শুক্রবার ১৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

কিছুক্ষণ পরেই রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার চিরে দেবদত্ত এসে ঢুকল কামদমনীর ঘরে। কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সোজা গিয়ে বসল কামদমনীর নরম শয্যায়।

চোখের সামনে নিজের স্ত্রীর এই কীর্তি দেখে রথকার বীরবরের তো রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে ওঠার জোগাড়! সে খাটের তলায় শুয়ে শুয়েই দাঁতে দাঁত চেপে ভাবতে লাগল, “কী করি এখন? এখনই খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসে এই বিশ্বাসঘাতকদের কচুকাটা করব? নাকি এরা দুজনে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে, তখন অবলীলায় দুটোকেই একসঙ্গে পরপারে পাঠিয়ে দেব? —কিমেনম্ উত্থায় হন্মি? অথবা হেলয়া এব প্রসুপ্তৌ দ্বৌ অপি এতৌ ব্যাপাদয়ামি?”

কিন্তু রাগের মাথায় হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে বীরবর ভাবল, “বরং এরা এখন কী করে আর নিজেদের মধ্যে কী গোপন কথাবার্তা বলে, সেটা আগে কান পেতে শুনে নিই।” এই ভেবে সে চুপ করে রইল। ঠিক তখনই ঘটল এক অঘটন! কামদমনী শয্যা থেকে নেমে এসে নিঃশব্দে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে দেবদত্তের পাশে এসে বসতে যাচ্ছিল। আর ঠিক তখনই তার পা-টা গিয়ে ঠেকল রথকারের শরীরের একটা অংশে, যা অসাবধানতাবশত খাটের তলা থেকে সামান্য একটু বেরিয়ে ছিল।

ওই একটু স্পর্শেই কামদমনীর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! মুহূর্তের মধ্যে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বুঝে ফেলল আসল ব্যাপারটা। সে মনে মনে প্রমাদ গুনল, “সর্বনাশ! নিশ্চয়ই আমার ওই ধড়িবাজ রথকারস্বামীটা আমাকে পরীক্ষা করার জন্য আজ অন্য গ্রামে যাওয়ার ভান করে এই খাটের তলায় ঘাপটি মেরে বসে আছে! বটে! তবে রে, আমিও দেখাচ্ছি আমার স্ত্রী-চরিত্রের আসল ভেলকি!”
কামদমনীর মাথায় যখন এইসব চিন্তার ঝড় বইছে, দেবদত্তের তখন আর তর সইছে না। কামদমনীর স্পর্শসুখ পাওয়ার জন্য সে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে উদ্যত হল। ঠিক তখনই কামদমনীর উপস্থিত বুদ্ধি একেবারে খোলতাই হয়ে উঠল। সে বিদ্যুতের বেগে পিছিয়ে গিয়ে, দু-হাত জোড় করে পরম সতীসাধ্বী নারীর মতো দেবদত্তকে বলে উঠল, “খবরদার! হে মহানুভব, আমার শরীরকে দয়া করে স্পর্শ করবেন না। কারণ আমি একজন একনিষ্ঠ পতিব্রতা এবং সতী নারী। যদি আমার এই নিষেধ সত্ত্বেও আপনি আমাকে জোর করে স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখান, তবে আমার সতীত্বের তেজে আমি এখনই আপনাকে অভিশাপ দিয়ে ভস্মীভূত করে দেব!”

কামদমনীর মুখে এমন ‘সতী সাবিত্রী’র মতো কথা শুনে দেবদত্ত তো একেবারে থ! সে আকাশ থেকে পড়ে বলল, “সে কী কথা! যদি এবং তর্হি ত্বয়া কিমহমাহূতঃ? — তাই যদি হয়, তাহলে আপনি নিজে গায়ে পড়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন কেন?”

কামদমনী তখন গলার স্বর খাদে নামিয়ে, চরম নাটকীয়তার সঙ্গে বলল, “আমার কথা মন দিয়ে শুনুন। আজ সকালে আমি চণ্ডিকাদেবীর দর্শনে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সেখানে এক দৈববাণী হলো— ‘হে পুত্রী! তোমাকে আমি আর কী বলব? তুমি আমার একজন একান্ত ভক্ত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দৈব দুর্বিপাকে আগামী ছ-মাসের মধ্যেই তুমি বিধবা হবে—বিধিনিয়োগাৎ বিধবা ভবিষ্যসি।’
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬৩: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৬ : চিড়িয়াখানা: সত্যান্বেষীর অন্দর, ডিটেকটিভের ড্রয়িংরুম

এই নিদারুণ কথা শুনে আমি তো কেঁদে আকুল! আমি দেবীমূর্তির পায়ে আছড়ে পড়ে বললাম, ‘হে করুণাময়ী দেবী! আপনি যখন ভবিষ্যৎ বিপদের কথা জানেন, তখন নিশ্চয়ই এই বিপদ থেকে উদ্ধারের পথটিও আপনার জানা আছে। আমার পতির প্রাণ বাঁচাতে এবং তাঁকে একশো বছর আয়ু দিতে পারে, এমন কি কোনো প্রতিকার নেই? — “তৎ অস্তি কশ্চিৎ উপায়ঃ, যেন মে পতিঃ শতসংবৎসরজীবী ভবতি?”

কামদমনী বলতে লাগল, “তখন সেই দৈবী কণ্ঠ মায়াভরে বলে উঠল, ‘ওহে বৎস! সে উপায় থেকেও নেই—সন্নপি নাস্তি। কারণ সেই প্রতিকার করা সম্পূর্ণ তোমারই অধীন—তব আয়ত্তঃ স প্রতিকারঃ।’
দেবীর কথা শুনে আমি ব্যাকুল হয়ে বললাম, ‘উপায় যদি কিছু থেকেই থাকে, তবে আমাকে দয়া করে আজ্ঞা করুন দেবী। প্রাণ থাকতে আমার সাধ্যের মধ্যে হলে আমি তা অবশ্যই করব!’
তখন দেবী আমাকে সেই চরম আজ্ঞা দিলেন। তিনি বললেন, ‘যদি আজ রাতে তুমি কোনও পরপুরুষের সঙ্গে একই শয্যায় উঠে আলিঙ্গনাদি করো, তবে তোমার পতির আসন্ন অপমৃত্যু সেই পরপুরুষের মধ্যে সঞ্চারিত হবে—তব ভর্তৃসক্তোঽপমৃত্যুঃ তস্য সঞ্চরতি। আর তোমার পতিও একশত বছরের পরমায়ু লাভ করবে!’”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৮ : বিনা বিচারে আটকদের নিয়ে রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে চিঠি লিখেন নেহরু

এই পর্যন্ত বলে, কামদমনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বিষণ্ণ মুখে, মাথা নিচু করে দেবদত্তকে বলল, “কেবলমাত্র এই কারণেই আমার স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে আজ আমি আপনাকে আহ্বান করেছি। এবার আপনার যা করতে ইচ্ছে হয়, আপনি তাই করুন। কারণ দেবীর বচনের কখনও অন্যথা হবে না, এটুকু আমি খুব ভালো করেই জানি।” এবার দেবদত্ত পুরো ব্যাপারটা জলের মতো বুঝে ফেলল। খাটের তলায় স্বামীর উপস্থিতি আর কামদমনীর এই চোখ-ধাঁধানো উপস্থিত বুদ্ধি দেখে সে মনে মনে হেসে কুটোপাটি! তারপর অত্যন্ত প্রসন্নচিত্তে সে কামদমনীকে আলিঙ্গন আর চুম্বন করে তাকে কামকলার পাঠ দিতে শুরু করল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

আর এদিকে সেই মহামূর্খ রথকার? স্ত্রীর মুখে তার প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের কথা শুনে খাটের তলায় তার সারা শরীরে তখন রোমাঞ্চ বইছে! আনন্দে আটখানা হয়ে সে তড়িঘড়ি খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এল। তারপর নিজের সেই ঘোর ব্যভিচারিণী স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে গদগদ হয়ে বলতে শুরু করল, “হে পতিব্রতে! তুমি ধন্য! সাধু কুলনন্দিনি— তুমি সমগ্র কুলের আনন্দবর্ধনকারী। আমি দুষ্ট লোকেদের নানান কথায় কান দিয়ে, মতিভ্রম হয়ে তোমাকে সন্দেহ করেছিলাম। আজ তোমাকে হাতেনাতে ধরবার জন্য পরদেশে যাওয়ার ভান করে এই খাটের তলায় লুকিয়ে ছিলাম। এসো, এখন আমাকে আলিঙ্গন করো! পতিব্রতা নারীদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ। কারণ পরপুরুষের শয্যায় শুয়েও তুমি কেবল আমার কথা ভেবে পাতিব্রত্য ধর্মই পালন করেছ। আমার অকাল মৃত্যুর ফাঁড়া কাটাতে আর আমার আয়ু বৃদ্ধির জন্য পরপুরুষের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে এমন কাজও তোমাকে করতে হল! সত্যিই তুমি ধন্য!”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৪: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— অলিভ রিডলে কচ্ছপ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এই বলে সেই নির্বোধ রথকার প্রেমপূর্ণ চিত্তে তার সেই ‘জঘনচপলা’ স্ত্রীকে সজোরে আলিঙ্গন করল। তারপর চরম কৃতজ্ঞতায় সেই স্ত্রীকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দেবদত্তের দিকে ফিরে হাত জোড় করে বলল, “হে মহানুভব! আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনি আজ এই গরিবের গৃহে পদার্পণ করেছেন। একমাত্র আপনার প্রসাদেই আমি একশো বছর পরমায়ু লাভ করলাম। আসুন, আপনিও আমাকে আলিঙ্গন করে আমার স্কন্ধে আরোহণ করুন!”

এই কথা বলে, হতবাক দেবদত্তের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, রথকার তাকে জোর করে আলিঙ্গন করল এবং তাকেও নিজের আরেক কাঁধে তুলে নিল। তারপর স্ত্রী ও তার প্রেমিক—দুজনকে দুই কাঁধে নিয়ে সারা ঘরময় নাচতে নাচতে মহা উল্লাসে বলতে লাগল, “হে ব্রহ্মব্রত! পরোপকারকারীদের মধ্যে আপনিই শ্রেষ্ঠ। আপনি আমার যে এমন চরম উপকার করেছেন, তাতে আমি চিরকালের জন্য কৃতার্থ হয়ে গেলাম!”—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content