কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

রাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর ভ্রান্তি হল শত্রুর আত্মসমর্পণকে নিজের শক্তির বিজয় বলে ভুল করা। কূটনীতির ময়দানে যখন কোনও প্রাজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের পুরনো শত্রু হঠাৎ বশ্যতা স্বীকার করে, তখন বুঝতে হয় তার পিছনে কোনও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ পাতা রয়েছে। উলূকরাজ অরিমর্দন ঠিক সেই ফাঁদেই পা দিলেন। বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের সমস্ত অকাট্য যুক্তি, দূরদর্শিতা আর রক্তজল করা সতর্কবাণী সেদিন রাজসভার চাটুকারদের স্তুতিবাক্যের স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। পেঁচাদের দল যেন এক অদ্ভুত আত্মঘাতী উল্লাসে নিজেদের চিরন্তন বিনাশ ডেকে আনার জন্যই কাকদের বৃদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত মন্ত্রী স্থিরজীবীকে সসম্মানে নিজেদের দুর্গের ভিতরে নিয়ে এলো।

উলূকদের সেই দুর্ভেদ্য দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করতে করতে বৃদ্ধ কাক স্থিরজীবী মনে মনে এক চরম শ্লেষের হাসি হাসলেন। তাঁর এই হাসি কোনো প্রাণের ভয়ে ভীত আশ্রিতের নয়, বরং শত্রুর অন্ধত্ব দেখে এক ধুরন্ধর রাজনীতিকের তৃপ্তির হাসি। মনে মনে তিনি উপলব্ধি করলেন যে পুরো উলূক-রাজ্যে যদি কেউ প্রকৃত রাষ্ট্রনীতি এবং শত্রু-মিত্রের সমীকরণ বোঝেন, তবে তিনি কেবল ওই রক্তাক্ষ! স্থিরজীবী ভাবলেন, রাজার ভালো করতে ইচ্ছুক যে মন্ত্রী তাঁকে শুরুতেই হত্যা করবার পরামর্শ দিয়েছিলেন, আসলে তিনিই একমাত্র সঠিক পরামর্শ দিয়েছিলেন— “স এবৈকোঽত্র সর্বেষাং নীতিশাস্ত্রার্থতত্ত্ববিত্।” স্থিরজীবী বুঝলেন, অরিমর্দন যদি আজ রক্তাক্ষের পরামর্শ মেনে তাঁকে হত্যা করতেন, তাহলে উলূক জাতির ওপর আসন্ন মহাবিপদের আর কোনও সম্ভাবনাই থাকত না। কিন্তু যে রাজা চাটুকারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, তার পতন স্বয়ং বিধাতাও আটকাতে পারেন না।

দুর্গদ্বারে পৌঁছে উলূকরাজ অরিমর্দন অত্যন্ত গর্বিত ভঙ্গিতে তাঁর সেবকদের আদেশ দিলেন, “ওহে সেবকগণ! এই স্থিরজীবী এখন থেকে আমার পরম হিতৈষী। এঁনাকে এঁনার পছন্দমতো দুর্গের উৎকৃষ্ট কোনও স্থান বসবাসের জন্য প্রদান করো।” অরিমর্দনের এই আদেশ শুনে স্থিরজীবীর মাথায় কূটনীতির পরবর্তী ছক খেলে গেল। তিনি ভাবলেন, উলূকদের দুর্গ পর্যন্ত তো পৌঁছানো গেল, এখন এদের সমূলে বিনাশ করবার উপায় ভাবতে হবে। কিন্তু এই কাজটা দুর্গের ভেতরে রাজার কাছাকাছি থেকে করা অসম্ভব। ভিতরে থাকলে উলূক মন্ত্রীদের কড়া নজরদারি এবং ঈর্ষার মুখে পড়তে হবে, যা গুপ্ত পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই দুর্গের দ্বারদেশেই অবস্থান করে তাঁকে উদ্দেশ্য সফল করতে হবে।
এইসব সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে স্থিরজীবী চরম বিনয়ের অভিনয় করে উলূকাধিপতি অরিমর্দনকে বললেন, “হে দেব! আপনি যে আদেশ দিয়েছেন তা সর্বৈব সঠিক ও কৃপাধন্য। কিন্তু আমিও দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গেই আছি, জীবনের অভিজ্ঞতা আমারও কিছু কম নয়; সেইসঙ্গে আমি আবার জন্মসূত্রে আপনার শত্রু কুলেরই একজন। আজ যদিও আমি আপনার পরম অনুগত, হিতৈষী এবং বিশ্বস্ত হয়েছি, তথাপি দুর্গের ভিতরে আমার থাকাটা রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও নিরাপত্তার খাতিরে সঠিক হবে না। তাই আমার একান্ত ইচ্ছা, আমি দুর্গের দ্বারদেশেই অবস্থান করব এবং সেখান থেকেই আপনার চরণধূলিতে নিজের শরীরকে পবিত্র করে নিরন্তর আপনার সেবায় নিযুক্ত থাকব।”

উলূকরাজ অরিমর্দন দেখলেন এ এক অতি উত্তম প্রস্তাব। তিনি ভাবলেন, দুর্গের অভ্যন্তরে থাকলে অন্যান্যদের কাছে নব-আশ্রিত স্থিরজীবীর প্রতি রাজার বেশি পক্ষপাতিত্ব মনে হতে পারে, ফলে তিনি দুর্গের দ্বারদেশে অবস্থান করলেই ভালো। দুর্গের একেবারে ভিতরের গোপন খবরও শত্রুপক্ষের এই বিক্ষুব্ধ মন্ত্রীর কাছে তাহলে অনেকটাই আড়াল থাকবে। অরিমর্দন বুঝতেও পারলেন না, দুর্গের এই প্রবেশদ্বারই আসলে গুপ্তচরের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অবস্থান, আর এই দ্বারদেশেই লুকিয়ে আছে তাঁর ভবিষ্যৎ চিতার কাঠ!

উলূকরাজের আদেশে বায়সরাজ মেঘবর্ণের বৃদ্ধমন্ত্রী স্থিরজীবী দুর্গের দ্বারদেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। রাজার সেবকেরা প্রতিদিন নিজেদের আহারের পর রাজাজ্ঞায় সেই বৃদ্ধ স্থিরজীবীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎকৃষ্ট মাংসাহার নিয়ে আসত। শত্রুর রাজকীয় রেশনে এবং নির্বিঘ্ন আশ্রয়ে আহার-বিহার করে স্বচ্ছন্দে বেশ ভালোই দিন কাটছিল তাঁর। বাইরে পরম আনুগত্যের মুখোশ, আর ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয়—কূটনীতির এই দ্বৈত চাল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খেলছিলেন স্থিরজীবী। কিছুদিনের মধ্যেই রাজকীয় মাংস খেয়েদেয়ে সেই জরাজীর্ণ বৃদ্ধ কাক একেবারে ময়ূরের মতো হৃষ্টপুষ্ট ও বলশালী হয়ে উঠল।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে

সব কিছুই রাজার ইচ্ছামতো ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু উলূকরাজের বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের তীক্ষ্ণ ও সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টি সব সময়েই নিবদ্ধ ছিল সেই দ্বারদেশে বসে থাকা স্থিরজীবীর ওপরে। স্থিরজীবীর এই সন্দেহজনক শারীরিক পরিবর্তন ও আস্ফালন দেখে সবিস্ময়ে ও চরম ক্ষোভে একদিন রক্তাক্ষ রাজসভায় উলূকরাজের অন্যান্য মন্ত্রীদের এবং স্বয়ং রাজাকে লক্ষ করে তীব্র শ্লেষে ফেটে পড়লেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অন্ধ আত্মতুষ্টি যে কতটা ভয়ংকর, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সরাসরি রাজাকে বললেন, “হে রাজন্‌! আপনার মন্ত্রীরা এবং সেইসঙ্গে আপনি নিজেও একজন মূর্খ— ‘মূর্খোঽয়ং মন্ত্রীজনো ভবাংশ্চ’ । আর কেউ এ কথা ভয়ে বা চাটুকারিতায় বলুন বা না বলুক, অন্তত আমার বিচারে আমি যেটুকু বুঝতে পারছি, আপনারা সকলেই মূর্খের মতো আত্মঘাতী কাজ করে চলেছেন দিনের পর দিন। আপনাদের এই নির্বুদ্ধিতা দেখে আমার সেই পাখির কথা মনে পড়ছে যে বলেছিল—
পূর্বং তাবদহং মূর্খো দ্বিতীযতঃ পাশবন্ধকঃ।
ততো রাজা চ মন্ত্রী চ সর্বং বৈ মূর্খমণ্ডলম্।।

(কাকোলূকীয়ম্ ১৯২)
অর্থাৎ, প্রথম মূর্খ তো স্বয়ং আমি, দ্বিতীয় মূর্খ হলো সেই পাশবন্ধক ব্যাধ, তারপর মূর্খ হলো স্বয়ং রাজা আর তাঁর মন্ত্রীরা। সোজা কথায়, এই রাজ্যের সকলেই মূর্খ — রাজ্যটাই মূর্খমণ্ডলে পর্যবসিত হয়েছে!”
রাজসভায় রক্তাক্ষের মুখে “মূর্খমণ্ডলম্” শ্লোকটি শুনে অন্যান্য মন্ত্রীরা বিস্মিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সে কেমন কথা? “কথমেতত্‍?” তখন কূটনীতিজ্ঞ রক্তাক্ষ রাজাকে এবং সভাসদদের তাঁদের বোকামির মাত্রা বোঝাতে এক চমৎকার আখ্যান বলতে শুরু করলেন।

রাষ্ট্রনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল—ক্ষমতা যখন অযোগ্যদের হাতে গিয়ে পড়ে, তখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই এক আত্মঘাতী মূর্খমণ্ডলে পরিণত হয়। শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকে ডেনমার্কের যুবরাজ যেমন বলেছিলেন, “Something is rotten in the state of Denmark,” ঠিক তেমনই উলূকরাজ অরিমর্দনের রাজসভায় দাঁড়িয়ে বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষ উপলব্ধি করেছিলেন যে তাঁদের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রেই পচন ধরেছে। চাটুকার মন্ত্রীদের স্তুতিবাক্যে অন্ধ রাজা যখন চরম শত্রু কাকদের গুপ্তচর স্থিরজীবীকে পরম সমাদরে নিজেদের দুর্গের দ্বারদেশে আশ্রয় দিলেন, তখন ক্ষোভে-দুঃখে ফেটে পড়লেন রক্তাক্ষ। কিন্তু কেবল আবেগ দিয়ে তো আর অন্ধ রাজাকে আলো দেখানো যায় না! তাই তিনি সমাজ-মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন দর্পণ তুলে ধরলেন অরিমর্দনের সামনে। শোনালেন এক আশ্চর্য সোনার পাখির গল্প—যে গল্প কেবল রূপকথা নয়, বরং রাষ্ট্রনীতি, অর্থশাস্ত্র ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তির (Cognitive Bias) এক নির্মম দলিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বে একটি অত্যন্ত পরিচিত ধারণা হলো ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি-প্রকোষ্ঠ—যেখানে শাসকেরা কেবল সেই কথাই শোনেন, যা তাঁরা শুনতে চান। এই স্তাবক পরিবেষ্টিত আত্মতুষ্টির ঘেরাটোপ কীভাবে একটি আস্ত রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তা বোঝাতেই রাজনীতি-বিশারদ রক্তাক্ষ তাঁর অন্ধ রাজা অরিমর্দন ও স্তাবক মন্ত্রীদের সামনে এক অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান তুলে ধরলেন। এটি কেবল একটি নিছক রূপকথা নয়; বরং গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা জাদুবাস্তবতার মোড়কে লুকিয়ে থাকা এক তীব্র রাজনৈতিক স্যাটায়ার।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৬: রাক্ষস খরের নিধনের নিরিখে রামচন্দ্রের মূল্যায়ন

 

১৪: সুবর্ণপুরীষ পক্ষীর আখ্যান

কোনও এক দূরবর্তী দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের সুপ্রাচীন মহীরুহে বাস করত ‘সিন্ধুক’ নামের এক অলৌকিক পাখি। প্রকৃতির এক অবিশ্বাস্য খেয়ালে তার শারীরিক গঠনে ছিল এক জাদুকরী বৈশিষ্ট্য; তার বিষ্ঠা মাটিতে স্পর্শ করলেই তা খাঁটি, নিরেট সুবর্ণে রূপান্তরিত হতো। একদিন এক বৃদ্ধ ব্যাধ জীবিকার সন্ধানে সেই গহীন অরণ্যে এসে উপস্থিত হলো। নিয়তির অদ্ভুত পরিহাসে পাখিটি ঠিক তখনই সেই ব্যাধের সামনে মলত্যাগ করে বসল, আর চোখের পলকে ধুলোমাখা মাটিতে ঝলমল করে উঠল খাঁটি সোনা! ব্যাধের চোখ আনন্দে নয়, বরং এক পরম বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। সে নিজের মনেই বলে উঠল, “আশ্চর্য! সেই শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের আশিটা বসন্ত পার করে দিলাম কেবল পাখি ধরে আর শিকার করে, কিন্তু কোনো পাখির বিষ্ঠা যে এমন স্বর্ণপ্রসবী হতে পারে, তা তো আমার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় কোনোদিন দেখিনি!”

সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস যেমন পুঁজি ও সম্পদের আদিম সঞ্চয়ের কথা বলেছিলেন, তেমনই সেই অপরিসীম সম্পদের লোভে ব্যাধের মনের ভেতরে জেগে উঠল চিরন্তন লোভ। সে কালবিলম্ব না করে গাছে ফাঁদ পাতল। আর সেই নির্বোধ সিন্ধুক পাখিটি? সে তার পরিচিত ও নিরাপদ অভয়ারণ্যের অহংকারে এতটাই অন্ধ ছিল যে আসন্ন বিপদের কোনও গন্ধই পেল না। নিশ্চিন্ত মনে আগের মতোই ডালে এসে বসল এবং তৎক্ষণাৎ ফাঁদে আটকা পড়ল। ব্যাধ তাকে সাবধানে খাঁচায় বন্দি করে নিজের কুটিরে নিয়ে এলো। কিন্তু এখানেই শুরু হলো গল্পটির আসল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মোড়। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের নাটকে যেমন নিয়তির অমোঘ পরিহাস দেখা যায়, তেমনই এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা আর ভয় গ্রাস করল ব্যাধকে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে এটি হল রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে স্বৈরাচারী ক্ষমতার এক চিরাচরিত মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। ব্যাধ ভাবল, “আমি সমাজের এক অতি সাধারণ, প্রান্তিক মানুষ। এমন এক রাজকীয় ও বিপজ্জনক সম্পদ নিজের পর্ণকুটিরে লুকিয়ে রাখা কি আমার পক্ষে নিরাপদ? রাজার গুপ্তচরেরা যদি কোনোক্রমে এই অলৌকিক পাখির সন্ধান পায়, তবে সম্পদ তো যাবেই, উপরন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে আমার গর্দান যাবে!” এই চরম রাজনৈতিক ভয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ব্যাধ নিজের জীবনের অমূল্য সম্পদটিকে স্বেচ্ছায় রাজদরবারে নিয়ে গিয়ে মহারাজের চরণে উপহার হিসেবে সমর্পণ করল।

আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

এমন এক অবিশ্বাস্য স্বর্ণপ্রসবী পাখি হাতে পেয়ে রাজা অরিমর্দনের মতো সেই রাজাও উল্লাসে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার বিনা পরিশ্রমে ভরে ওঠার আনন্দে তিনি তৎক্ষণাৎ রাজরক্ষীদের কড়া নির্দেশ দিলেন, “ওহে রক্ষীবৃন্দ! এই পাখিকে রাজকীয় নিরাপত্তায় সযত্নে বন্দি রাখো এবং একে যথেচ্ছ উৎকৃষ্ট আহার ও জল প্রদান করো।” কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময়েই একদল অতি-পণ্ডিত ও চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকে, যাদের তাত্ত্বিক জ্ঞান বাস্তবতাবর্জিত। ঠিক সেই মুহূর্তে রাজার এক তথাকথিত ‘বিচক্ষণ’ মন্ত্রী সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। আধুনিক সাহিত্যের ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘Bookish Intellectual’ বা পুঁথিগত বুদ্ধিজীবী—যিনি নিজের অসম্পূর্ণ ও ভাসা-ভাসা যুক্তিবোধ দিয়ে জগতকে বিচার করতে ভালোবাসেন। তিনি অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে রাজাকে বললেন, “মহারাজ! এক অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অবিশ্বাস্য ব্যাধের গাঁজাখুরি কথায় বিশ্বাস করে আপনি এই সামান্য পাখিকে সোনার খাঁচায় পুষছেন? বিজ্ঞানের কার্যকারণ তত্ত্ব আর যুক্তির আলোয় বিচার করে দেখুন—কখনো কি কোনো পাখির বিষ্ঠা সোনা হতে পারে? এটি প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে, সম্পূর্ণ অসম্ভব ও হাস্যকর! অবিলম্বে এই পাখিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিন, নতুবা সমাজে আপনার মেধা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে!”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার তাঁর ‘ক্যান্ডিড’ (Candide) উপন্যাসে যেমন অতি-যৌক্তিক কিন্তু বাস্তববর্জিত দার্শনিকদের তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন, এই মন্ত্রীও ছিলেন ঠিক তেমনই এক অন্ধ যুক্তিবাদী। দুর্ভাগ্যবশত, নিজের চোখে সত্য যাচাই না করেই রাজা সেই মন্ত্রীর আপাত-পণ্ডিতি কথায় প্রভাবিত হলেন এবং নিজের হাতে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো সেই অমূল্য সম্পদকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিলেন। খাঁচার দরজা খুলতেই সেই সিন্ধুক পাখি ডানা মেলে সোজা উড়ে গিয়ে বসল রাজপ্রাসাদের মূল তোরণের সবচেয়ে উঁচু চূড়ায়। মুক্ত আকাশের নিচে বসে রাজসভার সমস্ত পণ্ডিত ও মহারাজের চোখের সামনে সে ত্যাগ করল তার বিষ্ঠা, আর ঝনঝন করে রাজপ্রাসাদের পাথুরে মেঝেতে ঝরে পড়ল খাঁটি সোনার পিণ্ড! রাজার অহংকার আর মন্ত্রীর ভুয়া পাণ্ডিত্যের গালে যেন এক প্রচণ্ড চড় এসে পড়ল। উড়ে যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সেই পাখিটি সমগ্র রাজসভাকে শ্লেষে বিদ্ধ করে পাঠ করল তার সেই অমর শ্লোক:
পূর্বং তাবদহং মূর্খো দ্বিতীযঃ পাশবন্ধকঃ।
ততো রাজা চ মন্ত্রী চ সর্বং বৈ মূর্খমণ্ডলম্
॥ ২১২ ॥

অর্থাৎ, সমাজ ও রাষ্ট্রের এই ভ্রান্তির শৃঙ্খলে আমরা সকলেই এক একজন মূর্খ! প্রথম মূর্খ হলাম স্বয়ং আমি, যে নিজের অন্ধ আত্মবিশ্বাসে বিপদের সম্ভাবনা না বুঝে ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। দ্বিতীয় মূর্খ হল ওই ব্যাধ, যে এক অমূল্য সম্পদ হাতে পেয়েও রাষ্ট্রের ভয়ে ও নিজের মেরুদণ্ডহীনতায় তা হাতছাড়া করল। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও চূড়ান্ত মূর্খ হল এই রাজা এবং তাঁর মন্ত্রী—যারা অন্ধ অহংকার ও পুঁথিগত অসম্পূর্ণ যুক্তির ফাঁদে পড়ে চোখের সামনের বাস্তব সত্যকে চিনতে পারল না, হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলে দিল! এককথায়, এই গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আজ এক মহামূর্খদের স্বর্গরাজ্য বা ‘মূর্খমণ্ডল’!

গল্পটি শেষ করে রক্তাক্ষ এক জ্বলন্ত ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাজা অরিমর্দন এবং তাঁর চাটুকার মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে রাজন! ইতিহাসের এই নির্মম সত্যটি কি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না? আজ আমরাও ঠিক সেই ‘মূর্খমণ্ডল’-এ পরিণত হয়েছি! প্রথম মূর্খ আমি নিজে, যে আপনাদের মতো নির্বোধদের রাজসভায় মন্ত্রী হয়ে পড়ে আছি এবং প্রতিদিন অরণ্যে রোদন করছি। আর দ্বিতীয় এবং বৃহত্তম মূর্খ হলেন আপনারা—কারণ হাতের মুঠোয় পরম শত্রু স্থিরজীবীকে পেয়েও তাকে রাজনীতি ও দূরদর্শিতার আলোয় বিচার না করে, কেবল চাটুকারিতায় ভুলে দুর্গের প্রবেশদ্বারে পুষে রাখছেন! মনে রাখবেন মহারাজ, যেদিন আপনাদের এই মোহের ঘোর কাটবে, সেদিন ওই সিন্ধুক পাখির মতোই শত্রুপক্ষ আমাদের সমূলে বিনাশ করে বিজয়োল্লাসে উড়ে যাবে, আর আমরা এই রাজসভায় বসে কেবল নিজেদের ধ্বংসস্তূপের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকব!”—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content