
ভোরের সূর্য উঠি-উঠি করতে-না-করতেই ভোলারাম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। শীত-গ্রীষ্ম কোনও সময়েই এর নড়চড় হয় না। বয়স হয়েছে। পা খানিক টলমল করে আজকাল। অবশ্য যে-যে রাতে মহুয়া কিংবা তাড়ি বেশি করে খায়, তার পরের দিনই পা জানান দেয় যে, বয়স হচ্চে তো বাপু। এখন এত হড়বড় করে না-চললেই নয়। আরও কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকো। রিলিফের কম্বলের ওম নাও। জাড়টা কাটুক ভালো করে, তারপর না-হয় বেরিয়ো বাইরে! কিন্তু ভোলা না শুনে ধম্মের কথা! নিজের মনেই পা-কে শাপশাপান্ত করে বলে, “তুই বাপু মুটে মানুষ, সারাজীবন শরীরের ভার বইবি—এই তোর কাজ। তোর বাপু মাথায় চড়ে বসা কি ভালো? পা যদি বলে, আমি মাথায় চড়ে বসবো, মাথাকে এখন হাঁটার দায়িত্ব নিতে হবে, তাহলে তো ভারি অশৈলী কাণ্ড হবে বাপু? ভুঁই ট্র্যাপিজের দড়ি না-কি যে, সেখানে হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ হয়ে খেলা দেখাতে হবে? এই-যে তুই টলমল করে আমায় ভুঁয়ে ফেলে দিতে চাইছিস, এর ফল ভালো হবে ভেবেছিস্? অত দেমাক ভালো নয় রে? আর তুই আমায় ফেলেও দিতে পারবি না! দেখ, হাতে কেমন পাকা বাঁশের লাঠি আছে! এর এক ঘায়ে তুই তো তুই, হাতি-ঘোড়া বাঘ-সিংহের ঠাং পর্যন্ত খোঁড়া করে দিতে পারি জানিস্? আমি শ্যাম মুর্মুর ব্যাট, নারাণ মুর্মুর নাতি! মনে থাকে যেন, আমাকে ফ্যালা অত সোজা নয়!” বলে রেগেমেগে পাকা বাঁশের লাঠিটি বাগিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে গাড়ু হাতে।
তাদের গ্রাম নির্মল বাংলা প্রকল্পের শৌচাগার প্রকল্পে ঘটা করে সেকেন্ড প্রাইজ পেয়েছিল। তার বর্ণনা-সম্বলিত পোস্টার গ্রামে ঢোকার মুখে তোরণ করে টাঙিয়ে দেওয়া আছে, উইথ রাজ্য সরকারের ছোট-বড়-মেজো কেঁদো বাঘের ছবি-সহ। গ্রামের কয়েকটি বাড়ি প্রাথমিক পর্যায়ে শৌচাগার নির্মাণের জন্য বরাদ্দ টাকার কিছুটা পাওয়ায় পুরানো মাটির বাড়ির জায়গায় পাকা বাড়ি তুলেছে বটে, সেখানে শৌচাগারও আছে, কিন্তু তাদের প্রাতকৃত্য করার মনপসন্দ স্থান হল গ্রাম থেকে অনতিদূরে লোটা হাতে গিয়ে ঘন ঝোপঝাড় কিংবা শাল-মহুয়ার ভিড়ের মাঝে কোথাও। শৌচাগার দেখলেই তাদের মন, ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে…’ গাইতে থাকে এবং তারা রিভার্স সে আবার ঝোপঝাড়ের পিছনে ফিরেও আসে। নির্মল বাংলা প্রকল্পের ছোট ঘরটায় ভোলারাম খড়-বিচুলির বস্তা, কোদাল-গাঁইতি ইত্যাদি রাখে। অবশ্য এ-গ্রামের অনেকেই ভোলার মত পড়ে পাওয়া, চৌদ্দ আনা পেলেই নিজেদের ধন্য মনে করে। তারাও অনেকেই নির্মল বাংলার ছোট ঘরটায় কেউ ছাগল বেঁধে রাখে, কেউ জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা কাঠকুটোর স্তুপ, ডেলিভারি দেওয়ার জন্য থাকে শালপাতার থালা-বাটি। দু’-একটি বাড়িতেই কেবল সেই শৌচালয় ব্যবহৃত হয়, বাকিরা যেমন বাপঠাকুর্দার আমলে ঝোপঝাড়-জঙ্গলের মধ্যে বসে ভারমুক্ত হত, এখন তেমনই হয়। সকাল না-হতে হতেই তারা ছোটে প্রাতঃকৃত্য সেরে আসার জন্য, পাছে আলো বেরুলে ওই অবস্থায় তাদের কেউ দেখে ফেলে। তবে এই ভাবে তারা শেষপর্যন্ত দেখে রোজই দল বেঁধেই তারা প্রাতঃকৃত্য সারছে। অতএব ওই মুহূর্তে বিজনেস মিটিং-ও করে ফেলে কেউ-কেউ। প্রাতঃকৃত্যকে অতি-সাধারণ, নেহাতই তুচ্ছ ঘটনা বলে ভাবলে কী হবে? আদতে সে অত্যন্ত মহান এবং নিরপেক্ষ একটি আবেগ, যা একবার চাগাড় দিলে বেগমুক্ত না-হয়ে আর উপায় থাকে না। এখনও সেই উদ্দেশ্যেই হাতের লাঠিটা ঘোরাতে-ঘোরাতে ভোলারাম বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৮ : সোনার মাছি খুন করেছি

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৫: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৬

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫২: রামের জীবনে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে—নারী
ভোরবেলার এই সময়টায় কুকুরগুলি যেন সারারাতের পাহারার শেষে কিছুটা ক্লান্ত এবং তিতিবিরক্ত হয়ে থাকে।চেনাজানা মানুষ দেখলেও মাঝেমাঝেই এমন হাঁ-হাঁ করে তেড়ে আসে, ঘিরে ধরে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ঘেউ-ঘেউ করতে থাকে যে, হাতের লাঠিটা ব্যবহার না-করে আর উপায় কী? কিন্তু আজ সেই কুকুরগুলিকে কাছেপিঠে কোথাও দেখতে পেল না ভোলারাম। কী আশ্চর্য! সে অবাক হল। কোথায় গেল দুর্বৃত্তগুলি? অন্য পাড়ায় নেমন্তন্নে গেছে নাকি? কিন্তু এখানে অন্যপাড়া বলতে যা বোঝায়, তার সুযোগ নেই বললেই হয়। এক-একটি গ্রাম এক-একটি পাড়া দিয়েই গড়ে উঠেছে। দশ-বিশ ঘর লোকের বাস, হাতে গোনা জনঘনত্বের হার। আবার মাইলটাক গেলে আর-একটি গ্রাম। টুক্ করে গিয়ে আবার টুক্ করে যে ফিরে আসবে, তার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাহলে? রাত জেগে ক্লান্ত হয়ে ব্যাটাচ্ছেলেগুলি ঘুমিয়ে পড়ল না-কি? কিন্তু ঘুমালে কি সকলেই একসাথে ঘুমায় ওরা? জানে না ভোলারাম। তবে অন্যদিন ওরা জেগে থাকলে বিরক্ত হত, আজ জেগে না-থাকার কারণে ভোলারামের নিজের মেজাজটিই কেমন তেতো হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এইসময়েই ওকে চমকে দিয়ে কাছেই একপাল কুকুর চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু সেই চ্যাঁচানোটা যেন অন্যদিনের মতো নয়। একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল সে। যাক্ কুকুরগুলি তাহলে কাছেপিঠেই আছে। এবং ঘুমিয়েও পড়েনি একসঙ্গে সক্কলে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন
ঘর থেকে কয়েক পা গিয়ে টিলাপাহাড়ের দিকে তাকাল সে। অন্ধকারের চাদর এখনও চারপাশ জড়িয়ে শুয়ে আছে বলে দেখা যাচ্ছে না, তবু সে জানে ওই ঝোপঝাড়-জঙ্গলে সমাচ্ছন্ন টিলার মাথায় এক গুহাদেশেকালাদেওর অবস্থান, সেখানে থেকেই তিনি তাঁর রাজ্যপাট চালান। যদি কখন দরকার হয় তাহলে তিনি নিজেই নিজের স্থায়ী প্রতিনিধি মনোনীত করেন। কে জানে কার ভাগ্যে কবে শিকে ছেঁড়ে! কিন্তু সকলেই চায়, কালাদেওর সেবায়েত হতে। সেবায় কালাদেও যদি তুষ্ট হন, তাহলে একেবারে ছপ্পর ফুঁড়ে অর্থ দেন, রাতারাতি গরীব মানুষ সেই দয়ার দানে ‘ধন্য’ হয়ে গেল, তার আর ইয়ত্তা নেই। এই-যে বছর দেড়-দুই হল কালাদেও আবার জেগে উঠেছেন বলে সর্বত্র যে একটা হুলুস্থূল চলছে, তাতে তার নিজের কোন হেলদোল নেই। সে জানে এবং বিশ্বাস করে, কালাদেও সাধারণ মানুষের কোন ক্ষতি করেন না। তাছাড়া দশ-বিশটা গ্রামের রক্ষাকর্তা তিনি। রাজা কি নিজেই নিজের প্রজাদের নির্বিচারে প্রাণে মেরে ফেলতে পারেন? তিনি হয়ত তাঁর রাজ্যরক্ষার স্বার্থে দুষ্টের দমন করেন, কিন্তু তার পাশাপাশি শিষ্টের পালনও করেন। এই যে এত লোক কালাদেওর হাতে মরেছে বলে চারদিকে খবর, তাদের সকলকে সাধারণ মানুষ বলে মেনে নিতে তার একটু অসুবিধা আছে। নিশ্চয়ই তারা এমন কোন অন্যায় করেছিল যে, কালাদেও তাদের শাস্তি দিয়েছেন। এই যে সে, রাত থাকতে উঠে পড়ে বাহ্য করার জন্য ঝোপঝাড়-গাছের আড়াল খুঁজে বেড়াচ্ছে দিনের-পর-দিন, কই কালাদেওর মুখোমুখি তো একবারও হল না সে। মনে মনে বিড়বিড় করে সে, “হুঁ-হুঁ বাবা, কালাদেও কি ভুল করতে পারে? কালাদেও জানে ভোলারাম নিতান্ত নিরীহ একাচোরা মানুষ, তাকে মারা মানে ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করার সামিল। আমার কিচ্ছু হবে না। আজ অবধি না কালাদেও, না কালাদেওওর বলি, কিচ্ছু দেখলাম না। জীবনটাই যার পানসে, তাকে কি-আর কালাদেও দেখা দেন?” বলতে বলতে সে এগোচ্ছে। এমনসময় হঠাৎ তার গায়ের কাছ দিয়েই গোটা কয়েক শিয়াল দ্রুত ছুটে গেল সামনের দিকে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
এই সমস্ত জঙ্গলে শিয়াল মোটেও নিরীহ প্রাণী নয়। তাদের পালের খপ্পরে পড়া অনেকসময় হায়নার পালের সামনে পড়ার মতো। কিন্তু তারা যেন ঠিক ভোলারামকে দেখেও দেখল না। এত ব্যস্ততা তাদের। সামনের দিকে এমনভাবে ছুটছে যেন তাদের জন্য কেউ ভোজসভা বসিয়েছে। সামান্য দেরি হলেই খাবার শেষ হয়ে যাবে। ভাবতে যতটুকু সময় নিয়েছে ভোলারাম, হঠাৎ কুকুরগুলি সব একযোগে চিৎকার করে উঠল। তাদের চিৎকার শুনে ভোলারাম বুঝতে পারল, কুকুরগুলি এখন তার ডানদিকে রয়েছে। আরে, শিয়ালগুলি তো সব ওদিকেই ছুটে গেল। তাহলে কী কুকুরগুলির সঙ্গে যুদ্ধ করবে বলেই তাদের এত তাড়া ছিল? কিন্তু কুকুর-শিয়াল এরা কেউ মানুষ নয় যে, অকারণে ইচ্ছে হল বলেই যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে। ওই পশুত্ব মানুষের মধ্যেই কেবল আছে, পশুদের মধ্যে নেই। অকারণ হিংসা, হানাহানি, পরশ্রীকাতরতা, অন্যের ক্ষতি করে আত্মপ্রসাদলাভ এ-সমস্ত মানুষের অন্তর্গত স্বভাব। পশুরা অনেক বেশি মানবিক এবং ঠিকঠাক এ-সব দিক দিয়ে। এ-সব ভারি-ভারি তাত্ত্বিক কথা ভোলারামের জানার কথা নয়। কিন্তু সে জানে। সৌজন্যে তার গ্রামের মাষ্টারমশাই। মাঝে-মাঝে তাঁর বাগানে কাজ করার জন্য সে যায়, তখন রবিবার মুড়ি আর আলুরচপ কিংবা ঘুঘনি খেতে খেতে মাষ্টারমশাই এ-সব কথা বলেন। সব কথা যে সে ঠিকঠাক বুঝতে পারে তা নয়, তবে ভালো লাগে। কিছু কিছু কথা এমন দাগ কাটে যে, মনে থেকে যায়। যেমন এই কথাটি। কিন্তু সেখানেই খটকা লাগল তার। মাস্টারমশাই তো মিছে কথা কইবার লোক নয় ? তাহলে ? এই শিয়ালের পাল ছুটে গেল কেন? কুকুরগুলিকে বিনা কারণে আক্রমণ তো তারা করবে না। পরক্ষণেই তার মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো একটা প্রশ্ন জেগে উঠল, আচ্ছে, কোন ভাগের মানে ভোগের বখরার লড়াই নয় তো? কিন্তু কী সেই ভোগ্যবস্তু যার জন্য শিয়ালের পাল ছুটে আসে? কুকুরের সঙ্গে লড়াই বাধিয়ে দেয়? বাহ্যি করা মাথায় উঠল। হাতের লাঠিখানা ভালো করে পাকড়ে ভোলারাম টলতে-টলতে কুকুর-শিয়ালের আওয়াজ লক্ষ্য করেই এগোতে লাগল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
পূব আকাশ সামান্য আলো হয়েছে। একটু পরেই আশেপাশের অনেকেই এসে জুটে যাবে প্রাতঃকৃত্য সারতে। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। পা-ও নিজের বশে নেই। কিন্তু হাতের পাকা বাঁশের লাঠিটা এখনও ঠিক আছে। তার ভরসাতেই সে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
সেখানে তখন ধুন্ধুমার কাণ্ড। একদিকে গোটা পাঁচ ছয় শিয়াল, অন্যদিকে গোটা আষ্টেক কুকুর। একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এ-ওকে, সে-তাকে আঁচড়াচ্ছে-কামড়াচ্ছে। কিছু একটা জিনিস একটা শিয়ালের মুখে ধরা। কয়েকটি কুকুর সেটিকে ছিনিয়ে নেবে বলে কামড়াকামড়ি করছে। ভোলারাম যখন পৌঁছাল, তখন যুদ্ধের ঝাঁঝ ভয়ানক। শিয়ালগুলি অত্যন্ত পাজি, নচ্ছার। সুযোগ পেলেই ভোলারামের ছাগলগুলিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। একবার গিয়েও ছিল একটিকে নিয়ে। সেই থেকে তাদের উপর ভোলারামের ভারি রাগ। অতএব সেখানে পৌঁছাবার আগেই সে সিদ্ধান্ত নিল যে, সে কুকুরদের পক্ষ নেবে। সেই ভেবেই সে লাঠি ঘোরাতে-ঘোরাতে রে-রে করে গিয়ে পড়েছিল তাদের মাঝে। ভোলারাম সেখানে ওইভাবে গিয়ে পড়তেই, কুকুর এবং শিয়াল উভয় পক্ষই খানিকটা সম্ভ্রম দেখিয়ে প্রথমে দূরে সরে গেল আর চাপা গরগর আওয়াজ করতে লাগল গলায়। ওরা যে অদের মধ্যে ভোলারামের সালিশি ভালোভাবে নেয় নি, তা ওদের চোখে-মুখে স্পষ্ট। কিন্তু অ-সব দেখার সময় আর তখন নেই ভোলারামের। তার হাতের লাঠি প্রায় খসব-খসব তখন। তার পা থরথর করে কাঁপছে। মুখচোখের অবস্থাও ভয়ানক। নেশার মৌতাত তার ছুটে গেছে তখন। সে বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে দেখছে, কুকুর আর শিয়ালের দল যেখানে ঝগড়া-মারামারি করছিল, তার অনতিদূরে পড়ে আছে একজন মানুষ। এই কাকভোরে যতটুকু আলো জেগেছে, তা দিয়েই বোঝা যাচ্ছে মানুষটি কে। কারণ, মৃত্যুর আগে তার ঘাড় বীভৎসভাবে একদিকে ঘুরে গিয়েছে এবং মুখটি আবার ভোলারামের দিকেই ফেরানো। যেন বলতে চাইছে, দেখ তো বাপু, আমায় চিনতে পারো কি-না!
যতই নেশাভাঙ করুক-না-কেন, চিনবে না তা বলে? লোকটিকে আশেপাশের দশ-বিশটা গ্রামের সক্কলে চেনে। কেবল চেনে না, ভয়-ভক্তিও করে। কারণ, লোকটা কালাদেওর সেবায়েত।
মুহূর্তের মধ্যে মাথার মধ্যে কীরকম একটা করে উঠল ভোলারামের। প্রাণঘাতী চিৎকার করে সে গ্রামের দিকে ছুটল। এখন আর তার পা টলছে না, মাথা ঝিমঝিম করছে না। ছুটেই চলেছে সে, আর চিৎকার করছে, “মরে গেছে! হায় কালাদেও! মরে গেছে! কালাদেওর সেবায়েত মঙ্গল ওঝা মরে গেছে!” তার সেই চিৎকারে কুকুর-শিয়ালগুলিও ঘাবড়ে গেল যেন। মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই ছিটকে গেল। এদিকে ভোর যে আবার নতুন এক পবিত্র, বিশুদ্ধ কবিতা লেখার আয়োজন করছিল, তাতে যেন রক্তের ছিটে এসে লাগল! একটা অনাঘ্রাত ভোর মুহূর্তেই কুশ্রী, বীভৎস হয়ে পড়ল! —চলবে।
সেখানে তখন ধুন্ধুমার কাণ্ড। একদিকে গোটা পাঁচ ছয় শিয়াল, অন্যদিকে গোটা আষ্টেক কুকুর। একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এ-ওকে, সে-তাকে আঁচড়াচ্ছে-কামড়াচ্ছে। কিছু একটা জিনিস একটা শিয়ালের মুখে ধরা। কয়েকটি কুকুর সেটিকে ছিনিয়ে নেবে বলে কামড়াকামড়ি করছে। ভোলারাম যখন পৌঁছাল, তখন যুদ্ধের ঝাঁঝ ভয়ানক। শিয়ালগুলি অত্যন্ত পাজি, নচ্ছার। সুযোগ পেলেই ভোলারামের ছাগলগুলিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। একবার গিয়েও ছিল একটিকে নিয়ে। সেই থেকে তাদের উপর ভোলারামের ভারি রাগ। অতএব সেখানে পৌঁছাবার আগেই সে সিদ্ধান্ত নিল যে, সে কুকুরদের পক্ষ নেবে। সেই ভেবেই সে লাঠি ঘোরাতে-ঘোরাতে রে-রে করে গিয়ে পড়েছিল তাদের মাঝে। ভোলারাম সেখানে ওইভাবে গিয়ে পড়তেই, কুকুর এবং শিয়াল উভয় পক্ষই খানিকটা সম্ভ্রম দেখিয়ে প্রথমে দূরে সরে গেল আর চাপা গরগর আওয়াজ করতে লাগল গলায়। ওরা যে অদের মধ্যে ভোলারামের সালিশি ভালোভাবে নেয় নি, তা ওদের চোখে-মুখে স্পষ্ট। কিন্তু অ-সব দেখার সময় আর তখন নেই ভোলারামের। তার হাতের লাঠি প্রায় খসব-খসব তখন। তার পা থরথর করে কাঁপছে। মুখচোখের অবস্থাও ভয়ানক। নেশার মৌতাত তার ছুটে গেছে তখন। সে বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে দেখছে, কুকুর আর শিয়ালের দল যেখানে ঝগড়া-মারামারি করছিল, তার অনতিদূরে পড়ে আছে একজন মানুষ। এই কাকভোরে যতটুকু আলো জেগেছে, তা দিয়েই বোঝা যাচ্ছে মানুষটি কে। কারণ, মৃত্যুর আগে তার ঘাড় বীভৎসভাবে একদিকে ঘুরে গিয়েছে এবং মুখটি আবার ভোলারামের দিকেই ফেরানো। যেন বলতে চাইছে, দেখ তো বাপু, আমায় চিনতে পারো কি-না!
যতই নেশাভাঙ করুক-না-কেন, চিনবে না তা বলে? লোকটিকে আশেপাশের দশ-বিশটা গ্রামের সক্কলে চেনে। কেবল চেনে না, ভয়-ভক্তিও করে। কারণ, লোকটা কালাদেওর সেবায়েত।
মুহূর্তের মধ্যে মাথার মধ্যে কীরকম একটা করে উঠল ভোলারামের। প্রাণঘাতী চিৎকার করে সে গ্রামের দিকে ছুটল। এখন আর তার পা টলছে না, মাথা ঝিমঝিম করছে না। ছুটেই চলেছে সে, আর চিৎকার করছে, “মরে গেছে! হায় কালাদেও! মরে গেছে! কালাদেওর সেবায়েত মঙ্গল ওঝা মরে গেছে!” তার সেই চিৎকারে কুকুর-শিয়ালগুলিও ঘাবড়ে গেল যেন। মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই ছিটকে গেল। এদিকে ভোর যে আবার নতুন এক পবিত্র, বিশুদ্ধ কবিতা লেখার আয়োজন করছিল, তাতে যেন রক্তের ছিটে এসে লাগল! একটা অনাঘ্রাত ভোর মুহূর্তেই কুশ্রী, বীভৎস হয়ে পড়ল! —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















