
সুন্দরবনে গড়িয়োল। ছবি : সংগৃহীত।
প্রায় ১৪ বছর আগের কথা। শিয়ালদাগামী নামখানা লোকালে চেপে কলকাতা যাচ্ছিলাম জানালার ধারে বসে। প্রকৃতি দেখতে দেখতে যাওয়া বরাবরের অভ্যেস। ট্রেন জয়নগর-মজিলপুর স্টেশন ছাড়িয়ে যাওয়ার পর হঠাৎই নজরে এল ট্রেন লাইনের ধারে ঝিলের পাড়ে কালোরঙা একটা প্রাণী পড়ে আছে। কুমির নাকি? পরক্ষণেই ভাবলাম, নাহ্ এখানে তো কুমির থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ কাছে পিঠে নদীর সাথে কোনও সংযোগ নেই। তাছাড়া আশেপাশে জনবসতি আছে। পাশে ক্ষেতও রয়েছে। মাঠে লোকজন কাজ করছে। তার মানে প্রাণীটি এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত। নিশ্চিতভাবেই কুমির নয়। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এমন প্রাণী কি আমি সম্প্রতি না হলেও ছোটবেলায় দেখেছি? ভাবতে ভাবতে শিয়ালদায় পৌঁছে গেলাম। তারপর কাজ শেষে ফেরার সময় আবার প্রাণীটার কথা মনে পড়ল। ছোটবেলার নানা স্মৃতি ভাবতে লাগলাম। হলুদ গোসাপ প্রচুর দেখেছি। মাছ ধরার আটল বা মুগরির মধ্যে আটকা পড়ত। দু’ একবার খ্যাপলা জালেও জড়িয়েছে। কিন্তু রঙ এবং চেহারায় ওই প্রাণীটি হলুদ গোসাপের থেকে আলাদা। ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল, খুব ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির সামনে খাল পেরিয়ে ওপারে যেতে এইরকম গোসাপের মতো দেখতে কিন্তু বড়সড়ো আকারের প্রাণী দেখেছি। তবে দু’একবারের বেশি নয়। গোসাপ চিনতাম। তাই এগুলোকে গোসাপ ভেবে নিয়েছিলাম। যদিও পরবর্তীকালে আমার গ্রামের বাড়ির আশেপাশে বা পথেঘাটে কোথাও ওদের দেখিনি। যাই হোক সন্দেহ দূর করতে গেলে ভালো করে খোঁজ করতেই হবে।
কিন্তু ওই যা হয়! বাড়ি ফেরার পর নানা কাজের ভিড়ে মাথা থেকে ওই প্রাণীটার কথা বেরিয়ে গেল। তারপর থেকে যতবার ট্রেনে চেপে কলকাতা গিয়েছি মথুরাপুর, জয়নগর এলেই প্রাণীটার কথা মনে পড়ত আর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে খুঁজতাম – যদি দেখা পাই! কিন্তু সে কি আর আমাকে দেখা দেওয়ার জন্য বসে থাকবে! এভাবেই ধীরে ধীরে প্রাণীটির কথা মাথা থেকে প্রায় বেরিয়ে গেল। কিন্তু ২০১২ সালের পুজোর ঠিক আগে হঠাৎই সেই একই জায়গায় দেখি সে শুয়ে আছে। আসলে প্রথম দেখা প্রাণীটি নাকি তার মতো দেখতে অন্য প্রাণী তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না। কিন্তু তারা যে একজাতীয় প্রাণী সে নিয়ে কোনও সন্দেহ রইল না। ট্রেনের গতি বেশ কম ছিল, ফলে এবার বেশ ভালোভাবে লক্ষ্য করতে পারলাম। প্রায় ৩ হাত লম্বা। কালচে বাদামি রং। মোটেই কুমির নয়, বরং পুরোপুরি গোসাপের মতো দেখতে। হ্যাঁ, ছোটবেলায় এই প্রাণীটাকেই দু’একবার দেখেছি সাঁতরে খাল পেরিয়ে চলে যেতে। ঠাকুমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। কোনও এক প্রসঙ্গে একবার ঠাকুরমা বলেছিল, এক ধরনের গোসাপ আছে গাছে ওঠে। যদিও আমি কোনওদিন কোনও হলদে গোসাপকে গাছে উঠতে দেখিনি। তাহলে কি ঠাকুরমা এই গোসাপের কথাই বলেছিল? বাড়ি ফিরে বইপত্র আর ইন্টারনেট নিয়ে বসে পড়লাম। খুব বেশি পরিশ্রম করতে হল না। আমার বর্তমানে দেখা, শৈশবে দেখা এবং ঠাকুমার কথা—সবগুলো মিলিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম যে এরা হল গড়িয়োল। এই নামটাও অনেকবার শুনেছি বা পড়েছি মনে হল। যাইহোক প্রাচীনকাল থেকে এই গড়িয়োলরা যে সুন্দরবন অঞ্চলের বাসিন্দা তা নিয়ে আর কোনও সন্দেহ রইল না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪০: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বুনো শুয়োর

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫০: বালোদক-জাতক—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?
গড়িয়োলকে ইংরেজিতে বলে বেঙ্গল মনিটর (Bengal Monitor) বা কমন ইন্ডিয়ান মনিটর (Common Indian Monitor)। বিজ্ঞানসম্মত নাম Varanus bengalensis। যদিও নামে বেঙ্গল মনিটর এদের বিস্তার কিন্তু শুধু সুন্দরবন কিংবা বঙ্গভূমি নয়, এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এদের উপস্থিতি রয়েছে। ভারতসহ শ্রীলংকা, মায়ানমার, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব ইরান ও উজবেকিস্তানে এদের পাওয়া যায়। তবে আন্দামানে এদের দেখা মেলেনি।
গড়িয়োলরা বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়ায় বসবাসের জন্য অভিযোজিত। সমতল ও নিচু এলাকায় এদের বেশি দেখা গেলেও কখনও কখনও পাহাড়ি ও মরুপ্রায় শুষ্ক অঞ্চলেও দেখা যায়। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পশ্চিম হিমালয়ের বিগরানি ও পূর্ব হিমালয়ের দার্জিলিং থেকে গড়িয়োল সংগ্রহ করতে পেরেছে। এবার এই বিরলপ্রায় সরীসৃপটির চেহারা কেমন বলি। এদের মাথা থেকে পায়ু পর্যন্ত দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ২.৫ ফুট। আর লেজের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৩.৩ ফুট। ওজন হয় প্রায় ৭ কেজি। যারা টিভিতে বা ছবিতে গোসাপ দেখেছেন তাঁদের বলি, গড়িয়োলও কিন্তু এক জাতের গোসাপ। রং কালচে বাদামি বা সবুজাভ বাদামি। তাই অনেকে এদের কালো গোসাপও বলে।
গড়িয়োলরা বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়ায় বসবাসের জন্য অভিযোজিত। সমতল ও নিচু এলাকায় এদের বেশি দেখা গেলেও কখনও কখনও পাহাড়ি ও মরুপ্রায় শুষ্ক অঞ্চলেও দেখা যায়। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পশ্চিম হিমালয়ের বিগরানি ও পূর্ব হিমালয়ের দার্জিলিং থেকে গড়িয়োল সংগ্রহ করতে পেরেছে। এবার এই বিরলপ্রায় সরীসৃপটির চেহারা কেমন বলি। এদের মাথা থেকে পায়ু পর্যন্ত দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ২.৫ ফুট। আর লেজের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৩.৩ ফুট। ওজন হয় প্রায় ৭ কেজি। যারা টিভিতে বা ছবিতে গোসাপ দেখেছেন তাঁদের বলি, গড়িয়োলও কিন্তু এক জাতের গোসাপ। রং কালচে বাদামি বা সবুজাভ বাদামি। তাই অনেকে এদের কালো গোসাপও বলে।

গেঁওয়া গাছে বিশ্রামরত গড়িয়োল। ছবি : সংগৃহীত।
বাচ্চা গড়িয়োলের রঙ প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশ উজ্জ্বল হয়। বাচ্চাদের ঘাড়, গলা ও পিঠে কিছু আড়াআড়ি কালো দাগ দেখা যায়। আর পেটের রঙ হয় সাদা। সাদা রঙের উপর কালচে ডোরা ও ধূসর বা হলুদ ছিট ছিট দাগ থাকে। হলুদ ছিট থাকে পিঠেও। কিন্তু পরিণত হলে গায়ের রঙ হয়ে যায় কালচে বাদামি, আর ডোরা ও ছিট দাগগুলো হয়ে যায় কালো। পেটের দিকের রঙ হয় হলুদাভ, আর তার ওপরও থাকে কালো ফুটকি দাগ। এইরকম রঙের জন্য ওরা ম্যানগ্রোভ অরণ্যের জলকাদার পরিবেশে চমৎকার মিশে যেতে পারে।
গড়িয়োলদের নাকের ফুটোগুলো ভারি অদ্ভুত। ওরা ইচ্ছে করলেই নাকের ফুটো দুটো বন্ধ করে দিতে পারে। যখন জলকাদায় ডুব দেয় তখন যাতে জলকাদা নাকে ঢুকতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা। এদের জিভ বেশ লম্বা, সাপের মতো লিকলিকে ও চেরা। সাপদের মতো এরাও জিভকে গন্ধ শোঁকার কাজে ব্যবহার করে। অন্য গোসাপদের মতো ওদের দাঁতও চোয়ালের হাড়ের সাথে ভেতর দিকে জোড়া। প্রত্যেক দাঁতের পেছনে অর্থাৎ দুটো দাঁতের মাঝে থাকে বদলি দাঁত। একটা দাঁত খসে গেলে বদলি দাঁত তার স্থান নেয়। এভাবে বছরে ওরা চারবার দাঁত বদল করে। আর দাঁতের সংখ্যা? একশো এক! ভাবা যায়!! বোধহয় এজন্যই লোকে বলে একবার গোসাপ কামড়ে ধরলে সহজে ছাড়তে চায় না।
গড়িয়োলদের নাকের ফুটোগুলো ভারি অদ্ভুত। ওরা ইচ্ছে করলেই নাকের ফুটো দুটো বন্ধ করে দিতে পারে। যখন জলকাদায় ডুব দেয় তখন যাতে জলকাদা নাকে ঢুকতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা। এদের জিভ বেশ লম্বা, সাপের মতো লিকলিকে ও চেরা। সাপদের মতো এরাও জিভকে গন্ধ শোঁকার কাজে ব্যবহার করে। অন্য গোসাপদের মতো ওদের দাঁতও চোয়ালের হাড়ের সাথে ভেতর দিকে জোড়া। প্রত্যেক দাঁতের পেছনে অর্থাৎ দুটো দাঁতের মাঝে থাকে বদলি দাঁত। একটা দাঁত খসে গেলে বদলি দাঁত তার স্থান নেয়। এভাবে বছরে ওরা চারবার দাঁত বদল করে। আর দাঁতের সংখ্যা? একশো এক! ভাবা যায়!! বোধহয় এজন্যই লোকে বলে একবার গোসাপ কামড়ে ধরলে সহজে ছাড়তে চায় না।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ
প্রাপ্তবয়স্ক গড়িয়োলরা খুব একটা মিশুকে বা আড্ডাবাজ হয় না। এরা একা একা ঘুরে বেড়ায়। তবে রাত্রিবেলা নয়, দিনে ঘুরে বেড়ানোই ওদের পছন্দ। আর ঘুরে বেড়ানোর জায়গা হল খাল, বিল বা নদীর ধার, সমুদ্রতীর, জলাভূমি, জঙ্গল। আপনমনে হেলে দুলে যখন হেঁটে যায় তখন সে চলন দেখে ‘গদাইলশকরি’ বলতে ইচ্ছে করে। তবে বিপদের আঁচ পেলে খুব জোরে দৌড়ে পালায়। ওরা গাছে উঠতে ও সাঁতার কাটতেও ওস্তাদ। সাঁতার কাটতে নিজের চোখে দেখলেও গাছে উঠতে আমি নিজে দেখিনি। তবে অনেকের মুখে শুনেছি খাওয়ার পর নাকি জঙ্গলে গাছে উঠে বিশ্রাম নেয়।
রাত্রিবেলা ওরা ঘুমিয়েই কাটায়। নিজের বা অন্যের খোঁড়া গর্তে কিংবা গাছের কোটরে কিংবা পাথরের ফাটলে ওরা রাত কাটায়। তবে ওরা কিন্তু আর্লি রাইজার। ভরপুর ঘুম থেকে উঠে সকালের মিঠে রোদ পোহায়। তবে শীতকালে ওরা সচরাচর গর্তে বা আস্তানায় দিনরাত চুপচাপ শুয়ে থাকে। একে বলে শীতঘুম (Hibernation)। ওই সময় খাওয়া-দাওয়া থাকে বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি তখন ওরা ওদের লেজে ও পেটে সঞ্চিত চর্বি থেকে সংগ্রহ করে।
রাত্রিবেলা ওরা ঘুমিয়েই কাটায়। নিজের বা অন্যের খোঁড়া গর্তে কিংবা গাছের কোটরে কিংবা পাথরের ফাটলে ওরা রাত কাটায়। তবে ওরা কিন্তু আর্লি রাইজার। ভরপুর ঘুম থেকে উঠে সকালের মিঠে রোদ পোহায়। তবে শীতকালে ওরা সচরাচর গর্তে বা আস্তানায় দিনরাত চুপচাপ শুয়ে থাকে। একে বলে শীতঘুম (Hibernation)। ওই সময় খাওয়া-দাওয়া থাকে বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি তখন ওরা ওদের লেজে ও পেটে সঞ্চিত চর্বি থেকে সংগ্রহ করে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৬ : করিডোরে কেউ নেই

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
গড়িয়োলরা স্বভাবে কিন্তু ভীষণ লাজুক ও ভীতু। প্রখর দৃষ্টিশক্তি এদের। আড়াইশো মিটার দূর থেকেও মানুষের গতিবিধি বুঝতে পারে। ভালোভাবে দেখার জন্য কখনও কখনও পিছনের দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে শরীরকে খাড়া করে। অবশ্য স্বজাতির পুরুষদের সাথে মারামারি করার সময়ও ওইরকম ভঙ্গিতে দাঁড়াতে দেখা যায়। আগেই বলেছি বিপদে ওরা গাছে উঠতে যেমন পটু তেমনই পটু সাঁতারে। জেনে অবাক হবেন, টানা ১৭ মিনিট ওরা দম বন্ধ করে জলের তলায় ডুবে থাকতে পারে।
এবার গড়িয়োলদের খাবারদাবাদের একটু পরিচয় দেওয়া যাক। এরা পুরোপুরি মাংসাশী। পোকামাকড়, ব্যাঙ, সাপ, ইঁদুর, কাঁকড়া, শামুক, পিঁপড়ে, মাছ, পাখি ও সরীসৃপের ডিম ইত্যাদি ওদের প্রিয় খাদ্য। কখনও সখনও মৃত জীবদেহের মাংস খায়। এরা ফসল নষ্টকারী ইঁদুর খেয়ে চাষির খুব উপকার করে। বিষধর সাপের ডিম ও বাচ্চা খেয়ে সাপের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু গড়িয়োলদের সংখ্যা বর্তমানে খুব কমে যাওয়ায় বিষধর সাপের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
এবার গড়িয়োলদের খাবারদাবাদের একটু পরিচয় দেওয়া যাক। এরা পুরোপুরি মাংসাশী। পোকামাকড়, ব্যাঙ, সাপ, ইঁদুর, কাঁকড়া, শামুক, পিঁপড়ে, মাছ, পাখি ও সরীসৃপের ডিম ইত্যাদি ওদের প্রিয় খাদ্য। কখনও সখনও মৃত জীবদেহের মাংস খায়। এরা ফসল নষ্টকারী ইঁদুর খেয়ে চাষির খুব উপকার করে। বিষধর সাপের ডিম ও বাচ্চা খেয়ে সাপের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু গড়িয়োলদের সংখ্যা বর্তমানে খুব কমে যাওয়ায় বিষধর সাপের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

জলে ভেসে গড়িয়োল। ছবি : সংগৃহীত।
গড়িয়োলদের প্রজনন ঋতু হল জুন থেকে সেপ্টেম্বর। তবে স্ত্রী গড়িয়োলদের দখল নিতে এপ্রিল মাস থেকে পুরুষ গড়িয়োলদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়। জয়ী পুরুষ গড়িয়োল স্ত্রী গড়িয়োলের পানিগ্রহণের সুযোগ পায়। তারপর স্ত্রী মাটিতে গর্ত খুঁড়ে কিংবা উইপোকার পরিত্যাক্ত ঢিবিতে ডিম পাড়ে। ডিম পেড়ে গর্তের মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেয়। স্ত্রী গড়িয়োলরা তাদের ডিমকে বাঁচানোর জন্য আসল গর্তের আশপাশে আরও কিছু নকল গর্ত খুঁড়ে তার মুখও মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেয়। যেহেতু জোয়ারের জল বা জলোচ্ছ্বাস থেকে ডিমকে রক্ষা করতে হয় তাই এরা অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় ডিম পাড়ে। এক একবারে এরা ১০ থেকে ৩০ টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোতে ১৬৮ থেকে ২৫৪ দিন সময় নেয়। বাচ্চাদের পরিণত হতে ২.৫ থেকে ৩ বছর লেগে যায়। এদের আয়ু মোটামুটি ১৮ থেকে ২০ বছর। তবে আবদ্ধ অবস্থায় ২২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে দেখা গেছে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
তবে এই গড়িয়োল বা কালো গোসাপরা সুন্দরবনে এখন খুব সংকটে রয়েছে। আর এই সংকটের অন্যতম কারণ হল মানুষের লোভ। এদের চামড়া খুব দামি। ব্যাগ, জুতো, হাতঘড়ির ফিতে, কুকরি (ছুরি)-র খাপ ইত্যাদি তৈরি হয় ওদের চামড়া দিয়ে। তাই একসময় নির্বিচারে গড়িয়োলদের শিকার করা হয়েছে। ১৯৩২ সালে নাকি আমাদের দেশে ১ কোটি ২০ লক্ষ সরীসৃপ শুধু চামড়ার জন্য হত্যা করা হয়েছিল যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল এই গড়িয়োল। ১৯৭২ সালে ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন চালু হওয়ার পরেও গড়িয়োলসহ অন্যান্য গোসাপের নিধন বন্ধ হয়নি। এক গবেষকের কাছ থেকে জানা গেল ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে শুধু কলকাতাতেই সরীসৃপের চর্মব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় ৩০ লক্ষ চামড়া মজুত ছিল, আর এর ৫০ শতাংশ ছিল গোসাপের চামড়া। ১৯৯০ সালের জুন মাসে কলকাতাতে পাচার করার সময় পুলিশ ১৭,০০০ গোসাপের চামড়া আটক করেছিল। মানুষের লোভ ওদের আজ নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

জল-কাদা মেখে গড়িয়োল। ছবি : সংগৃহীত।
এছাড়া নগরায়ন, শিল্পায়ন, নদীবাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, জলাভূমি ভরাট, অরণ্যচ্ছেদন ইত্যাদি কারণেও গড়িয়োলদের খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে প্রধানতঃ অরণ্য ধ্বংস এবং জলাভূমি ধ্বংস করে নগরায়ন এদের সংকটকে ঘনীভূত করেছে। পাশাপাশি সুন্দরবন অঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য ব্যাপক পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার অসংখ্য গড়িয়োলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রাচীন ইউনানি চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে গড়িয়োলের মাংস ব্যবহৃত হত। কাঁটা ফুটে গেলে বা বিষাক্ত পোকামাকড় কামড়ালে সদ্য হত গড়িয়োলের মাংস দিয়ে নাকি চিকিৎসা করা হত। এছাড়া চোখ ও ত্বকের রোগের চিকিৎসাতেও গড়িয়োলের চর্বি ব্যবহার করা হত।
ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে গড়িয়োল বা কালো গোসাপ হত্যা করা নিষিদ্ধ ও আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু এই আইন জানেন কজন, আর মানেনই বা ক’জন? গড়িয়োলরা সংরক্ষণ তালিকায় শিডিউল-১-এ রয়েছে অর্থাৎ এরা অতি বিপন্ন প্রজাতি। আইইউসিএন (IUCN)-ও এদের অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যাপেন্ডিক্স-১-এ রেখেছে। কিন্তু তালিকায় থাকাই সার। নির্বিবাদী, উপকারী এই সরীসৃপটিকে সাধারণ মানুষ আজও দেখতে পেলে ‘মার মার’ করে তাড়া করে। মেরেও ফেলে। যেন আতঙ্ক বিদয়ে হলেই খুশি। কিন্তু আমরা খেয়াল রাখি না গড়িয়োলরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে প্রকৃতিও অসুখী হবে। আর তার ফলস্বরূপ সুন্দরবনসহ সর্বত্র বিপন্নতা আরও বাড়বে। তাই মানুষের লালসা ও উন্নয়নের ভ্রুকুটি এড়িয়ে যে ক’টি গড়িয়োল সুন্দরবন অঞ্চলে এবং অন্যত্র টিকে রয়েছে তাদের নিরাপদে বাঁচার সুযোগ আমাদের করে দিতে হবে। নইলে ছবি হয়ে যাবে।—চলবে।
ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে গড়িয়োল বা কালো গোসাপ হত্যা করা নিষিদ্ধ ও আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু এই আইন জানেন কজন, আর মানেনই বা ক’জন? গড়িয়োলরা সংরক্ষণ তালিকায় শিডিউল-১-এ রয়েছে অর্থাৎ এরা অতি বিপন্ন প্রজাতি। আইইউসিএন (IUCN)-ও এদের অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যাপেন্ডিক্স-১-এ রেখেছে। কিন্তু তালিকায় থাকাই সার। নির্বিবাদী, উপকারী এই সরীসৃপটিকে সাধারণ মানুষ আজও দেখতে পেলে ‘মার মার’ করে তাড়া করে। মেরেও ফেলে। যেন আতঙ্ক বিদয়ে হলেই খুশি। কিন্তু আমরা খেয়াল রাখি না গড়িয়োলরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে প্রকৃতিও অসুখী হবে। আর তার ফলস্বরূপ সুন্দরবনসহ সর্বত্র বিপন্নতা আরও বাড়বে। তাই মানুষের লালসা ও উন্নয়নের ভ্রুকুটি এড়িয়ে যে ক’টি গড়িয়োল সুন্দরবন অঞ্চলে এবং অন্যত্র টিকে রয়েছে তাদের নিরাপদে বাঁচার সুযোগ আমাদের করে দিতে হবে। নইলে ছবি হয়ে যাবে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















