শুক্রবার ৫ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সুনীতি প্রমাদ গুনছেন। গোরার আত্মপ্রচারিত বিয়ের কথায় স্বামীর স্তব্ধতা নজর এড়ানোর নয়। পরিবেশকে স্বাভাবিক করতেই হবে। নির্জন দুপুরের দেহে রোদের আঁচ এখন খানিক তেরছা ভাবে পড়ছে। পাখির কুজন উচ্চ গ্রামে। নীড়ে ফেরার মহোৎসবে ঢাকা পড়ে গিয়েছে প্রাকৃতিক নৈঃশব্দ। ভালোই হয়েছে। তাঁদের কথা-ধ্বনি অন্যের কানে প্রবেশ করবে না।

দরজা ভেজিয়ে স্বামীর পায়ের কাছে বসলেন সুনীতি। অন্য দিন হলে আদিনাথ সরে শুতেন। বালিশ গুছিয়ে যত্নে স্ত্রীর শোবার বন্দোবস্ত করে দিতেন। আজ নির্বাক। বন্ধ চোখের ওপর আড়াআড়ি হাত দিয়ে শুয়ে আছেন। দীর্ঘ দেহ। স্পন্দনহীন। ঝড়ের পূর্বাভাস। একের পর এক বিচিত্র সব ঘটনার অভিঘাত যেন জমাট যন্ত্রণা হয়ে আছড়ে পড়বে সুনীতির ওপর।

—আমার কথা শুনছেন?
—হুম।
—বিবাহ করবার বয়স অখন হয় নাই গোরার। তবে বিচক্ষণতা হইছে আমি নানা ভাবে লইক্ষ করছি, যে দায়িত্ব সে নেয় তা সম্পন্ন করে।
—হুম।
—তাই আপনারে কই, ওরে লইয়া আপনি চিন্তা করবেন না।
—আর শঙ্কু মানুরে লইয়া? খুকু গৌরী সুধারে লইয়া? আদিনাথ কেমন কর্কশ হয়ে ওঠেন।
চোখের উপর থেকে সরে গেছে হাতের আড়াল। চশমাহীন ভাসমান দুটি আয়ত চক্ষু সুনীতির দিকে স্পষ্ট তাকিয়ে। যেন এইসব অবাঞ্ছিত সন্তানদের অবাধ বৃদ্ধির দৌড়াত্মে পিষ্ট হয়ে যাবেন। যন্ত্রণা কাতর শিশুর অসহায়তা তাঁর সর্বাঙ্গে।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় সুনীতি মুখ নিচু করে ফেলেছেন। গোরার বিবাহ প্রসঙ্গে স্বামীর মনে যন্ত্রণার বিষ ছড়াচ্ছে। আদিনাথের ধবধবে পা দুখানায় সুনীতি তাঁর কর্মশীর্ণ হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন।
—শোনেন, আপনি আমার কথাডা, বিশ্বাস করেন।

কোনও ভয় নাই, গুরুদেব আছেন, তিনি পরম রক্ষা কর্তা।
সময় বয়ে চলেছে নিম্নাভিমুখে। পাশের জানলা বেয়ে চৌকির বিছানায় মেদুর ছায়া ছড়াচ্ছে বাতাবি পাতার পুঞ্জ। দুটি শব্দহীন নরনারী কিঞ্চিত শারীরিক ব্যবধানে। মধ্যেকার শূন্যতা ক্রমশ পূর্ণ থেকে পূর্ণতর হয়ে দুজনের সম্মিলিত কত স্মৃতি সন্তাপ আর অনিশ্চয়তাকে ভরাট করে তুলতে থাকে।
সন্ধ্যাবেলা শঙ্খে ফুঁ দিয়ে খুকু উঠোনে নেমে এলো প্রদীপ হাতে। দু থাক সিঁড়ি দিয়ে নেমে তুলসী মঞ্চ। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় অন্ধকার এখানে মায়াবী। তার মধ্যিখানে দেবদূতীর মতো খুকু। আকাশের ছায়া পথ থেকে কোন দেবতা হয় তো দেখছে ওকে। মুখ টিপে হাসলো খুকু। হেসেই ধমকালো নিজেকে। তুলসী তলায় প্রদীপ দেখাতে গিয়ে ওসব কখনো মনে করতে নেই।
টুলুদা কি যে করে। লোকের সামনে লজ্জার এক শেষ হতে হয়। ওর তো কোনও সংকোচ নেই। প্রথম দিন থেকেই। সেই কবে গৌরী হারিয়েছিল তখন তাকে খুঁজে পেতে নিয়ে এসেছিল এই টুলুদা।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-৯৩: কৈলাসচন্দ্রের কাছে রাজবংশের কাহিনি শুনে ত্রিপুরার প্রতি আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথ

শুরুতেই তাকে ভারী পছন্দ হয়েছিল সুনীতির। এখনও মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। সেদিন ও এমন বেলা পড়ে আসা শেষ বিকেলে মা-মেয়ে মুখোমুখি হয়েছিল। উত্তর দিকে নিম গাছের ঝিরিঝিরি পাতায় হালকা হলুদ রঙের মরা রোদ দিনের শেষ খেলায় মেতেছিল। দুটো শালিক ডাকছিল আপন মনে। হাওয়ায় শোনা যাচ্ছিল উত্তরের গান । সুনীতি এসে খুকুকে বলেছিলেন—
—ওখানে কি করছিস রে মা?
খুকু সাঁতার কাটছিল লজ্জা সুখের গোপন জলাশয়ে। খুকুর নিবিড় কিশোরী বুকে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউয়ের দোল অকারণে দুলছিল।
—কিছু না মা, তুমি কি কর?
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

সুনীতি বলেছিলেন, কালো হয়ে আসা গাছালির ছায়ায় মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমে মুখ করে অগোচরের দীনমণির উদ্দেশ্যে নিঃশব্দ প্রণাম রেখে সুনীতি বলেছিলেন—
—বোঝোই তো মা সংসারের করুণ দশা, তোমার বাবায় কী ছিলেন আর বর্তমানে কী হইলেন, এতগুলি পোলাপান ভবিতব্যের কথা চিন্তার বাইরে। তাই কই রে মা, ওই টুলুর লগে তোর সম্বন্ধ যদি করি, এখন জানি না আলাপ পরিচয় তো সেভাবে হয় নাই, তয় ছেলেটিরে বড় চোখে লাগছে রে, মা।
কিন্তু সেদিন পৃথক হয়ে গেছিল খুকু। অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সুনীতির আবেগের খোলা মুখ। বলেছিল—
—মা আমি কলকাতার ইস্কুলে ভর্তি হ।
হইছিলাম তো কও? এখানেও আমারে ইস্কুলে পাঠাও মা। পড়াশুনাডা আমারে করতেই হইবো।
—খাড়া মা! এত বিপত্তির মধ্যে এমন বায়না তুললে কি চলে?
—না মা না কোনো কথা শুনুম না। আমারে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। আমি লেখাপড়া করতে চাই। গৌরী সুধারেও শিখতে হইব। বাউন্ডুলের লাখান উড়ে বেরালে দুঃখের শেষ থাকব না।
তার ওপর রামের এমন ব্যাধি!
সুনীতি শান্ত মানুষ। বুঝেছিলেন আপাতত বিবাহ প্রসঙ্গে গিয়ে লাভ নেই। সংসারের শতছিন্ন যন্ত্রণায় মুহ্যমান খুকু। সংকটের ভরাডুবি থেকে আগে সকলকে নিয়ে পারে উঠতে চায় ও।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

তারপর কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন। এখন খুকুর সঙ্গে টুলুর আলাপ জমে উঠেছে বেশ। খুকু ভাবে টুলুর তো কোন সংকোচ নেই। যখন ই আসবে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে তার দিকে। দু’ একটা কথা বলবে কি বলবে না শুধু যেন তার দিকে চেয়ে থাকা কাজ। কেন খুকুর মুখে কি আছে! এদিকে একটা কাজ দিলে করবার নাম নেই। এই তো সেদিন টুলু যখন রান্নাঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল তখন খুকু বলে দিয়েছে বোনেদের জন্য স্কুলের খোঁজ নিতে।
আজই খোঁজ নেব, বলে দুদিনের জন্য বাবু নিখোঁজ হয়েছেন। ভরা সন্ধ্যায় সিঁড়ির শেষ ধাপে পা ছড়িয়ে একটু বসলো খুকু। রাতের রান্নার পাট দেরি আছে।
একটু দূরে কার ছায়া শরীর! খুকু হাঁক দেয়—
—কেডা নবীন নাকি?
—হ দিদি।
—আয়, এখানে বস।
—না না, ঠিক আছে, আমি খাড়া আছি।
ভ্রুকুটির সঙ্গে এবার হুকুম—
—আয় বস বলছি।
আরও পড়ুন:

শিবরাত্রির বিশেষ পর্ব : শিব

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

মুহূর্তে হুকুম তালিম। দু’জনে বসে আছে উঠোনের আলো ছায়ায়। খুকু ওর কাছ থেকে নিচ্ছে কলকাতার খবর। সোনাদার কথা। বড় দাদা বড় বৌদি, ছোড়দা ছোট বৌদির কথা, এমনকি ছেদো বিড়ালের সংবাদ। বাধ্য অনুগত ছাত্রের মত নবীন একের পর এক উত্তর দিতে থাকে। ততটুকুই দেয় যা শুনলে খুকু খুশি হবে। এক সময় ফুরিয়ে যায় কথা। উঠি উঠি করেও খুকুর উঠতে ইচ্ছা করে না। মনটা জুড়ে টুলুদার অপলক চোখ দুটো পাপড়ি মেলা পদ্মের মতো ফুটে থাকে। চোখে চোখে সকলের অলক্ষে কথা হয় দুজনের। শুভদৃষ্টির অনুরাগ মুহুর্তের কল্পনায় খুকু যেন টুক করে চোখ নামিয়ে নেয়। ঘন অন্ধকারে মিশে দুটো আরক্ত নয়ন কেবল নিঃশেষে চুরি করে নেয় সেই সলজ্জ অমূল্য দৃষ্টিপাতের ছবি।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content