
এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ঢুকে ডাক্তার এবং তার অ্যাটেনডেন্ট যেদিকে যাওয়ার কথা, সেদিকে গেল না। উল্টোদিকে যেদিকে গোডাউন এবং ওয়াশরুম আছে পেশেন্টপার্টির জন্য, সেদিকে গেল। পিছন-পিছন পল্টু, সাইকেল আর ট্রলিতে শায়িত অবস্থায় চেতন। সে বুঝতে পারছিল না ট্রলি থেকে নেমে পড়বে না-কি পড়বে না। সাইকেল তাকে নির্দেশ দিলে তবেই তার চাদর সরিয়ে অ্যাকশান শুরু করার কথা। এরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে! চাদরের ফুটো দিয়ে চোখ পিটপিট করে দেখল, টানা লম্বা করিডোর দিয়ে চলেছে তারা। করিডোরের মাথার উপর কিছুটা দূরে-দূরে টিউবলাইট জ্বলছে। সেগুলির অবশ্য তেমন জোর নেই বলে করিডোরে আলো তেমন জোরদার নয়। দু’পাশে কয়েকটি ঘর খোলা, কাঁচের দরজা দিয়ে ঘরের ভিতরের আলো এসে যেখানে-যেখানে পড়েছে, সেই-সেই অংশ কিছুটা আলোকিত। অনেক ঘর বন্ধ। কেউ একজন উচ্চকিতে হেসে উঠল। তারপর আবার সব চুপ।
আস্তে-আস্তে করিডোর ডান দিকে বাঁক নিল। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এমার্জেন্সি ওয়ার্ড ইউ আকৃতির। ইউ-র দুই বাহু ভিতরের দিকে দু’পাশে ছড়ানো। নিচের ঘরগুলি মেইল ওয়ার্ড, দোতলায় ফিমেল ওয়ার্ড, তিন তলায় আইসিইউ, সিসিইউ, উপরের তলায় অফিস, ল্যাব, ডাক্তার ও নার্স-অ্যাটেনডেন্টদের রেস্টের জায়গা ও অন্যান্য। চারতলা ছাড়া প্রতিটি ফ্লোরেই একটি উইং-এ অপারেশনের ব্যবস্থা রয়েছে পাঁচটি রুমে। এমার্জেন্সির ইউ বিল্ডিং-এর মাঝখানে পিছনের দিকে ফুলের বাগান, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং পিছনের গেট দিয়ে বেরোলে কিছুটা গেলেই কিচেন, ক্যান্টিন ইত্যাদি পরপর রয়েছে। পিছনের গেটটিও সারারাত খোলা থাকে। কিচেনে কাজ শুরু হয়ে যায় ভোররাত থাকতেই। বাগানের আলোকস্তম্ভগুলিতে আলো জ্বলছিল। ঘোলাটে হলদেটে আলো। কয়েকটি পোকা মরবে জেনেও তার কাছাকাছি উড়ছিল।
আস্তে-আস্তে করিডোর ডান দিকে বাঁক নিল। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এমার্জেন্সি ওয়ার্ড ইউ আকৃতির। ইউ-র দুই বাহু ভিতরের দিকে দু’পাশে ছড়ানো। নিচের ঘরগুলি মেইল ওয়ার্ড, দোতলায় ফিমেল ওয়ার্ড, তিন তলায় আইসিইউ, সিসিইউ, উপরের তলায় অফিস, ল্যাব, ডাক্তার ও নার্স-অ্যাটেনডেন্টদের রেস্টের জায়গা ও অন্যান্য। চারতলা ছাড়া প্রতিটি ফ্লোরেই একটি উইং-এ অপারেশনের ব্যবস্থা রয়েছে পাঁচটি রুমে। এমার্জেন্সির ইউ বিল্ডিং-এর মাঝখানে পিছনের দিকে ফুলের বাগান, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং পিছনের গেট দিয়ে বেরোলে কিছুটা গেলেই কিচেন, ক্যান্টিন ইত্যাদি পরপর রয়েছে। পিছনের গেটটিও সারারাত খোলা থাকে। কিচেনে কাজ শুরু হয়ে যায় ভোররাত থাকতেই। বাগানের আলোকস্তম্ভগুলিতে আলো জ্বলছিল। ঘোলাটে হলদেটে আলো। কয়েকটি পোকা মরবে জেনেও তার কাছাকাছি উড়ছিল।
সাইকেল চাপা গলায় বলল, “ইদিকে আমাদের আনলি ক্যানে ঘুষ?”
“ঘুষ” আসলে বামাপদ ঘোষ, যে এই হাসপাতালের রেজিস্টার্ড একজন অ্যাটেনডেন্ট। তবে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে সে অন্য হাসপাতালের হয়েও কাজ করে। অবসর সময়ে তার কাজ হাসপাতালে ইতিউতি ঘুরে-ঘুরে তেমন কোন পেশেন্টপার্টিকে পেলে, তাদের কথার ছলে বশীভূত করে, এই হাসপালাতে ভর্তি হলে চিকিৎসা তেমন পাবে না—এ-কথা বোঝায় আর পাঠিয়ে দেয় নির্দিষ্ট কয়েকটি নার্সিংহোমে, যে-গুলির সঙ্গে এই হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার জড়িত কিংবা তাঁরাই বকলমে মালিক। এই সমাজসেবার জন্য অবশ্য সে মাস গেলে যতগুলি কেস পাঠাতে পারে, সেই অনুপাতে কমিশন পায়। আজ অবশ্য সাইকেলদার কাজ করে দিচ্ছে সে। সাইকেলদার কয়েকটি কাজ সে এর আগেও করে দিয়েছে। অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গিয়েছে কাজ মেটার সঙ্গে-সঙ্গেই। কোনওদিন তার অন্যথা হয় নি বলে, সাইকেলকে সে না করে না কখন।
“ঘুষ” আসলে বামাপদ ঘোষ, যে এই হাসপাতালের রেজিস্টার্ড একজন অ্যাটেনডেন্ট। তবে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে সে অন্য হাসপাতালের হয়েও কাজ করে। অবসর সময়ে তার কাজ হাসপাতালে ইতিউতি ঘুরে-ঘুরে তেমন কোন পেশেন্টপার্টিকে পেলে, তাদের কথার ছলে বশীভূত করে, এই হাসপালাতে ভর্তি হলে চিকিৎসা তেমন পাবে না—এ-কথা বোঝায় আর পাঠিয়ে দেয় নির্দিষ্ট কয়েকটি নার্সিংহোমে, যে-গুলির সঙ্গে এই হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার জড়িত কিংবা তাঁরাই বকলমে মালিক। এই সমাজসেবার জন্য অবশ্য সে মাস গেলে যতগুলি কেস পাঠাতে পারে, সেই অনুপাতে কমিশন পায়। আজ অবশ্য সাইকেলদার কাজ করে দিচ্ছে সে। সাইকেলদার কয়েকটি কাজ সে এর আগেও করে দিয়েছে। অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গিয়েছে কাজ মেটার সঙ্গে-সঙ্গেই। কোনওদিন তার অন্যথা হয় নি বলে, সাইকেলকে সে না করে না কখন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫০: বালোদক-জাতক—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?
বামাপদ ফিসফিস করে বলল, “আঃ! চুপটি মেরে থাক দিকিনি! এইদিকে নিয়ে যাচ্ছিস, তার কারণ আছে নিশ্চয়ই!”
সাইকেল নাছোড়বান্দা। বলল, “কী কারণ?”
“এদিক দিয়ে তিনতলায় যাব বলে!”
“কিন্তু লিফট তো সামনে দু’পাশে দুটো ছিল। কথা তো ছিল, ওয়াশরুমে গিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে এসে লিফটে করে তিনতলায় যাব!”
“যা-ই কথা থাক, এখন চেঞ্জ করতে হয়েছে। তিনতলায় দু’টি লিফটের দোরগোড়ায় দু’জন পুলিশ মোতায়েন আছে। এরা যে থাকবে, তা আগে জানতাম নাকি?”
“ও-হো!” ওখানেও পুলিশ রেখেছে? আমি ভেবেছিলাম, কেবল কেবিনের বাইরেই রেখেছে!” সাইকেল কিছুটা দমে গিয়ে বলল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। কাজটা যতটা সহজ হবে সে ভেবেছিল, ততটাও সহজ নয়।
বামাপদ বলল, “সেইজন্যই তো এদিক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস!”
“ট্রলি থেকে ব্যাটাকে নামিয়ে দে ক্যানে এবার!” সাইকেল বলল।
“করিডোরের শেষে গিয়ে নামাচ্ছি। ওখানে আলোটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে মাসখানেক হল। সরকারি কাজ তো! আলো পাল্টাতে সময় লাগবে। ওদিকে গিয়ে ট্রলি রেখে দেব একপাশে। লোকটাকে তখন নামতে বল!”
“কিন্তু ওদিকে কেউ যদি থাকে?” সাইকেল উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করল।
“কেউ থাকবে না। এদিকে উপরে ওঠা-নামা করার একটা এমার্জেন্সি সিঁড়ি আছে। চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে বলে দোতলার অনেকে লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে এই সিঁড়ি দিয়েই ওঠানামা করে। দিনের বেলা হলে এই সিঁড়ি ফাঁকা পেতে না। এখন রাতের বেলা তাই পাচ্ছ। আমরা ওটা দিয়েই তিনতলায় যাব। তারপর তোমাদের নির্দিষ্ট কেবিন দেখিয়ে দেব দূর থেকে। তারপর তোমাদের কাজ তোমরা করবে!”
সঙ্গে-সঙ্গে ডাক্তারের পোশাক পরা যে লোকটি যাচ্ছিল, তাকে দেখিয়ে সাইকেল ইঙ্গিতে বলল, “ও শুনতে পাচ্ছে এ-সব। গড়বড় হবে না তো?”
“আরে না না, আমার চেনা লোক। হাসপাতালের ক্লোকরুম থেকে পোশাক ম্যানেজ করে এনেছি। এই তোমাদের পৌঁছে দিয়েই আবার সব যথাস্থানে রেখে দিয়ে আসব, চিন্তা করো না ওকে নিয়ে। পাঁচশো টাকা দিও কিন্তু। রিস্কের কাজ। ও না থাকলে তোমরা কিন্তু আমি বললেও ঢুকতে পারতে না। পুলিশ সন্দেহ করত।”
“সে পাবে,” সাইকেল বলল, “বস কাজ করিয়ে কারুর টাকা গাপ্ করে না, আর যা দেয় যথেষ্ট দেয় বলে যারা তাঁর কাজ করে, তারা কখন তাঁর অনুযোগ করে না!”
“জানি, সেই কারণেই তো তোমার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। দু’হাজার টাকা মুখের কথা না-কি?” বামাপদ বলল।
সাইকেল নাছোড়বান্দা। বলল, “কী কারণ?”
“এদিক দিয়ে তিনতলায় যাব বলে!”
“কিন্তু লিফট তো সামনে দু’পাশে দুটো ছিল। কথা তো ছিল, ওয়াশরুমে গিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে এসে লিফটে করে তিনতলায় যাব!”
“যা-ই কথা থাক, এখন চেঞ্জ করতে হয়েছে। তিনতলায় দু’টি লিফটের দোরগোড়ায় দু’জন পুলিশ মোতায়েন আছে। এরা যে থাকবে, তা আগে জানতাম নাকি?”
“ও-হো!” ওখানেও পুলিশ রেখেছে? আমি ভেবেছিলাম, কেবল কেবিনের বাইরেই রেখেছে!” সাইকেল কিছুটা দমে গিয়ে বলল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। কাজটা যতটা সহজ হবে সে ভেবেছিল, ততটাও সহজ নয়।
বামাপদ বলল, “সেইজন্যই তো এদিক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস!”
“ট্রলি থেকে ব্যাটাকে নামিয়ে দে ক্যানে এবার!” সাইকেল বলল।
“করিডোরের শেষে গিয়ে নামাচ্ছি। ওখানে আলোটা খারাপ হয়ে পড়ে আছে মাসখানেক হল। সরকারি কাজ তো! আলো পাল্টাতে সময় লাগবে। ওদিকে গিয়ে ট্রলি রেখে দেব একপাশে। লোকটাকে তখন নামতে বল!”
“কিন্তু ওদিকে কেউ যদি থাকে?” সাইকেল উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করল।
“কেউ থাকবে না। এদিকে উপরে ওঠা-নামা করার একটা এমার্জেন্সি সিঁড়ি আছে। চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে বলে দোতলার অনেকে লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে এই সিঁড়ি দিয়েই ওঠানামা করে। দিনের বেলা হলে এই সিঁড়ি ফাঁকা পেতে না। এখন রাতের বেলা তাই পাচ্ছ। আমরা ওটা দিয়েই তিনতলায় যাব। তারপর তোমাদের নির্দিষ্ট কেবিন দেখিয়ে দেব দূর থেকে। তারপর তোমাদের কাজ তোমরা করবে!”
সঙ্গে-সঙ্গে ডাক্তারের পোশাক পরা যে লোকটি যাচ্ছিল, তাকে দেখিয়ে সাইকেল ইঙ্গিতে বলল, “ও শুনতে পাচ্ছে এ-সব। গড়বড় হবে না তো?”
“আরে না না, আমার চেনা লোক। হাসপাতালের ক্লোকরুম থেকে পোশাক ম্যানেজ করে এনেছি। এই তোমাদের পৌঁছে দিয়েই আবার সব যথাস্থানে রেখে দিয়ে আসব, চিন্তা করো না ওকে নিয়ে। পাঁচশো টাকা দিও কিন্তু। রিস্কের কাজ। ও না থাকলে তোমরা কিন্তু আমি বললেও ঢুকতে পারতে না। পুলিশ সন্দেহ করত।”
“সে পাবে,” সাইকেল বলল, “বস কাজ করিয়ে কারুর টাকা গাপ্ করে না, আর যা দেয় যথেষ্ট দেয় বলে যারা তাঁর কাজ করে, তারা কখন তাঁর অনুযোগ করে না!”
“জানি, সেই কারণেই তো তোমার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। দু’হাজার টাকা মুখের কথা না-কি?” বামাপদ বলল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ
বলতে-বলতে তারা ডান উইংয়ের শেষপ্রান্তে চলে এল। সাইকেল আশ্চর্য হল যে, সত্যসত্যই একবারের জন্যও আর কোনও লোকের মুখোমুখি হতে হল না তাদের। সামনে সত্যিই অন্ধকার। তবে নিকটবর্তী টিউবলাইটের ফ্যাকাশে আলোর যতটুকু এখানে এসে পড়েছে, তার আলোয় সত্যিই একটা সিঁড়ি দেখা গেল। ছোট সিঁড়ি। পাশাপাশি দু’জনে যেতে-আসতে পারে। সিঁড়ির তলায় অন্ধকারে বেশ কয়েকটা ট্রলি ভ্যান রাখা রয়েছে। সেখানেই ট্রলি ভ্যানটা থামাল বামাপদ আর তার সহযোগী। ফিসফিস করে সাইকেলকে বলল, “তোমার লোককে নেমে পড়তে বল সাইকেল দা!”
সাইকেল চেতনকে ডাকল গায়ে হাত দিয়ে ঠেলা মেরে। কে জানে ঘুমিয়ে পড়েছে কি-না! কিন্তু নাহ্। চেতনের গায়ে ঠেলা মারতেই সে চাদর সরিয়ে ট্রলির উপর উঠে বসে বলল, “আ গ্যায়ে ক্যা?”
“উতর জলদি। হাম লোগোকো উপর তিন তল্লে মে যানা হ্যায়!” সাইকেল ফিসফিস করে বলল।
চেতন কোনও কথা বলল না আর। তড়াক করে নেমে পড়ল। সে বেশ লম্বাসম্বা। মুখে দাড়িগোঁফের ঘন জঙ্গল। অন্ধকারে তার মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও, সে-যে খুব সুদর্শন নয়, তা বোঝাই যাচ্ছিল।
নেমেই সে বলল, “কাঁহা যানা হ্যায়? হামকো উয়ো কেবিন দিখা দেনা। বাদ মে যো করনা হ্যায় হাম সামহাল লেঙ্গে!”
“আচ্ছা আচ্ছা! য্যাদা বাত মত্ করো। চুপচাপ চলো!” সাইকেল বলল চাপা গলায়।
চেতন একেবারেই চুপ করে গেল।
সাইকেল চেতনকে ডাকল গায়ে হাত দিয়ে ঠেলা মেরে। কে জানে ঘুমিয়ে পড়েছে কি-না! কিন্তু নাহ্। চেতনের গায়ে ঠেলা মারতেই সে চাদর সরিয়ে ট্রলির উপর উঠে বসে বলল, “আ গ্যায়ে ক্যা?”
“উতর জলদি। হাম লোগোকো উপর তিন তল্লে মে যানা হ্যায়!” সাইকেল ফিসফিস করে বলল।
চেতন কোনও কথা বলল না আর। তড়াক করে নেমে পড়ল। সে বেশ লম্বাসম্বা। মুখে দাড়িগোঁফের ঘন জঙ্গল। অন্ধকারে তার মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও, সে-যে খুব সুদর্শন নয়, তা বোঝাই যাচ্ছিল।
নেমেই সে বলল, “কাঁহা যানা হ্যায়? হামকো উয়ো কেবিন দিখা দেনা। বাদ মে যো করনা হ্যায় হাম সামহাল লেঙ্গে!”
“আচ্ছা আচ্ছা! য্যাদা বাত মত্ করো। চুপচাপ চলো!” সাইকেল বলল চাপা গলায়।
চেতন একেবারেই চুপ করে গেল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
বামাপদ প্রথমে উঠছিল। তারপর সাইকেল। তার পিছনে চেতন, পল্টু, আরা শেষে বামাপদর ডাক্তার সাজা সহযোগী। খুব আস্তে-আস্তে বেশি শব্দ না হয়, এমনভাবে উঠতে হচ্ছিল তাদের। দ্বিতীয় তলায় এসে বামাপদ হাতের ইশারায় থামতে বলল একটু। এটি ফিমেল ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডেই ব্যস্ততা দিনে-রাতে সব সময়েই থাকে। নার্সদিদিরা ছোটাছুটি করে। লেবার পেইন নিয়ে যারা ভর্তি হয়, তাদের ডেলিভারির সময় দিন-রাত যে-কোন সময়েই হতে পারে। এই কারণে বামাপদ আগে উঠে দেখে নিল দোতলার করিডোরের অবস্থা। ফিমেল ওয়ার্ডে মেল অ্যাটেনডেন্টের ওঠার নিয়ম নেই। বামাপদ অবশ্য ভিতরে যাচ্ছে না। তিনতলায় ওঠার সিঁড়িটার বাঁকে দাঁড়িয়েই সে দেখে নিল। দু’-একজন নার্স এদিক-ওদিক যাচ্ছে, অনেকের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হয়তো কোন ক্রিটিক্যাল কেস বা হঠাৎ লেবার-পেইন উঠেছে। সে আর দেরি করল না। হাতের ইশারায় জলদি আসতে বলল সাইকেলদের। এই বাঁকটা মারাত্মক। কেউ দেখে নিলেই সর্বনাশ। আইসিইউ বা সিসিইউ আছে বলে তিনতলায় সকলের এমনিতেই ওঠার অনুমতি নেই, আর রাতের বেলা তো নয়ই, যদি না নির্দিষ্ট কোন কারণ থাকে। আজ তো আবার স্পেশাল কেস। এতক্ষণে গোটা হাসপাতাল হয়তো জেনে গিয়েছে।
দ্রুত তারা সিঁড়ির ওই বিপজ্জনক বাঁকটা পেরিয়ে উঠে এল তিনতলায় ওঠার আগের ল্যান্ডিং-এ। আর কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙলেই তিনতলার করিডোর। সেখানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আর কী-কী থাকবে তা জানে না সাইকেল। বুকের মধ্যে ঢিপ্ঢিপ্ আওয়াজ করে কেউ হাতুড়ি পিটছে যেন। আজ পর্যন্ত অনেক রিস্কের কাজ করলেও এতটা ভয় কোনঅদিন পায়নি। কাজটা ভালোয়-ভালোয় সেরে ফেলে পালাতে পারলে সে বাঁচে। অবশ্য চেতনের কাছে সাইলেন্সার-দেওয়া অত্যাধুনিক রিভলভার আছে। কেবিনে ঢুকলে টার্গেট তো হাতের মুঠোয়। তার কপালে দানা ভরতে দু’ মিনিট লাগবে না। তারপর এদিক-ওদিক দেখে বেরিয়ে আসা।
একটা কথা মনে হল তার। বামাপদকে ফিসফিস করে বলল, “বামাপদ, এখানকার সব কেবিনে তো সেপারেট ওয়াশরুম আছে। সেগুলি দিয়ে বাইরে বেরুনোর কোন সিঁড়ি নেই পিছনের দিকে?”
“নাহ্! নেই তো তেমন!” বামাপদ জবাব দিল।
“থাকলে ওই পথেই বেরিয়ে যেতে পারতাম!”
“কিচ্ছু করার নেই। তোমাদের যেভাবেই হোক, যে পথে নিয়ে এলাম, সেই পথেই বেরিয়ে যেতে হবে। আমি কিন্তু তখন থাকব না। কারণ, একটু পরেই ঠিক কী পরিস্থিতি হবে তা তো আমার জানা নেই। কেউ না কেউ দেখতে পাবেই ডাক্তারের ওই অবস্থা। তখন কিন্তু ছোটাছুটি, পুলিশ, সুপার স্যার থেকে শুরু করে অনেকেই কিন্তু ভিড় করবে। তার আগে পালাবে না-কি সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে পালাবে, সেটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে !”
“হুম্,” চিন্তিত মুখে বলল সাইকেল। ফেরার ব্যাপারটা নিয়ে সে আগে ভাবেনি। মনে করেছিল, কাজ মিটে গেলেই বেরিয়ে নেমে যাবে। কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে, তাতে কাজটা সহজ নয়।
বামাপদ আর কথা না-বাড়িয়ে উঠতে লাগল। পিছন-পিছন তারা সকলে। শেষ ধাপে পৌঁছে বামাপদ বলল, “অপেক্ষা কর। দেখে আসি একবার কী অবস্থা।”
“কেউ যদি চলে আসে?”
“এমনিতে কেউ আসে না। এলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবে। বেশিক্ষণ নয়। একবার টহল দিয়ে আসি!”
বলে বামাপদ চলে গেল। সাইকেলসহ সকলেই নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুকের মধ্যে একটাই আশঙ্কা, কেউ যেন না আসে। কিন্তু কেউ এল না। বামাপদই মিনেট তিনেক পরে ফিরে এল। সাইকেল উৎকন্ঠিত মুখে বলল, “অবস্থা কী?”
দ্রুত তারা সিঁড়ির ওই বিপজ্জনক বাঁকটা পেরিয়ে উঠে এল তিনতলায় ওঠার আগের ল্যান্ডিং-এ। আর কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙলেই তিনতলার করিডোর। সেখানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আর কী-কী থাকবে তা জানে না সাইকেল। বুকের মধ্যে ঢিপ্ঢিপ্ আওয়াজ করে কেউ হাতুড়ি পিটছে যেন। আজ পর্যন্ত অনেক রিস্কের কাজ করলেও এতটা ভয় কোনঅদিন পায়নি। কাজটা ভালোয়-ভালোয় সেরে ফেলে পালাতে পারলে সে বাঁচে। অবশ্য চেতনের কাছে সাইলেন্সার-দেওয়া অত্যাধুনিক রিভলভার আছে। কেবিনে ঢুকলে টার্গেট তো হাতের মুঠোয়। তার কপালে দানা ভরতে দু’ মিনিট লাগবে না। তারপর এদিক-ওদিক দেখে বেরিয়ে আসা।
একটা কথা মনে হল তার। বামাপদকে ফিসফিস করে বলল, “বামাপদ, এখানকার সব কেবিনে তো সেপারেট ওয়াশরুম আছে। সেগুলি দিয়ে বাইরে বেরুনোর কোন সিঁড়ি নেই পিছনের দিকে?”
“নাহ্! নেই তো তেমন!” বামাপদ জবাব দিল।
“থাকলে ওই পথেই বেরিয়ে যেতে পারতাম!”
“কিচ্ছু করার নেই। তোমাদের যেভাবেই হোক, যে পথে নিয়ে এলাম, সেই পথেই বেরিয়ে যেতে হবে। আমি কিন্তু তখন থাকব না। কারণ, একটু পরেই ঠিক কী পরিস্থিতি হবে তা তো আমার জানা নেই। কেউ না কেউ দেখতে পাবেই ডাক্তারের ওই অবস্থা। তখন কিন্তু ছোটাছুটি, পুলিশ, সুপার স্যার থেকে শুরু করে অনেকেই কিন্তু ভিড় করবে। তার আগে পালাবে না-কি সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে পালাবে, সেটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে !”
“হুম্,” চিন্তিত মুখে বলল সাইকেল। ফেরার ব্যাপারটা নিয়ে সে আগে ভাবেনি। মনে করেছিল, কাজ মিটে গেলেই বেরিয়ে নেমে যাবে। কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে, তাতে কাজটা সহজ নয়।
বামাপদ আর কথা না-বাড়িয়ে উঠতে লাগল। পিছন-পিছন তারা সকলে। শেষ ধাপে পৌঁছে বামাপদ বলল, “অপেক্ষা কর। দেখে আসি একবার কী অবস্থা।”
“কেউ যদি চলে আসে?”
“এমনিতে কেউ আসে না। এলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবে। বেশিক্ষণ নয়। একবার টহল দিয়ে আসি!”
বলে বামাপদ চলে গেল। সাইকেলসহ সকলেই নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুকের মধ্যে একটাই আশঙ্কা, কেউ যেন না আসে। কিন্তু কেউ এল না। বামাপদই মিনেট তিনেক পরে ফিরে এল। সাইকেল উৎকন্ঠিত মুখে বলল, “অবস্থা কী?”
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
বামাপদ বলল, “কেবিন নম্বর ৩০৫। সেখানে একজন পুলিশ বসে-বসে খৈনি ডলছে আর হাই তুলছে। করিডোর দিয়ে এগিয়ে বাঁ-দিকে পাঁচ নাম্বার ঘর। লিফট্ দুটির সামনে দু’জন আর্মড পুলিশ দাঁড়িয়ে। তবে একটি লিফট ওদিকের ব্লকে ঢোকবার মুখে, আর একটি অন্যদিকে। দুজনেই অবশ্য নিশ্চিন্ত। তাদের চোখে ঘুম। আমাকে দেখেও কিছু বলল না। তবে তোমাদের তিনজন একসাথে গেলে কী বলবে জানি না!”
“কী করব বল তো?” সাইকেল জিজ্ঞাসা করল।
“তুমি বল। আমার তো মাথা কাজ করছে না!”
সাইকেল কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “বামাপদ, তুর লোককে বল, ওর গায়ের অ্যাপ্রণ আর স্টেথো চেতনকে দিক। হয়ে যাবে চেতনের। ডাক্তার সেজে গেলে কেউ সন্দেহ করবে না। আর তোর গায়ের নীল জ্যাকেটখানা আমায় দে। আমি কাজ মিটে গেলে তোর কাছে পৌঁছে দেবো কাল-পরশু। পল্টুর যাওয়ার দরকার নেই। ও এখানেই থাক। বেগতিক বুঝলে তুই পালিয়ে যাস্ পল্টু। আমাদের জন্য দাঁড়াবি না। আমাদের ব্যবস্থা আমরা ঠিক করে নেবো। আর হ্যাঁ, বামাপদ, কেবিনের মধ্যে তো তোমার মতো অ্যাটেনডেন্ট কেউ আছে, তার ব্যাপারে…”
“আশ্চর্যের কথা। কেউ নেই। সুপার নিজে না-কি দেখছেন ব্যাপারটা। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় সিনিয়ার ডক্টর নিজে এসে দেখছেন। একজন জুনিয়ারকেও তাঁর সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আর কাউকে ভিতরে রাখা রিস্ক বলেই কেবিন ফাঁকা। কেবেল পেশেন্ট আছে!”
“বাহ্!” খুশি হল সাইকেল। তাহলে তো তার কাজে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। একবার ভিতরে ঢোকার অপেক্ষা শুধু।
করিডোরে দাঁড়িয়েই বামাপদর সহযোগীর গায়ে থাকা অ্যাপ্রন গায়ে চড়াল চেতন। গলায় স্টেথোও ঝুলিয়ে নিল। কে বলবে, এই লোকটা আসলে ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা মাথার একজন খুনি?
উঁকি দিল বামাপদ। নাহ্, করিডোরে এখনও কেউ নেই। সে ইশারা করল। সাইকেল আর চেতন এগিয়ে গেল নিঃশব্দ পায়ে। ঠিক যেমন বেড়ালেরা যায়! —চলবে।
“কী করব বল তো?” সাইকেল জিজ্ঞাসা করল।
“তুমি বল। আমার তো মাথা কাজ করছে না!”
সাইকেল কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “বামাপদ, তুর লোককে বল, ওর গায়ের অ্যাপ্রণ আর স্টেথো চেতনকে দিক। হয়ে যাবে চেতনের। ডাক্তার সেজে গেলে কেউ সন্দেহ করবে না। আর তোর গায়ের নীল জ্যাকেটখানা আমায় দে। আমি কাজ মিটে গেলে তোর কাছে পৌঁছে দেবো কাল-পরশু। পল্টুর যাওয়ার দরকার নেই। ও এখানেই থাক। বেগতিক বুঝলে তুই পালিয়ে যাস্ পল্টু। আমাদের জন্য দাঁড়াবি না। আমাদের ব্যবস্থা আমরা ঠিক করে নেবো। আর হ্যাঁ, বামাপদ, কেবিনের মধ্যে তো তোমার মতো অ্যাটেনডেন্ট কেউ আছে, তার ব্যাপারে…”
“আশ্চর্যের কথা। কেউ নেই। সুপার নিজে না-কি দেখছেন ব্যাপারটা। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় সিনিয়ার ডক্টর নিজে এসে দেখছেন। একজন জুনিয়ারকেও তাঁর সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আর কাউকে ভিতরে রাখা রিস্ক বলেই কেবিন ফাঁকা। কেবেল পেশেন্ট আছে!”
“বাহ্!” খুশি হল সাইকেল। তাহলে তো তার কাজে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। একবার ভিতরে ঢোকার অপেক্ষা শুধু।
করিডোরে দাঁড়িয়েই বামাপদর সহযোগীর গায়ে থাকা অ্যাপ্রন গায়ে চড়াল চেতন। গলায় স্টেথোও ঝুলিয়ে নিল। কে বলবে, এই লোকটা আসলে ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা মাথার একজন খুনি?
উঁকি দিল বামাপদ। নাহ্, করিডোরে এখনও কেউ নেই। সে ইশারা করল। সাইকেল আর চেতন এগিয়ে গেল নিঃশব্দ পায়ে। ঠিক যেমন বেড়ালেরা যায়! —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















