রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

১৯৪২-৪৩ সালে রতনমণি নামে এক সাধুর নেতৃত্বে ত্রিপুরায় ঘটেছিল রিয়াং আদিবাসী বিদ্রোহ। মূলত সামন্ততান্ত্রিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ঘটলেও সে সময়ে অনেক ক্ষেত্রে রতনমণির শিষ্যদের ‘স্বদেশী’ বলে অভিহিত করা হতো। পরবর্তী সময়ে রিয়াং বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদাও দেয়া হয়েছে।

নৃপতি শাসিত ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলে জনজাতি সম্প্রদায়ের রিয়াং সর্দারদের বলা হতো চৌধুরী। এই চৌধুরীরা কার্যত সেদিন সামন্ত প্রভুদের মতো আচরণ করতেন। গরীব রিয়াং প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায়, জরিমানা ইত্যাদি নানা ভাবে তারা অত্যাচার চালাতেন। চৌধুরীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল রিয়াং সম্প্রদায়ের গরীব মানুষ। এমনকি তাদের অভাব অভিযোগ জানানোর কোনও সুযোগও ছিল না। কারণ রাজার কাছে অভাব অভিযোগ জানানোর মাধ্যমও ছিল চৌধুরীরাই। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা রাজদরবারে পেশ করার কোনও উপায় ছিল না। এ রকম অবস্থায় রিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল। ক্ষুব্ধ রিয়াংরা কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল। এ রকম সময়েই রতনমণি নামে এক সাধুর আবির্ভাব ঘটে। তিনি লোকমান সাধু নামে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড়ে। তিনি নিজে ছিলেন নোয়াতিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত। ত্রিপুরার রিয়াং ও নোয়াতিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দলে দলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে।শিষ্য সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অমরপুর ও উদয়পুরের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর আশ্রমও গড়ে উঠতে থাকে। তিনি শিষ্যদের মন্ত্র দেয়ার পাশাপাশি রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের গল্প বলে তাদের মধ্যে ধর্মবোধ সঞ্চার করতেন। এই ভাবে রিয়াং সম্প্রদায় সহ ত্রিপুরার পার্বত্য প্রজাদের মধ্যে দিনে দিনে বাড়তে থাকে রতনমণির প্রভাব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ত্রিপুরায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। রাজ সরকার থেকে তখন সৈন্যদের জন্য কৃষকদের কাছ থেকে শস্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। একই সময়ে আবার চৌধুরীরা কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে শস্য মজুদ করতেও থাকে। ফলশ্রুতিতে ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট শুরু হয়। অমরপুর, উদয়পুর, সাব্রুম, বিলোনীয়ার পার্বত্য অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। রতনমণির শিষ্যরা তখন দরিদ্র আদিবাসীদের পরিত্রাণে এগিয়ে আসে।বিভিন্ন এলাকায় ধর্মগোলা স্হাপন করে তারা খাদ্য বিতরণ করতে শুরু করে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প পর্ব-৯৩: কৈলাসচন্দ্রের কাছে রাজবংশের কাহিনি শুনে ত্রিপুরার প্রতি আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫০: বালোদক-জাতক—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ত্রিপুরার রাজা ব্রিটিশ সহায়তায় এগিয়ে আসেন। পার্বত্য এলাকা থেকে তিনি সৈন্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্হানে সেনা ঘাঁটি স্হাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পার্বত্য অঞ্চলে সৈন্য সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রতনমণির শিষ্যদের সঙ্গে রাজার প্রতিনিধি চৌধুরীদের বিরোধ বাধে। চৌধুরী খগেন্দ্র রিয়াং রাজধানীতে খবর পাঠান যে, রতনমণির শিষ্যরা সৈন্য সংগ্রহে বাধা দিচ্ছে। এমনকি তারা চৌধুরীদের বন্দি করে নিজেরাই বিচার করতে শুরু করেছে। গরু, ছাগল ইত্যাদি লুটপাট করছে। এ ধরণের খবরাখবরে রাজধানীতে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এদিকে দীর্ঘদিনের অত্যাচারিত, নিপীড়িত রিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষ এবার রতনমণির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চৌধুরীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্ৰহণে এগিয়ে আসে। তারা আন্দোলন শুরু করে। তৈরি হয় একটি সশস্ত্র দল। অমরপুর, উদয়পুর অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি গড়ে উঠতে থাকে। রতনমণি ও তাঁর শিষ্যরা রাজার বিরুদ্ধে না থাকলেও রাজার মনোনীত রায় কাঞ্চনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে তারা চৌধুরীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করে। তারা নিজেরাই চৌধুরীদের বিচার করতে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে লুঠতরাজের খবরাখবরও রাজধানীতে আসতে থাকে। এই ভাবে রতনমণির শিষ্যরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। জনসাধারণের পক্ষ থেকে তখন এদের ‘স্বদেশী’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সরকারী রিপোর্টেও এদের তাই বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ

সাধারণ পার্বত্য প্রজারা এই সব ‘স্বদেশী’র প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল ছিল। রতনমণি ও তাঁর শিষ্যদের অবস্থান কিংবা তাদের ঘাঁটি সম্পর্কে তারা রাজ সরকারের লোকজনদের কোনও তথ্যাদি দিত না। বরং অনেক সময় ‘স্বদেশী’দের সতর্ক করে দিত। রিয়াং এবং নোয়াতিয়া সম্প্রদায় মিলিয়ে রতনমণির বাহিনীতে প্রায় বিশ হাজার মানুষ ছিল। তারা নিজেদের এক গুপ্তচর ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছিল। সেই আমলের এক দারোগার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, রতনমণির সঙ্গে দেখা করা খুবই দুরূহ ছিল। পাঁচটি ঘাঁটি পেরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছতে হতো। শক্তিশালী সরকারি বাহিনীকেও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল রতনমণির বাহিনীর। উদয়পুরের তদানীন্তন নায়েব দারোগা দীনেশচন্দ্র দাস রতনমণির ঘাঁটিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। রতনমণিকে সেদিন দীনেশবাবুর প্রকৃত সাধু বলেই মনে হয়েছিল। দরিদ্র পার্বত্য প্রজাদের উপর রাজার প্রতিনিধি রায় কাঞ্চনের অত্যাচারে তিনি ভারাক্রান্ত ছিলেন এবং এ সবের প্রতিকার চাইছিলেন। রিয়াং সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম প্রচারে তিনি নিয়োজিত এ রকমই বলেছিলেন দারোগাবাবুকে। আরও বলেছিলেন কাওকে অত্যাচার না করার জন্য শিষ্যদের প্রতি তার উপদেশ ছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪০: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বুনো শুয়োর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

যাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অবস্থায় ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলে রতনমণির শিষ্যদের বিদ্রোহের ঘটনায় রাজা এবং পাশাপাশি এলাকার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। বিদ্রোহকে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় পর্যাপ্ত সৈন্য পাঠানো হয়। ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার-সহ বিদ্রোহীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। বিভিন্ন পার্বত্য এলাকায় রতনমণির শিষ্যদের সঙ্গে রাজার সেনাবাহিনীর খণ্ডযুদ্ধ হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক বিদ্রোহী প্রাণ হারান। গ্রেপ্তারকৃতদের কয়েকজন ছাড়া সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল কয়েক দিনের মধ্যেই। তবে রাজার আদেশে তাদের মস্তক মুণ্ডন করে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করা হয়।এই ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে রাজশক্তি বিদ্রোহ দমন করে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এদিকে রতনমণি সীমান্ত পেরিয়ে চট্টগ্রামে চলে গেলে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কেউ কেউ আবার উল্লেখ করেছেন যে, বার্মা পালিয়ে যাবার পথে অনুগামী সহ তিনি গ্রেফতার হন। কিছুদিন চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি কারাগারে আটক থাকার পর ত্রিপুরার রাজ সরকারের অনুরোধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ রতনমণি ও তাঁর ক’জন অনুগামীকে তাদের হাতে তুলে দেয়। চট্টগ্রাম থেকে তাদের আগরতলা নিয়ে এসে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।পরে রাজ প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং তার ফলেই রতনমণির মৃত্যু ঘটে বলে প্রচলিত বিশ্বাস।অবশ্য রাজ সরকার থেকে প্রচার করা হয় যে,কোনও কঠিন রোগে রতনমণির মৃত্যু ঘটেছে।

এই ভাবে সেদিনের বিদ্রোহ নির্বাপিত হলেও রতনমণির নেতৃত্বে রিয়াং বিদ্রোহ উজ্জ্বল হয়ে আছে ত্রিপুরার ইতিহাসে।পরবর্তী সময়ে এই বিদ্রোহ স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা পেয়েছে। রতনমণির অন্যতম অনুগামী তসলামফা ওরফে রাজপ্রসাদ চৌধুরী কংগ্রেস আমলে ত্রিপুরার মন্ত্রীও হয়েছেন। ১৯৭৮ সালে ত্রিপুরায় প্রথম বামফ্রন্ট সরকার আসার পর সেদিনের রিয়াং বিদ্রোহীদের মধ্যে জীবিতদের সম্বর্ধনা জানানো হয়েছিল।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content