
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাজা জরাসন্ধের রাজধানী গিরিব্রজনগরে পৌঁছুলেন কৃষ্ণ,ভীম ও অর্জুন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নৃশংস মগধরাজের কবল হতে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্তি ও অত্যাচারী একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী জরাসন্ধের দুর্দমনীয় প্রভাব ক্ষুণ্ণ করে তাঁকে দমন। মগধরাজ জরাসন্ধের প্রখরদৃষ্টিতে তাঁদের ছদ্ম আবরণ খসে পড়ল। জরাসন্ধ ব্রহ্মচারী স্নাতক ব্রাহ্মণের বেশধারী তিনজনের প্রতি সন্দিহান হলেন।শুরু হল দুই ধুরন্ধর রাজনীতিবিদের বাদানুবাদ যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির অবতারণা। রাজার সন্দেহের মূলে রয়েছে যুক্তি —কৃষ্ণ ও অন্য দু’জন সকলেই ক্ষত্রিয়। কারণ, ব্রাহ্মণোচিত বেশবাসে অনভ্যস্ত কৃষ্ণ ও তাঁর দুই সঙ্গীদের দৈহিক গঠন ও শারীরিক অভিব্যক্তি ক্ষত্রিয়সুলভ।তাঁদের আচরণের মধ্যেও অব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের ভাব পরিষ্ফুট হয়েছে।রাজার শেষ প্রশ্ন ছিল —এবঞ্চ মামুপস্থায় কস্মান্ন বিধিনার্হণাম্।প্রণীতাঞ্চৈব গৃহ্নীথ কার্য্যসমাগমে চ কিম্।। এইভাবে রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে,রাজার প্রদত্ত সম্মান তাঁরা গ্রহণ করেননি কেন?তাঁদের উদ্দেশ্য কী? কৃষ্ণ, জরাসন্ধের যুক্তির প্রত্যুত্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে সযৌক্তিক নিজেদের আত্মপরিচয় প্রচ্ছন্ন রেখে, জানালেন,বিশেষ কার্যোদ্ধারের কারণে তাঁরা এসেছেন। রাজা তাঁদের শত্রু তাই তাঁর প্রদত্ত সম্মান তাঁরা গ্রহণ করেননি।
জরাসন্ধ প্রত্যুত্তরে জানালেন,তাঁদের সঙ্গে শত্রুতার কথা তাঁর নিজের জানা নেই। তিনি তাঁদের কোনও অপকার করেছেন, সেটা রাজার চিন্তার অতীত। জরাসন্ধের প্রশ্ন, রাজা অপকার করেননি তবু কেন ব্রাহ্মণগণ নিরপরাধ জরাসন্ধকে শত্রু বলে মনে করছেন? রাজার অনুরোধ, সত্যং বিব্রূত বৈ বিপ্রাঃ! সতাং সময় এব হি। হে ব্রাহ্মণগণ, আপনারা সত্য বলুন, সজ্জনদের ক্ষেত্রে নিয়ম হল সত্যাবলম্বন। অর্থ বা উদ্দেশ্য ও ধর্মের ব্যাঘাত হলে মন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণগণ, নিরপরাধ রাজা জরাসন্ধের প্রতি অপরাধের তকমা আরোপ করেছেন। এটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে তাঁরা ক্ষত্রিয় (যুদ্ধবাজ ক্ষত্রিয়দের এমনই স্বভাব হয়ে থাকে)। ধর্মজ্ঞ হয়ে যে মহাবীর ক্ষত্রিয় (সত্যাচরণের) বিপরীত আচরণ করেন, তিনি শ্রেয় অর্থাৎ শুভবোধ হতে বিচ্যুত হন এবং পাপীদের শেষ পরিণতি নরকে যান।ক্ষত্রধর্মের প্রশংসা করে রাজা বললেন, সাধুব্যক্তিদের মতে, ত্রিলোকের মধ্যে ক্ষত্রধর্মই সেরা ধর্ম। ধর্মবিদ মানুষরা অন্য ধর্মের তেমন প্রশংসা করেন না (যেমন ক্ষত্রধর্মের প্রশংসা করেন)। নিশ্চয়ই অনবধানতাবশত আপনারা ক্ষত্রধর্মাশ্রিত, সংযতচিত্ত আমার মতো মানুষ, যে অপরাধী নয়, তবু তাঁকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছেন। তস্য মেঽদ্য স্থিতস্যেহ স্বধর্মে নিয়তাত্মনঃ। অনাগসি প্রযুঞ্জানাঃ প্রমাদাদিব জল্পথ।।
কৃষ্ণ তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা শুরু করলেন। জানালেন— এটি তাঁর বংশগত দায়ভার। ক্ষত্রিয়কুলে আছেন এক ধুরন্ধর বিচক্ষণ, যাঁর নির্দেশে তাঁরা এই আক্রমণাত্মক কাজে প্রবৃত্ত হয়েছেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের নিরপরাধ ভাবমূর্তি ভেঙ্গে দিয়ে বললেন,জরাসন্ধ পৃথিবীবাসী ক্ষত্রিয়দের অপহরণ করেছেন। সেই নিষ্ঠুর কাজ করেও তিনি কি করে নিজেকে নিরপরাধ মনে করেন? হে নৃপশ্রেষ্ঠ, একজন রাজা কেন নির্দোষ রাজাদের প্রতি হিংস্র হন? সেই রাজাদের অত্যাচার করে তুমি কি রুদ্রকে উপহার দিতে ইচ্ছুক হয়েছ? রাজা রাজ্ঞঃ কথং সাধূন্ হিংস্যান্নৃপতিসত্তম!। তদ্রাজ্ঞঃ সন্নিগৃহ্য ত্বং রুদ্রায়োপজিহীর্ষসি।। বৃহদ্রথপুত্র জরাসন্ধ যে পাপ করছেন,তা অন্য ক্ষত্রিয়দের স্পর্শ করছে। প্রতিবাদীর কণ্ঠে,কৃষ্ণ জানালেন, আমরা ধর্মচারী, ধর্মরক্ষার সামর্থ্য আমাদের আছে, বয়ং হি শক্তা ধর্ম্মস্য রক্ষণে ধর্ম্মচারিণঃ। আরও জানালেন, তাঁরা কখনও নরবলি দেখেননি।
কৃষ্ণ তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা শুরু করলেন। জানালেন— এটি তাঁর বংশগত দায়ভার। ক্ষত্রিয়কুলে আছেন এক ধুরন্ধর বিচক্ষণ, যাঁর নির্দেশে তাঁরা এই আক্রমণাত্মক কাজে প্রবৃত্ত হয়েছেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের নিরপরাধ ভাবমূর্তি ভেঙ্গে দিয়ে বললেন,জরাসন্ধ পৃথিবীবাসী ক্ষত্রিয়দের অপহরণ করেছেন। সেই নিষ্ঠুর কাজ করেও তিনি কি করে নিজেকে নিরপরাধ মনে করেন? হে নৃপশ্রেষ্ঠ, একজন রাজা কেন নির্দোষ রাজাদের প্রতি হিংস্র হন? সেই রাজাদের অত্যাচার করে তুমি কি রুদ্রকে উপহার দিতে ইচ্ছুক হয়েছ? রাজা রাজ্ঞঃ কথং সাধূন্ হিংস্যান্নৃপতিসত্তম!। তদ্রাজ্ঞঃ সন্নিগৃহ্য ত্বং রুদ্রায়োপজিহীর্ষসি।। বৃহদ্রথপুত্র জরাসন্ধ যে পাপ করছেন,তা অন্য ক্ষত্রিয়দের স্পর্শ করছে। প্রতিবাদীর কণ্ঠে,কৃষ্ণ জানালেন, আমরা ধর্মচারী, ধর্মরক্ষার সামর্থ্য আমাদের আছে, বয়ং হি শক্তা ধর্ম্মস্য রক্ষণে ধর্ম্মচারিণঃ। আরও জানালেন, তাঁরা কখনও নরবলি দেখেননি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫২: রামের জীবনে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে—নারী

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫২: কূটবণিক্-জাতক — ভাণ্ডার তোর পণ্ড যে হয়
জরাসন্ধ, মানুষদের উৎসর্গ করে, কেমন করে, মহাদেবের পূজায় ইচ্ছুক হয়েছেন? ক্ষত্রিয় হয়ে সবর্ণ ক্ষত্রিয়দের পশুতে রূপান্তরিত করেছেন, জরাসন্ধ। জরাসন্ধ ছাড়া, এমনটি আর কোথাও নেই। জরাসন্ধের মতো এমন আর কে আছেন? উনি (শাস্ত্রার্থ) বোধবুদ্ধিহীন।কৃষ্ণ তাঁর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বললেন, যে ব্যক্তি যে অবস্থায় যে কাজ করেন তিনি সেই অবস্থার ফল ভোগ করেন।কৃষ্ণ সদলে অত্যাচারিত জ্ঞাতি ক্ষত্রিয়দের জীবনরক্ষার জন্যে জরাসন্ধকে হত্যা করতে এখানে এসেছেন। রাজা জরাসন্ধ মনে করেন, এই পৃথিবীতে ক্ষত্রিয়দের মধ্যে (তাঁর নিজের তুল্য) অন্য কোনও পুরুষ নেই। এ যে গুরুতর বুদ্ধিবিভ্রম। কৃষ্ণ আক্রমণাত্মক কথা শুরু করলেন, কোনও অভিজাত ক্ষত্রিয় আছেন যিনি নিজে ক্ষত্রিয় জেনেও যুদ্ধশেষে অক্ষয় ও অতুলনীয় স্বর্গ লাভ করেন না? রাজা এই বিষয়টি অবগত হন—ক্ষত্রিয়গণ স্বর্গলাভের জন্যই রণযজ্ঞে দীক্ষিত হন এবং (যুদ্ধশেষে) স্বর্গলাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন। স্বর্গের কারণ পরব্রহ্মোপসনা, (সৎকর্মজনিত) মহান কীর্তি স্বর্গের কারণ, তপস্যাও স্বর্গের কারণ। যুদ্ধে মৃত্যু (ক্ষত্রিয়ের)কিন্তু অবধারিত স্বর্গলাভের কারণ। কৃষ্ণ, যুদ্ধে মৃত্যুর প্রশংসা করে বললেন, গুণে পরিপূর্ণ ইন্দ্রের বৈজয়ন্তপ্রাসাদ, যেটি ইন্দ্র অসুরদের পরাজিত করে অধিগত করেছিলেন,সেটি লাভের কারণও যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষত্রিয়ের মৃত্যুবরণ। কৃষ্ণর মতে, তাঁদের সঙ্গে বিরোধিতার ফলে স্বর্গলোকের এমন একটি পথ, রাজা জরাসন্ধ অন্য কারও সঙ্গে বিরোধিতার সূত্রে পাবেন কি?
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা
মগধের বিপুল সৈন্যবলে বলী জরাসন্ধের, অন্য রাজাদের অবজ্ঞা করা উচিত নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে শক্তিমত্তা। কারও বল রাজার সমান, কারও বা তাঁর থেকেও বেশি। এবিষয়ে (মানুষের শক্তিসম্বন্ধে) রাজার গভীর ধারণা নেই, তাই জরাসন্ধকে সহ্য করা যেতে পারে। কৃষ্ণ এই বিষয়ে বলছেন। মগধাধিপতি, যেন সমমর্যাদাসম্পন্ন রাজাদের প্রতি অহঙ্কার ও দর্প ত্যাগ করেন। কৃষ্ণের অনুরোধ, নিজের পুত্র, অমাত্য, সৈন্য-সহ তিনি যমের বাড়ি যাবেন না। মা গমঃ সসুতামাত্যঃ সবলশ্চ যমক্ষয়ম্।। উদাহরণ আছে দমোদ্ভব, কার্ত্তবীর্য্যো, মরুত্ত এবং বৃহদ্রথ— চারজন শ্রেষ্ঠ রাজা সকলকে অবমাননা করে, সসৈন্যে ধ্বংস হয়েছিলেন। কৃষ্ণ আত্মপরিচয় প্রকাশ করলেন, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক আমরা নিশ্চিতভাবে ব্রাহ্মণ নই। আমি শূরবংশজাত হৃষীকেশ কৃষ্ণ। এই দু’জন পুরুষশ্রেষ্ঠ এবং পাণ্ডুপুত্র। যুযুৎসমানাস্ত্বত্তশ্চ ন বয়ং ব্রাহ্মণা ধ্রুবম্। শৌরিরস্মি হৃষীকেশো নৃবরৌ পাণ্ডবাবিমৌ।। কৃষ্ণ, রাজা জরাসন্ধকে রণ-আহ্বান জানালেন,হে রাজন্, আপনাকে আহ্বান জানাই।স্থির হয়ে যুদ্ধ করুন। হয় (বন্দি) রাজাদের মুক্ত করুন, তা না হলে, যমালয়ে যান। ত্বামাহ্বয়ামহে রাজন্! স্থিরো যুদ্ধস্ব মাগধ! মুঞ্চ বা নৃপতীন্ সর্ব্বান্ গচ্ছ বা ত্বং যমক্ষয়ম্।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬২: আকাশ এখনও মেঘলা
উত্তরে জরাসন্ধ বললেন, তিনি পরাজিত না করে কোন রাজাকেই এখানে নিয়ে আসেননি। জরাসন্ধ জয় করেননি অথচ স্থিত অবস্থায় আছেন, এমন কোনও রাজা কি এখানে আছেন? জরাসন্ধ ক্ষত্রিয়ধর্মের দোহাই দিয়ে কৃষ্ণকে বললেন, শৌর্য প্রকাশ করে (বিরুদ্ধবাদীদের) বশে নিয়ে এসে ইচ্ছানুসারে আচরণ করা উচিত—বলা হয়, এটাই ক্ষত্রিয়দের আশ্রয়ণীয় ধর্ম। হে কৃষ্ণ, উদ্দেশ্য ছিল, দেবতাদের উৎসর্গ করব। আজ এই ক্ষত্রিয়ধর্ম অনুসরণ করে, ভয়বশত কি করে তাঁদের মুক্ত করি? দেবতার্থমুপাহৃত্য রাজ্ঞঃ কৃষ্ণ! কথং ভয়াৎ। অহমদ্য বিমুঞ্চেয়ং ক্ষাত্রং ধর্ম্মমনুসরন্।। (আমার)ব্যূহের আশ্রিত সৈন্যরা (তোমাদের) ব্যূহগত সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, অথবা আমি একাকী একজনের সঙ্গে, দু’জনের সঙ্গে বা তিনজনের সঙ্গে একসঙ্গে বা আলাদাভাবে যুদ্ধ করব। জরাসন্ধ, এই কথা বলে, কৃষ্ণ প্রভৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করবার ইচ্ছায়, পুত্র সহদেবের অভিষেক-আয়োজনের আদেশ দিলেন। যুদ্ধ সমাগতপ্রায়, রাজা জরাসন্ধ সেনাপতি কৌশিক ও চিত্রসেনকে স্মরণ করলেন। মহাভারতকাহিনির বর্ণনাকারী বৈশম্পায়নের মতে, এই সেনাপতি দুজনের লোকসমাজে সমাদৃত নাম দুটি, ছিল হংস ও ডিম্বক। ধরাতলে বাঘের মতো পরাক্রমশালী, যাদবদের অবধ্য, জরাসন্ধের ভাগ্য নির্দিষ্ট করবেন অন্য কেউ—এই কথা স্মরণ করে,ব্রহ্মার আদেশের সম্মান রেখে,যুদ্ধে বলশালীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, পরমেশ্বর, শূরবংশীয়, সত্যপ্রতিজ্ঞ, বলরামের অনুজ ভাই, শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান, কৃষ্ণ জরাসন্ধবধবিষয়ে আগ্রহী হলেন না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
রাজা জরাসন্ধের রাজধানীতে উপস্থিত, স্নাতকব্রাহ্মণবেশী কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের ছদ্ম আবরণ, রাজার ক্ষুরধারবুদ্ধিতে ও দৃষ্টিতে সন্দেহজনক বলে মনে হল। সদলে কৃষ্ণের পরিচয় প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন, জরাসন্ধ তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তিজাল বিস্তার করলেন। আপাতসারল্যে ভরা যুক্তিগুলো তাঁর অতীত আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
কৃষ্ণ নিজেদের পরিচয় প্রচ্ছন্ন রেখে জানালেন, ধর্মানুসারে বুদ্ধিমানেরা যথাক্রমে অদ্বার দিয়ে শত্রুগৃহে দ্বার দিয়ে মিত্রগৃহে প্রবেশ করে থাকেন। কেন জরাসন্ধপ্রদত্ত সম্মান গ্রহণ করেননি,সেটাও জানালেন।রাজা জরাসন্ধের সরল উত্তর— তিনি জ্ঞানত এই ব্রাহ্মণদের কোন অপকার করেননি। সজ্জনগণের আশ্রয় হল সত্যাবলম্বন। সতাং সময় এব হি। জরাসন্ধ নিরপরাধ অথচ তাঁকে অপরাধী প্রতিপন্ন করেছেন এই ব্রাহ্মণ, তাঁর এই স্বভাব প্রমাণ করে তিনি ক্ষত্রিয়। যোঽনাগসি প্রসৃজসি ক্ষত্রিয়োঽসি ন সংশয়ঃ।
কৃষ্ণ নিজেদের পরিচয় প্রচ্ছন্ন রেখে জানালেন, ধর্মানুসারে বুদ্ধিমানেরা যথাক্রমে অদ্বার দিয়ে শত্রুগৃহে দ্বার দিয়ে মিত্রগৃহে প্রবেশ করে থাকেন। কেন জরাসন্ধপ্রদত্ত সম্মান গ্রহণ করেননি,সেটাও জানালেন।রাজা জরাসন্ধের সরল উত্তর— তিনি জ্ঞানত এই ব্রাহ্মণদের কোন অপকার করেননি। সজ্জনগণের আশ্রয় হল সত্যাবলম্বন। সতাং সময় এব হি। জরাসন্ধ নিরপরাধ অথচ তাঁকে অপরাধী প্রতিপন্ন করেছেন এই ব্রাহ্মণ, তাঁর এই স্বভাব প্রমাণ করে তিনি ক্ষত্রিয়। যোঽনাগসি প্রসৃজসি ক্ষত্রিয়োঽসি ন সংশয়ঃ।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাজপদের প্রথম দাবীদার ক্ষত্রিয়। রাজনীতির কূট চোরাস্রোতে ভেসে যায় ধর্মবোধ, সত্যাবলম্বনের স্বচ্ছতা। আবিলতা, অসততা, সত্য অপলাপের প্রবণতা, এগুলি সবই রাজনীতির বিষাক্ত আবহ। তাই একজন কূট রাজনীতিবিদের অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পরে যায় ছদ্ম আবরণের আড়ালে অপরের নগ্ন স্বরূপ। জরাসন্ধ ধর্মজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি, ক্ষত্রিয়ের সত্যপথের বিপরীত পথ আশ্রয়, নীতিবিরুদ্ধ বলে মনে করেছেন, এমন ব্যক্তিত্বের নিন্দায় সোচ্চার হয়েছেন জরাসন্ধ। অপরদিকে নিজেকে নিয়ত ক্ষত্রধর্মে স্থিত, সংযতচিত্ত নিরপরাধ ক্ষত্রিয় বলে দাবি করেছেন। রাজনীতির নিক্তিতে পাপপুণ্যের হিসাব বিচিত্র। একজন নিষ্ঠুর অপরাধী নিজের অপরাধ সম্পূর্ণ ভুলে নিজেকে নিরপরাধ দাবি করেন। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম জীবনরক্ষা। জরাসন্ধ কিন্তু তার বিপরীত আচরণ করছেন। তিনি জীবনহানির খেলায় মেতে উঠেছেন। কৃষ্ণ তাঁকে তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় দোষারোপ করে ভর্ৎসনা করলেন। জরাসন্ধ রাজা। তিনি কি করে সজ্জন রাজাদের প্রতি হিংস্র হতে পারেন? তিনি নির্দোষ রাজাদের, রুদ্রকে উপহার দিতে ইচ্ছুক কেন? দেবতার সন্তুষ্টির থেকেও মূল্যবান মানুষের জীবন। কৃষ্ণের এই ধিক্কার বোধ হয়, মনুষ্যত্বহীন জরাসন্ধের অমানবিক আচরণের প্রতি ঘৃণার বিষোদ্গার। নরবলির বিপক্ষে মানবাত্মার তীব্র প্রতিবাদ। জরাসন্ধের নীচ বিবেচনাবোধ।তাই তিনি অন্য রাজাদের পশু বলে মনে করেন। মহাভারতকার বেদবিহিত পশুবলির বিরুদ্ধ সমালোচনা করেননি। তাঁর আপত্তি অমূল্য মানবপ্রাণের অপচয়ে, দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের এই নিষ্ঠুর নিন্দনীয় অমানবিক প্রথায়। রাজনীতির মূল কথা কৃষ্ণের ভাষায় —নাস্তি লোকে পুমানন্যঃ ক্ষত্রিয়েষ্বিতি চৈব যৎ। মন্যসে স চ তে রাজন্! সুমহান্ বুদ্ধিবিপ্লবঃ।। আমি ছাড়া ক্ষত্রিয়দের মধ্যে আর কোন পুরুষ নেই, এটি বুদ্ধিবিভ্রম। নিজের বিকল্প কেউ নেই অর্থাৎ নিজেকে অবিসংবাদী মনে করার মতো বুদ্ধিভ্রম হয়তো রাজনীতিবিদদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পরিচয়। তাঁরা ভুলে যান প্রত্যেকের মধ্যে আছে অপরিমিত শক্তি,এই সামর্থ্যের নিরিখে কেউ প্রতিপক্ষের সমান, কেউ বা তার থেকেও বেশি। তাই মানুষের সামর্থ্যের অবমূল্যায়ন, উচিত নয়।ক্ষত্রিয়মুখ্য জরাসন্ধের সমালোচনায় মুখর কৃষ্ণের এই কথায় নিহিত আছে, প্রাসঙ্গিক রাজনীতির পাঠ,শুধু ক্ষত্রিয়ের সংজ্ঞা এখন বোধ হয় রাজনীতিতে যুক্ত সব রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কৃষ্ণ মগধাধিপতি জরাসন্ধকে বলেছেন, জহি ত্বং সদৃশেষ্বেব মানং দর্পঞ্চ মাগধ!। সমপর্যায়ের সকলের প্রতি অহঙ্কার ও দর্পপ্রকাশ,বাঞ্ছনীয় নয়। বর্তমান ক্ষমতা ও অহঙ্কারের উচ্চকিত ঘোষণায়,যুদ্ধের বিষাক্ত আবহে, দুঃখদীর্ণ পৃথিবীতে, কৃষ্ণ ও জরাসন্ধের কথোপকথনসূত্রে মহাভারত ও বর্তমান সমকালীন রাজনৈতিক বাতাবরণের সমতা খুঁজে পাওয়া যায় কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















