কলকাতায় বৃষ্টি
আলো নিয়ে মানুষের মনে নানা যুক্তি-তর্ক। গরমের দিনে কাঠফাটা রোদ, ঘন বর্ষার শেষে মেঘের ফাঁক থেকে রোদের লুকোচুরি, ভোরের আলো, গোধূলির আলো, পড়ন্ত বেলার আলো, পূর্ণিমার আলো, অমাবস্যার আলো ইত্যাদি প্রভৃতির পাশাপাশি জোনাকির আলো থেকে হ্যাজাক বা হারিকেনের আলো, মশালের আলো থেকে দীঘির ধারে ওই যে কীসের আলো, কনে দেখা আলো থেকে জ্ঞানের আলো, চোখের আলো থেকে মাথায় জ্বলে ওঠা আলো, পাড়ার পুজোর আলো থেকে লোডশেডিংয়ে চলে যাওয়া আলো…নানারকম। কবি তাই আলো আমার আলো, আলো ভুবনভরা ইত্যাদি নানাভাবে আলোকে মাহাত্ম্যপূর্ণ করেছেন। কিন্তু অন্ধকার না হলে ঘুম আসে না। কারও কারও অবশ্য অন্ধকার হলেই ঘুম আসে না। সে যাই হোক, অন্ধকার না থাকলে আলোর মাহাত্ম্য নেই, আলোও অন্ধকার-সাপেক্ষ বটে। কোনও কোনও সকালের আলো রাতের থেকেও অন্ধকার। ভুবনভরা এই আলো আবার দ্রুতগামী হলেও সর্বত্রগামী নয়। তাই পাড়ার কোনও কোনও গলি থেকে রাজপথ, নিশীথের অন্ধকারের মালয় কিংবা যমালয়, পৃথিবীর আলোকিত ভাগের অন্য দিক কিংবা প্রোজ্জ্বল প্রদীপের পাদদেশে অবশ্যম্ভাবী হয়ে “থাকে শুধু অন্ধকার”।
অনেক অনেক দিন আগে, অনেক অনেক রাত আগে পবিত্রতম অগ্নি জ্বলে উঠে ক্রমে ক্রমে অন্তরতর হয়ে নির্ভয় করেছিল আদিমানবকে। অন্ধকার থেকে উত্সারিত ওগো অনন্ত অগ্নি, যুগে যুগে আঁধারের গায়ে গায়ে তোমার ভাস্বর দীপ্ত স্পর্শের অনির্বাণ দীপালিকা শীতল ধরিত্রীকে উষ্ণতা, নিরাপত্তা দিয়েছে। তুমিই আবার লেলিহান হয়ে গ্রাস করেছো নগর-জনপদ-অরণ্য, ভূলোক থেকে দ্যুলোকে, অন্তরীক্ষে তোমার সপ্রভ নিরন্তর পদসঞ্চার, পাদবিক্ষেপ। ভয়ংকর থেকে অন্তরতম হয়ে উঠেছ তুমি কালে কালে। শরীরের অন্তঃস্থলে তেজোরূপ, জগতে প্রকট, অন্তরে অন্তর্যামী তুমি দৃশ্যমান লোক থেকে হৃদয়ের গহন গভীরপুরে সচ্ছন্দ “আপন আলো”কে জ্বালিয়ে তুলেছো বারবার।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৫: সুস্থ থাকলে কেউ কি কবিতা লেখে?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৭: জীবনখাতার প্রতি পাতায়

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

আকাশ এখনও মেঘলা/৪০

আলো আর অন্ধকারের পারস্পরিক সহাবস্থান কালে কালে এক দ্বন্দ্বের পরিসর গড়ে তুলেছে। যে আলো নিশীথিনী রাত্রির অমানিশা কাটিয়ে দিয়েছিল মানসিক নিরাপত্তা, যে অগ্নি পথভোলা পান্থজনকে করেছিল গৃহবাসী, যে গৃহবাসীর পবিত্র গৃহকোণে জ্বলে উঠেছিল পূতাগ্নি, সেই আলো, সেই অগ্নি অন্ধকারের বিপ্রতীপে শুভাশুভের প্রতীকায়িত ব্যঞ্জনাটিকে সংস্কারের মূলগত করেছে। সামাজিক আদর্শ, সংঘাত, ন্যায়-অন্যায়ের মূল নির্ণায়ক, মাণদণ্ড হিসেবে যা-কিছু স্বীকৃত… সকলের মধ্যেই আলোর পবিত্র, অন্ধকারের অশুভ স্পর্শটুকু লেগে থাকে। দিব্য, অন্তরতম আলোকের উত্স পার্থিব অগ্নি, সূর্যাগ্নির প্রত্যক্ষপ্রভা যুগে যুগে পৌঁছে গিয়েছে বোধে, মস্তিস্কে, চেতনায়, যাপনে, সাংস্কৃতিক পরিসরে। মানুষ তাকে বহন করছে বাহ্য ইন্দ্রিয় থেকে অতীন্দ্রিয় রহস্যলোকে, হৃদয়ের মণিমঞ্জুষায় লালিত শাশ্বত দীপ্তিতে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২২: সুন্দরবনের পাখি: ডোরা-লেজ জৌরালি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন

যখন পৃথিবীতে গভীর নিরালোক অমানিশার তমঃ বিস্তৃত হয়, অপবিত্র অসীম অন্ধকারে হৈমন্তিকী সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারের বুকে জ্বলে উঠবে সেই দীপালোক। সেই দীপালোক একদিন বসন্তসেনার করবন্ধনের অন্তরালে নিভেছিল, জ্বলে উঠেছিল শাশ্বত হিরণ্যের দীপ্তি নিয়ে ছোট্ট মাটির খেলনা গাড়ির মাঝে। মৃচ্ছকটিকে এও এক দীপালিকা। সেই দীপরাশিতেই পূজারিণী শ্রীমতীর সাজিয়ে তোলাপ্রাসাদকাননের স্তূপপদমূলে শেষ আরতির শিখাটুকু নিবেছিল কোনও এক শারদনিশীথে। নিবেছিল জীবনদীপ। তবুও অগ্নি অনির্বাণ, জীবন মৃত্যুঞ্জয়ী। এই আলোর অমলিন রাত সকল ভয়কে জয় করে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে দিয়ে আত্মদীপ হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। চতুর্দশীর ঘোরা রজনীর স্নিগ্ধ প্রদীপে পিতৃঋণ স্বীকার করে দীপাবলীর দীপান্বিতা রাত্রির বিচিত্র শোভায় জগৎ পূর্ণ হবে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৪: কথা বলা অতীত

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৪: রামের অমল মহিমা, অরণ্যবাসের সাধুসঙ্গ

এই আলোর অমলিন রাত সকল ভয়কে জয় করে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে দিয়ে আত্মদীপ হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। চতুর্দশীর ঘোরা রজনীর স্নিগ্ধ প্রদীপে পিতৃঋণ স্বীকার করে দীপাবলীর দীপান্বিতা রাত্রির বিচিত্র শোভায় জগৎ পূর্ণ হবে। এই আলো, এই অগ্নি পূর্ণতার। অন্ধকারকে অপসৃত করে অনুপম আলোকধারায় পূর্ণ হওয়া যদি জীবনের একটি লক্ষ্য হয়, তবে সেই পুণ্য আলোকপ্রাপ্তির পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। দহনের পথ অতিক্রম করেই জীবন সেই অলকায় পৌঁছোয়। সাহিত্য, শাস্ত্র সেই যাত্রাপথের আনন্দগান শুনিয়ে জীবনকে সদর্থক করে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

বিদেশের প্রাচীন লোককথার সেই গল্পটি শেষে মনে করা যাক অ্যাণ্ডারসনের অমর গল্পমালা থেকে। প্রবল শীতের রাতে এক পসারিণী বালিকা বাড়ি ফিরছিল। প্রবল শৈত্যে তার শরীর প্রায় স্থবির। সারাদিনে কিছু বিক্রি হয়নি। পেটে খাবার নেই, কালনিদ্রা নেমে আসতে চাইছে শরীর জুড়ে। একটা বাড়ির রোয়াকে বসে পড়ে সে। একটা দুটো করে জ্বালতে থাকে তার পণ্য, অবিক্রীত দেশলাই কাঠি। ক্রমে আরও বেশি। আরও আরও। মুহূর্তের উষ্ণতা, রোশনাই, আলোকসাগর পার করে তারপর ফুরোয় সকল বারুদ। ক্রমে কমে আসে আলো, আলো ফুরোয়। জীবনও লুটিয়ে পড়ে অনন্ত শৈত্যের মাঝে নিরালোক আঁধারে। দীপান্বিতার রাতগুলি আত্মোপলব্ধির, নিজের অন্তর্লোকের ঝিকিমিকিটুকুর খোঁজেই নিজের মুখোমুখি বসার অন্ধকার ঘনায় এদিন, ওই তামসীকে জয় করার জন্য।

* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content