রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

ত্রিপুরার উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়িয়ে আছে নানা প্রত্ন সম্পদ। উত্তরে আছে ভাস্কর্যের পাহাড় উনকোটি, দক্ষিণে অনবদ্য প্রত্নভূমি পিলাকের বিগ্রহ বলয়,আছে গোমতী নদীর কূল ঘেঁষে দেবতামুড়ার ভাস্কর্য। এসব ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে আরও প্রত্ন সম্পদ।মাঝে মাঝে মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয় বিগ্রহ, মুদ্রা কিংবা সুপ্রাচীন যুগের স্হাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। আবার অনেক কিছু হয়তো আবিস্কারের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। অদূরে বরাক উপত্যকার শৈবতীর্থ ভুবন পাহাড় এবং সাম্প্রতিক কালে অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার জঙ্গলে আবিষ্কৃত ভাস্কর্যের সঙ্গেও ত্রিপুরার প্রত্ন সম্পদের এক যোগসূত্রের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।
সঠিক ইতিহাস অনাবিষ্কৃত হলেও উনকোটি, পিলাক কিংবা দেবতামুড়ার ভাস্কর্যের সৃষ্টি ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশ প্রতিষ্ঠার অনেক অনেক আগেই শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তা হলে কোন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হয়েছিল এসব ভাস্কর্য? সব মিলিয়ে ত্রিপুরা ও নিকটবর্তী এলাকার প্রত্ন সম্পদের আলোকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ যেন আজ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৯: শেফালিকার বিপদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরার সুপ্রাচীন যুগের ইতিহাস ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ‘রাজমালা’ যে সেই ইতিহাসের সূত্র হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।পঞ্চদশ শতকে ত্রিপুরার রাজা ধর্ম মাণিক্যের (১৪৩১-৬২ খ্রিস্টাব্দ) আদেশে পণ্ডিত শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর চন্তাই দুর্লভেন্দ্রের সহায়তায় রচনা করেছিলেন ‘রাজমালা’। রাজা ও রাজবংশের গুণকীর্তন নির্ভর কাব্যগাঁথা ‘রাজমালা’ সঠিক ইতিহাস না হলেও এতে পঞ্চদশ শতকের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ ইতিহাসের সঙ্গে মোটামুটি সঙ্গতিপূর্ণ বলেই সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণ মনে করেন।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৪: সুন্দরবনের পাখি: গোত্রা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৫: ডেসডিমোনার রুমাল/৫

কিন্তু তার আগেকার সময়ের ত্রিপুরার ইতিহাস? সেটাই পুরোপুরি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ‘রাজমালা’য় ত্রিপুরার রাজবংশকে চন্দ্রবংশীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে মহাভারতের সময়কালের ত্রিপুরার রাজা ত্রিলোচনের কথা। কিন্তু ‘রাজমালা’তে যেমন সুপ্রাচীন কালের রাজবংশের কাহিনির নির্ভরযোগ্য ধারাবাহিকতা নেই, তেমনি পঞ্চদশ শতকের পূর্ববর্তী সময়ের ত্রিপুরার কোনও রাজকীয় মুদ্রাও আবিষ্কৃত হয়নি। ত্রিপুরার রাজাগণ এক সময় ‘ফা’ উপাধি ধারণ করতেন। তারপর একদিন ‘ফা’ ছেড়ে তারা মাণিক্য উপাধি ধারণ করতে শুরু করেন। ‘রাজমালা’ অনুসারে প্রথম রাজা রত্ন ফা ‘মাণিক্য’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। গৌড়াধিপতির সহায়তায় তিনি ভাইদের পরাস্ত করে বসেছিলেন ত্রিপুরার সিংহাসনে। তারপর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কয়েকটি হাতি ও একটি মূল্যবান মণি তিনি উপহার দিয়েছিলেন গৌড়াধিপতিকে।উপহারে সন্তুষ্ট হয়ে গৌড়েশ্বর তখন ত্রিপুরার রাজাকে ‘মাণিক্য’ উপাধি দেন।রত্ন ফা তারপরই হলেন রত্ন মাণিক্য। কিন্তু এ নিয়ে দ্বিমত আছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৬: বিষণ্ণ সকাল, নিঃসঙ্গ আদিনাথ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে মহা মাণিক্য (১৪০০-৩০খ্রিস্টাব্দ) হলেন ত্রিপুরার প্রথম মাণিক্য রাজা।’রাজমালা’ অনুসারে তাঁর নাম ছেংথুম ফা। যাইহোক, ত্রিপুরার ‘ফা’ রাজাদের মাণিক্য উপাধি ধারণকাল নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এটা স্পষ্ট পঞ্চদশ শতক থেকেই তার শুরু।ঊনকোটি ও পিলাকের ভাস্কর্যের নির্মাণ খ্রীষ্টিয় সপ্তম-অষ্টম শতক থেকে শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়।ছবিমুড়া বা দেবতামুড়ার ভাস্কর্যও দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের নির্মাণ বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আশ্চর্য ত্রিপুরার এই সব বৃহৎ সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে ‘রাজমালা’তে তেমন কিছু উল্লেখ নেই।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৬: জীবন নিয়ে কৌতুক আর ‘যৌতুক’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

ত্রিপুরার আবিষ্কৃত রাজকীয় মুদ্রা সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন হচ্ছে রত্ন মাণিক্যের মুদ্রা।১৪৬৪ থেকে ১৪৬৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি এই রাজার বেশ কিছু মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।’রাজমালা’,রাজকীয় মুদ্রার স্বাক্ষ্য,স্হাপত্য ও প্রত্ন সম্পদ এবং বিশিষ্ট ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুসারে ত্রিপুরার পঞ্চদশ শতক ও পরবর্তীকালের ইতিহাসের একটি রূপরেখা অঙ্কিত রয়েছে।কিন্তু ত্রিপুরা ও সন্নিহিত অঞ্চলের সুপ্রাচীন কালের বিভিন্ন শিল্পকর্মের সঙ্গে সেই ইতিহাসের সংযোগ ও ধারাবাহিকতা আজও যেন অধরা।সে কারণেই সুপ্রাচীন কালের প্রত্ন সম্পদে ছড়িয়ে থাকা উপাদান নির্ভর করে এই অঞ্চলের ইতিহাস পুনর্নির্মাণে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।—চলবে।

* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content