
রোজ যেমন রাত্রি নামে, আজকেও তেমনই নেমেছিল। ন্যাথানিয়েল গোবিন্দ সোরেন মেইন গেট বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে তালা মারেনি। সেটা মারা যায়ও না। অনেক সময় এমার্জেন্সি কেস থাকে। ডাক্তার না থাকলেও নার্স দিদিরা রয়েছেন, তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা অন্তত করতে পারেন। হয়তো অপারেশন ইত্যাদি করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাদের চার্চ-হসপিটালে পাঠিয়ে দেওয়া যায়। আগে রাতের বেলাও মেইন গেট খোলা থাকত। ডাক্তারবাবুর করা হুকুম ছিল, হেলথ সেন্টারকে দিনে-রাতে চব্বিশ ঘণ্টা পেশেন্ট-ফ্রেন্ডলি রাখতে হবে।
ডাক্তারের আলাদা কোনও বিশ্রামের সময় বলে কিছু হয় না। কিন্তু এই উদারতাই তাঁর কাল হল। তাঁর আগের ডাক্তারদের তো গোবিন্দ দেখেছে। তাঁরা সন্ধ্যার পর এখানে হয় থাকতেন না, সদরে চলে যেতেন। কোনদিন যদি থাকতেন কেউ, তাহলে সন্ধ্যার পর-পরই নট-অ্যাভেইলেবল্ হয়ে যেতেন। কিন্তু সত্যব্রত সব দিক থেকেই আলাদা। তাঁর না থাকাটা বড় বেদনার মতো বুকে বাজছে তার। বড় ভালমানুষ ছিলেন। সেটাই কাল হল!
ডাক্তারবাবু অন্তর্ধানের পর সেই যে অতর্কিতে হামলা হয়েছিল, তারপর পুলিশ থেকেই তাকে রাতের বেলায় মেইন গেট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ডাক্তার যেহেতু নেই, ফলে আপাতত এই হেলথ সেন্টার রাতের বেলা পরিষেবা বন্ধ রাখছে, এটাই লিখে গেটের বাইরে নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ডাক্তারের আলাদা কোনও বিশ্রামের সময় বলে কিছু হয় না। কিন্তু এই উদারতাই তাঁর কাল হল। তাঁর আগের ডাক্তারদের তো গোবিন্দ দেখেছে। তাঁরা সন্ধ্যার পর এখানে হয় থাকতেন না, সদরে চলে যেতেন। কোনদিন যদি থাকতেন কেউ, তাহলে সন্ধ্যার পর-পরই নট-অ্যাভেইলেবল্ হয়ে যেতেন। কিন্তু সত্যব্রত সব দিক থেকেই আলাদা। তাঁর না থাকাটা বড় বেদনার মতো বুকে বাজছে তার। বড় ভালমানুষ ছিলেন। সেটাই কাল হল!
ডাক্তারবাবু অন্তর্ধানের পর সেই যে অতর্কিতে হামলা হয়েছিল, তারপর পুলিশ থেকেই তাকে রাতের বেলায় মেইন গেট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ডাক্তার যেহেতু নেই, ফলে আপাতত এই হেলথ সেন্টার রাতের বেলা পরিষেবা বন্ধ রাখছে, এটাই লিখে গেটের বাইরে নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ডাক্তারবাবু থাকলে অনেক রাত অবধি তিনি চেম্বারে বসে থাকতেন। কম্পিউটারে কাজ করতেন। ফাইলপত্রের কাজ করতেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা কখনও শেফালিদি, কখনও তার সঙ্গে কত কথা বলতেন। এত অন্তরঙ্গতা আর কোউ ডাক্তারবাবু কখন তাদের প্রতি দেখিয়েছেন বলে তো মনে হয় না। কিন্তু কথায় বলে না, বেশি ভালো মানুষের শত্রু বেশি। সেটাই হল। অবশ্য গোবিন্দর সিক্স সেন্স আগেই বলছিল, যখন থেকে ডাক্তারবাবু বুধন মাহাতোর কেস নিয়ে ইনভেস্টিগেট করতে লেগেছেন, তখন থেকেই তিনি বিপদ প্রায় ঘাড়ে করে ডেকে এনেছেন। কোনও-না-কোনওদিন কিছু-না-কিছু হয়ে যাবেই যাবে। সাবধানও করেছে ডাক্তারবাবুকে সে। কিন্তু তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, “গোবিন্দ, আমি তো আর পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা না? কিন্তু আমারই হেলথ সেন্টার থেকে একজন পেশেন্ট সেজে ভর্তি হল, তারপর উধাও হয়ে গেল, তার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে, সেই লাশও পাওয়া গেল জঙ্গলের মধ্যে, লোকে বলল কালাদেওর হাতে মৃত্যু হওয়ায় বুধন প্রেত হয়ে গিয়েছে—এসব গাঁজাখুরি আর যেই বিশ্বাস করুক, আমি করি না। আমি সেজন্য আসল সত্যটাকে জানতে চাই। তা না হলে, সারাজীবন ওই কাঁটা খচখচ করবে আমারই বুকের মধ্যে!”
“কিন্তু ওই কাঁটা যে যারা কাণ্ডটা সাজিয়েছে, তাদেরও বুকের মধ্যে খচখচ করবে স্যার। আপনি বড় বেশি জেনে গিয়েছেন। সার্কাসের ছেলেটির সন্ধান পুলিশকে দিয়েছেন। তারা পাগলের মতো খুঁজছে তাদের। যদিও পাশের রাজ্যে যেখানে তারা লাস্ট অবধি ছিল বলে খবর, সেখান থেকে রাতারাতি তারা উধাও হয়ে গিয়েছে বলে শুনছি!”
“এত তাড়াতাড়ি তারা সতর্ক হয়ে গেল কী করে গোবিন্দ?”
“সেটাই বুঝতে পারছি না স্যার! সর্ষের মধ্যে ভূত নেই তো?”
“কী জানি?”
“ওরা কোনওদিন এখানে অ্যাটাক না করে!”
“হেলথ সেন্টারে সহজে অ্যাটাক করার সাহস দেখাবে না বলেই মনে হয়!”
“কী জানি! আমার মন কু-ডাক ডাকছে স্যার!”
“পজিটিভ চিন্তা করো। সবসময় খারাপ হয় না!” বেশ জোরের সঙ্গে বলেছিলেন সত্যব্রত।
“কিন্তু ওই কাঁটা যে যারা কাণ্ডটা সাজিয়েছে, তাদেরও বুকের মধ্যে খচখচ করবে স্যার। আপনি বড় বেশি জেনে গিয়েছেন। সার্কাসের ছেলেটির সন্ধান পুলিশকে দিয়েছেন। তারা পাগলের মতো খুঁজছে তাদের। যদিও পাশের রাজ্যে যেখানে তারা লাস্ট অবধি ছিল বলে খবর, সেখান থেকে রাতারাতি তারা উধাও হয়ে গিয়েছে বলে শুনছি!”
“এত তাড়াতাড়ি তারা সতর্ক হয়ে গেল কী করে গোবিন্দ?”
“সেটাই বুঝতে পারছি না স্যার! সর্ষের মধ্যে ভূত নেই তো?”
“কী জানি?”
“ওরা কোনওদিন এখানে অ্যাটাক না করে!”
“হেলথ সেন্টারে সহজে অ্যাটাক করার সাহস দেখাবে না বলেই মনে হয়!”
“কী জানি! আমার মন কু-ডাক ডাকছে স্যার!”
“পজিটিভ চিন্তা করো। সবসময় খারাপ হয় না!” বেশ জোরের সঙ্গে বলেছিলেন সত্যব্রত।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : এই ভাষাতেই করি গান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৭: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত
গোবিন্দ এখন জানে, সবসময় আত্মবিশ্বাসের ফল ভালো হয় না। এবারেও হয়নি। গেট লাগিয়ে চেম্বারে এসে সামনের যে-ঘরটার একপ্রান্তে সে বিছানা করে শুয়ে থাকে, সেখানে আজও শোওয়ার তোরজোড় করছিল। আজকাল যত বয়স বাড়ছে ঘুম তত কমে যাচ্ছে তার। আর যখন ঘুমায়, তখনও আধা ঘুম, আধা জাগরণের মতো অবস্থা হয়। সারারাত কত কী যে শব্দ হয়। আর থেকে-থেকে সে চমকে ওঠে। কখন রাতচরা পাখিদের ডাক, কখন পোকামাকড়ের আওয়াজ, গাছপালা থেকেও রহস্যময় অদ্ভুত সব আওয়াজ ভেসে আসে, দূরে কোথাও হো-হো করে হেসে ওঠে যেন কেউ, আর তার ঘুম ভেঙে যায়। এই সময় সে নড়ে না, চড়ে না। মড়ার মতো শুয়ে থাকে আর প্রভু যিশুকে স্মরণ করে। কোনও-কোওদিন বাইরে বেরিয়ে দেখেছে। গোটা কম্পাউন্ড জুড়ে আলোছায়ার খেলা। নিস্তব্ধতারও একটা নিজস্ব রূপ আছে। কিন্তু এ-রূপ তার মনে কোন ভালোলাগার জন্ম দেয় না। বরং থেকে-থেকে সে শিউরে ওঠে। কে জানে কেন? সে নিজেই বোঝে না। তার মনে হয়, অন্ধকারের মধ্যে কারা যেন দাঁত-নখ বার করে গিলে খেতে আসবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পিশাচ পাহাড়ে যে কত অদ্ভুত ঘটনাই ঘটতে সে শুনেছে। দেখেছেও। আজকাল ঘুম ভেঙে গেলে সেইসব কথাও ভিড় করে। ভয় পায় না সে। অস্বস্তি হয়। নির্বিকার একটা ঘুমের রাত চায় সে। কিন্তু বারবার কেন যে ঘুম ভেঙে যায় তার? এক সময় হয়তো এমন হবে যে রাতে পাতা খসে পড়লেও ঘুম ভেঙে যাবে তার।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ
আজকেও সে শুয়ে পড়েছিল। ঘুমিয়েও পড়েছিল হয়তো। আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় হঠাৎ যেন মনে হল, কোথাও আওয়াজ হল মৃদু। কেউ কি কথা বলছে চাপাস্বরে? উঠে বসবে ভাবলেও উঠল না। অপেক্ষা করল। নাহ্। আবার চুপচাপ। একটু চোখ বন্ধ করতেই সরসর করে আওয়াজ। কেউ যেন মোরাম-বিছানো কম্পাউন্ডে হাঁটছে। কোনও এমার্জেন্সি না-কি? তারা কি জানে না, ডাক্তারবাবু নেই!
দরজাটা ভেজান থাকে রাতের বেলা। একটা ছোট ঠেকনা আলগাভাবে দেওয়া থাকে ভিতরের দিকে। যাতে একটু জোরে ঠেললেই শব্দ হয় আর তার ঘুম ভেঙে যায়। ভালুক-টালুক যদি এসে পড়ে তার জন্য আগাম সতর্কতা আসলে। অনেকসময় পাহাড়ি অজগরও চলে আসে। এসেছিল একবার। তবে ওই একবারই। তখন চারপাশের সীমানা-প্রাচীর ছিল না। কাঠের খুঁটি আর ছেঁড়া তার সম্বল ছিল সে-সময়। কিন্তু এখন কংক্রিটের প্রাচীর। যদিও অজগরের কাছে সে বাধা কোন বাধাই নয়। আশেপাশের গাছ বেয়ে সে অবলীলায় কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে যে-কোন সময়। একটু সজাগ হল গোবিন্দ। দরজায় কেউ ঠেলল বলে মনে হল তার। আস্তে-আস্তে ঠেলছে। খুব সতর্ক ভঙ্গীতে।
কে? উঠে বসে সে। জীবজন্তু হলে সামলে নেবে সে। এতটা ক্ষমতা এই বয়সেও তার আছে। কিন্তু তার ভয় জীবজন্তুর চ্যেও ভয়ানক যে প্রাণি, সেই মানুষকে নিয়ে। কিন্তু ডাক্তারকে তো কারা তুলে নিয়ে গিয়েছে। তারপর আবার কাকে তুলে নিতে এসেছে? তাকে? কিন্তু কেন? তাহলে কি তারা জেনে গিয়েছে যে, সে-ই বেদের দলেত্র সেই অদ্ভুত ছেলেটির খবর ডাক্তারকে দিয়েছিল। সেইজন্য কি এবার তাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে? ডাক্তারবাবু হয়তো বলেছেন, তার কাছেই শুনেছেন তিনি। কিন্তু যদি দিয়েই থাকে, তাহলে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে কী লাভ? তবে কি ওরা জেনে গিয়েছে যে, তার কাছে আরও কিছু খবর আছে, যা ডাক্তারকে বলেনি সে এখনও? উঠে বসল সে। ওরা ভিতরে ঢোকার আগে যদি কোনরকমে ভিতরে ডাক্তারের নিজস্ব যে ওয়াশরুম আছে, সেখানে চলে যেতে পারে, তাহলে তার পিছনের দরজা দিয়ে সে পালিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আত্মগোপন করতে পারবে। মুহূর্তে সে চিন্তা করে নিল কী করতে হবে। অতি দ্রুত সে বিছানা ছড়ে উঠে পড়ল। তারপর পাশে রাখা সস্তার বোতামটেপা মোবাইল, আর চাবির গোছাটা তুলে নিল। ওরা দরজায় আবারও আস্তে-আস্তে ঠেলা মারল। সম্ভবত ওরা ভাবছে তার ঘুম যাতে না ভাঙে। তবে ওরা খবর নিয়েই এসেছে। রাতে দরজা যে বন্ধ থাকে না, তা ওরা জানে। বাইরে দু’জনের অন্তত গলার আওয়াজ পেল সে।
একজন বলছে, “বেজন্মার বাচ্চা বুড়োটা ভিতরে আছে তো?”
উত্তরে আর একটি গলা শোনা গেল, “না থাকলে, দরজা ভিতর থেকে কেই বা বন্ধ রেখেছে?”
“বন্ধ না-কি? ভেজানো থাকে বলেই তো জানি!”
“তাহলে খুলছে না কেন?”
“পুরানো দরজা বলেই হয়তো ! জোরে ঠেলতে হবে!”
“বন্ধ থাকলে কিন্তু তাতে আওয়াজ হবে এবং শয়তান বুড়োটা উঠে পড়বে। ওর কাছে মোবাইল আছে। পুলিশ ডাকলে আজকের মিশন কিন্তু মায়ের ভোগে!”
“দাঁড়া, ঠেলে দেখি আস্তে। না হলে জোরেই ঠেলতে হবে। তারপর যা হয় হবে!” বলে আবার আস্তে-আস্তে দরজায় ঠেলা মারতে লাগল।
দরজাটা ভেজান থাকে রাতের বেলা। একটা ছোট ঠেকনা আলগাভাবে দেওয়া থাকে ভিতরের দিকে। যাতে একটু জোরে ঠেললেই শব্দ হয় আর তার ঘুম ভেঙে যায়। ভালুক-টালুক যদি এসে পড়ে তার জন্য আগাম সতর্কতা আসলে। অনেকসময় পাহাড়ি অজগরও চলে আসে। এসেছিল একবার। তবে ওই একবারই। তখন চারপাশের সীমানা-প্রাচীর ছিল না। কাঠের খুঁটি আর ছেঁড়া তার সম্বল ছিল সে-সময়। কিন্তু এখন কংক্রিটের প্রাচীর। যদিও অজগরের কাছে সে বাধা কোন বাধাই নয়। আশেপাশের গাছ বেয়ে সে অবলীলায় কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে যে-কোন সময়। একটু সজাগ হল গোবিন্দ। দরজায় কেউ ঠেলল বলে মনে হল তার। আস্তে-আস্তে ঠেলছে। খুব সতর্ক ভঙ্গীতে।
কে? উঠে বসে সে। জীবজন্তু হলে সামলে নেবে সে। এতটা ক্ষমতা এই বয়সেও তার আছে। কিন্তু তার ভয় জীবজন্তুর চ্যেও ভয়ানক যে প্রাণি, সেই মানুষকে নিয়ে। কিন্তু ডাক্তারকে তো কারা তুলে নিয়ে গিয়েছে। তারপর আবার কাকে তুলে নিতে এসেছে? তাকে? কিন্তু কেন? তাহলে কি তারা জেনে গিয়েছে যে, সে-ই বেদের দলেত্র সেই অদ্ভুত ছেলেটির খবর ডাক্তারকে দিয়েছিল। সেইজন্য কি এবার তাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে? ডাক্তারবাবু হয়তো বলেছেন, তার কাছেই শুনেছেন তিনি। কিন্তু যদি দিয়েই থাকে, তাহলে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে কী লাভ? তবে কি ওরা জেনে গিয়েছে যে, তার কাছে আরও কিছু খবর আছে, যা ডাক্তারকে বলেনি সে এখনও? উঠে বসল সে। ওরা ভিতরে ঢোকার আগে যদি কোনরকমে ভিতরে ডাক্তারের নিজস্ব যে ওয়াশরুম আছে, সেখানে চলে যেতে পারে, তাহলে তার পিছনের দরজা দিয়ে সে পালিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে আত্মগোপন করতে পারবে। মুহূর্তে সে চিন্তা করে নিল কী করতে হবে। অতি দ্রুত সে বিছানা ছড়ে উঠে পড়ল। তারপর পাশে রাখা সস্তার বোতামটেপা মোবাইল, আর চাবির গোছাটা তুলে নিল। ওরা দরজায় আবারও আস্তে-আস্তে ঠেলা মারল। সম্ভবত ওরা ভাবছে তার ঘুম যাতে না ভাঙে। তবে ওরা খবর নিয়েই এসেছে। রাতে দরজা যে বন্ধ থাকে না, তা ওরা জানে। বাইরে দু’জনের অন্তত গলার আওয়াজ পেল সে।
একজন বলছে, “বেজন্মার বাচ্চা বুড়োটা ভিতরে আছে তো?”
উত্তরে আর একটি গলা শোনা গেল, “না থাকলে, দরজা ভিতর থেকে কেই বা বন্ধ রেখেছে?”
“বন্ধ না-কি? ভেজানো থাকে বলেই তো জানি!”
“তাহলে খুলছে না কেন?”
“পুরানো দরজা বলেই হয়তো ! জোরে ঠেলতে হবে!”
“বন্ধ থাকলে কিন্তু তাতে আওয়াজ হবে এবং শয়তান বুড়োটা উঠে পড়বে। ওর কাছে মোবাইল আছে। পুলিশ ডাকলে আজকের মিশন কিন্তু মায়ের ভোগে!”
“দাঁড়া, ঠেলে দেখি আস্তে। না হলে জোরেই ঠেলতে হবে। তারপর যা হয় হবে!” বলে আবার আস্তে-আস্তে দরজায় ঠেলা মারতে লাগল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
মনে হচ্ছে দু’জনই। আর দেরি করল না গোবিন্দ। বিছানা ছাড়ার আগে বালিশটার উপর চাদর বিছিয়ে সে বিছানা থেকে বেরিয়ে এল। ঘরে রাতে সে একটা ডিমলাইট জ্বেলে রাখে। তাতে ময়লা পড়ে আরও আবছা আলো ছড়ায়। সেটা বন্ধ করে দিয়ে সে ভিতরে চলে এল। ঘরের মধ্যে এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ভিতরে ডাক্তারের চেম্বারের পিছন দিকে ওয়াশরুমের দরজা। সন্তর্পণে সেটা খুলে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে। এইসময়েই কোথাও বাজি ফাটার আওয়াজ হল। বাজি নয়, সে বুঝতে পারল, ওটা গুলির আওয়াজ। সে বাজি আর গুলির আওয়াজের মধ্যে তফাৎ করতে জানে। ওরা তবে দলবল নিয়ে এসেছে।
ওয়াশরুমের মধ্যে ঢোকার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আর একবার গুলির আওয়াজ শুনল সে। ওরা এত গুলি খরচ করছে কার জন্য? তবে কি দল একটা নয়, দুটো? না কি পুলিশ এসেছে? কিন্তু পুলিশ জানবেই বা কেমন করে? একটু থামল সে। পরবর্তী পদক্ষেপ ভেবে ফেলতে হবে এক্ষুনি। সে সন্তর্পণে পিছনের দরজাটা সামান্য খুলে উঁকি মারল। নাহ্, কেউ কোথাও নেই। যারা এসেছে, তারা সামনের দিক দিয়েই এসেছে। পিছনের দরজার কথা হয় তারা জানে না, কিংবা তারা গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি। ভিতর থেকেই শব্দ পেল গোবিন্দ। ভিতরে রাখা ঠেকনা পড়ে গিয়েছে। ওরা নিশ্চয়ই জোরে চাপ দিয়েছে। এবার বিছানার কাছে এসে ওরা গোবিন্দ ভেবে বালিশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে। ওদের ভুল ভাঙতে অবশ্য দেরি হবে না। তারপরেই ওরা এসে পড়বে ভিতরে। ওয়াশরুম বন্ধ দেখে ওদের বুঝতে অসুবিধা হবে না কী ঘটেছে। তখন হয়ত ওরা ওয়াশরুমের দরজা ভেঙেই ফেলবে। তার আগেই তাকে বেরিয়ে যা করার করতে হবে। মনে-মনে প্ল্যান ছকে ফেলল সে। ওয়াশরুমের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সে চাবির গোছা বার করল। কড়ার ঝুলতে থাকা তালাটা খুলে লাগিয়ে দিল সে। আহামরি তালা নয়, আবার খুব পলকা তালাও নয়। কিছুক্ষণ লাথির আঘাত সহ্য করতে পারবে। এই সময়েই পরপর গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক।
ওয়াশরুমের মধ্যে ঢোকার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আর একবার গুলির আওয়াজ শুনল সে। ওরা এত গুলি খরচ করছে কার জন্য? তবে কি দল একটা নয়, দুটো? না কি পুলিশ এসেছে? কিন্তু পুলিশ জানবেই বা কেমন করে? একটু থামল সে। পরবর্তী পদক্ষেপ ভেবে ফেলতে হবে এক্ষুনি। সে সন্তর্পণে পিছনের দরজাটা সামান্য খুলে উঁকি মারল। নাহ্, কেউ কোথাও নেই। যারা এসেছে, তারা সামনের দিক দিয়েই এসেছে। পিছনের দরজার কথা হয় তারা জানে না, কিংবা তারা গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি। ভিতর থেকেই শব্দ পেল গোবিন্দ। ভিতরে রাখা ঠেকনা পড়ে গিয়েছে। ওরা নিশ্চয়ই জোরে চাপ দিয়েছে। এবার বিছানার কাছে এসে ওরা গোবিন্দ ভেবে বালিশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে। ওদের ভুল ভাঙতে অবশ্য দেরি হবে না। তারপরেই ওরা এসে পড়বে ভিতরে। ওয়াশরুম বন্ধ দেখে ওদের বুঝতে অসুবিধা হবে না কী ঘটেছে। তখন হয়ত ওরা ওয়াশরুমের দরজা ভেঙেই ফেলবে। তার আগেই তাকে বেরিয়ে যা করার করতে হবে। মনে-মনে প্ল্যান ছকে ফেলল সে। ওয়াশরুমের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সে চাবির গোছা বার করল। কড়ার ঝুলতে থাকা তালাটা খুলে লাগিয়ে দিল সে। আহামরি তালা নয়, আবার খুব পলকা তালাও নয়। কিছুক্ষণ লাথির আঘাত সহ্য করতে পারবে। এই সময়েই পরপর গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
ভিতরে লোক দুটি তখন গোবিন্দ ভেবে বালিশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বুঝতে পেরেছিল তারা প্রতারিত হয়েছে। এদিকে বাইরে গুলির আওয়াজ হচ্ছে। তাহলে কি পুলিশ এল না-কি? কিংবা অন্য পার্টি? বস্ বলছিল, আর একটা পার্টি বাইরে থেকে সুযোগ নিচ্ছে। এরা কি তারাই? কিন্তু তাদের কী স্বার্থ? তারাও কি নুনিয়াকে খুঁজতে এসেছে? হতচ্ছাড়া মেয়েটাকে পেলে যদি জ্যান্ত তুলে না-ও আনতে পারে তাহলে নিকেশ করে দিতে হবে। তেমনই হুকুম তাদের উপরে। কিন্তু মেয়েটাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে, তা সম্ভবত জানে গোবিন্দ নামের এই লোকটি। শয়তান বুড়োটা ডাক্তারের পিছনে ছায়ার মতো ঘুরতো। অতএব তাকে আগে খুঁজে পেতেই হবে তাদের। নিশ্চয়ই বুড়োটা পালিয়েছে ভিতরে। তারা ভিতরে ঢুকল। স্যুইচ টিপে আলো জ্বালতেই ঘরটা সাদা আলোয় ঝলমল করে উঠল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল তারা। একপাশে পর্দা টানা রুগীদের পরীক্ষা করার বেড। দাক্তারির সরঞ্জাম রাখা একটা টেবিলের উপর। সাধারন কিছু এমার্জেন্সি মেডিসিন টেবিলের উপর রাখা। নাহ্, টেবিলের তলা, আলমারির পিছন— কোথাও তো নেই বুড়োটা! তখনই চোখে পড়ল ওয়াশরুমের দরজার দিকে।
ঠেলে দেখল, ভিতর থেকে বন্ধ।
চাপা গলায় একজন দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “অ্যাই শয়তান বুড়ো! বেরিয়ে আয় বলছি। নাহলে দরজা ভেঙে তর মাথায় দানা ভরে দেবো!”
ভিতর থেকে কারও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
আগের জন হিংস্র গলায় বলল, “বুড়ো, তাড়াতাড়ি বেরো বলছি। দিল্লাগি করিস না। এরপর দরজা ভেঙে ফেললে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। বেরো বলছি!”
তাও কোনও সাড়াশব্দ নেই।
“বুড়োটা অজ্ঞান হয়ে পড়েনি তো ভয়ে?”
“ও অত দুর্বল হলে বিছানায় বালিশ চাপা দিয়ে পালিয়ে এখানে টয়লেটে ঢুকে বসে থাকতে পারতো?”
“তবুও…!”
বাইরে গুলিগোলার আওয়াজ হল পরপর।
দ্বিতীয়জন চিন্তিত মুখে বলল, “কী ব্যাপার বল তো? বাইরে কিছু হচ্ছে বলে মন হয়!”
“হবে। কিন্তু আমাদের মিশন সাকসেসফুল করে তবেই যেতে হবে। ওরা দু’জনে আছে, ঠিক সামলে নেবে। ঠেল দরজা। যদি আগেরটার মতো খুলে যায়, ভালো, নাহলে ভেঙে ফেলবো!” বলে ওরা দু’ জনে দরজায় ধাক্কা মারতে লাগল জোরে।
গোবিন্দ অবশ্য তখন পিছনে ছিল না। সে চারপাশ ভালো করে দেখে-শুনে সামনের দিকে চলে এসেছিল, তারপর ঢোকার দরজাটা টেনে বন্ধ করে তাতেও ভারি তালাটা ঝুলিয়ে দিল। খরগোশ এখন খাঁচায় বন্দি। সামনে-পিছনে দু’ দিকেই বন্ধ। এখন গোবিন্দকে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ শেফালিকা দিদিমণির কোয়াটার্সে যাওয়া। দ্বিতীয় সেখানে পৌঁছে শেফালিকা দিদিমণিকে যা বলার বলে পুলিশকে ফোন করা। পুলিশের সাহায্য নিতেই হবে। কিন্তু তার আগে আর একজনকে বাঁচাতে হবে। সেই জন্যই গোবিন্দ ছুটতে শুরু করল শেফালিকা দিদিমণির বাড়ি। তাঁকে খবরটা দিতেই হবে। তাকে কেউ না বললেও সে জানে, মানে অনুমান করে নিয়েছে এবং সে জানে তার অনুমান অভ্রান্ত। সে জানে, নুনিয়া কোথায় আছে। এখনি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। নাহলে সমূহ বিপদ। —চলবে।
ঠেলে দেখল, ভিতর থেকে বন্ধ।
চাপা গলায় একজন দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “অ্যাই শয়তান বুড়ো! বেরিয়ে আয় বলছি। নাহলে দরজা ভেঙে তর মাথায় দানা ভরে দেবো!”
ভিতর থেকে কারও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
আগের জন হিংস্র গলায় বলল, “বুড়ো, তাড়াতাড়ি বেরো বলছি। দিল্লাগি করিস না। এরপর দরজা ভেঙে ফেললে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। বেরো বলছি!”
তাও কোনও সাড়াশব্দ নেই।
“বুড়োটা অজ্ঞান হয়ে পড়েনি তো ভয়ে?”
“ও অত দুর্বল হলে বিছানায় বালিশ চাপা দিয়ে পালিয়ে এখানে টয়লেটে ঢুকে বসে থাকতে পারতো?”
“তবুও…!”
বাইরে গুলিগোলার আওয়াজ হল পরপর।
দ্বিতীয়জন চিন্তিত মুখে বলল, “কী ব্যাপার বল তো? বাইরে কিছু হচ্ছে বলে মন হয়!”
“হবে। কিন্তু আমাদের মিশন সাকসেসফুল করে তবেই যেতে হবে। ওরা দু’জনে আছে, ঠিক সামলে নেবে। ঠেল দরজা। যদি আগেরটার মতো খুলে যায়, ভালো, নাহলে ভেঙে ফেলবো!” বলে ওরা দু’ জনে দরজায় ধাক্কা মারতে লাগল জোরে।
গোবিন্দ অবশ্য তখন পিছনে ছিল না। সে চারপাশ ভালো করে দেখে-শুনে সামনের দিকে চলে এসেছিল, তারপর ঢোকার দরজাটা টেনে বন্ধ করে তাতেও ভারি তালাটা ঝুলিয়ে দিল। খরগোশ এখন খাঁচায় বন্দি। সামনে-পিছনে দু’ দিকেই বন্ধ। এখন গোবিন্দকে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ শেফালিকা দিদিমণির কোয়াটার্সে যাওয়া। দ্বিতীয় সেখানে পৌঁছে শেফালিকা দিদিমণিকে যা বলার বলে পুলিশকে ফোন করা। পুলিশের সাহায্য নিতেই হবে। কিন্তু তার আগে আর একজনকে বাঁচাতে হবে। সেই জন্যই গোবিন্দ ছুটতে শুরু করল শেফালিকা দিদিমণির বাড়ি। তাঁকে খবরটা দিতেই হবে। তাকে কেউ না বললেও সে জানে, মানে অনুমান করে নিয়েছে এবং সে জানে তার অনুমান অভ্রান্ত। সে জানে, নুনিয়া কোথায় আছে। এখনি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। নাহলে সমূহ বিপদ। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















