একঝলকে
● সিনেমা : গলি থেকে রাজপথ
● প্রেক্ষাগৃহ : রূপবাণী, অরুণা ও ভারতী
● পরিচালনা : প্রফুল্ল চক্রবর্তী
● ছবির নায়িকা : সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়
● অভিনীত চরিত্রের নাম : রাজা
● মুক্তির তারিখ : ১৭/০৭/১৯৫৯
সে সময়ের বাণিজ্যিক ছবির একটা গড়পড়তা মানদণ্ড নিয়ে বাজারে হাজির হয়েছিল ‘গলি থেকে রাজপথ’ নামক অচেনা নাম নিয়ে একটা ছবি। ‘বিচারক’ উত্তর উত্তমকুমার যে সমস্ত ছবিতে সকাল সন্ধ্যা অভিনয় করে যাচ্ছিলেন, সেদিক দিয়ে এ ছবির কাহিনি ও পরিচালনার বুনন, মূলত সে সময়ের বিদেশি ছবিতেই দেখা যেত। কিন্তু উত্তমবাবু ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং পাশ্চাত্যের মানসিক দ্বন্দ্বকে খুব সুন্দর করে ভারতীয় মোড়কে বিশেষত বাঙালি মোড়কে উপহার দিতে পেরেছিলেন।
আমরা সবাই জানি যে, দেশভাগোত্তর বাঙালি মনন, অনেকভাবে বিব্রত হয়ে গিয়েছিল। ধনবান লোকেদের ধনতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা; খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকার লড়াইয়ের সংগ্রাম, তাও যদি সে আবার বাস্তুহারা হয়ে থাকে এসব কিছুর একটা অনিয়মিত মেলবন্ধনে বাঙালিমানস দিশাহারা হয়ে পড়েছিল।
ঠিক সেই সময় উত্তমকুমারের আবির্ভাব এবং বাঙালির গড় পড়তা সেন্টিমেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত ছক ভাঙ্গা একটা আদতে গড়ে তোলা প্রশংসার দাবি রাখে বৈকি। ‘পথের পাঁচালী’ ভারতীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে এবং তার সাথে মানুষের লেনদেন যেভাবে বিশ্বজনীন করে তুলেছিল পরবর্তীকালে ঋত্বিক ঘটক মৃণাল সেন এনারা সামাজিক ব্যবধানের জরুরি অবস্থা তাদের সেলুলয়েডি কায়দায় উপস্থাপন করেছিলেন।
কিন্তু সেসব ছিল সুশীল সমাজের জন্য। গড়পড়তা মানুষের নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা কেউই সে অর্থে ভেবে উঠতে পারতেন না। পড়ে থাকতেন মাঝারি মানের নির্মাতারা। সেই মাঝারি মানের নির্মাতাদের কাছে ভগবান হয়ে উঠেছিলেন উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়। কারণ তিনিই বুঝতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র সংরক্ষিত ও সুশীল সমাজের কথা ভাবলেই চলবে না সিনেমা যেমন আর্ট, তেমনই ইন্ডাস্ট্রি। এদের দুজনের লড়াইটা যেমন চিরকাল থাকবে ব্যবধানটাও চিরকাল থাকবে। কাজেই শুধুমাত্র আর্ট-র কথা ভেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে হবে না।
ইন্ডাস্ট্রির কথা ভেবেও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে। যারা তাকে সারা বছর বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা সিনেমার আলোচনায় উত্তমায়ন না ঘটিয়ে নির্মিত সিনেমাটিক ফরম্যাট আলোচনা করলে লেখার স্বাস্থ্য আরো ভালো থাকবে। ছবিটির কাহিনী পরিচালক প্রফুল্ল চক্রবর্তীর। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মিহির সেন। ছবিতে উত্তম কুমার একটি চোর তথা পকেটমারের রোল করেছিলেন। এবং এই পকেটমারের রোল করতে গিয়ে তার প্রেমিকার সাথে যে মানসিক দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছিল সেটাই ছিল পরম উপভোগ্য বিষয়। সাবিত্রী চ্যাটার্জী বরাবরই সু-অভিনেত্রী। কোনও নির্দিষ্ট ম্যানারিজম আঁকড়ে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেননি। মঞ্চ ও চলচ্চিত্র উভয় জায়গার ব্যবধান সযত্নে রক্ষা করে ধীরে ধীরে এ ছবির প্রতিটি স্তরে নিজেকে উপস্থিত করেছিলেন।
ছবিটির মূল সম্পদ ছিল অভিনেতা অভিনেত্রী নির্বাচন। তৎকালীন সময়ে উত্তম-সুচিত্রা বা উত্তম সাবিত্রী দের নিয়ে নির্মাতারা যে ছবি নির্মাণ করুন না কেন অবধারিতভাবে একজন অভিভাবকের চরিত্রে হয় ছবি বিশ্বাস নয় পাহাড়ি সান্যাল বা কমল মিত্র, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব চরিত্রে তুলসী চক্রবর্তী, বিকাশ রায় নিধেনপক্ষে জহর রায়। তৃতীয় স্তরে যারা সমস্ত চরিত্রের মধ্যে সেতুবন্ধন করেন সেখানে অবধারিতভাবে শৈলেন মুখোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা অনুপ কুমার ও গঙ্গাপদ বসু এরকম একটা স্টাফ প্যাটার্ন কে তৎকালীন পরিচালকরা মাথায় রেখেই সিনেমা শিল্পে নামতেন এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি, হয়েছিল শুধু কমল মিত্রের মতো একজন দাপুটে অভিনেতার যাওয়া । ছবিটির সাযুজ্য রক্ষায় সে সময় কমল মিত্রকে রাখলে খুব ভালো হতো।
চরিত্রের ওঠাপড়া যেভাবে ছবিটির মূল কেন্দ্রকে আবর্তিত করেছে তার ফসল আমরা দেখতে পাবো চিত্রনাট্যের মার প্যাঁচে। মিহির সেনের চিত্রনাট্য কোন অংশে নিতাই ভট্টাচার্য বা নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের থেকে কম যায়নি। যে সময় মেকাপ নিয়ে বাঁকা চোখের চাহনি আর কৃত্রিম চলাফেরায় একটা টাইপ অভিনয় বাংলা ছবি সম্পদ ছিল সেখানে নিজেকে বন্দী না রেখে উত্তম কুমার একটা ব্রেক এনেছিলেন। উত্তমকুমার মানেই এমন এক প্রেমিক যিনি নায়িকার শরীরে আবেদনে নয়, সাড়া দিতেন তাঁর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আর অব্যক্ত প্রেমে।
এ ছবিতে উত্তম কুমারের উপস্থাপন একটু ছকভাঙ্গা হলেও তার চোখের আবেদন যেন শুধু উদাসীনতায় ভরা। যিনি উল্টোদিকের মানুষটার হৃদয়ের ঐশ্বর্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মুখ চোখের দৃষ্টিতেই যাঁর ফুটে উঠছে আশ্চর্য এক অভিজ্ঞান। এক কথায় ভিক্টোরীয় জনরুচির যোগানদারিতে এক শক্তিশালী অভিনেতার অধিকাংশ প্রতিভার অপচয়।
কারণ সাধারণ ম্যাটিনি আইডল থেকে বড় মাপের অভিনেতা হওয়ার উচিত জ্ঞানত অজ্ঞানত উত্তম কুমার সেটা নির্মাণ করেছেন। তিনি মধ্যবিত্ত বাঙালির চাহিদার ছাঁচে নিজেকে ঢালাই হতে দিয়েছিলেন নানা নির্বোধ পরিচালকের হাতে চিত্রনাট্যের দাবিতে। কথাটা নির্মম হলেও সত্য। অন্যদিকে নায়িকা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ অভিনয়, এ ছবির প্রতিটি পর্ব ফুলে ফলে ভরে উঠেছে।
চরিত্রাভিনেতা হিসাবে অনুপ কুমার ষও এই ছবিতে বেশ উজ্জ্বল আরও একটি সম্পদ এই ছবিতে তৈরি হল যা না বললে সময়ের কাছে অপরাধ থেকে যাবে। পরবর্তীকালে উত্তম কণ্ঠের অপরিহার্য সম্পদ মান্না দে এই ছবিতেই প্রথম উত্তম কুমারের জন্য মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। অনিবার্যভাবে সুরারোপের দায়িত্ব পেয়েছিলেন আর এক ক্ষণজন্মা সুরকার, সুধীন দাশগুপ্ত।
উত্তম কুমার যে সময়ের ফসল হিসাবে পরবর্তী কালে নিজেকে উপস্থাপন করবেন এ ধরণের ছবিগুলো ছিল তারই প্রস্তুতি পর্ব। কেন জানি না, জেনে হোক বুঝে হোক ছবিটির নামকরণ ছিল অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী। উত্তম কুমারের সমস্ত ফিল্মোগ্রাফ সেই সময় থেকেই ‘গলি থেকে রাজপথে’-ই যাত্রা শুরু করেছিল।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com