
কপোত ও লুব্ধকের সেই রোমহর্ষক কাহিনি শেষ করে মন্ত্রী ক্রূরাক্ষ বললেন, “মহারাজ, এই কাহিনির সারাংশ অনুধাবন করেই আমার এই সুদৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, বায়সরাজ মেঘবর্ণের এই বিতাড়িত বৃদ্ধমন্ত্রী স্থিরজীবী যেহেতু এখন আপনার আশ্রয়ে এসেছেন, তাই তাঁকে হত্যা করাটা হবে নিতান্তই নির্দয় ও কাপুরুষোচিত কাজ।
গৃহস্থের পালনীয় বহুবিধ কর্তব্যের মধ্যে ‘আতিথ্য ধর্ম’ পালন করাও অন্যতম, আর আপনি তো স্বয়ং রাজাধিরাজ। ভেবে দেখুন, বনের এক সামান্য কপোত যদি নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে তার গৃহাগত শত্রুকে (ব্যাধকে) আপ্যায়ন করতে পারে, তবে আমরা কি আমাদের শত্রুপক্ষের এক বৃদ্ধ ও অসহায় মন্ত্রীকে—যাকে তার নিজের রাজাই অপমান করে দূর করে দিয়েছে—সামান্য আশ্রয়টুকুও দিতে পারব না? বিশেষত তিনি যখন স্বেচ্ছায় আপনার শরণাপন্ন হয়েছেন।”
ক্রূরাক্ষের এই আবেগময় ও যুক্তিপূর্ণ মতামত শুনে উলূকরাজ অরিমর্দন গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নীরবতা ভঙ্গ করে অপর মন্ত্রী দীপ্তাক্ষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভদ্র! এই বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনার কী অভিমত? এবমবস্থিতে কিং ভবান্ মন্যতে?”
রাজার প্রশ্নের উত্তরে দীপ্তাক্ষ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে রাজন! আমারও সুচিন্তিত অভিমত হলো—ন হন্তব্য এবায়ম্। অর্থাৎ, এঁকে হত্যা করা কোনওভাবেই উচিত নয়। কারণ, অনেক সময় দেখা যায়, শত্রুর অস্তিত্বও পরোক্ষভাবে আমাদের উপকারে আসে। কখনও কখনও দুই শত্রুর বিবাদ বা তৃতীয় কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রেম বা ঐক্য বাড়িয়ে তোলে। সেই চোরের কথাটা জানেন তো? যে চোর এক বৃদ্ধ বণিককে উদ্দেশ্য করে বলেছিল—‘ওহে বণিক! যদি আপনার স্ত্রী আপনাকে আলিঙ্গন না করে, তবে আমি চুরি করবার জন্য আপনার ঘরে আবার আসব’—পুনরাগমিষ্যামি যদীয়ং নাবগূহতে।”
এই অদ্ভুত কথা শুনে মহারাজ অরিমর্দন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভদ্র! কে কাকে আলিঙ্গন করে না? আর এই চোরটিই বা কে, যে চুরি করতে এসে এমন অদ্ভুত শর্ত দেয়? পুরো ঘটনাটা আমি সবিস্তারে শুনতে চাই। কথমেতৎ? সে কী রকম ব্যাপার?”
মহারাজের কৌতূহল নিরসনে মন্ত্রী দীপ্তাক্ষ তখন বলতে শুরু করলেন—
গৃহস্থের পালনীয় বহুবিধ কর্তব্যের মধ্যে ‘আতিথ্য ধর্ম’ পালন করাও অন্যতম, আর আপনি তো স্বয়ং রাজাধিরাজ। ভেবে দেখুন, বনের এক সামান্য কপোত যদি নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে তার গৃহাগত শত্রুকে (ব্যাধকে) আপ্যায়ন করতে পারে, তবে আমরা কি আমাদের শত্রুপক্ষের এক বৃদ্ধ ও অসহায় মন্ত্রীকে—যাকে তার নিজের রাজাই অপমান করে দূর করে দিয়েছে—সামান্য আশ্রয়টুকুও দিতে পারব না? বিশেষত তিনি যখন স্বেচ্ছায় আপনার শরণাপন্ন হয়েছেন।”
ক্রূরাক্ষের এই আবেগময় ও যুক্তিপূর্ণ মতামত শুনে উলূকরাজ অরিমর্দন গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নীরবতা ভঙ্গ করে অপর মন্ত্রী দীপ্তাক্ষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভদ্র! এই বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনার কী অভিমত? এবমবস্থিতে কিং ভবান্ মন্যতে?”
রাজার প্রশ্নের উত্তরে দীপ্তাক্ষ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে রাজন! আমারও সুচিন্তিত অভিমত হলো—ন হন্তব্য এবায়ম্। অর্থাৎ, এঁকে হত্যা করা কোনওভাবেই উচিত নয়। কারণ, অনেক সময় দেখা যায়, শত্রুর অস্তিত্বও পরোক্ষভাবে আমাদের উপকারে আসে। কখনও কখনও দুই শত্রুর বিবাদ বা তৃতীয় কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রেম বা ঐক্য বাড়িয়ে তোলে। সেই চোরের কথাটা জানেন তো? যে চোর এক বৃদ্ধ বণিককে উদ্দেশ্য করে বলেছিল—‘ওহে বণিক! যদি আপনার স্ত্রী আপনাকে আলিঙ্গন না করে, তবে আমি চুরি করবার জন্য আপনার ঘরে আবার আসব’—পুনরাগমিষ্যামি যদীয়ং নাবগূহতে।”
এই অদ্ভুত কথা শুনে মহারাজ অরিমর্দন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভদ্র! কে কাকে আলিঙ্গন করে না? আর এই চোরটিই বা কে, যে চুরি করতে এসে এমন অদ্ভুত শর্ত দেয়? পুরো ঘটনাটা আমি সবিস্তারে শুনতে চাই। কথমেতৎ? সে কী রকম ব্যাপার?”
মহারাজের কৌতূহল নিরসনে মন্ত্রী দীপ্তাক্ষ তখন বলতে শুরু করলেন—
০৯: চোর আর বৃদ্ধবণিকের কাহিনি।
কোনও এক নগরে এক বৃদ্ধ বণিক বাস করতেন। ধনসম্পদে তিনি ছিলেন কুবেরের তুল্য, কিন্তু শরীরে তখন বার্ধক্যের স্পষ্ট ছাপ। তবে শরীর জরাজীর্ণ হলে কী হবে? তাঁর মনটি ছিল বসন্তের বাতাসের মতোই চঞ্চল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কামাতুর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর মনে নতুন করে সংসার পাতার—নাকি বলা ভালো, নতুন করে যৌবন উপভোগের—এক প্রবল সাধ জাগল।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কামবাসনা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। তাই সেই বৃদ্ধ বণিক নিজের বয়সের কথা ভুলে, এক দরিদ্র বণিককে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে তার এক অসামান্যা সুন্দরী ও অল্পবয়সী কন্যাকে বিবাহ করে ঘরে আনলেন।
কিন্তু হায়! জোর করে কি আর মন পাওয়া যায়? ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’—বৃদ্ধের যুবতী স্ত্রী হলে যা হয়, তাই হল। সেই নববিবাহিতা বধূটি তার পিতার দারিদ্র্যের কারণে এই বিয়েতে বাধ্য হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মনেপ্রাণে সে ছিল অত্যন্ত অসুখী। তার সেই জরাজীর্ণ পতিকে দেখে সে মনে মনে কেবল ঘৃণাই বোধ করত। পতিসেবা তো দূরের কথা, সে বৃদ্ধের দিকে ফিরেও তাকাত না।
বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ঠুর বা অমানবিক মনে হতে পারে, কিন্তু পঞ্চতন্ত্রকার বিষ্ণুশর্মা এখানে চরম বাস্তববাদী। তিনি এই অপ্রিয় সত্যটি তুলে ধরেছেন একটি শ্লোকের মাধ্যমে—
শ্বেতপদং শিরসি যত্তু শিরোরূহাণাং স্থানং পরং পরিভবস্য তদেব পুংসাম্।
আরোপিতাস্থিশকলং পরিহৃত্য যান্তিচণ্ডালকূপমিব দূরতর তরুণ্যঃ।। [কাকোলূকীযম্ ১৮৮]
অর্থাৎ বার্ধক্যে যখন মানুষের মাথার চুলে তুষারের শুভ্রতা দেখা দেয়, তখন যুবতী স্ত্রীদের কাছে তা আর শ্রদ্ধার বিষয় থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে চরম অপমান ও বিতৃষ্ণার কারণ। তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন চণ্ডালের কুয়োর পাড়ে হাড়গোড় বা মড়ার খুলি (অস্থিমাত্রসার চিহ্ন) দেখে দূর থেকেই তা বর্জন করে এবং জলপান না করেই ফিরে যায়, ঠিক তেমনই নবযৌবনা স্ত্রীরা তাদের শুভ্রকেশ ও অস্থিসার বৃদ্ধ স্বামীদের দূর থেকেই বর্জন করে। সেই বৃদ্ধের সান্নিধ্য তাদের কাছে চণ্ডালের কুয়োর মতোই অস্পৃশ্য ও ভীতিপ্রদ মনে হয়।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কামবাসনা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। তাই সেই বৃদ্ধ বণিক নিজের বয়সের কথা ভুলে, এক দরিদ্র বণিককে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে তার এক অসামান্যা সুন্দরী ও অল্পবয়সী কন্যাকে বিবাহ করে ঘরে আনলেন।
কিন্তু হায়! জোর করে কি আর মন পাওয়া যায়? ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’—বৃদ্ধের যুবতী স্ত্রী হলে যা হয়, তাই হল। সেই নববিবাহিতা বধূটি তার পিতার দারিদ্র্যের কারণে এই বিয়েতে বাধ্য হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মনেপ্রাণে সে ছিল অত্যন্ত অসুখী। তার সেই জরাজীর্ণ পতিকে দেখে সে মনে মনে কেবল ঘৃণাই বোধ করত। পতিসেবা তো দূরের কথা, সে বৃদ্ধের দিকে ফিরেও তাকাত না।
বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ঠুর বা অমানবিক মনে হতে পারে, কিন্তু পঞ্চতন্ত্রকার বিষ্ণুশর্মা এখানে চরম বাস্তববাদী। তিনি এই অপ্রিয় সত্যটি তুলে ধরেছেন একটি শ্লোকের মাধ্যমে—
শ্বেতপদং শিরসি যত্তু শিরোরূহাণাং স্থানং পরং পরিভবস্য তদেব পুংসাম্।
আরোপিতাস্থিশকলং পরিহৃত্য যান্তিচণ্ডালকূপমিব দূরতর তরুণ্যঃ।। [কাকোলূকীযম্ ১৮৮]
অর্থাৎ বার্ধক্যে যখন মানুষের মাথার চুলে তুষারের শুভ্রতা দেখা দেয়, তখন যুবতী স্ত্রীদের কাছে তা আর শ্রদ্ধার বিষয় থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে চরম অপমান ও বিতৃষ্ণার কারণ। তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন চণ্ডালের কুয়োর পাড়ে হাড়গোড় বা মড়ার খুলি (অস্থিমাত্রসার চিহ্ন) দেখে দূর থেকেই তা বর্জন করে এবং জলপান না করেই ফিরে যায়, ঠিক তেমনই নবযৌবনা স্ত্রীরা তাদের শুভ্রকেশ ও অস্থিসার বৃদ্ধ স্বামীদের দূর থেকেই বর্জন করে। সেই বৃদ্ধের সান্নিধ্য তাদের কাছে চণ্ডালের কুয়োর মতোই অস্পৃশ্য ও ভীতিপ্রদ মনে হয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯৫ : রাজনীতির দাবার ছকে ত্যাগের মহাকাব্য: এক অন্য পঞ্চতন্ত্রের খোঁজে

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৬: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৩: ক্যান ইউ হ্যান্ডেল ইট?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বানর
পঞ্চতন্ত্রের এই কাহিনিতে বৃদ্ধ বণিকের প্রতি তাঁর নবযৌবনা স্ত্রীর বিতৃষ্ণাকে বোঝাতে গিয়ে বিষ্ণুশর্মা যে উপমাটি ব্যবহার করেছেন, তা কেবল সাহিত্যিক অলঙ্কার নয়; বরং তা তৎকালীন ভারতীয় সমাজকাঠামোর এক নির্মম ঐতিহাসিক দলিল। ‘চণ্ডাল-কূপ’ বা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের ব্যবহার্য কুয়োর প্রসঙ্গটি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় প্রাচীন ভারতের এক অস্বস্তিকর কিন্তু অমোঘ সত্যের মুখোমুখি।
সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষকদের চশমায় এই শ্লোকটিকে বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন বর্ণাশ্রমী সমাজের এক দ্বিমুখী চিত্র ফুটে ওঠে।প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে (যেমন মনুসংহিতা ১০.৫১-৫৬) সমাজকে কঠোরভাবে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। এর একেবারে নিচুতলায় ছিল ‘অন্ত্যজ’ বা ‘চণ্ডাল’ শ্রেণি। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘Ritual Pollution’ বা ‘আচারগত দূষণ’-এর ধারণা। উচ্চবর্ণের মানুষের বিশ্বাস ছিল, এই অন্ত্যজ শ্রেণির স্পর্শ, এমনকি তাদের ছায়াও তাদের অপবিত্র করতে পারে।
পঞ্চতন্ত্রে উল্লিখিত ‘চিহ্নস্বরূপ হাড়গোড় ঝোলানো’র বিষয়টি কোনো কল্পকথা নয়। ফা-হিয়েন (৫ম শতক) বা হিউয়েন সাং-এর (৭ম শতক) মতো চৈনিক পর্যটকদের বিবরণীতে আমরা স্পষ্ট দেখি যে, চণ্ডালদের গ্রামের বাইরে বাস করতে হতো। যখন তারা লোকালয়ে প্রবেশ করত, তখন হাতে কাঠ বা ঘণ্টা বাজিয়ে নিজেদের আগমন বার্তা ঘোষণা করতে হতো, যাতে উচ্চবর্ণের মানুষরা সতর্ক হয়ে তাদের ছোঁয়া বাঁচাতে পারেন। জলের উৎসেও ছিল কড়া বিধিনিষেধ। যে কুয়ো চণ্ডালদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে যাতে ভুলবশত কোনও উচ্চবর্ণের মানুষ জলপান না করেন, তার জন্য মৃতপ্রাণীর হাড় বা নরকরোটি ঝুলিয়ে রাখার প্রথা কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। এটি ছিল একাধারে ভীতিপ্রদর্শন এবং সতর্কীকরণ।
সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষকদের চশমায় এই শ্লোকটিকে বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন বর্ণাশ্রমী সমাজের এক দ্বিমুখী চিত্র ফুটে ওঠে।প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে (যেমন মনুসংহিতা ১০.৫১-৫৬) সমাজকে কঠোরভাবে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। এর একেবারে নিচুতলায় ছিল ‘অন্ত্যজ’ বা ‘চণ্ডাল’ শ্রেণি। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘Ritual Pollution’ বা ‘আচারগত দূষণ’-এর ধারণা। উচ্চবর্ণের মানুষের বিশ্বাস ছিল, এই অন্ত্যজ শ্রেণির স্পর্শ, এমনকি তাদের ছায়াও তাদের অপবিত্র করতে পারে।
পঞ্চতন্ত্রে উল্লিখিত ‘চিহ্নস্বরূপ হাড়গোড় ঝোলানো’র বিষয়টি কোনো কল্পকথা নয়। ফা-হিয়েন (৫ম শতক) বা হিউয়েন সাং-এর (৭ম শতক) মতো চৈনিক পর্যটকদের বিবরণীতে আমরা স্পষ্ট দেখি যে, চণ্ডালদের গ্রামের বাইরে বাস করতে হতো। যখন তারা লোকালয়ে প্রবেশ করত, তখন হাতে কাঠ বা ঘণ্টা বাজিয়ে নিজেদের আগমন বার্তা ঘোষণা করতে হতো, যাতে উচ্চবর্ণের মানুষরা সতর্ক হয়ে তাদের ছোঁয়া বাঁচাতে পারেন। জলের উৎসেও ছিল কড়া বিধিনিষেধ। যে কুয়ো চণ্ডালদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে যাতে ভুলবশত কোনও উচ্চবর্ণের মানুষ জলপান না করেন, তার জন্য মৃতপ্রাণীর হাড় বা নরকরোটি ঝুলিয়ে রাখার প্রথা কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। এটি ছিল একাধারে ভীতিপ্রদর্শন এবং সতর্কীকরণ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২১ : পরশপাথর— ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে…
তবে গবেষক হিসেবে একটি কথা মনে রাখা আবশ্যিক—ভারতবর্ষের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে কোনো প্রথাই সর্বজনীন বা চিরস্থায়ী ছিল না। এই অস্পৃশ্যতার চিত্রটি যেমন সত্য, তেমনই এর উলটো পিঠে ছিল এক প্রবল মানবতাবাদী স্রোত। প্রাচীন ভারত কেবল বিধিনিষেধের বেড়াজাল ছিল না, তা ছিল প্রতিবাদেরও ক্ষেত্র।মহাভারত, পুরাণ এবং পরবর্তীকালের ভক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, সমাজের একশ্রেণির বিবেকবান মানুষ (যাঁদের অনেকেই উচ্চবর্ণের) এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষে মানুষে এই ভেদ কেন?
মহাভারতের শান্তিপর্বে (অধ্যায় ১৮৮) আমরা এক অভূতপূর্ব বিতর্কের সাক্ষী হই। একদিকে রয়েছেন রক্ষণশীল ঋষি ভৃগু, যিনি বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রবক্তা; আর অন্যদিকে রয়েছেন প্রশ্নকর্তা ঋষি ভরদ্বাজ (যিনি নিজে একজন উচ্চকুলের ব্রাহ্মণ)। যখন ভৃগু চতুবর্ণের গুণগান করছেন, তখন ভরদ্বাজ সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—“যদি চতুবর্ণের মানুষের গায়ের রং, রক্ত, মল-মূত্র, সুখ-দুঃখ, ঘাম এবং আয়ু একই রকম হয়, তবে তাদের মধ্যে ‘বর্ণ’ বা জাতির পার্থক্য থাকে কী করে? (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৭৮/০৮)”
ভরদ্বাজ কেবল প্রশ্ন করেই থামেননি, তিনি এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন—
“ন বিশেষোঽস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রাহ্মমিদং জগৎ।
ব্রহ্মণা পূর্বসৃষ্টং হি কর্মভিঃ বর্ণতাং গতম্।।” (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৭৮/১০)
এর অর্থ হলো,“বর্ণ বা জাতির মধ্যে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। এই সমগ্র জগৎই ব্রহ্মময়। আদিতে ব্রহ্মা সকলকেই সমানভাবে সৃষ্টি করেছিলেন, কেবল পরবর্তীকালে মানুষ নিজ নিজ কর্মের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ প্রাপ্ত হয়েছে।”
ভাবা যায়! আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে একজন ব্রাহ্মণ ঋষি ঘোষণা করছেন—‘জন্মগত কোনো জাতিভেদ নেই’। এটি কি আধুনিক সংবিধানের সাম্যবাদের চেয়ে কম কিছু?
এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক পুরাণের পাতায়। ‘শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ’ ভক্তি সাহিত্যের এক অন্যতম স্তম্ভ। সেখানে তৃতীয় স্কন্ধের ৩৩তম অধ্যায়ে সাংখ্যদর্শনের প্রবক্তা ভগবান কপিলদেব তাঁর মাতা দেবহূতিকে ভক্তিযোগের উপদেশ দিচ্ছেন। সেই উপদেশ শুনে দেবহূতির মোহ কেটে যায় এবং তিনি পুত্রের মধ্যে পরমেশ্বরের স্বরূপ দর্শন করে তাঁর স্তব করতে শুরু করেন।
সেখানে কপিল মুনির মাতা দেবহুতিপরমজ্ঞান লাভ করে এমন একটি শ্লোক উচ্চারণ করেছেন, যা শুনলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ আঁতকে উঠতে বাধ্য।
“অহো বত শ্বপচোঽতো গরীয়ান্ যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ততে নাম তুভ্যম্।
তেপুস্তপস্তে জুহুবুঃ সস্নুরাৰ্যা ব্রহ্মানূচুর্নাম গৃণন্তি যে তে।।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ৩/৩৩/৭)
অর্থাৎ— “অহো! কী আশ্চর্য! যাঁর জিহ্বাগ্রে আপনার পবিত্র নাম বর্তমান, তিনি ‘শ্বপচ’ (চণ্ডাল বা কুকুরভোজী) কুলে জন্মগ্রহণ করলেও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পূজনীয়। যাঁরা আপনার নাম কীর্তন করেন, বুঝতে হবে যে তাঁরা (পূর্বজন্মে বা অতীতে) কঠোর তপস্যা, অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, পবিত্র তীর্থে স্নান এবং সদাচার পালনপূর্বক বেদপাঠ সম্পন্ন করেছেন—তাই আজ তাঁরা আপনার নামগ্রহণের অধিকার পেয়েছেন।”
মহাভারতের শান্তিপর্বে (অধ্যায় ১৮৮) আমরা এক অভূতপূর্ব বিতর্কের সাক্ষী হই। একদিকে রয়েছেন রক্ষণশীল ঋষি ভৃগু, যিনি বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রবক্তা; আর অন্যদিকে রয়েছেন প্রশ্নকর্তা ঋষি ভরদ্বাজ (যিনি নিজে একজন উচ্চকুলের ব্রাহ্মণ)। যখন ভৃগু চতুবর্ণের গুণগান করছেন, তখন ভরদ্বাজ সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—“যদি চতুবর্ণের মানুষের গায়ের রং, রক্ত, মল-মূত্র, সুখ-দুঃখ, ঘাম এবং আয়ু একই রকম হয়, তবে তাদের মধ্যে ‘বর্ণ’ বা জাতির পার্থক্য থাকে কী করে? (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৭৮/০৮)”
ভরদ্বাজ কেবল প্রশ্ন করেই থামেননি, তিনি এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন—
“ন বিশেষোঽস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রাহ্মমিদং জগৎ।
ব্রহ্মণা পূর্বসৃষ্টং হি কর্মভিঃ বর্ণতাং গতম্।।” (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৭৮/১০)
এর অর্থ হলো,“বর্ণ বা জাতির মধ্যে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। এই সমগ্র জগৎই ব্রহ্মময়। আদিতে ব্রহ্মা সকলকেই সমানভাবে সৃষ্টি করেছিলেন, কেবল পরবর্তীকালে মানুষ নিজ নিজ কর্মের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ প্রাপ্ত হয়েছে।”
ভাবা যায়! আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে একজন ব্রাহ্মণ ঋষি ঘোষণা করছেন—‘জন্মগত কোনো জাতিভেদ নেই’। এটি কি আধুনিক সংবিধানের সাম্যবাদের চেয়ে কম কিছু?
এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক পুরাণের পাতায়। ‘শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ’ ভক্তি সাহিত্যের এক অন্যতম স্তম্ভ। সেখানে তৃতীয় স্কন্ধের ৩৩তম অধ্যায়ে সাংখ্যদর্শনের প্রবক্তা ভগবান কপিলদেব তাঁর মাতা দেবহূতিকে ভক্তিযোগের উপদেশ দিচ্ছেন। সেই উপদেশ শুনে দেবহূতির মোহ কেটে যায় এবং তিনি পুত্রের মধ্যে পরমেশ্বরের স্বরূপ দর্শন করে তাঁর স্তব করতে শুরু করেন।
সেখানে কপিল মুনির মাতা দেবহুতিপরমজ্ঞান লাভ করে এমন একটি শ্লোক উচ্চারণ করেছেন, যা শুনলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ আঁতকে উঠতে বাধ্য।
“অহো বত শ্বপচোঽতো গরীয়ান্ যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ততে নাম তুভ্যম্।
তেপুস্তপস্তে জুহুবুঃ সস্নুরাৰ্যা ব্রহ্মানূচুর্নাম গৃণন্তি যে তে।।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ৩/৩৩/৭)
অর্থাৎ— “অহো! কী আশ্চর্য! যাঁর জিহ্বাগ্রে আপনার পবিত্র নাম বর্তমান, তিনি ‘শ্বপচ’ (চণ্ডাল বা কুকুরভোজী) কুলে জন্মগ্রহণ করলেও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পূজনীয়। যাঁরা আপনার নাম কীর্তন করেন, বুঝতে হবে যে তাঁরা (পূর্বজন্মে বা অতীতে) কঠোর তপস্যা, অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, পবিত্র তীর্থে স্নান এবং সদাচার পালনপূর্বক বেদপাঠ সম্পন্ন করেছেন—তাই আজ তাঁরা আপনার নামগ্রহণের অধিকার পেয়েছেন।”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২০: গোরা-সুনীতি: সম্পর্কের অন্য সুর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
এখানে ‘শ্বপচ’ বা চণ্ডালকে কেবল স্পর্শযোগ্য বলা হয়নি, তাকে ‘গরীয়ান’ বা শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল তৎকালীন আভিজাত্যভিমানী সমাজের গালে এক সপাট চপেটাঘাত। এই শ্লোকটি প্রমাণ করে যে, সনাতন ভাগবত ধর্মে জাতিভেদ নয়, ভক্তিই হলো শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি। বৈদিক যাগযজ্ঞ বা কঠোর তপস্যার চূড়ান্ত ফল হলো ভক্তি লাভ করা; তাই কেউ যদি ভক্তি লাভ করে ফেলেন, তবে তিনি যাগযজ্ঞের স্তর অতিক্রম করে গেছেন—তাঁর আর লৌকিক আচারের প্রয়োজন নেই।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও ভক্তির মহিমা প্রচারের সময় এই শ্লোকটি বহুবার উদ্ধৃত করেছেন এটা বোঝাতে যে, ভক্তের কোনো জাতি হয় না; কৃষ্ণ ভজলে চণ্ডালও গুরু হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
সামবেদের অন্তর্গত ‘বজ্রসূচী উপনিষদ’ নামক একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রন্থ রয়েছে। সেখানে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে— “ব্রাহ্মণ কে?” (কো বা ব্রাহ্মণঃ?)।সেখানে ধাপে ধাপে যুক্তি দিয়ে দেখানো হয়েছে—জীব (আত্মা) ব্রাহ্মণ নয়, দেহ ব্রাহ্মণ নয়, জাতি ব্রাহ্মণ নয়, জ্ঞান ব্রাহ্মণ নয়, কর্ম ব্রাহ্মণ নয়। শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে— “যিনি অদ্বৈত আত্মাকে জানেন, তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।”সেখানে জন্মগত অধিকারকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
এমনকিমধ্যযুগে এই প্রতিবাদ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। স্বামী রামানন্দ, যিনি নিজে ছিলেন একজন কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ, তিনি বারাণসীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন—
“জাতি পাঁতি পুছে নহি কোই।হরি কো ভজে সো হরি কা হোই।।”
অর্থাৎ, “জাতপাত বা বর্ণের কথা কেউ জিজ্ঞাসা কোরো না। যে ঈশ্বরকে ভজনা করে, সে-ই ঈশ্বরের আপন জন।”তিনি কেবল মুখের কথায় থামেননি। তিনি রবিদাস (মুচি বা চর্মকার), কবীর (জোলা বা তাঁতি), এবং সেনা (নাপিত)-কে নিজের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও ভক্তির মহিমা প্রচারের সময় এই শ্লোকটি বহুবার উদ্ধৃত করেছেন এটা বোঝাতে যে, ভক্তের কোনো জাতি হয় না; কৃষ্ণ ভজলে চণ্ডালও গুরু হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
সামবেদের অন্তর্গত ‘বজ্রসূচী উপনিষদ’ নামক একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রন্থ রয়েছে। সেখানে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে— “ব্রাহ্মণ কে?” (কো বা ব্রাহ্মণঃ?)।সেখানে ধাপে ধাপে যুক্তি দিয়ে দেখানো হয়েছে—জীব (আত্মা) ব্রাহ্মণ নয়, দেহ ব্রাহ্মণ নয়, জাতি ব্রাহ্মণ নয়, জ্ঞান ব্রাহ্মণ নয়, কর্ম ব্রাহ্মণ নয়। শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে— “যিনি অদ্বৈত আত্মাকে জানেন, তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।”সেখানে জন্মগত অধিকারকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
এমনকিমধ্যযুগে এই প্রতিবাদ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। স্বামী রামানন্দ, যিনি নিজে ছিলেন একজন কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ, তিনি বারাণসীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন—
“জাতি পাঁতি পুছে নহি কোই।হরি কো ভজে সো হরি কা হোই।।”
অর্থাৎ, “জাতপাত বা বর্ণের কথা কেউ জিজ্ঞাসা কোরো না। যে ঈশ্বরকে ভজনা করে, সে-ই ঈশ্বরের আপন জন।”তিনি কেবল মুখের কথায় থামেননি। তিনি রবিদাস (মুচি বা চর্মকার), কবীর (জোলা বা তাঁতি), এবং সেনা (নাপিত)-কে নিজের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮২ : সখের চোর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
একইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা স্মরণ করুন। তিনি যবন (মুসলমান) হরিদাসের মৃতদেহ নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন এবং পুরীর সমুদ্রে সেই দেহ নিজের হাতে সমাধিস্থ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—“চণ্ডালও যদি কৃষ্ণভক্ত হয়, তবে সে গুরুর চেয়েও বড়।”
আলোচনার ইতিবৃত্ত টানতে গিয়ে অবধারিতভাবেই স্মরণে আসে সেই চিরায়ত পৌরাণিক আপ্তবাক্যটি—
“শুভা অশুভা চ যা সৃষ্টিঃ সা সৃষ্টিঃ প্রশস্যতে।”
অর্থাৎ, শুভ এবং অশুভ—উভয়েরই সহাবস্থান যে সৃষ্টিতে, সেই সৃষ্টিই পূর্ণাঙ্গ এবং প্রশংসার্হ। অমৃতের সঙ্গে হলাহল, আলোর সঙ্গে তমসা এবং ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায় পাশাপাশি থাকে বলেই সৃষ্টির ভারসাম্য সুরক্ষিত থাকে। চিরায়ত ভারতভূমি এই শাশ্বত সত্যের ব্যতিক্রম ছিল না।
ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে দেখা যায়, এই মহামানবের সাগরতীরে একদিকে যেমন চাণক্য বা মনুর কঠোর অনুশাসন ছিল, তেমনই সমান্তরালে প্রবহমান ছিল বুদ্ধ বা মহাবীরের মৈত্রী ও সাম্যের বাণী। সমাজদেহে যেখানে ‘চণ্ডাল-কূপ’ বা অস্পৃশ্যতার বিষাক্ত ক্ষত ছিল, ঠিক সেখানেই আবির্ভূত হয়েছেন মহর্ষি ভরদ্বাজ, কপিল বা পরবর্তীকালের রামানন্দ ও শ্রীচৈতন্যর মতো ‘নীলকণ্ঠ’ মহাপুরুষরা। তাঁরা সেই সামাজিক বিষকে অমৃত করার আজীবন সাধনা করে গেছেন। তাঁরাই প্রমাণ করেছেন যে, অস্পৃশ্যতা কোনো ধর্ম নয়, বরং ধর্মের নামে এক সামাজিক ব্যাধি; আর এর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়াই সনাতন ভারতীয় চেতনার প্রকৃত স্বরূপ। এই ভালো ও মন্দের নিরন্তর দ্বন্দ্বই ভারতীয় সভ্যতাকে স্থবির হতে দেয়নি, বরং গতিশীল রেখেছে।
সুতরাং, পঞ্চতন্ত্রের ওই শ্লোকে বৃদ্ধ স্বামীকে ‘চণ্ডাল-কূপ’-এর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি বহুমাত্রিক। এটি একদিকে যেমন তৎকালীন নারীদের মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করে, অন্যদিকে তেমনই প্রাচীন সমাজব্যবস্থার এক গভীর ও দগদগে ক্ষতের দিকে আমাদের আঙুল দিয়ে দেখায়।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক আলোকবৃত্তে দাঁড়িয়ে আমরা সেই প্রথাকে ঘৃণা করতে পারি, তাকে ‘অমানবিক’ বলে ধিক্কার দিতে পারি; কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ ছাত্র হিসেবে আমাদের এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, আলো এবং অন্ধকার—উভয়কে নিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের অতীত। সেই অতীতের ভুলগুলো থেকেই শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে শোধরানোই ইতিহাসের প্রকৃত পাঠ।—চলবে।
আলোচনার ইতিবৃত্ত টানতে গিয়ে অবধারিতভাবেই স্মরণে আসে সেই চিরায়ত পৌরাণিক আপ্তবাক্যটি—
“শুভা অশুভা চ যা সৃষ্টিঃ সা সৃষ্টিঃ প্রশস্যতে।”
অর্থাৎ, শুভ এবং অশুভ—উভয়েরই সহাবস্থান যে সৃষ্টিতে, সেই সৃষ্টিই পূর্ণাঙ্গ এবং প্রশংসার্হ। অমৃতের সঙ্গে হলাহল, আলোর সঙ্গে তমসা এবং ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায় পাশাপাশি থাকে বলেই সৃষ্টির ভারসাম্য সুরক্ষিত থাকে। চিরায়ত ভারতভূমি এই শাশ্বত সত্যের ব্যতিক্রম ছিল না।
ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে দেখা যায়, এই মহামানবের সাগরতীরে একদিকে যেমন চাণক্য বা মনুর কঠোর অনুশাসন ছিল, তেমনই সমান্তরালে প্রবহমান ছিল বুদ্ধ বা মহাবীরের মৈত্রী ও সাম্যের বাণী। সমাজদেহে যেখানে ‘চণ্ডাল-কূপ’ বা অস্পৃশ্যতার বিষাক্ত ক্ষত ছিল, ঠিক সেখানেই আবির্ভূত হয়েছেন মহর্ষি ভরদ্বাজ, কপিল বা পরবর্তীকালের রামানন্দ ও শ্রীচৈতন্যর মতো ‘নীলকণ্ঠ’ মহাপুরুষরা। তাঁরা সেই সামাজিক বিষকে অমৃত করার আজীবন সাধনা করে গেছেন। তাঁরাই প্রমাণ করেছেন যে, অস্পৃশ্যতা কোনো ধর্ম নয়, বরং ধর্মের নামে এক সামাজিক ব্যাধি; আর এর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়াই সনাতন ভারতীয় চেতনার প্রকৃত স্বরূপ। এই ভালো ও মন্দের নিরন্তর দ্বন্দ্বই ভারতীয় সভ্যতাকে স্থবির হতে দেয়নি, বরং গতিশীল রেখেছে।
সুতরাং, পঞ্চতন্ত্রের ওই শ্লোকে বৃদ্ধ স্বামীকে ‘চণ্ডাল-কূপ’-এর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি বহুমাত্রিক। এটি একদিকে যেমন তৎকালীন নারীদের মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করে, অন্যদিকে তেমনই প্রাচীন সমাজব্যবস্থার এক গভীর ও দগদগে ক্ষতের দিকে আমাদের আঙুল দিয়ে দেখায়।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক আলোকবৃত্তে দাঁড়িয়ে আমরা সেই প্রথাকে ঘৃণা করতে পারি, তাকে ‘অমানবিক’ বলে ধিক্কার দিতে পারি; কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ ছাত্র হিসেবে আমাদের এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, আলো এবং অন্ধকার—উভয়কে নিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের অতীত। সেই অতীতের ভুলগুলো থেকেই শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে শোধরানোই ইতিহাসের প্রকৃত পাঠ।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















