শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

ব্রাহ্মণ, চোর ও পিশাচের সেই অদ্ভুত কাহিনি শেষ করে সচিব বক্রনাস রাজার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “মহারাজ, ঠিক এই কারণেই আমি বলেছিলাম—শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে বিবাদে মত্ত হয়, তখন দিনের শেষে তা তৃতীয় পক্ষের জন্য আশীর্বাদ হয়েই দেখা দেয়।”

বক্রনাসের এই অকাট্য যুক্তির পর রাজসভায় ক্ষণিকের নীরবতা নেমে এল। উলূকরাজ অরিমর্দন গভীরভাবে কিছু একটা ভাবলেন, তারপর দৃষ্টি ঘোরালেন তাঁর আরেক বিচক্ষণ মন্ত্রী প্রাকারকর্ণের দিকে। শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভদ্র! বক্রনাসের যুক্তি তো শুনলাম। এবার আপনি বলুন—এই বিষয়ে আপনার কী অভিমত? কিমত্র মন্যতে?”

রাজার প্রশ্ন শুনে প্রাকারকর্ণ কিছুক্ষণ চোখ বুজে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। তারপর ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে রাজন! আমার সুচিন্তিত অভিমত হলো—বায়সরাজ মেঘবর্ণের এই বৃদ্ধ মন্ত্রীকে কোনোভাবেই বধ করা উচিত নয়। বরং এই রকম একজন বর্ষীয়ান ও বিচক্ষণ মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমাদের অনেক ভালো সময় কাটতে পারে। আর তাছাড়া, রাজনীতিতে শত্রুপক্ষের গোপন খবর জানাটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ নীতিশাস্ত্রে একটি কথা আছে—
পরস্পরং মর্মাণি যে ন রক্ষন্তি জন্তবঃ।
ত এব নিধনং যান্তি বল্মীকোদরসর্পবৎ।।
[কাকোলূকীয়ম্ – ১৯১]

অর্থাৎ, যে প্রাণীরা একে অপরের গোপন দুর্বলতা বা মর্মকথা রক্ষা করে না, তারা সেই উইয়ের ঢিবির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাপটির মতোই দ্রুত বিনাশপ্রাপ্ত হয়।”

‘উইয়ের ঢিবির সাপ!’—এমন অদ্ভুত উপমা শুনে উলূকরাজ অরিমর্দনের কৌতূহলের আর সীমা রইল না। তিনি অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, “কথমেতৎ? সে আবার কী রকম কথা! ঘটনাটা ঠিক কী রকম? সবিস্তারে বলুন।”
মহারাজের আদেশে মন্ত্রী প্রাকারকর্ণ তখন এক নতুন আখ্যান শোনাতে শুরু করলেন—
 

১১. উঁইয়ের ঢিবিবাসী সাপের কাহিনি

কোনও এক প্রাচীন নগরে দেবশক্তি নামে এক পরাক্রমশালী রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর এক পুত্র ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই রাজপুত্রের পেটের ভিতর বাসা বেঁধেছিল এক জ্যান্ত সাপ! সেই সাপের বিষাক্ত প্রভাবে রাজপুত্রের সুন্দর, সুঠাম শরীর দিন দিন ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। রাজকীয় জৌলুস হারিয়ে সে যেন এক জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হচ্ছিল। দেশের নামজাদা সব বৈদ্য এবং আয়ুর্বেদাচার্যরা এসে নাড়ী টিপলেন, আয়ুর্বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র ঘেঁটে রাশি রাশি মহার্ঘ ওষুধপত্র আর নানা চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু কিছুতেই কোনো ফল হলো না।

দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক কষ্ট আর মানসিক হতাশায় ধ্বস্ত রাজপুত্র একসময় চরম বিরক্ত হয়ে উঠল। প্রতিদিনের এই যন্ত্রণাদায়ক জীবন, বৈদ্যদের অজস্র ওষুধ আর ব্যর্থ চিকিৎসার গ্লানি—সব মিলিয়ে তার রাজকীয় জীবন যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছিল। নিজের এই করুণ ও জরাজীর্ণ দশা সে আর কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। অবশেষে একদিন, কাউকে কিছু না জানিয়ে, রাজপ্রাসাদের সমস্ত আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে সে এক অজানা ভিনদেশের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল।

পথ চলতে চলতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব সেই রাজপুত্র একদিন এসে পৌঁছল এক নতুন নগরে। যে ছেলের একসময় কোনও কিছুরই অভাব ছিল না, আজ সেই রাজপুত্রকেই পেটের দায়ে পথে পথে ঘুরে সাধারণ ভিখারির মতো ভিক্ষা করতে হলো। আর সারা দিনের ক্লান্তি শেষে, মাথা গোঁজার সামান্য একটু আশ্রয়ের জন্য সে বেছে নিল নগরীর এক নির্জন দেবালয়, সেখানেই কাটতে লাগল তার দিন-রাত্রির নিঃসঙ্গ প্রহরগুলো।

সেই নগরের রাজার নাম বলি। বলিরাজের ছিল দুই অপরূপা কন্যা। প্রতিদিন নিয়ম করে সূর্যাস্তের সময় তারা রাজসভায় আসত তাদের পিতা বলিরাজকে প্রণাম জানাতে। সেদিনও সান্ধ্যকালীন সভায় দুই রাজকন্যা এল। বড় কন্যা রাজার সামনে মাথা নত করে স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করে বলল, “বিজয়স্ব মহারাজ! যস্য প্রসাদাৎ সর্বং সুখং লভ্যতে। — হে মহারাজ! আপনার জয় হোক। একমাত্র আপনারই অশেষ কৃপা ও কল্যাণে আমরা এই জীবনে সমস্ত সুখ লাভ করছি।”

কিন্তু দ্বিতীয় কন্যা রাজার সামনে এসে এক অদ্ভুত ও নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে উঠল, “বিহিতং ভুঙ্ক্ষ্ব মহারাজ! — হে রাজন! আপনি কেবল আপনার নিজ কর্মফলই ভোগ করুন।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৩ : ফেলুদার শেষদৃশ্য— শেষের পরে, শেষের পারে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?

নিজ কন্যার মুখে এমন উদ্ধত ও দুর্বিনীত কথা শুনে রাজা বলির চোখ রাগে ফেটে পড়ার জোগাড়! অহঙ্কারে ঘা লাগতেই তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন। সভাসদ ও মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে তিনি চরম ক্রোধে আদেশ দিলেন, “ওহে মন্ত্রীগণ! আমার এই দুর্মুখ ও অহঙ্কাকারী মেয়েটাকে এখনই এই রাজপ্রাসাদ থেকে দূর করো আরআজই নগরে আগত কোনও এক কপর্দকশূন্য, অচেনা বিদেশির হাতে একে সম্প্রদান করো। আমি দেখতে চাই, আমার রাজকীয় আশ্রয় ছাড়া সে কীভাবে নিজের কর্মফল ভোগ করে!”

রাজা বলির এমন রূঢ় আদেশ শুনে মন্ত্রীরা আর কী করেন! রাজার নির্দেশ শিরোধার্য করে, তাঁরা “মহারাজের আজ্ঞাই শিরোধার্য” বলে মাথা নোওয়ালেন। কিন্তু রাজকন্যার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাঁরা গোপনে সামান্য কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরী দাসীকে সঙ্গে দিলেন। তারপর সেই চরম অপমানিতা রাজকন্যাকে তাঁরা সমর্পণ করলেন ওই মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া, রোগজীর্ণ ও কপর্দকশূন্য ভিনদেশি রাজপুত্রের হাতে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, রাজকন্যা বিন্দুমাত্র বিচলিত বা দুঃখিত হলেন না। বরং তিনি এই ঘটনাটিকে নিজের কর্মফল ও ভবিতব্য হিসেবেই অত্যন্ত প্রসন্নচিত্তে মেনে নিলেন। সেই রোগগ্রস্ত ভিনদেশি যুবককেই তিনি পতিরূপে বরণ করে নিলেন এবং দেবতাজ্ঞানে পরম মমতায় তাঁর সেবা করতে লাগলেন। তারপর রাজপ্রাসাদের সমস্ত মায়া চিরতরে ত্যাগ করে, সেই জরাজীর্ণ পতিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন এক নতুন অজানার উদ্দেশে।

পথ চলতে চলতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন এক ভিনদেশের বিশাল ও মনোরম সরোবরের ধারে। টানা পথশ্রমে দুর্বল রাজপুত্র তখন ক্লান্তিতে ধুঁকছেন। তাঁকে সেই সরোবরের ধারে একা বিশ্রামের জন্য রেখে, রাজকন্যা নিজে কিছু দাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাছাকাছি কোনো হাটের খোঁজে বেরোলেন, যাতে সংসারের জন্য চাল, ডাল, নুন, তেল, ঘি-এর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনা যায়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : পর্ব-৫৯: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ

বেশ কিছুক্ষণ পর, বাজার-হাট সেরে রাজকন্যা যখন সরোবরের ধারে ফিরে এলেন, দূর থেকে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখে তাঁর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল! তিনি দেখলেন, ক্লান্ত রাজপুত্র একটি উইয়ের ঢিবির ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। আর সেই সুযোগে, রাজপুত্রের পেটের ভিতর বাসা বেঁধে থাকা সেই ভয়ংকর সাপটি তার মুখ দিয়ে অর্ধেক শরীর বের করে, ফণা তুলে বাইরের খোলা বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে!

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। রাজপুত্রের মাথা রাখা সেই উইয়ের ঢিবির ভেতর থেকেও আর-একটি পেল্লাই সাপ বাইরের বাতাসে একটু নিশ্বাস নেওয়ার জন্য ফণা তুলে বেরিয়ে এল।

চোখা-চোখি হতেই একে অপরকে দেখে দুই সাপের চোখ ক্রোধে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো লাল হয়ে উঠল। ফোঁস ফোঁস শব্দে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল। তখন উইয়ের ঢিবিতে বসবাসকারী সাপটি, রাজপুত্রের পেটের ভেতর থেকে মুখ বের করা সাপটিকে তীব্র আক্রোশে হিসহিস করে বলে উঠল—“ওরে দুরাত্মা! কী পিশাচ রে তুই! এমন সর্বাঙ্গসুন্দর একটা রাজপুত্রকে তুই বিনা কারণে এমন তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারছিস কেন?”

এই কথা শুনে রাজপুত্রের মুখের সাপটিরও তো ফণা ফুলে উঠল! সে পালটা গর্জে উঠে বলল, “ওরে দুষ্ট! তুই আমাকে নীতি শেখাচ্ছিস? তুই-ই বা এই উইয়ের ঢিবির মধ্যে থাকা ওই মহামূল্যবান সোনাভরা কলসি দুটোকে কেন শুধু শুধু পাহারা দিয়ে দূষিত করছিস? ওগুলো কি তোর বাপের সম্পত্তি?”

আর যায় কোথায়! এইভাবে একে অপরকে আক্রমণ করতে করতে, রাগের চোটে দুই সাপ নিজেদের সবচেয়ে গোপন দুর্বলতাগুলো একে অপরের সামনে ফাঁস করে দিতে শুরু করল।

উঁইয়ের ঢিবির সাপটি চরম তাচ্ছিল্যের সুরে বলল— “ভো দুরাত্মন্! ভেষজমিদং তে কিং কোঽপি ন জানাতি যৎ জীর্ণোৎফালিতকাঞ্জিকরাজিকা পানেন ভবান্ বিনাশম্ উপযাতি? তোর ওই বিষ নিরাময়ের ওষুধটা কি কেউ জানে না ভেবেছিস? একটু পুরোনো কাঞ্জি (ভাতের মাড় বা গেঁজিয়ে ওঠা জল) আর সর্ষেবাটা একসঙ্গে মিশিয়ে এই রাজপুত্রকে খাওয়ালেই যে তোর চিরতরে বিনাশ ঘটবে, সে কথা তো আমি খুব ভালো করেই জানি!”

এই কথা শুনে রাজপুত্রের মুখের সাপটির যেন গায়ে রাগে আগুন ধরে গেল! সেও পালটা বিষাক্ত হেসে হিসহিসিয়ে উঠল—“বটে! আর তোর মৃত্যুর উপায়টা বুঝি কেউ জানে না? ফুটন্ত গরম তেল বা টগবগ করে ফোটা গরম জল তোর ওই ঢিবির গর্তে ঢেলে দিলেই যে তোর ওই দম্ভ আর ফণা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে, সে খবরও আমার কাছে আছে!”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

এদিকে, অদূরেই একটি বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রাজকন্যা শ্বাসরুদ্ধ করে এই পুরো রোমহর্ষক দৃশ্যটি দেখছিলেন। দুই সাপের এই মারাত্মক বিবাদ আর একে অপরের দুর্বলতা ফাঁস করার মুহূর্তটি তাঁর কাছে যেন এক দৈব আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিল! তিনি শুধু যে নিজের স্বামীর সেই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির অব্যর্থ ওষুধটির সন্ধান পেলেন, তা-ই নয়; সেই সঙ্গে উঁইয়ের ঢিবির ভেতর লুকিয়ে থাকা দুই ঘড়া সোনার কলসির মহামূল্যবান গোপন খবরটিও তিনি জেনে গেলেন।

আর কালবিলম্ব না করে রাজকন্যা তড়িঘড়ি কাজে নেমে পড়লেন। তিনি দ্রুত বাজার থেকে কিনে আনা জিনিসপত্র দিয়ে এক অব্যর্থ ওষুধ তৈরি করলেন। পুরোনো কাঞ্জি (ভাতের মাড় বা গেঁজিয়ে ওঠা জল) আর সর্ষেবাটা একসঙ্গে মিশিয়ে তিনি সেই ঘুমন্ত রাজপুত্রকে পরম যত্নে খাইয়ে দিলেন। আর যায় কোথায়! ওষুধ পেটে পড়তেই রাজপুত্রের ভিতরের সেই বিষধর সাপটি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিরতরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। দীর্ঘদিনের সেই মারণব্যাধি থেকে মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ ও রোগমুক্ত হলেন রাজপুত্র।

স্বামীর জীবন বাঁচিয়েই রাজকন্যা কিন্তু থামলেন না। এবার তিনি মন দিলেন উইয়ের ঢিবির সেই অহংকারী সাপটির দিকে। উনুনে ফুটন্ত গরম তেল চাপিয়ে, সেই টগবগ করে ফোটা তেল তিনি সাবধানে ঢেলে দিলেন উইয়ের ঢিবির গর্তের ভিতর। তেলের সেই ভয়ংকর তাপে ঢিবির ভিতরের সাপটিও নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আর ঢিবি খুঁড়তেই বেরিয়ে এল ঝকমকে সোনাভর্তি দুটো বিশাল কলসি!

নিজের অভিশপ্ত স্বামীকে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত, সুঠাম ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে ফিরে পেয়ে এবং সেই বিপুল ধনসম্পদ লাভ করে রাজকন্যা যেন নতুন জীবন পেলেন। এরপর সেই সুস্থ রাজপুত্র ও অগাধ ধনরত্ন সঙ্গে নিয়ে রাজকন্যা সগৌরবে ফিরে গেলেন তাঁর পিতা বলিরাজের প্রাসাদে।

রাজসভায় তাঁদের এই অভাবনীয় রাজকীয় প্রত্যাবর্তন দেখে রাজা বলি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, আত্মীয়স্বজন—সকলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন! তাঁরা বুঝতে পারলেন, রাজকন্যা তাঁর ভাগ্যের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। সকলেই তাঁকে বিপুল সম্মান জানালেন। আর সেদিন রাজসভার সকলেই মাথা নত করে এই অমোঘ সত্যটি মেনে নিলেন যে—কর্মফলকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই; প্রত্যেককেই নিজের কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়, তা সে ভালো হোক বা মন্দ। এরপর থেকে রাজকন্যা ও রাজপুত্র সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলে পরম সুখে জীবনযাপন করতে লাগলেন।
 

১০ম কাহিনি সমাপ্ত

আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

পঞ্চতন্ত্রের এই ‘উইয়ের ঢিবির সাপের কাহিনি’টি প্রাচীন ভারতীয় কূটনীতি ও গুপ্তচরবৃত্তির এক অসাধারণ রূপক। মন্ত্রী প্রাকারকর্ণ এই গল্পের মাধ্যমে রাজা অরিমর্দনকে চাণক্য-নির্দেশিত ‘ভেদ’ বা বিভাজন নীতির বাস্তব প্রয়োগ বুঝিয়েছেন। তাঁর মূল বক্তব্য হলো—আবেগের বশে শত্রুকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা চরম বোকামি; বরং শত্রুর অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানোই হল প্রকৃত রাজনীতি। ঠিক যেভাবে দুই সাপ নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ে নিজেদের মৃত্যুর গোপন উপায় ফাঁস করে দিয়েছিল, তেমনই কাকরাজ মেঘবর্ণ এবং মন্ত্রী স্থিরজীবীর বিবাদ উলূকদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। প্রাকারকর্ণের মতে, স্থিরজীবীকে হত্যা করার অর্থ হলো শত্রুপক্ষের একটি জ্যান্ত ‘তথ্যভাণ্ডার’ নষ্ট করে ফেলা। বরং এই অপমানিত মন্ত্রীকে আশ্রয় দিয়ে, তার মুখ থেকেই কাকদের দুর্গের নকশা ও সামরিক দুর্বলতার সমস্ত গোপন খবর হাতিয়ে নেওয়া উচিত।চাণক্য যেমন নন্দবংশের মন্ত্রী শকটালের অপমানকে কাজে লাগিয়ে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, প্রাকারকর্ণও ঠিক সেই বাস্তববাদী কূটনীতির (Realpolitik) পথ ধরেই শত্রুর গোপন তথ্য জেনে শত্রুকে সমূলে বিনাশ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

একাদশ শতাব্দীতে রচিত সোমদেবসূরির কথাসরিত্সাগরের“কথাপীঠনামক” প্রথম লম্বকেরচতুর্থ ও পঞ্চম তরঙ্গে শকটালের কাহিনিটি সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে আছে। কাহিনি অনুযায়ী, নন্দরাজা তাঁর মন্ত্রী শকটালের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে ও তাঁর ১০০ পুত্রকে একটি অন্ধকূপে বন্দি করেন এবং প্রতিদিন তাঁদের সকলের জন্য মাত্র এক পাত্র ছাতু ও সামান্য জল দিতেন। শকটালের পুত্ররা বুঝতে পারে যে এইটুকু খাবারে সবাই বাঁচবে না। তাই তারা ঠিক করে যে খাবারটুকু কেবল তাদের পিতাকেই দেওয়া হবে, যাতে তিনি বেঁচে থেকে এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পারেন। একা বেঁচে ফেরা শকটাল পরে চাণক্যের (যিনি নিজেও নন্দরাজের দ্বারা অপমানিত হয়েছিলেন) ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে নন্দবংশের পতন ঘটান। দ্বাদশ শতাব্দীতের রচিত জৈনপণ্ডিত হেমচন্দ্রের‘স্থবিরাবলীচরিত” বা ‘পরিশিষ্টপর্বন্’ গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়েও নন্দবংশের মন্ত্রী হিসেবে শকটালের উল্লেখ আছে। এখানেও তাঁর এবং রাজা ধননন্দের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত এবং চাণক্যের দ্বারা নন্দবংশ ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। তবে চতুর্থ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে রচিত বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস নাটকে সরাসরি শকটালের কথা সেভাবে না থাকলেও, চাণক্য কীভাবে নন্দদের মন্ত্রী রাক্ষসকেকূটনৈতিক চালে পরাস্ত করে চন্দ্রগুপ্তের শাসন সুনিশ্চিত করেছিলেন, তার অনবদ্য বর্ণনা রয়েছে।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content