
বাচ্চাদের নিয়ে মা নেংটি ইঁদুর। সংগৃহীত।
ছোটবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা ‘মজার দেশ’ ছড়া সবাই পড়েছি। ছড়াটির শেষ অনুচ্ছেদ নিশ্চয়ই সবার মনে আছে।
“সেই দেশেতে বেড়াল পালায়,
নেংটি ইঁদুর দেখে;
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর অয়েল
রসগোল্লা রেখে!”
নেংটি ইঁদুর দেখে;
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর অয়েল
রসগোল্লা রেখে!”
রাষ্ট্রনীতির নির্মম দাবার বোর্ডে মন্ত্রীর আসল পরিচয় তাঁর পদে নয়, তাঁর প্রদত্ত মন্ত্রণায়। বৃদ্ধ গুপ্তচর স্থিরজীবী মনে মনে জানতেন—যে মন্ত্রী রাজাকে অপ্রিয় কিন্তু হিতকর সত্য না বলে, কেবল চাটুকারিতায় অন্ধ করে অনুচিত পরামর্শ দেয়, সে আসলে মন্ত্রী নয়; সে হল রাজার ছদ্মবেশী আততায়ী!
পুরো উলূক-সাম্রাজ্যে এই চরম সত্যটি বোঝার মতোপ্রজ্ঞা কেবল একজনেরই ছিল—তিনি প্রধান অমাত্য রক্তাক্ষ। স্থিরজীবীর প্রতিটি পদক্ষেপকে তিনি শুরু থেকেই সন্দেহ করে এসেছেন। কিন্তু চাটুকারদের স্তুতিতে মত্তউলূকরাজঅরিমর্দন এবং তাঁর মূর্খ সভাসদেরারক্তাক্ষের সেই রক্তজল করা সতর্কবাণী কানেই তুলল না। চরম অবজ্ঞায় ও হতাশায় যখন সেই দূরদর্শীরক্তাক্ষ নিজের পরিবার নিয়ে চিরকালের মতো দুর্ভেদ্য পাহাড়ি দুর্গ ত্যাগ করে চলে গেলেন, তখন দুর্গের প্রবেশদ্বারে বসে স্থিরজীবী এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, প্রাণঘাতী হাসি। কারণ তিনি বুঝে গেলেন, পেঁচাদের অন্ধ রাজাকে সুপরামর্শ দেওয়ার শেষ প্রদীপটিও আজ নিভে গিয়েছে। দুর্গ এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত; এবার চরম আঘাত হানার সময় আসন্ন!
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূল বুঝে স্থিরজীবী এবার তাঁর অন্তিম ও ভয়ঙ্কর চালটি চাললেন। গ্রিক পুরাণে ট্রয় নগরী ধ্বংসের জন্য যেমন কাঠের ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে ছিল মৃত্যু, স্থিরজীবীও ঠিক তেমনই এক মারণ-ফাঁদ তৈরি করতে শুরু করলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধ কাক কেবল নিজের বসবাসের জন্য একটি নিরীহ বাসা তৈরি করছে। কিন্তু আসলে তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে বনের শুকনো ডালপালা, খড়কুটো আর অত্যন্ত দাহ্য তৃণ এনে জড়ো করতে লাগলেন পেঁচাদের সেই পাহাড়ি গুহার ঠিক মুখে!
পুরো উলূক-সাম্রাজ্যে এই চরম সত্যটি বোঝার মতোপ্রজ্ঞা কেবল একজনেরই ছিল—তিনি প্রধান অমাত্য রক্তাক্ষ। স্থিরজীবীর প্রতিটি পদক্ষেপকে তিনি শুরু থেকেই সন্দেহ করে এসেছেন। কিন্তু চাটুকারদের স্তুতিতে মত্তউলূকরাজঅরিমর্দন এবং তাঁর মূর্খ সভাসদেরারক্তাক্ষের সেই রক্তজল করা সতর্কবাণী কানেই তুলল না। চরম অবজ্ঞায় ও হতাশায় যখন সেই দূরদর্শীরক্তাক্ষ নিজের পরিবার নিয়ে চিরকালের মতো দুর্ভেদ্য পাহাড়ি দুর্গ ত্যাগ করে চলে গেলেন, তখন দুর্গের প্রবেশদ্বারে বসে স্থিরজীবী এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, প্রাণঘাতী হাসি। কারণ তিনি বুঝে গেলেন, পেঁচাদের অন্ধ রাজাকে সুপরামর্শ দেওয়ার শেষ প্রদীপটিও আজ নিভে গিয়েছে। দুর্গ এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত; এবার চরম আঘাত হানার সময় আসন্ন!
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূল বুঝে স্থিরজীবী এবার তাঁর অন্তিম ও ভয়ঙ্কর চালটি চাললেন। গ্রিক পুরাণে ট্রয় নগরী ধ্বংসের জন্য যেমন কাঠের ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে ছিল মৃত্যু, স্থিরজীবীও ঠিক তেমনই এক মারণ-ফাঁদ তৈরি করতে শুরু করলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধ কাক কেবল নিজের বসবাসের জন্য একটি নিরীহ বাসা তৈরি করছে। কিন্তু আসলে তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে বনের শুকনো ডালপালা, খড়কুটো আর অত্যন্ত দাহ্য তৃণ এনে জড়ো করতে লাগলেন পেঁচাদের সেই পাহাড়ি গুহার ঠিক মুখে!
ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড়ট্র্যাজেডি হল—পতনের আগে ক্ষমতাদর্পীরা অন্ধ হয়েযায়। মূর্খ পেঁচাদের দল ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারল না যে, এই বৃদ্ধ কাক তার বাসা তৈরির ছলে আসলে তাদেরই চিতাকাঠ সাজাচ্ছে! সংস্কৃত নীতিশাস্ত্রে একটি কথা আছে—“বিনাশকালেবিপরীতবুদ্ধিঃ”অর্থাৎ, ভাগ্য যখন চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন দুর্ভাগা মানুষ তার চরম শত্রুকে পরম মিত্র বলে বুকে টেনে নেয়, আর প্রকৃত মিত্রকে শত্রু ভেবে তাড়িয়ে দেয়। সেই দুর্ভাগা তখন পুণ্যকর্মকে পাপ, আর অমঙ্গলকে শুভ বলে ভুল করে। নিয়তির এই নিষ্ঠুর পরিহাসে উলূক-সাম্রাজ্য তখন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন।
এইভাবে গুহার দ্বারে বারুদস্তূপেরমতো শুকনো কাঠ আর ঘাস পর্যাপ্ত পরিমাণে জমা করার পর একদিন ভোর হল। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো ফুটে উঠতেই প্রকৃতির নিয়ম মেনে পেঁচাদের দল তাদের চোখের দৃষ্টি হারাল। গুহার অন্ধকারে তারা তখন সম্পূর্ণ অসহায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থিরজীবী তাঁর ডানা মেলে তীরের বেগে উড়ে গেলেন বায়সরাজমেঘবর্ণের গোপন আস্তানায়।
সেখানে পৌঁছে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “হে স্বামী! আমাদের প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। শত্রুদের সেই গুহা এখন আমি সম্পূর্ণভাবে জ্বালাবার উপযোগী করে তুলেছি। আর এক মুহূর্তও দেরি নয়! আপনি এখনই আপনার সমগ্র বাহিনীকে নির্দেশ দিন—সবাই যেন ঠোঁটে করে এক-একটি জ্বলন্ত কাঠের টুকরো নিয়ে আমার তৈরি করা সেই শুকনো বাসায়ছুড়ে ফেলে। মুহূর্তে সেই দাবানল গুহার ভেতরে ছড়িয়েপড়বে। কুম্ভীপাকনরকের সেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে আপনার সমস্ত শত্রু আজই যন্ত্রণায়ছটফট করতে করতেচিরতরে ভস্মীভূত হবে!”
এইভাবে গুহার দ্বারে বারুদস্তূপেরমতো শুকনো কাঠ আর ঘাস পর্যাপ্ত পরিমাণে জমা করার পর একদিন ভোর হল। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো ফুটে উঠতেই প্রকৃতির নিয়ম মেনে পেঁচাদের দল তাদের চোখের দৃষ্টি হারাল। গুহার অন্ধকারে তারা তখন সম্পূর্ণ অসহায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থিরজীবী তাঁর ডানা মেলে তীরের বেগে উড়ে গেলেন বায়সরাজমেঘবর্ণের গোপন আস্তানায়।
সেখানে পৌঁছে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “হে স্বামী! আমাদের প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। শত্রুদের সেই গুহা এখন আমি সম্পূর্ণভাবে জ্বালাবার উপযোগী করে তুলেছি। আর এক মুহূর্তও দেরি নয়! আপনি এখনই আপনার সমগ্র বাহিনীকে নির্দেশ দিন—সবাই যেন ঠোঁটে করে এক-একটি জ্বলন্ত কাঠের টুকরো নিয়ে আমার তৈরি করা সেই শুকনো বাসায়ছুড়ে ফেলে। মুহূর্তে সেই দাবানল গুহার ভেতরে ছড়িয়েপড়বে। কুম্ভীপাকনরকের সেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে আপনার সমস্ত শত্রু আজই যন্ত্রণায়ছটফট করতে করতেচিরতরে ভস্মীভূত হবে!”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৭: চাটুকারদের স্তুতিবাক্যই রাজ্যের পতন ডেকে আনে! পেঁচাদের ট্র্যাজেডি আর ‘কথা বলা গুহার’ এক কালজয়ী রাজনৈতিক পাঠ

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
দীর্ঘদিনের নির্বাসন আর অপমানের পর স্থিরজীবীকে ফিরে পেয়ে রাজা মেঘবর্ণ আনন্দে ও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “তাত! অনেক দিন পর আজ আপনার দেখা পেলাম—’চিরাৎ অদ্য দৃষ্টোঽসি’। আগে আপনার কুশল সমাচার তো বলুন, আপনার আত্মবৃত্তান্ত শোনান!”
কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে আবেগের কোনো স্থান নেই! এক নিপুণ সেনাপতির মতোস্থিরজীবী রাজাকে মাঝপথেইথামিয়েদিয়ে চরম সতর্কতায় বলে উঠলেন, “বৎস! এটা কুশল বিনিময় বা আবেগ প্রদর্শনের সময় নয়! শত্রুপক্ষের কোনও গুপ্তচর যদি আমার এখানে আসার খবরটি জেনে গিয়েউলূকরাজঅরিমর্দনকেজানিয়ে দেয়, তবে সেই অন্ধের দল তখনই অন্য কোনো গুপ্তপথে দুর্গ ছেড়ে পালাবে। আমাদের হাতের মুঠোয় আসা এই সুবর্ণ সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যাবে।”
সামরিক কূটনীতিতে ‘সময়’ বা ‘কাল’-এর যে কী এক নির্মম ও অমোঘ ভূমিকা রয়েছে, তা বোঝাতে স্থিরজীবী এবার আবেগপ্রবণ রাজা মেঘবর্ণের সামনে এক অসামান্য রাষ্ট্রনৈতিক ও দার্শনিক পাঠ তুলে ধরলেন। যুদ্ধের ময়দানে যখন মোক্ষম সুযোগ এসে যায়, তখন এক মুহূর্তের দ্বিধা বা বিলম্বও যে কীভাবে নিশ্চিত জয়কে পরাজয়ে বদলে দিতে পারে, সেই চরম সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্থিরজীবী বললেন,
“মহারাজ! পণ্ডিতরা বলেন—
শীঘ্রকৃত্যেকার্যেষুবিলম্বয়তি যো নরঃ।
তৎকৃত্যংদেবতাস্তস্যকোপাদ্বিঘ্নন্ত্যসংশয়ম্।। (কাকোলূকীয়ম্ ২১৯)
অর্থাৎ, যে কাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করা প্রয়োজন, সেখানে যে ব্যক্তি অযথা কালক্ষেপণ বা আলস্য করে, তার সেই বিলম্ব দেখে স্বয়ং দেবতারাও রুষ্ট হন এবং তার সেই কাজে নিশ্চিত কোনো না কোনও বিঘ্ন ঘটিয়ে দেন। সুযোগ একবারই দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে অপেক্ষায় রাখতে নেই।”
স্থিরজীবী আরও বললেন,
যস্য যস্য হি কার্যস্যফলিতস্যবিশেষতঃ।
ক্ষিপ্রমক্রিয়মাণত্বংকালঃপিবতিতৎফলম্।। (ঐ, ২২০)
মহারাজ, ভালো করে বুঝুন! যে কাজের ফললাভের সময় একেবারে সামনে এসে পেকে উঠেছে, সেই মুহূর্তে যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তা গ্রহণ না করা হয়, তবেমহাকাল নিজেই সেই কাজের সমস্ত নির্যাস ও রস পান করে তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে দেয়! গাছে পাকা ফল দেখলে তখনই তা পেড়ে নিতে হয়, নাহলে কালরূপী সময় নিজেই সেই ফলের রস শুষে নিয়ে তাকে মাটিতে ঝরিয়ে দেয়। আজ আমাদের সামনে সেই পাকা ফলের মতোই সুযোগ এসেছে। এই মুহূর্তে আঘাত না হানলে, সময়ের ফেরে শত্রুরা হ্য়তো সতর্ক হয়ে যাবে, আর মহাকাল আমাদের এই জয়ের সুযোগ চিরতরেকেড়ে নেবে!
কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে আবেগের কোনো স্থান নেই! এক নিপুণ সেনাপতির মতোস্থিরজীবী রাজাকে মাঝপথেইথামিয়েদিয়ে চরম সতর্কতায় বলে উঠলেন, “বৎস! এটা কুশল বিনিময় বা আবেগ প্রদর্শনের সময় নয়! শত্রুপক্ষের কোনও গুপ্তচর যদি আমার এখানে আসার খবরটি জেনে গিয়েউলূকরাজঅরিমর্দনকেজানিয়ে দেয়, তবে সেই অন্ধের দল তখনই অন্য কোনো গুপ্তপথে দুর্গ ছেড়ে পালাবে। আমাদের হাতের মুঠোয় আসা এই সুবর্ণ সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যাবে।”
সামরিক কূটনীতিতে ‘সময়’ বা ‘কাল’-এর যে কী এক নির্মম ও অমোঘ ভূমিকা রয়েছে, তা বোঝাতে স্থিরজীবী এবার আবেগপ্রবণ রাজা মেঘবর্ণের সামনে এক অসামান্য রাষ্ট্রনৈতিক ও দার্শনিক পাঠ তুলে ধরলেন। যুদ্ধের ময়দানে যখন মোক্ষম সুযোগ এসে যায়, তখন এক মুহূর্তের দ্বিধা বা বিলম্বও যে কীভাবে নিশ্চিত জয়কে পরাজয়ে বদলে দিতে পারে, সেই চরম সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্থিরজীবী বললেন,
“মহারাজ! পণ্ডিতরা বলেন—
তৎকৃত্যংদেবতাস্তস্যকোপাদ্বিঘ্নন্ত্যসংশয়ম্।। (কাকোলূকীয়ম্ ২১৯)
অর্থাৎ, যে কাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করা প্রয়োজন, সেখানে যে ব্যক্তি অযথা কালক্ষেপণ বা আলস্য করে, তার সেই বিলম্ব দেখে স্বয়ং দেবতারাও রুষ্ট হন এবং তার সেই কাজে নিশ্চিত কোনো না কোনও বিঘ্ন ঘটিয়ে দেন। সুযোগ একবারই দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে অপেক্ষায় রাখতে নেই।”
স্থিরজীবী আরও বললেন,
ক্ষিপ্রমক্রিয়মাণত্বংকালঃপিবতিতৎফলম্।। (ঐ, ২২০)
মহারাজ, ভালো করে বুঝুন! যে কাজের ফললাভের সময় একেবারে সামনে এসে পেকে উঠেছে, সেই মুহূর্তে যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তা গ্রহণ না করা হয়, তবেমহাকাল নিজেই সেই কাজের সমস্ত নির্যাস ও রস পান করে তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে দেয়! গাছে পাকা ফল দেখলে তখনই তা পেড়ে নিতে হয়, নাহলে কালরূপী সময় নিজেই সেই ফলের রস শুষে নিয়ে তাকে মাটিতে ঝরিয়ে দেয়। আজ আমাদের সামনে সেই পাকা ফলের মতোই সুযোগ এসেছে। এই মুহূর্তে আঘাত না হানলে, সময়ের ফেরে শত্রুরা হ্য়তো সতর্ক হয়ে যাবে, আর মহাকাল আমাদের এই জয়ের সুযোগ চিরতরেকেড়ে নেবে!
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৭০: রাবণ কে? রামায়ণের রাবণ কী আজও নেই?
বৃদ্ধ গুপ্তচর স্থিরজীবীর চোখ দুটো এবার প্রখর হয়ে উঠল। তিনি রাজার চোখে চোখ রেখে এক বজ্রকঠিন সেনাপতির মতোদৃঢ়স্বরে বললেন,“তাই বলছি মহারাজ! আবেগের সময় এটা নয়। আগে শত্রুর গুহা জ্বালিয়ে তাদের সমূলে বিনাশ করুন। তারপর নিষ্কণ্টক ও নিশ্চিন্ত হয়ে যখন সিংহাসনে বসবেন, তখন স্থির হয়ে বসে আপনাকে সব কথা সবিস্তারে শোনাব—‘নির্ব্যাকুলতযাকথযিষ্যামি’। এখন শুধু আক্রমণ!”
স্থিরজীবীর এই বজ্রকঠিন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাক্যে রাজা মেঘবর্ণের ঘোর কাটল। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর সমগ্র কাক-বাহিনীকে যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন। পরের দৃশ্যটি যেন কোনও মহাকাব্যের ধ্বংসলীলারমতো! ভোরের আকাশে হঠাৎ যেন গ্রহণ লাগল। হাজার হাজার কাকের কালো ডানায়ঢেকে গেল আকাশ। তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে ধরা এক-একটি জ্বলন্ত উল্কা—দগদগে আগুনের টুকরো! তারা তীরের মতো নেমে এসে উলূকদের গুহার মুখে স্থিরজীবীরসাজিয়ে রাখা সেই শুকনো কাঠের স্তূপে ছুঁড়ে দিতে লাগল সেই আগুন।
স্থিরজীবীর এই বজ্রকঠিন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাক্যে রাজা মেঘবর্ণের ঘোর কাটল। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর সমগ্র কাক-বাহিনীকে যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন। পরের দৃশ্যটি যেন কোনও মহাকাব্যের ধ্বংসলীলারমতো! ভোরের আকাশে হঠাৎ যেন গ্রহণ লাগল। হাজার হাজার কাকের কালো ডানায়ঢেকে গেল আকাশ। তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে ধরা এক-একটি জ্বলন্ত উল্কা—দগদগে আগুনের টুকরো! তারা তীরের মতো নেমে এসে উলূকদের গুহার মুখে স্থিরজীবীরসাজিয়ে রাখা সেই শুকনো কাঠের স্তূপে ছুঁড়ে দিতে লাগল সেই আগুন।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮১ : আকাশ এখনও মেঘলা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
মুহূর্তের মধ্যে এক ভয়াল গর্জনে ফুঁসে উঠল লেলিহান শিখা! স্থিরজীবীর সযত্নে জমানো শুষ্ক কাঠ আর ভোরের উন্মত্ত বাতাসের যুগলবন্দিতে সেই আগুন যেন এক হিংস্র দাবানলের রূপ নিয়ে সোজা ধেয়ে গেল গুহার অন্ধকার গহ্বরে। এমনিতেই সূর্যের আলোয় পেঁচাদের দৃষ্টিশক্তি বিলুপ্ত, তার ওপর গুহামুখের সেই দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা তাদের সম্পূর্ণ অন্ধ ও দিশেহারা করে তুলল। পালানোর সমস্ত পথ আজ চিরতরে রুদ্ধ! শুরু হলো এক চরম প্রতিশোধ ও ঐতিহাসিক পতনের চূড়ান্ত অধ্যায়।
মৃত্যুর সেই ভয়াল আস্ফালনের সামনে দাঁড়িয়ে, আগুনের আঁচে ঝলসে যেতে যেতে আজ সেই দিবা-অন্ধ পেঁচাদের দলের বারবার মনে পড়তে লাগল বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের সেই রক্তজল করা সতর্কবাণী! সেদিন চাটুকারিতার মোহে তারা যে সত্যকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সেই সত্যই আগুনের রূপ ধরে তাদের গ্রাস করতে এসেছে। কিন্তু অনুশোচনার সময় তখন বড্ড পেরিয়ে গিয়েছে।
মৃত্যুর সেই ভয়াল আস্ফালনের সামনে দাঁড়িয়ে, আগুনের আঁচে ঝলসে যেতে যেতে আজ সেই দিবা-অন্ধ পেঁচাদের দলের বারবার মনে পড়তে লাগল বিচক্ষণ মন্ত্রী রক্তাক্ষের সেই রক্তজল করা সতর্কবাণী! সেদিন চাটুকারিতার মোহে তারা যে সত্যকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সেই সত্যই আগুনের রূপ ধরে তাদের গ্রাস করতে এসেছে। কিন্তু অনুশোচনার সময় তখন বড্ড পেরিয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৮ : পথে এবার নাম সাথী
পুরাণে বর্ণিত ‘কুম্ভীপাক’নরকে বিশাল ফুটন্ত হাঁড়ির (কুম্ভ) মধ্যে পাপীদের যেমন ফুটন্ত তেলে বা জলে সেদ্ধ করে যন্ত্রণা দেওয়া হয়, ঠিক তেমনই নিজেদের দুর্ভেদ্য সাধের দুর্গের ভেতর আজ জ্যান্ত সেদ্ধ হতে লাগল রাজা অরিমর্দন ও তাঁর মূর্খমণ্ডলী। চাটুকারিতার আগুনে যে রাষ্ট্রযন্ত্র ভিতর থেকে আগেই পুড়ে ছাই হয়েছিল, আজ তা বাস্তবের আগুনে ভস্মীভূত হয়ে চিরকালের মতো মুছে গেল পৃথিবীর বুক থেকে! গুহার একমাত্র প্রবেশদ্বার তখন লেলিহান অগ্নিশিখায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ—যেন সাক্ষাৎ মহাকাল সেখানে মৃত্যুদূত হয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে! আলো আর ধোঁয়ায় অন্ধ, দিশেহারা পেঁচাদের দলের আর কেউই সেই জ্বলন্ত মারণ-ফাঁদ থেকে এক পা-ও বাইরে ফেলতে পারল না। রাজা অরিমর্দন থেকে শুরু করে চাটুকার মন্ত্রী আর সাধারণ সেবক—সকলকেই সপরিবারে সেই গুহার ভেতরেই মর্মান্তিকমৃত্যুবরণ করতে হলো। আগুনের ভয়াল গর্জনের নিচে চিরতরে ভস্মীভূত হয়ে গেল একটি গোটা সাম্রাজ্যের অন্ধ অহংকার!—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















