শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
আগন্তুক মনমোহন মিত্র বলছেন, “সভ্য কে জানেন? সভ্য হচ্ছে সেই মানুষ যে আঙুলের একটি চাপে একটি বোতাম টিপে একটি ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে সমস্ত অধিবাসি-সমেত একটা গোটা শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর সভ্য কারা জানেন? যারা অস্ত্রপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অশনি সংকেত’ অবলম্বনে সত্যজিতের ছবি সেই মনুষ্যসৃষ্ট দুর্বিপাকের। প্রেক্ষাপট ১৩৫০ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের প্রাক্-বিশ্বযুদ্ধের সমাজ, দেশ-কাল। কোনও এক পল্লীগ্রামের বৃদ্ধ জানতে চান, এই এত হাঙ্গামার শেষ কবে হবে? উত্তর আসে, সে কি আর সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসে? এ হল রাজায় রাজায় যুদ্ধ। পণ্ডিতরা যদি এর স্বরূপ বোঝেন। পণ্ডিত গঙ্গাচরণ মহতী সভার মধ্যমণি বলা চলে। আরেক অনুসন্ধিৎসু জানান, জার্মানরা কোনও এক পুর দখল করেছে শোনা গেছে। গঙ্গাচরণ জানান সিঙ্গাপুর। জার্মানী নয়, জাপান। তো কোন জেলা? পণ্ডিত খানিক ভেবে “ইতি গজ” সমাধান দেন। জেলা মেদিনীপুর। আবার প্রশ্ন আসে অন্য দিক থেকে। পুর যখন, তাহলে পুরীর কাছে হল কি? কাছে না, একটু দূরে। পশ্চিমে। অর্থাৎ যুদ্ধের ফলাফল কে বলতে পারে! কে রাজপুরীর দখল পায়! তো পশ্চিমের এই যুদ্ধের জন্য দাম বাড়ছে, মূল্যবৃদ্ধি? সেটাই স্বাভাবিক। পণ্ডিত মত দেন।
অথচ প্রকৃতিতে এর কোনও প্রভাব নেই। ফুল ফুটছে। পাখি উড়ছে। প্রজাপতি রঙ ছড়াচ্ছে, সেই রঙ লাগছে দিনান্তের আকাশে। মেঘে। সেই রঙ মেখে রাত নামছে। সেই দুনিয়ায় কোনও কার্পণ্য নেই, ক্লেশ নেই, দ্বেষ নেই। অথচ, যুদ্ধের খবর, বোমারু বিমান, কালোবাজারি, কৃত্রিম অভাব, ডামাডোলের তালে তালে নামছে মহামারী, অনাহার, হাহাকার। সংবাদপত্রের সাদায়-কালোয় গোটা গোটা অক্ষরে দেখা যায়। সঙ্গে মন্বন্তরের ছবি, মৃত্যুর ছবি। সেখানে দৃশ্যমান থাকে মৃতের অনাহারক্লিষ্ট সরু, কৃশ সরীসৃপের মতো হাত-পা। হাঁটু ভাঙা দ’য়ের মতো। অকালবর্ষণের মতো নেমে এসেছে আকালিক মৃত্যু, অকস্মাৎ। তার পরের ফ্রেমে তেমনই কৃশ হাত পায়ের মতো কিছু কাদার দাগ জলের বুকে। কাঁচা রাস্তায় গরুর গাড়ির চাকার চাপে জেগে ওঠা তিন চারটি সরু মোটা, ভাঙাচোরা রেখার মধ্যে জমে থাকা জলে একটি নারী মূর্তির প্রতিচ্ছবি জেগে ওঠে। আসন্ন কোনও বিপর্যয়ের দ্যোতনা থাকে এই দৃশ্যকল্পে। ওই অভুক্ত মানুষের প্রতিনিধি এই মেয়েটি। অশক্ত শরীরে গ্রাম ছেড়েছে মহামারীর আবহে। তরুণী বিধবা মেয়েটির ভার হাতের লাঠিটি বহন করতে পারে না। একটি প্রশস্ত, কাণ্ডসার, দষ্টমূল বৃক্ষের নিচে সে নুয়ে পড়ে। এই গাছটি যেন স্বয়ং এই অসমঞ্জস অসময়ের প্রতীক, যার মধ্যে কমনীয় সৌন্দর্য নেই। আছে কেবল শ্রীহীন জাগতিক অস্তিত্বের মাঝে টিকে থাকার অসুন্দর বাধ্যবাধকতা। তার একপাশে নুয়ে পড়া পত্রভার বিরলপত্র অপরপাশটিকে যেন বিদ্রূপ করে। এ যেন ক্ষুধার্তের জন্য বরাদ্দ অনাহার আর পরিতৃপ্তের জন্য উপর্যুপরি উদরপূর্তির আয়োজনের মতো অসাম্যক্লিষ্ট, বীভৎস। ক্রমে ক্রমে দেখা যায় অনঙ্গ বৌ তার পূর্বপরিচিতা এই মেয়েটিকে সেখানেই কিছু খাদ্য, জল দিয়ে আসে। না, মৃত্যুপথযাত্রী মেয়েটির আকাঙ্ক্ষা সে মেটাতে পারে না। ভাত দিতে পারে না। মানকচু আর জল। ক্যামেরার চোখে দেখা যায় এক অন্তরালবর্তিনীকে। শকুন যেমন মৃত্যুমুখীর শেষ শ্বাসটুকুর অপেক্ষা করে ধৈর্য ধরে, তেমন-ই আড়াল থেকে এক বালিকা অপেক্ষা করে আসন্ন মৃত্যুর পরে আকাঙ্ক্ষিত খাদ্যটুকুর। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট অমৃতের সন্তান মানুষের এই সত্তাটুকুও জাগিয়ে তোলে বৈকী!
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬২: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫২: রামের জীবনে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে—নারী

“আগন্তুক” মনমোহন মিত্র বলছিলেন, “মানুষ নিরালম্ব, বর্বর বাঁদুরে হাণ্টিং, ফিশিং, এগ্রিকালচার, উইভিং, পটারি… জীবনধারণের যাবতীয় উপাদান উদ্ভব করতে কীভাবে শিখল? আরও আছে। আর্কিটেকচার। একটি পর্ণকুটীর-ও স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করে। আপনি ইগলু জানেন?… এক কি বলবেন? সায়েন্স নয়? টেকনোলজি নয়?” প্রতিপক্ষ বলবেন “থামুন মশাই! টোটেম, ট্যাবু, ভুডুইজম, উইচক্রাফট, মাম্বোজাম্বো, আপনি… আপনার ব্যারাম হলে আপনি কি ওঝাকে কল দেন?”

এই প্রতর্কের প্রসঙ্গ না হয় অন্যদিন। কিন্তু আজ ওই মানুষের উত্তরাধুনিক প্রতিনিধি একটু আড়াল থেকে এক মৃতপ্রায়ের মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। যে মানুষ একদিন শিকারের প্রয়োজনে যুদ্ধের অস্ত্রে শাণ দিচ্ছিল, সেই মানুষ আজ আকাশের বোমারু বিমানের যাতায়াত আর আকালিক মূল্যবৃদ্ধি আর অভাবের বাতাবরণে তার ফেলে আসা তথাকথিত বর্বরতায় শাণ দিচ্ছে। তার আপাতঃ সভ্য সংস্কৃত চেহারার নিচে বহমান আপাত আদিম চেহারাটুকু জেগে উঠে অস্বাভাবিক চাতুর্যের সঙ্গে সুযোগের অপেক্ষায়। প্রাচীন প্রয়োজনকে আধুনিক বিনোদনে পরিণত করা নাগরিক উন্নত পৃথিবী আজ অসুস্থ অ-সভ্য আক্রান্ত সত্তাটুকু নিয়ে ওই বিষম গাছটির মতো অপেক্ষা করছে যুদ্ধের, ভবিতব্যের।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা

অশনি সংকেত আসন্ন কিংবা সম্ভাব্য বজ্রপতনের দুর্যোগের প্রহর গোনে। বিবর্ণ ভূতলে বর্ণময় যুগল প্রজাপতির সচল পক্ষ্মস্পন্দন সেই অনিবার্য সত্যটুকুর ভার বহন করে। কোথাও কোনও দৈন্য, অপূর্ণতা নেই, কিন্তু মনুষ্যলোকে মহামারীর পদপাত, মৃত্যুর নিত্য পদচারণার ধ্বনি কী অদ্ভুত অবিচারের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। স্পন্দিত, সিক্ত, সান্দ্র ঘাসের বুকে মৌন জলফড়িং কীসের অপেক্ষায় থাকে? মৃত্যুমুখী মেয়েটির উন্মুক্ত অব্যক্ত চোখে ধরা দেয় অপরাহ্নের অস্তাচল, বিকট দীর্ঘবাহু মৃত্যুদূতের মতো পত্রভারকুটিল বৃক্ষের অন্তরালবর্তী শেষ আলোটুকু। আসন্ন গোধূলিবেলায় জেগে থাকা জীবনের আকাঙ্ক্ষাস্রোত তার মৃত অথচ সবাক চোখে জেগে থাকে যেন। নেপথ্যে শিকারি পাখি ডেকে যায়। না, পণ্ডিত গঙ্গাচরণ তার হাতের নাড়িতে জীবনের স্পন্দন খুঁজে পায় না। এতক্ষণের অপেক্ষা অবশেষে সার্থক হয় যেন। এতক্ষণ সরু, চেরা চেরা, তীক্ষ্ণ শাণিত অস্ত্রের মতো গাছের পাতার আড়াল থেকে শ্বাপদের মতো বেরিয়ে এসে সেই বালিকাটি যেন তার শিকার ধরে। ওই শাণিত ফলার মতো গাছের পাতাগুলি যুদ্ধোন্মাদনা আর তার আশেপাশে সঞ্চরমান হিংস্র, কুটিল সভ্যতা, বিপন্নতার কথা বলে। গঙ্গাচরণ চলে গেলে শবদেহের পাশ থেকে কলাপাতায় মোড়া খাবারটুকু সরিয়ে নিয়ে যায় সেই বালিকাটি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

গুপি গান ধরেছিল কারাগারে বসে। দুঃখ কীসে হয়? অভাগাদের-ই কেবল তা দুঃখ হয়, তাতো নয়। যার ভাণ্ডারে রাশি রাশি সোনাদানা ঠাসাঠাসি তারও হয়। তার আরও বেশি হয় বুঝি। তবে সে তো অনেক পরের কথা। শুণ্ডির রাজা হাল্লা রাজার চিঠি পেয়ে রাজসভাতেই চোখ উল্টে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। হাল্লার রাজা তাঁর আপন ভাই। পত্রবাহক দূত রাজার অবস্থা দেখে “হে হে” করে হেসে চলে গেল। হাসবে না-ই বা কেন। রাজা তো ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার। তাঁর রাজ্যে সৈন্য, অশ্ব কিছুই নেই। অথচ তাঁকেই পাঠিয়েছে যুদ্ধের বার্তা। তিনদিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে হাল্লার রাজা সৈন্য-টৈন্য নিয়ে শুণ্ডি দখল করবেন। রাজা তাই বিশেষ ভাবিত। তাঁর তো হাতি ঘোড়া কিছুই নেই। তবে?
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

বাঘা ব্যগ্র হয়ে প্রশ্ন করে, “যুদ্ধ থামানো যায় না?”
রাজা হাসেন, “যুদ্ধ থামানো কি সহজ কথা?”
“আচ্ছা আমরা যদি সেখানে যাই?”
“কোথায় যাইবা?” আশ্চর্য হয়ে রাজা জানতে চান।
“ওই যে হল্লা না কী বললেন…”


এটুকুই যথেষ্ট। কতটা পথ গেলে যুদ্ধ হয়? যুদ্ধ আর হল্লা এক হয়ে যায়? —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content