কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাক্ষসী শূর্পনখা, রাক্ষসরাজ রাবণের কাছে রামের শৌর্য এবং রামের সুন্দরী স্ত্রী সীতার দৈহিক সৌন্দর্য বর্ণনা করল। রাক্ষসী, রাবণকে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায় প্ররোচিত করল। শূর্পনখার মতে, রামের বিরুদ্ধে রাবণের যুদ্ধযাত্রার দুটি উদ্দেশ্য —রামলক্ষ্মণের সম্মিলিত শক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং নিজের শক্তিতে আস্থা রেখে অনবদ্য দৈহিকসৌন্দর্যের অধিকারিণী সীতাকে ভার্যারূপে গ্রহণ। বিজ্ঞায়ৈষামশক্তিঞ্চ ক্রিয়তাঞ্চ মহাবল। সীতা তবানবদ্যাঙ্গী ভার্য্যাত্বে রাক্ষসেশ্বর।।

রাবণ শূর্পনখার এই রোমাঞ্চকর প্রস্তাব শুনে, মন্ত্রীদের সম্মতি নিয়ে, নিজের বুদ্ধিবলে, কর্তব্য স্থির করে, প্রস্থান করল। রাবণ কাজের গভীরতা চিন্তা করে যাথার্থ্য উপলব্ধি করল। সে সেই সঙ্গে দোষ ও গুণের বলাবলও নির্দ্ধারণ করল। নিজের আসন্ন কর্তব্যবিষয়ে স্থিরনিশ্চিত হয়ে, স্থিরবুদ্ধি রাবণ, সুরম্য যানশালায় গমন করল। যানশালায় উপস্থিত হয়ে রাবণ সংগোপনে সারথিকে আদেশ করল, রথঃ সংযুজ্যতাম্। রথ সংযোজিত কর। রাবণের আদেশমাত্র সারথি দ্রুততার সঙ্গে রাবণের পছন্দ-অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ রথ প্রস্তুত করল।
ইচ্ছেমতো বিচরণ করে এমন, স্বর্ণময় ও রত্নালঙ্কৃত ও পিশাচের মতো মুখবিশিষ্ট স্বর্ণবিভূষিত গর্দভসংযুক্ত যে রথ, তাতে আরোহণ করে, কুবেরের অনুজ রাবণ, মেঘমন্দ্রিত শব্দে, নদনদীপতি সাগরের দিকে যাত্রা করল। রথারূঢ় রাবণের মাথায় শ্বেতচ্ছত্র, শ্বেত চামর, স্নিগ্ধবৈদূর্যমণির মতো তার তপ্তকাঞ্চনের ভূষণ। দশানন রাবণের বিশ বাহু, দর্শনীয় তার পরিচ্ছদ। দেবতাদের শত্রু, মুনিশ্রেষ্ঠদের ঘাতক, রাবণ, দশটি শিখরধারী পর্বতাধিপতির মতো দৃশ্যমান হলেন। ইচ্ছানুসারে গমনশীল রথে সমাসীন রাবণকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। আকাশে তখন মণ্ডলাকৃতি বিদ্যুত, বলাকাসমন্বিত মেঘ। ইচ্ছানুসারে গমনশীল রথে সমাসীন রাবণ তার শোভা হলেন। শৌর্যবান রাবণ দেখল, হাজার হাজার ফুলফলতরুরাজি সমাকীর্ণ পর্বতসমন্বিত সমুদ্রোপকূল,চতুর্দিকে পবিত্র জলপূর্ণ পদ্মসরোবর, বেদিযুক্ত অলঙ্কৃত বিশাল আশ্রমপরিসর। সেখানে রয়েছে কলাবন। কোথাও নারকেলগাছ হয়েছে তার শোভা। আছে কুসুমিত শাল, তাল, তমালের বিস্তার। সেখানে বিরাজ করছেন মহর্ষিরা, তাঁদের আহার অত্যন্ত পরিমিত। হাজার হাজার নাগ, সুপর্ণ, গন্ধর্ব, কিন্নর,সংযতেন্দ্রিয় সিদ্ধ এবং চারণরা সেখানে শোভা বিস্তার করেছেন। বৈখানস, বালখিল্য, মরীচিপ প্রভৃতি ব্রহ্মার পুত্ররাও আছেন। এ ছাড়াও স্বর্গীয় অলঙ্কার ও মালায় সজ্জিত, দিব্যরূপধারিণী, রতিক্রীড়ায় অভিজ্ঞা অপ্সরারাও উপস্থিত আছেন। শ্রীময়ী দেবপত্নীরা সেখানে উপাসনারতা, অমৃতপানকারী দেব,দানব ও গন্ধর্বরা দলবদ্ধ হয়ে বিচরণ করছেন। হাঁস, ক্রৌঞ্চ ও সারসরা ঢেউ তুলে সাঁতার কাটছে,বৈদূর্যমণির সংস্পর্শে স্নিগ্ধ এবং সাগরের সান্নিধ্যে চমকপ্রদ স্থানটি। চারিদিকে রয়েছে পাণ্ডুরশুভ্রবর্ণের, দিব্যমালায় অলঙ্কৃত, তূর্য ও সঙ্গীতের মিশ্রধ্বনির শব্দমুখর বিমানগুলি (সাততলা বাড়ি)। কুবেরের অনুজ ভাই রাবণ, তপস্যা করে যাঁরা বিভিন্ন লোক জয় করেছেন, তাঁদের স্বেচ্ছানুসারে চলমান বিমানগুলি এবং গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের দেখল। সে দেখল, হাজার হাজার চন্দনগাছের স্নিগ্ধ বন, যাদের নির্যাসরস হল প্রধান এবং আঘ্রাণ সুখকর। কোথাও উত্তম অগরুর,কোথাও বা বিশেষপ্রজাতির ফলবন্ত সুগন্ধী তক্কোলফলের বন ও উপবন, তমালের ফুল, মরীচের গুল্ম, এবং সমুদ্রতীরে শুকনো মুক্ত, পর্বতগুলি, উৎকৃষ্ট প্রবালরাজি,সোনা ও রূপার শিখরগুলি প্রভৃতি। সেখানের ঝর্ণাগুলি আকর্ষণীয় মনোহর ও অদ্ভুত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

সংস্কৃত দিবস

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৮ : দেয়া নেয়া

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রাক্ষসরাজ রাবণ ধনধান্যে পরিপূর্ণ, স্ত্রীরত্ন-পরিবৃত, হাতি-ঘোড়া-রথ-সমাকীর্ণ নগরী দেখতে দেখতে, সমুদ্রসৈকতে স্নিগ্ধ মৃদু সুখস্পর্শ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে এমন একটি স্বর্গতুল্য সর্বত্র সমতল স্থান দেখতে পেল। সেখানে ছিল মুনিগণ পরিবৃত একটি মেঘবরণ বটগাছ। গাছটির শাখা শতযোজন পর্যন্ত বিস্তৃত। মহাবলশালী গরুড়, হাতি ও বিশালাকার কচ্ছপকে খাদ্যরূপে নিয়ে এসে ওই শাখায় আশ্রয় নিয়েছিল। শ্রেষ্ঠ পাখি মহাবল সুপর্ণ গরুড়ের দেহভারে সেই পাতাভরা শাখাটি হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ল। সেখানে বৈখানস, মাষ, বালখিল্য, মরীচিপ, ধূম্র প্রভৃতি ব্রহ্মনন্দন মহর্ষিরা সমাগত ছিলেন। গরুড় তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে,এক পায়ে সেই শতযোজনব্যাপী ভাঙ্গা শাখাটি এবং অন্য পায়ে হাতি ও কচ্ছপটি নিয়ে বেগে চললেন। ধর্মাত্মা গরুড়, একপায়ের গজকচ্ছপের মাংস খেয়ে ফেললেন। পাখিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গরুড়, অন্যপায়ের শাখা দিয়ে নিষাদদেশ ধ্বংস করে মহর্ষিদের মুক্ত করলেন। এই কাজটি করে তিনি পরমানন্দ লাভ করলেন। সেই অপরিসীম আনন্দের ফলে তাঁর বিক্রম হল দ্বিগুণ। যার ফলে বুদ্ধিমান গরুড়, অমৃত উদ্ধারের জন্য মতিস্থির করলেন। এর পরে তিনি, লোহার জাল ছিঁড়ে ফেলে, উত্তম রত্ননির্মিত ঘরটি ভেদ করে, ইন্দ্রের ভবন থেকে সঙ্গোপনে রাখা অমৃত হরণ করেছিলেন। কুবেরের কনিষ্ঠ ভাই রাবণ, মহর্ষিদের সেবিত, সুপর্ণ গরুড়চিহ্নিত (ভাঙ্গাশাখার চিহ্নযুক্ত), সুভদ্র নামের বটগাছটি দেখল। নদীপতি সমুদ্রের অন্য পারে উপস্থিত হয়ে, রাবণ দেখল, পবিত্র রমণীয় বনান্তরে একান্ত নিরিবিলি একটি আশ্রম আছে। সেখানে সে দেখল, আহারে সংযমী রাক্ষস মারীচকে। মারীচের পরনে কৃষ্ণাজিন। সে মণ্ডলাকারে জটাজুট ধারণ করে আছে। সেই রাক্ষস মারীচের সঙ্গে রাক্ষসরাজ রাবণ, যথানিয়মে মিলিত হল। মারীচ মানুষের কাম্য নয় এমন সব বস্তু দিয়ে তাকে সম্মানিত করল। মারীচ, ভোজ্য ও পানীয় জল প্রদান করে রাবণকে আপ্যায়িত করল। অর্থপূর্ণ ভাষায় প্রথমে রাবণের ও লঙ্কার কুশলসংবাদ জানতে চাইলেন। তার পরবর্তী প্রশ্ন ছিল, কচ্চিৎ তে কুশলং রাজন্ লঙ্কায়াং রাক্ষসেশ্বর। কেনার্থেন পুনস্ত্বং বৈ তূর্ণমেবামিহাগতঃ।। কি কারণে আপনার এত সত্বর পুনরায় আগমন? বাক্যবিশারদ মহাতেজস্বী রাবণ, মারীচের প্রশ্নের উত্তরে বলল, আমি বলছি, তবে শোন, মারীচ। আমি আর্ত। আমার মতো আর্তের পরম আশ্রয় তুমি। মারীচ শ্রূয়তাং তাত বচনং মম ভাষতঃ। আর্ত্তোঽস্মি মম চার্ত্তস্য ভবান্ হি পরমা গতিঃ।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস, আকাশ এখনও মেঘলা/৮৫

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

রাবণ বলে চললেন, মারীচ জনস্থানবিষয়ে বোধ হয় অবগত আছে, যেখানে রাবণের ভাই খর ও মহাবাহু দূষণ, ভগিনী শূর্পনখা, মহাবলশালী ত্রিশিরা এবং আরও অনেক মাংসাশী অব্যর্থলক্ষ্য বীর নিশাচর রাক্ষসরা, মহারণ্যে ধর্মচারী মুনিদের উৎপীড়ন করে বসবাস করত। রাবণ জানাল, তাদের সে নিজে নিযুক্ত করেছিল। ভয়ঙ্করকাজে অভ্যস্ত,লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয় না, এমন চোদ্দো হাজার বীর রাক্ষস ছিল একান্তই খরের মতানুসারী। সম্প্রতি জনস্থাননিবাসী মহাবলশালী নানা অস্ত্রধারী খরপ্রমুখ রাক্ষসরা চরম প্রস্তুতি নিয়ে যুদ্ধে রামের সম্মুখীন হয়েছিল। ক্রুদ্ধ রাম যুদ্ধক্ষেত্রে কোন কঠোর কথা না বলে,ধনুকে শরযোজনা করল। পদচারী, মানুষ, রাম, দীপ্তবাণ নিক্ষেপ করে চোদ্দো হাজার উগ্র তেজস্বী রাক্ষসদের হত্যা করল। যুদ্ধে খর নিহত হল, দূষণের পতন হল।ত্রিশিরাকে হত্যা করে, রাম দণ্ডকারণ্য ভয়হীন করে তুলেছে।ক্রুদ্ধ পিতা রামকে পত্নী-সহ নির্বাসিত করেছে,তার প্রাণশক্তি ক্ষীণ হয়েছে। ক্ষত্রিয়কুলের কলঙ্ক রাম, সেই রাক্ষস সৈন্যবাহিনী ধ্বংস করেছে। চরিত্রহীন, রুক্ষ, উগ্র, মূর্খ, লুব্ধ ও অসংযতেন্দ্রিয়, ধর্মত্যাগী, অধার্মিক সে, প্রাণীদের অকল্যাণে নিরত। রাবণের অভিযোগ— কোন শত্রুতা ছাড়াই অরণ্যে, রাম, কেবলমাত্র বলপূর্বক আমার ভগিনীর নাক, কান ছেদন করে তাকে বিকৃতাঙ্গী করেছে। যেন বৈরং বিনারণ্যে সত্ত্বমাস্থায় কেবলম্। কর্ণনাসাপহারেণ ভগিনী মে বিরূপিতা।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮২: ডাবল ধামাকা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৪: গোখরো

শেষে মারীচের সঙ্গে দেখা করবার উদ্দেশ্য, প্রকাশ করল রাবণ—তার (রামের) ভার্যা দেবকন্যার সঙ্গে তুলনীয়া সীতাকে সবলে এখানে নিয়ে আসব, সেই কাজে তুমি আমার সহায় হও। তস্য ভার্য্যাং জনস্থানাৎ সীতাং সুরসুতোপমাম্।আনয়িষ্যামি বিক্রম্য সহায়স্তত্র মে ভব।। রাবণ মারীচের প্রতি তার আস্থা প্রকাশ করল— মহাবল মারীচ সহায় হয়ে যদি পাশে থাকে তবে ভাইদের সঙ্গে রাবণের সমস্ত দেবতাদের বিষয়ে কোন অতিরিক্ত চিন্তা থাকে না। রাবণের আকুতি— তৎ সহায়ো ভব ত্বং মে সমর্থো হ্যসি রাক্ষস। বীর্য্যে যুদ্ধে চ দর্পে চ ন হ্যস্তি সদৃশস্তব।। তাই তুমি আমার সহায় হও। ওহে রাক্ষস, তোমার সামর্থ্য আছে। বীর্যে, যুদ্ধে, দর্পে তোমার সমকক্ষ কেউ নেই। রাবণ, মারীচের প্রশংসা করল —মারীচ উপায়নিপুণ, মহাবীর এবং মায়াসৃজনে দক্ষ।এই কারণেই রাবণ, এই নিশাচরের কাছে এসেছে। এই কাজে রাবণকে সাহায্যের জন্য মারীচকে যা করতে হবে, সেই বিষয়ে যা বলল রাবণ — মারীচ রূপোর বিন্দুতে চিত্রিত সোনার হরিণ হয়ে, আশ্রমে সীতার সামনে বিচরণ করবে। সীতা মৃগরূপী মারীচকে দেখে নিশ্চয়ই স্বামী রামকে বা দেবর লক্ষ্মণকে হরিণটিকে ধরে আনতে বলবে। রাবণ তাঁর সীতাহরণের পরিকল্পনা ব্যক্ত করল। তাদের দুজনের (রামলক্ষ্মণের) অনুপস্থিতি সুযোগ নিয়ে শূন্য আশ্রমে, বেশ সুখেই, অবাধে রাহু যেমন চাঁদকে হরণ করে তেমনই আমিও সীতাকে হরণ করব। ততস্তয়োরপায়ে তু শূন্যে সীতাং যথাসুখম্।নিরাবাধো হরিষ্যামি রাহুশ্চন্দ্রপ্রভামিব।।* তার সিদ্ধান্ত জানাল রাবণ। তারপরে স্ত্রীর অপহরণের কারণে রাম, শোকে কাতর হয়ে পড়বে। তখন কৃতার্থ রাবণ, নির্জনে, মনের সুখে তাকে প্রহার করবে। রামবিষয়ক কথা শুনে, মহাত্মা মারীচের মুখ শুকিয়ে গেল, সে ভয়ার্ত হল। শুকনো ঠোঁট দুটি বার বার লেহন করে, অপলকচোখে মৃতের মতো কাতর হয়ে রাবণের দিকে তাকিয়ে রইল।সে মহারণ্যে রামের পরাক্রমের কথা বিশেষভাবে জেনেছে। ভীত হয়ে বিষণ্ণমনে, মারীচ, কৃতাঞ্জলি হয়ে রাবণের এবং নিজের জন্য মঙ্গলকর কথা বলতে লাগল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

ভগিনী রাক্ষসী শূর্পনখার প্ররোচনায়, রাক্ষসরাজ রাবণ, সীতার অনুপম রূপসৌন্দর্যের আকর্ষণে রামের স্ত্রী সীতার অপহরণে উদ্যোগী হল। রামকে উচিত শিক্ষা দিয়ে পত্নীর বিরহে দগ্ধ করে মনোবল নষ্ট করা তার উদ্দেশ্য। এ ছাড়াও দ্বিতীয় উদ্দেশ্য রামের স্ত্রী সীতাকে নিজের ভার্যারূপে গ্রহণ। কারণ তার লক্ষ্য, সীতার অনবদ্য দৈহিক সৌন্দর্যোপভোগ। রাক্ষস মারীচ রাবণের হাতিয়ার। রাবণের পরিকল্পনা রূপায়ণে মারীচের আবশ্যিক ভূমিকা হল সে মায়াবিদ্যা জানে। রাবণ মারীচের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছে। প্রবল প্রতাপান্বিত রাবণ দেব, দানব, গন্ধর্ব কারও পরোয়া করে না। অপরিমিত তার আত্মবিশ্বাস। যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য রাবণের আত্মশক্তিবিষয়ে স্থির বিশ্বাস অটুট থাকেনি যখন সে জানতে পেরেছে তার ভাই সশস্ত্র খর ও দূষণ, মহাবলশালী রাক্ষস ত্রিশিরা এবং বিশ্বস্ত চোদ্দো হাজার অব্যর্থলক্ষ্য রাক্ষস রামের হাতে নিহত হয়েছে। অরণ্যবাসী ধার্মিক মুনিদের উৎপীড়ন করাই ছিল এই সব রাক্ষসদের কাজ। এই রাক্ষসরা রাবণের নির্দেশে অরণ্যে ত্রাস সৃষ্টি করত। রাবণের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পরস্ত্রীহরণে মারীচের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ সে উপায়তো মহাশূরো মহামায়াবিশারদঃ। রাবণ স্বীকার করেন, মারীচ উপায়নিপুণ, মহাবীর এবং সমস্তমায়াবিশারদ। এই মায়া কেমন? ইচ্ছামতো স্বরূপ পরিবর্তনবিষয়ক জ্ঞান। মারীচ হবেন রূপার বিন্দু দিয়ে চিত্রিত একটি সোনার হরিণ। তার রূপে মুগ্ধা সীতা স্বামী ও দেবরকে সেই সোনার হরিণটি ধরে আনবার জন্যে অনুরোধ জানাবে তখনই রাম ও লক্ষ্মণের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাবণ সীতাকে হরণ করবে। রাবণ সীতার সৌন্দর্যের আকর্ষণে মোহগ্রস্ত হয়েছে। তার চোখ কিন্তু খুঁজছে তাকেই, যাকে যায় না পাওয়া,তারই হাওয়া লেগেছে তার মনে। মোহের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে হৃদয় ভেসেছে তার। মায়ার মোহমুগ্ধতা কার নেই? সকলেই হয়তো অপ্রাপ্তির পিছনে ছুটে চলে সোনার হরিণভ্রমে। সেই প্রাপ্তি অধরাই থেকে যায়,সোনার হরিণ ধরা দেয় না, সে যে শুধু ক্ষণিকবিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, মানুষকে চরম আক্ষেপের সম্মুখীন করে উধাও হয়। রাবণের কাছে সোনার হরিণ ওই সীতা। মারীচের কাছে রাবণ এসেছে কারণ মারীচের মায়ার ছলনার আশ্রয় তার লক্ষ্য। মারীচ নিজে সীতার সম্মুখের সাধের সোনার হরিণ। মহারণ্যের গভীরে দুষ্প্রাপ্য এই হরিণটি সীতার চোখে মোহমুগ্ধতা ছড়িয়ে তাকে আবিষ্ট করবে, চরম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, যার আকর্ষণে সম্মোহিতপ্রায় সীতা তাকে কাছে পেতে ইচ্ছুক হবে। তার এই অমোঘ ইচ্ছাপূরণের খেসারত দিতে হবে তার স্বামী রামকে। রাবণ যেমন সীতার রূপজ মোহের আকর্ষণে ছুটে এসেছেন মারীচের কাছে। মারীচ এর ফলসম্পর্কে পূর্ণ সচেতন, তবু মায়ামৃগ তাকে হয়তো হতেই হবে রাবণের ইচ্ছাপূরণের তাগিদে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

এই মায়ামৃগ রয়েছে বাস্তবজীবনে সর্বত্র।মানুষ সেই মায়াময় সোনার হরিণের পিছনে ছুটে চলেছে নিরন্তর। হরিণ কিন্তু অধরাই থেকে যায়। অনেকেরই নৈতিক পতন, জটিলতা, সঙ্কটের আবর্তে পড়ে জীবনের অনেক সেরা সময় নষ্ট হয়। মায়াময় হরিণের আকর্ষণে ছুটে চলা দিকভ্রান্ত মানুষ হয়ে ওঠে প্রবঞ্চিত নায়ক রামের মতো। আক্ষেপ ও অনুশোচনাকে সম্বল করে সে বাকি জীবনটা অতিক্রম করে, নিঃসঙ্গ, একাকী। —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content