রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

কৈলাসচন্দ্র সিংহ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রকাশবাবু ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি লিখেছেন যে, কৈলাসবাবু যখন একটি বিশেষ গ্রন্থ রচনা করছিলেন তখন গ্রন্থটির একটি অধ্যায়কে পরিবর্তন করে লেখার জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল এবং এ জন্য তাঁকে দশ হাজার মুদ্রার প্রলোভনও দেখানো হয়েছিল। প্রকাশবাবুর ভাষায়, “কৈলাসবাবু তখন আমার সঙ্গে বাস করিতেছিলেন এবং তাহাকে বলিয়াছিলাম—“ক্ষতি কি, অধ্যায়টা বদলাইয়া দিন না। এতগুলি টাকা পাইলে আপনার অনেক কাজে লাগিবে, অনেকগুলি বই ছাপাইতে পারিবেন।”
কৈলাসবাবু আমায় বলিয়াছিলেন, “তুমিও এই কথা বল? তোমার নিকট হইতে ইহা আশা করি নাই। সত্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিক হইব ইহা আমার জীবনের লক্ষ্য। টাকার লোভে যাহা সত্য নয় বলিয়া জানি, তাহা ঐতিহাসিক গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করিয়া সত্যভ্রষ্ট হওয়া অপেক্ষা আমি চিরজীবন দারিদ্র্যের সহিত সংগ্রাম করা শ্রেয় মনে করি।’ আমি লজ্জিত হইয়া এই বিষয়ে তাহাকে আর কিছু বলিতে সাহস পাই নাই।…”
ইতিহাস চর্চায় আপসহীন মনোভাবের নজির হিসেবে নিজ পিতা সম্পর্কেও তাঁর লেখার কথা উল্লেখ করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যুর পর এক বিতর্কিত রোবকারী অর্থাৎ রাজাদেশ মূলে রাজ্যভার গ্রহণ করেন বীরচন্দ্র। এ নিয়ে প্রাসাদ পরিমণ্ডলে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠে। চলে দীর্ঘ মামলা মোকদ্দমা। তাঁর পিতা গোলকচন্দ্র সিংহ এ ক্ষেত্রে বীরচন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কথাও উল্লেখ করেছেন কৈলাসচন্দ্র। কিন্তু এ সব সত্বেও ইতিহাস চর্চায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা

মহারাজা বীরচন্দ্রের কঠোর সমালোচনা করে তিনি যে ভাবে কলমের কালি ব্যয় করেছেন তাতে ইতিহাস লেখকের সাহস নিয়ে বিস্ময়ের উদ্রেক হলেও রাজার প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতার কথাও কারও কারও মনে হতে পারে!বীরচন্দ্রের রাজ্যাধিকার থেকে রাজ্য পরিচালনা, সর্ব ক্ষেত্রেই তিনি শুধু নেতিবাচক বার্তাই দিয়েছেন। এমন কি, রাজার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি কখনও ইংরেজ শাসনকেও স্বাগত জানিয়েছেন। যেমন ১৮৭০ সালে ত্রিপুরায় প্রথম ইংরেজ পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগে বীরচন্দ্র যদিও অসন্তুষ্ট ছিলেন তবু ইংরেজ সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে কৈলাসচন্দ্র লিখেছেন—…”যদিও এই কার্য্যে মহারাজ সম্পূর্ণ প্রীতিলাভ করেন নাই, কিন্তু ইতিহাস লেখক ইহা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেন যে, পার্বত্য ত্রিপুরায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত করিয়া, গভর্নমেন্ট প্রজা সাধারণের মহোপকার সাধন করিয়েছিলেন।” অবশ্য, শুধু বীরচন্দ্র নয়, ত্রিপুরার অন্য ক’জন রাজা সম্পর্কেও কৈলাসচন্দ্রের গ্রন্থে রয়েছে বিরূপ সমালোচনা।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

কৈলাসচন্দ্র নিজেই লিখেছেন, ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সম্পর্ক ছিল। তাঁর পিতাও ছিলেন উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারী। কিন্তু তিনি কেন এমন ভাবে বীরচন্দ্রের বিরুদ্ধবাদী হলেন? কেন রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র নবদ্বীপচন্দ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেন? কৈলাসচন্দ্র তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন—”… মহারাজ বীরচন্দ্র দ্বারা ঈশানচন্দ্রের একমাত্র পুত্র নবদ্বীপচন্দ্র একটি গৃহমধ্যে অনাহারে অবরুদ্ধ থাকিয়া শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন। তদনন্তর প্রায় এক বৎসর তিন মাস নবদ্বীপচন্দ্র মহারাজ বীরচন্দ্র দ্বারা রাজভবনে অবরুদ্ধ ছিলেন।…” ধারণা করা যায়, এ ধরণের ঘটনা কৈলাসচন্দ্রকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল রাজার বিরুদ্ধে এবং তিনি নবদ্বীপচন্দ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

যাইহোক, কৈলাসচন্দ্র স্বীকার করেছেন যে, ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সূত্রে তাঁর রাজমালা গ্রন্থটি রচনায় সুবিধা হয়েছিল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে কৈলাসচন্দ্রের যোগাযোগ সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছ থেকে ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের কিছু কিছু ইতিহাস পেয়েছিলেন। কৈলাসচন্দ্রের কাছে রাজবংশের কাহিনি শুনে তিনি ত্রিপুরার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লিখেছিলেন ত্রিপুরার ইতিহাস নির্ভর গল্প, উপন্যাস। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে কৈলাসচন্দ্রের নামটি অনুক্ত থাকলেও এ ব্যাপারে সলতে পাকানোর কাজটা যে কৈলাসচন্দ্রের হাতেই ঘটেছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না!
আরও পড়ুন:

শিবরাত্রির বিশেষ পর্ব : শিব

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

বীরচন্দ্র, রাধাকিশোর, বীরেন্দ্র কিশোর ও বীরবিক্রম-ত্রিপুরার এই চারজন মাণিক্য রাজার সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল। সুদীর্ঘকাল ব্যাপী এক রাজবংশের চারজন রাজার সঙ্গে কবির সম্পর্ক নিঃসন্দেহে এক বিরল বিষয়। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে যেন উদ্ভাসিত হয়েছেন এক অন্য রবীন্দ্রনাথ। কখনও তিনি রাজনীতিক, কখনও আবার অর্থনীতিবিদ। রাজ্য পরিচালনার বিষয়েও রাজাকে পরামর্শ দেন তিনি। আবার নির্ধারণ করি দেন বাজেটের মূল নীতি। কিন্তু কবির সঙ্গে রাজপরিবারের সুদীর্ঘকাল ব্যাপী এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেন কৈলাসচন্দ্র অনুক্ত থেকে গেলেন এটাই হচ্ছে প্রশ্ন! সে কি কৈলাসচন্দ্র রাজপরিবারের, বিশেষত মহারাজ বীরচন্দ্রের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বলে?—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content