত তোরণ, যেখানে বীরগণ বিক্রম প্রকাশ করতে সক্ষম, যুদ্ধে দুর্দম আঠারর বেশি ক্ষত্রিয়দের দ্বারা সেগুলি সুরক্ষিত। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানালেন, তাঁদের বংশে আঠার হাজার ভাই আছেন। এ ছাড়াও আছেন আহুকের শত পুত্র, সেই পুত্রদের একেক জনের তুলনায় দেবতারাও নিকৃষ্ট। আছেন ভাইয়ের সঙ্গে চারুদেষ্ণ, চক্রদেব, সাত্যকি, কৃষ্ণ নিজে, বলরাম এবং যুদ্ধে বিষ্ণুতুল্য শাম্ব। এই সাতজনই রথী। কৃষ্ণ আরও অন্যান্য রাজাদের নাম জানালেন। তাঁরা হলেন, কৃতবর্মা, অনাধৃষ্টি, সমীক, সমিতিঞ্জয়, কঙ্ক, শঙ্কু, কুন্তি, এই সাতজন মহারথী।আর আছেন অন্ধকভোজরাজের দুই পুত্র এবং বৃদ্ধ রাজা নিজে। এই দশ জন। এনাদের দেহ বজ্রকঠিন, এঁরা সকলেই বীর, শৌর্যশালী, মহারথী। এনারা মধ্যদেশ অর্থাৎ জরাসন্ধ-অধিকৃত মথুরাদেশের কথা স্মরণে রেখে বৃষ্ণিগণের মধ্যেই বাস করছেন। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের অনুরোধ—হে ভরতবংশীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ,আপনি ক্ষত্রিয়সমাজে সর্বদাই সম্রাটোচিত গুণে (অসাধারণ শৌর্যাদিগুণ) বিভূষিত। তাই আপনি নিজে সম্রাটপদের যোগ্য প্রার্থী। স ত্বং সম্রাড়্গুণৈর্যুক্তঃ সদা ভরতসত্তম!। ক্ষত্রে সম্রাজমাত্মানং কর্ত্তুমর্হসি ভারত!।।
কৃষ্ণ নিজেদের মনের অবস্থা বর্ণনা করে বললেন, তাঁরা তখন পূর্বের মন্ত্রণা স্মরণ করে, বিরসমনে, বিশাল সম্পদ পৃথক পৃথক ভাগে ভাগ করে (মথুরা হতে), সেখান হতে প্রস্থান করলেন। তাঁরা সেই জরাসন্ধের ভয়ে, কর্তব্যবিষয়ে স্থির করে, পুত্র, জ্ঞাতি, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে,পশ্চিম দিক বরাবর পালিয়ে গেলেন। রৈবতকপর্বত যাঁর শোভা সেই কুশস্থলী নামে মনোরম নগরীতে তাঁরা বাস করতে লাগলেন। কৃষ্ণ জানালেন, তাঁরা এমনভাবে দুর্গসংস্কার করলেন যেন সেটি দেবতাদের দুরাভিগম্য হয় এবং সেখানে অবস্থান করে নারীরাও যুদ্ধ করতে পারে, বৃষ্ণিবংশীয় মহাবীরের কথা আর কি বলবেন। সেখানে তাঁরা অকুতোভয়ে বাস করতে লাগলেন। তথৈব দুর্গসংস্কারং দেবৈরপি দুরাসদম্। স্ত্রিয়োঽপি যস্যাং যুধ্যেয়ুঃ কিমু বৃষ্ণিমহারথাঃ। তস্যাং বয়মমিত্রঘ্ন! নিবসামোঽকুতোভয়াঃ।।
রৈবতকপর্বত একটি গিরিদুর্গে পরিণত হওয়ায় মগধরাজ জরাসন্ধের ত্রাসমুক্ত যাদবরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। কৃষ্ণ, অকপটে স্বীকার করলেন, তাঁরা জামাতা কংসকে হত্যা করে, জরাসন্ধের প্রতি অপরাধ করেছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও,জরাসন্ধের ভয়ে, তাঁরা মথুরা হতে রৈবতকপর্বতে আশ্রয় নিয়েছেন। রৈবতকপর্বতের বৈশিষ্ট্য কী? তিন যোজন বিস্তৃত, একুশটি শৃঙ্গবিশিষ্ট পর্বতটির একেক যোজনান্তে রয়েছে একশটি করে দ্বারযুক্ত তোরণ, যেখানে বীরগণ বিক্রম প্রকাশ করতে সক্ষম, যুদ্ধে দুর্দম আঠারর বেশি ক্ষত্রিয়দের দ্বারা সেগুলি সুরক্ষিত। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানালেন, তাঁদের বংশে আঠার হাজার ভাই আছেন। এ ছাড়াও আছেন আহুকের শত পুত্র, সেই পুত্রদের একেক জনের তুলনায় দেবতারাও নিকৃষ্ট। আছেন ভাইয়ের সঙ্গে চারুদেষ্ণ, চক্রদেব, সাত্যকি, কৃষ্ণ নিজে, বলরাম এবং যুদ্ধে বিষ্ণুতুল্য শাম্ব। এই সাতজনই রথী। কৃষ্ণ আরও অন্যান্য রাজাদের নাম জানালেন। তাঁরা হলেন, কৃতবর্মা, অনাধৃষ্টি, সমীক, সমিতিঞ্জয়, কঙ্ক, শঙ্কু, কুন্তি, এই সাতজন মহারথী।আর আছেন অন্ধকভোজরাজের দুই পুত্র এবং বৃদ্ধ রাজা নিজে। এই দশ জন। এনাদের দেহ বজ্রকঠিন, এঁরা সকলেই বীর, শৌর্যশালী, মহারথী। এনারা মধ্যদেশ অর্থাৎ জরাসন্ধ-অধিকৃত মথুরাদেশের কথা স্মরণে রেখে বৃষ্ণিগণের মধ্যেই বাস করছেন। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের অনুরোধ—হে ভরতবংশীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ,আপনি ক্ষত্রিয়সমাজে সর্বদাই সম্রাটোচিত গুণে (অসাধারণ শৌর্যাদিগুণ) বিভূষিত। তাই আপনি নিজে সম্রাটপদের যোগ্য প্রার্থী। স ত্বং সম্রাড়্গুণৈর্যুক্তঃ সদা ভরতসত্তম!। ক্ষত্রে সম্রাজমাত্মানং কর্ত্তুমর্হসি ভারত!।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫০

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি
কৃষ্ণের মতে, তা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধকতা আছে। কী সেই প্রতিকূলতা? কৃষ্ণের ধারণা,যুধিষ্ঠির,মহাবলী জরাসন্ধের জীবদ্দশায়, রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারবেন না। সিংহ যেমন শ্রষ্ঠ পর্বতের গুহায় মহাগজদের আবদ্ধ রাখে তেমনই জরাসন্ধ, গিরিব্রজ নামের পার্বত্যদুর্গে বিজিত রাজাদের রুদ্ধ করে রেখেছেন। রাজা জরাসন্ধ, সেই রাজগণ দ্বারা পুরুষমেধ যজ্ঞ করতে ইচ্ছুক। তিনি কঠোর তপস্যা করে মহাত্মা উমাপতি মহাদেবের আরাধনা করেছেন। ফলস্বরূপ সেই রাজশ্রেষ্ঠ জরাসন্ধ, রাজাদের জয় করে, তাঁর প্রতিজ্ঞা সম্পূর্ণ করেছেন। তিনি সব দিকের সব রাজাদের নিঃশেষে জয় করে, রাজধানীতে আবদ্ধ রেখে, মহাপুরুষের নিয়মোচিত কাজ করেছেন। কৃষ্ণের মুখে, জরাসন্ধের বিশদ বিবরণ কেন? কৃষ্ণ বললেন, হে মহারাজ, আমরাও তখন জরাসন্ধের ভয়ে মথুরা নগরী পরিত্যাগ করে দ্বারকানগরীতে গিয়েছি। বয়ঞ্চৈব মহারাজ! জরাসন্ধভয়াত্তদা। মথুরাং সম্পরিত্যজ্য গতা দ্বারবতীং পুরীম্।। কৃষ্ণের প্রস্তাব— মহারাজ যুধিষ্ঠির যদি রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করতে অভিলাষী হন, তাহলে তাঁদের মুক্তিকামনায়,জরাসন্ধের হত্যাকার্যে সচেষ্ট হন। এইভাবেই সূচনা হোক। রাজসূয়যজ্ঞ সার্বিকভাবে সম্পাদনের জন্য আর অন্য কোন উপায় নেই। কৃষ্ণ, নিজের অভিমত প্রকাশ করে, যুধিষ্ঠিরের যুক্তিপূর্ণ মতামত জানতে চাইলেন। ইত্যেষা মে মতী রাজন্! যথা বা মন্যসে২নঘ !। এবং গতে মমাচক্ষ্ব স্বয়ং নিশ্চিত্য হেতুভিঃ।। এই আমার অভিমত। হে নিষ্পাপ, আপনার মতামত বা কী? এমন অবস্থায়,সেটি যুক্তি দ্বারা নিশ্চিত হয়ে, আমায় বলুন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৪: রাঙা মেঘের বেলাভূমি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৭: মধ্যরাতের অভিযান
যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান বিষয়ে কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন মনে করেছেন। কারণ কৃষ্ণের আন্তরিক সমর্থনে, তিনি আস্থাশীল। কেন? তাঁর এ বিষয়ের যৌক্তিকতা বোধ হয় শুধু বৃহৎ রাজনৈতিক পরিসরে নয়, পারিবারিক জীবনের ছোট্ট পরিসরেও গ্রহণযোগ্য। বাস্তবিকই, কোনও বিষয়ে, বিবেচক যদি যে কোনও পক্ষের প্রতি স্নেহদুর্বল হন তবে সৌহার্দ্যপূর্ণ বিবেচনা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। আবার স্বার্থনিষ্ঠ সমর্থকের নিজের স্বার্থরক্ষার তাগিদ, তাঁর নিজের সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতিত্বহীন হতে দেয় না। কীভাবে নিজের কল্যাণ হবে, এই চিন্তায় মানুষ শুধু নিজের প্রিয় কাজটিই করে থাকেন, নিঃস্বার্থ সমর্থন পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে।সার্বিক কল্যাণচিন্তায় নেই প্রিয়কথার চাটুকারিতার প্রলেপ, নেই স্বার্থচিন্তার আবিলতা, আত্মহিতের বহ্নিজ্বালা নেই, আছে সমিদ্ধ নিখাদ বিবেকবোধের উজ্জ্বলতার দীপ্তি।
পূর্বপুরুষদের সঞ্চিত সম্পদ ভোগ করে আত্মতুষ্টি নয়, জরাসন্ধ তাঁর রাজ্যলক্ষ্মীকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই প্রয়াসে ছিল স্বৈরাচারের ছায়া। ক্ষমতাশীল ব্যক্তির চারিপাশে ভিড় করে ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা। এমন সব স্বার্থনিষ্ঠ রাজারা, ক্ষমতাশীল জরাসন্ধকে ঘিরে ধরেছিল। শুধু স্বার্থচিন্তায় নয়, ক্ষমতার দম্ভের কাছে মাথা নত করে অপরাপর শক্তিরা। কেউ নিজের উন্নতির লক্ষ্যে, কেউ সম্ভ্রমবশত ভীরুতায়, কখনও বা সমমনস্ক স্বৈরাচারে বিশ্বাসী মানুষের কাছে, ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব আদর্শ হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণ অনমনীয় ব্যতিক্রমীদের দলভুক্ত, যিনি ক্ষমতার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। তবে জরাসন্ধের সঙ্গে সমঝোতা নয়, শুধু তাঁকে দমনের জন্য সময়ের অপেক্ষা করেছেন। জরাসন্ধ ও অশুভ আঁতাতের সঙ্গীরা মিলে শুভ শক্তিকে পদানত করতে সমর্থ, এই বিবেচনায় কৃষ্ণ নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। পরে জরাসন্ধ যখন সঙ্গীহীন হয়েছেন তখন বললাম ও কৃষ্ণ নিজেদের রাজ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু আত্মীয়তার সূত্রে যে শত্রুতার সূচনা, তা নির্মূল করা কঠিন। জরাসন্ধজামাতা কংসর হত্যাকারী কৃষ্ণের বিরুদ্ধে জরাসন্ধ বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেন— এই চিন্তায় কৃষ্ণ নিজের রাজ্য ত্যাগ করে সুরক্ষিত দেশে অবস্থান করেছেন। জরাসন্ধের স্বৈরাচারের একটি নমুনা হল, মহাদেবের বলে অপ্রতিহত শক্তির আধার জরাসন্ধ, গিরিব্রজ নামের গিরিদুর্গে পরাজিত রাজাদের আবদ্ধ রেখে পৈশাচিক নরমেধযজ্ঞে তাঁদের আহুতি দানের অপেক্ষায় আছেন। কৃষ্ণ অকপটে স্বীকার করেছেন, জরাসন্ধভয়াৎ মথুরানগরী ত্যাগ করে দ্বারকানগরীতে স্থানান্তরিত হয়েছেন। যাঁর পরামর্শপ্রার্থী ধার্মিক, প্রজ্ঞাবান, বিবেচক, জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব, সেই কৃষ্ণ, তিনি যুধিষ্ঠিরের মাধ্যমে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্ত করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান নিজের রাজ্যের সার্বভৌমিকতাপ্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজন। বিরুদ্ধশক্তির বিনাশের মাধ্যমেই সেটি সম্ভব। তাই রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানসম্পাদনের প্রথম পদক্ষেপ হল, জরাসন্ধের দমন যেটি যুধিষ্ঠির ও তাঁর অপ্রতিরোধ্য ভাইদের দ্বারাই সম্ভব সেটি অনুধাবন করে হয়তো কৃষ্ণের এই সিদ্ধান্ত। অনেকসময়ে পরিস্থিতি নিজের আয়ত্তাধীন না হলে, নিজের পরিমণ্ডলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্যপ্রার্থী হতে হয়।
পূর্বপুরুষদের সঞ্চিত সম্পদ ভোগ করে আত্মতুষ্টি নয়, জরাসন্ধ তাঁর রাজ্যলক্ষ্মীকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই প্রয়াসে ছিল স্বৈরাচারের ছায়া। ক্ষমতাশীল ব্যক্তির চারিপাশে ভিড় করে ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা। এমন সব স্বার্থনিষ্ঠ রাজারা, ক্ষমতাশীল জরাসন্ধকে ঘিরে ধরেছিল। শুধু স্বার্থচিন্তায় নয়, ক্ষমতার দম্ভের কাছে মাথা নত করে অপরাপর শক্তিরা। কেউ নিজের উন্নতির লক্ষ্যে, কেউ সম্ভ্রমবশত ভীরুতায়, কখনও বা সমমনস্ক স্বৈরাচারে বিশ্বাসী মানুষের কাছে, ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব আদর্শ হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণ অনমনীয় ব্যতিক্রমীদের দলভুক্ত, যিনি ক্ষমতার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। তবে জরাসন্ধের সঙ্গে সমঝোতা নয়, শুধু তাঁকে দমনের জন্য সময়ের অপেক্ষা করেছেন। জরাসন্ধ ও অশুভ আঁতাতের সঙ্গীরা মিলে শুভ শক্তিকে পদানত করতে সমর্থ, এই বিবেচনায় কৃষ্ণ নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। পরে জরাসন্ধ যখন সঙ্গীহীন হয়েছেন তখন বললাম ও কৃষ্ণ নিজেদের রাজ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু আত্মীয়তার সূত্রে যে শত্রুতার সূচনা, তা নির্মূল করা কঠিন। জরাসন্ধজামাতা কংসর হত্যাকারী কৃষ্ণের বিরুদ্ধে জরাসন্ধ বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেন— এই চিন্তায় কৃষ্ণ নিজের রাজ্য ত্যাগ করে সুরক্ষিত দেশে অবস্থান করেছেন। জরাসন্ধের স্বৈরাচারের একটি নমুনা হল, মহাদেবের বলে অপ্রতিহত শক্তির আধার জরাসন্ধ, গিরিব্রজ নামের গিরিদুর্গে পরাজিত রাজাদের আবদ্ধ রেখে পৈশাচিক নরমেধযজ্ঞে তাঁদের আহুতি দানের অপেক্ষায় আছেন। কৃষ্ণ অকপটে স্বীকার করেছেন, জরাসন্ধভয়াৎ মথুরানগরী ত্যাগ করে দ্বারকানগরীতে স্থানান্তরিত হয়েছেন। যাঁর পরামর্শপ্রার্থী ধার্মিক, প্রজ্ঞাবান, বিবেচক, জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব, সেই কৃষ্ণ, তিনি যুধিষ্ঠিরের মাধ্যমে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্ত করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠান নিজের রাজ্যের সার্বভৌমিকতাপ্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজন। বিরুদ্ধশক্তির বিনাশের মাধ্যমেই সেটি সম্ভব। তাই রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানসম্পাদনের প্রথম পদক্ষেপ হল, জরাসন্ধের দমন যেটি যুধিষ্ঠির ও তাঁর অপ্রতিরোধ্য ভাইদের দ্বারাই সম্ভব সেটি অনুধাবন করে হয়তো কৃষ্ণের এই সিদ্ধান্ত। অনেকসময়ে পরিস্থিতি নিজের আয়ত্তাধীন না হলে, নিজের পরিমণ্ডলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্যপ্রার্থী হতে হয়।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত ।
যুধিষ্ঠিরের একান্ত নির্ভর আশ্রয় কৃষ্ণ। এমন নির্ভরতা জীবনে প্রয়োজন।সুবিবেচনাপ্রসূত সুচিন্তিত পরামর্শ জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। রাজসূয়যঞ্জে উদ্যোগী যুধিষ্ঠিরের প্রতি পারিষদবর্গ, ভাই, মন্ত্রীদের পূর্ণ সমর্থন ছিল, তা সত্ত্বেও তিনি কৃষ্ণের বিচক্ষনতার প্রতি গভীর আস্থায়,পরামর্শ বা পূর্ণ সমর্থনের আশায় কৃষ্ণের দ্বারস্থ হয়েছেন। এমন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, সবক্ষেত্রেই হয়তো প্রয়োজন।
আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান কৃষ্ণ নিজে এবং তাঁর অপরিমিত পৃষ্ঠবল থাকা সত্ত্বেও জরাসন্ধকে দমন করেননি কেন? সেই পরিস্থিতিতে, মহাদেবের আশীর্বাদধন্য জরাসন্ধের নিধন হয়তো কৃষ্ণের আয়ত্তাধীন ছিল না। কিংবা মহতের ধর্ম হয়তো সুমহানকে মহত্তর কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করা। কৃষ্ণের বিবেচনায় হয়তো যুধিষ্ঠিরের সার্বভৌম রাজত্বে প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। পঞ্চপাণ্ডবের আত্মশক্তির উদ্বোধন সুদৃঢ় হয়েছিল অপ্রতিরোধ্যকে দমনের মাধ্যমে। রাজসূয় যজ্ঞের উদ্যোগে কী তার শুভ সূচনা? —চলবে।
আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান কৃষ্ণ নিজে এবং তাঁর অপরিমিত পৃষ্ঠবল থাকা সত্ত্বেও জরাসন্ধকে দমন করেননি কেন? সেই পরিস্থিতিতে, মহাদেবের আশীর্বাদধন্য জরাসন্ধের নিধন হয়তো কৃষ্ণের আয়ত্তাধীন ছিল না। কিংবা মহতের ধর্ম হয়তো সুমহানকে মহত্তর কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করা। কৃষ্ণের বিবেচনায় হয়তো যুধিষ্ঠিরের সার্বভৌম রাজত্বে প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। পঞ্চপাণ্ডবের আত্মশক্তির উদ্বোধন সুদৃঢ় হয়েছিল অপ্রতিরোধ্যকে দমনের মাধ্যমে। রাজসূয় যজ্ঞের উদ্যোগে কী তার শুভ সূচনা? —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















