
ছবি : সংগৃহীত।
একঝলকে
প্রেক্ষাগৃহ : দেয়া নেয়া
পরিচালনা : সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবির নায়ক: উত্তম কুমার
ছবির নায়িকা: তনুজা
উত্তম কুমার অভিনীত চরিত্রের নাম : প্রশান্ত/অভিজিৎ/হৃদয় হরণ
মুক্তির তারিখ : ২৪.১০.১৯৬৩
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেগুলি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন হয়ে থেমে থাকেনি; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি হয়ে উঠেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। উত্তম কুমার অভিনীত ‘দেয়া নেয়া’ সেই ধরনেরই একটি চলচ্চিত্র। বিধায়ক ভট্টাচার্যের কাহিনি ও চিত্রনাট্য এবং শ্যামল মিত্রের সংগীত ছবিটিকে পরিচালনা করেছেন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। চরিত্রে অভিনয় করেছেন মহানায়ক উত্তম কুমার এবং তনুজা।
‘দেয়া নেয়া’ মূলত একটি রোম্যান্টিক-কমেডি ও সঙ্গীতনির্ভর পারিবারিক চলচ্চিত্র। কিন্তু এর ভিতরে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিল্পীর আত্মপরিচয়, পিতার সঙ্গে সন্তানের মতপার্থক্য, প্রেমের আকর্ষণ এবং সামাজিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব। ছবির কাহিনি তাই শুধুমাত্র নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনি নয়; বরং নিজের পছন্দ ও নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার একটি সহজ, হাস্যরসাত্মক অথচ তাৎপর্যপূর্ণ গল্প।
কাহিনির মূল সুর কিন্তু যুগের হাওয়ার সাথে সমানুপাতিক। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রশান্ত রায়। সে এক ধনী শিল্পপতি পরিবারের সন্তান। তার বাবা বি কে রায় চান ছেলে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করুক। কিন্তু প্রশান্তের মন পড়ে আছে সংগীতের জগতে। সে ভালো গান গায় এবং ‘অভিজিৎ চৌধুরী’ ছদ্মনামে সংগীতচর্চা করে জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে। পিতার ব্যবসায়িক প্রত্যাশা এবং নিজের শিল্পীসত্তার মধ্যে এই দ্বন্দ্বই ছবির সূচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে।
‘দেয়া নেয়া’ মূলত একটি রোম্যান্টিক-কমেডি ও সঙ্গীতনির্ভর পারিবারিক চলচ্চিত্র। কিন্তু এর ভিতরে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিল্পীর আত্মপরিচয়, পিতার সঙ্গে সন্তানের মতপার্থক্য, প্রেমের আকর্ষণ এবং সামাজিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব। ছবির কাহিনি তাই শুধুমাত্র নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনি নয়; বরং নিজের পছন্দ ও নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার একটি সহজ, হাস্যরসাত্মক অথচ তাৎপর্যপূর্ণ গল্প।
কাহিনির মূল সুর কিন্তু যুগের হাওয়ার সাথে সমানুপাতিক। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রশান্ত রায়। সে এক ধনী শিল্পপতি পরিবারের সন্তান। তার বাবা বি কে রায় চান ছেলে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করুক। কিন্তু প্রশান্তের মন পড়ে আছে সংগীতের জগতে। সে ভালো গান গায় এবং ‘অভিজিৎ চৌধুরী’ ছদ্মনামে সংগীতচর্চা করে জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে। পিতার ব্যবসায়িক প্রত্যাশা এবং নিজের শিল্পীসত্তার মধ্যে এই দ্বন্দ্বই ছবির সূচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে।
একসময় পিতার সঙ্গে মতবিরোধের ফলে প্রশান্ত বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। সেখানে সে নিজের পরিচয় গোপন রেখে অন্য জীবন শুরু করে। ঘটনাচক্রে সে অমৃতলাল মজুমদারের বাড়িতে গাড়ির চালক ও মেকানিকের পরিচয়ে প্রবেশ করে এবং ‘হৃদয় হরণ’ নাম গ্রহণ করে। অমৃতলালের ভাগ্নী সুচরিতা বা ‘শুচি’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তনুজা। এই দ্বৈত-ত্রিমাত্রিক পরিচয়—প্রশান্ত, অভিজিৎ এবং হৃদয় হরণ—ছবির হাস্যরস ও নাটকীয়তার অন্যতম প্রধান উৎস।
শুচি একদিকে আধুনিকা, প্রাণবন্ত এবং স্বাধীনচেতা তরুণী; অন্যদিকে সে অভিজিৎ চৌধুরীর গানের ভক্ত। ফলে সে যে মানুষটির কণ্ঠ ও শিল্পীসত্তায় আকৃষ্ট, তাকে বাস্তবে সে চেনে না। আবার যে মানুষটি তার সামনে ‘হৃদয় হরণ’ নামে উপস্থিত, তার প্রকৃত পরিচয়ও সে জানে না। এই পরিচয়-বিভ্রান্তিই ছবির রোমান্টিক পর্বকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
উত্তম কুমারের অভিনয়গুণেই সে আকর্ষণ সহস্রধারায় ফিরে ফিরে আসে। চরিত্রের প্রয়োজনে অভিনয়ের প্রতিটি গতিমুখ তিনি এমনভাবে বদলেছেন যা হয়ে উঠেছে কালজয়ী।
তাই ‘দেয়া নেয়া’র সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে উত্তম কুমার। প্রশান্ত রায় চরিত্রে তাঁকে একসঙ্গে তিনটি ভিন্ন পরিচয় ধারণ করতে হয়েছে—প্রশান্ত, অভিজিৎ এবং হৃদয় হরণ। কিন্তু তিনি তিনটি চরিত্রকে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হিসেবে না দেখিয়ে একই ব্যক্তিত্বের তিনটি প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
প্রশান্ত হিসেবে উত্তম কুমারের মধ্যে রয়েছে শিক্ষিত, বিত্তশালী পরিবারের তরুণের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস। বাবার সঙ্গে মতবিরোধের সময় তাঁর অভিনয়ে আবেগ ও অভিমান স্পষ্ট। অন্যদিকে অভিজিৎ চৌধুরী হিসেবে তিনি শিল্পীর আত্মবিশ্বাস ও জনপ্রিয়তার আবহ তৈরি করেন। আর হৃদয় হরণ চরিত্রে তাঁর অভিনয়ে যোগ হয় কৌতুক, আত্মগোপনের উত্তেজনা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা।
শুচি একদিকে আধুনিকা, প্রাণবন্ত এবং স্বাধীনচেতা তরুণী; অন্যদিকে সে অভিজিৎ চৌধুরীর গানের ভক্ত। ফলে সে যে মানুষটির কণ্ঠ ও শিল্পীসত্তায় আকৃষ্ট, তাকে বাস্তবে সে চেনে না। আবার যে মানুষটি তার সামনে ‘হৃদয় হরণ’ নামে উপস্থিত, তার প্রকৃত পরিচয়ও সে জানে না। এই পরিচয়-বিভ্রান্তিই ছবির রোমান্টিক পর্বকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
উত্তম কুমারের অভিনয়গুণেই সে আকর্ষণ সহস্রধারায় ফিরে ফিরে আসে। চরিত্রের প্রয়োজনে অভিনয়ের প্রতিটি গতিমুখ তিনি এমনভাবে বদলেছেন যা হয়ে উঠেছে কালজয়ী।
তাই ‘দেয়া নেয়া’র সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে উত্তম কুমার। প্রশান্ত রায় চরিত্রে তাঁকে একসঙ্গে তিনটি ভিন্ন পরিচয় ধারণ করতে হয়েছে—প্রশান্ত, অভিজিৎ এবং হৃদয় হরণ। কিন্তু তিনি তিনটি চরিত্রকে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হিসেবে না দেখিয়ে একই ব্যক্তিত্বের তিনটি প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
প্রশান্ত হিসেবে উত্তম কুমারের মধ্যে রয়েছে শিক্ষিত, বিত্তশালী পরিবারের তরুণের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস। বাবার সঙ্গে মতবিরোধের সময় তাঁর অভিনয়ে আবেগ ও অভিমান স্পষ্ট। অন্যদিকে অভিজিৎ চৌধুরী হিসেবে তিনি শিল্পীর আত্মবিশ্বাস ও জনপ্রিয়তার আবহ তৈরি করেন। আর হৃদয় হরণ চরিত্রে তাঁর অভিনয়ে যোগ হয় কৌতুক, আত্মগোপনের উত্তেজনা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা

উপন্যাস, আকাশ এখনও মেঘলা/৮৫

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮২: ডাবল ধামাকা
উত্তম কুমারের অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল তাঁর স্বাভাবিকতা। তিনি কখনও অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গি বা নাটকীয়তার আশ্রয় নেন না। চোখের দৃষ্টি, মুখের হাসি, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং শরীরী ভাষার সামান্য পরিবর্তনেই চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। ‘দেয়া নেয়া’ তাঁর এই স্বাভাবিক অভিনয়শৈলীর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
এ ছবিতে তাঁর রোমান্টিক নায়কসুলভ উপস্থিতির পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দক্ষতাও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে পরিচয় গোপন রাখার পরিস্থিতিতে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় ছবিটিকে প্রাণবন্ত করেছে।
অন্যদিকে তনুজা-র নায়িকা হিসেবে স্বতন্ত্র উপস্থিতিও আমাদের মন টানে। ‘দেয়া নেয়া’ তনুজার বাংলা চলচ্চিত্রজীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি। তিনি এ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং উত্তম কুমারের বিপরীতে শুচি চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে তিনি ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী’ ও ‘রাজকুমারী’-সহ আরও বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন।
তনুজার অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা। শুচি চরিত্রটি একেবারে গতানুগতিক বাংলা ছবির লাজুক, নীরব নায়িকা নয়। তার মধ্যে রয়েছে কৌতূহল, প্রাণচাঞ্চল্য, স্বাধীনতা এবং আধুনিকতার ছাপ। উত্তম কুমারের বিপরীতে তনুজার অভিনয় তাই ছবিতে একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছে। উত্তম কুমারের পরিণত ও নিয়ন্ত্রিত অভিনয়ের পাশে তনুজার তারুণ্য ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছবির রোম্যান্টিক আবহকে সতেজ করে তুলেছে।
তনুজা নিজেও বাংলা ছবিতে নিজের সংলাপ বলতেন—তাঁর বাংলা চলচ্চিত্রজীবনের এই দিকটিও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া উত্তম-তনুজা রসায়নের গভীরতাও কম ছিল না। দু’জনের বয়স, অভিনয়-অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বে পার্থক্য থাকলেও পর্দায় তাঁদের জুটি অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বরং উত্তমের পরিণত ব্যক্তিত্ব এবং তনুজার তারুণ্যের সংমিশ্রণ ছবিতে একটি আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
এ ছবিতে তাঁর রোমান্টিক নায়কসুলভ উপস্থিতির পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দক্ষতাও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে পরিচয় গোপন রাখার পরিস্থিতিতে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় ছবিটিকে প্রাণবন্ত করেছে।
অন্যদিকে তনুজা-র নায়িকা হিসেবে স্বতন্ত্র উপস্থিতিও আমাদের মন টানে। ‘দেয়া নেয়া’ তনুজার বাংলা চলচ্চিত্রজীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি। তিনি এ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং উত্তম কুমারের বিপরীতে শুচি চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে তিনি ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী’ ও ‘রাজকুমারী’-সহ আরও বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন।
তনুজার অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা। শুচি চরিত্রটি একেবারে গতানুগতিক বাংলা ছবির লাজুক, নীরব নায়িকা নয়। তার মধ্যে রয়েছে কৌতূহল, প্রাণচাঞ্চল্য, স্বাধীনতা এবং আধুনিকতার ছাপ। উত্তম কুমারের বিপরীতে তনুজার অভিনয় তাই ছবিতে একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছে। উত্তম কুমারের পরিণত ও নিয়ন্ত্রিত অভিনয়ের পাশে তনুজার তারুণ্য ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছবির রোম্যান্টিক আবহকে সতেজ করে তুলেছে।
তনুজা নিজেও বাংলা ছবিতে নিজের সংলাপ বলতেন—তাঁর বাংলা চলচ্চিত্রজীবনের এই দিকটিও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া উত্তম-তনুজা রসায়নের গভীরতাও কম ছিল না। দু’জনের বয়স, অভিনয়-অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বে পার্থক্য থাকলেও পর্দায় তাঁদের জুটি অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বরং উত্তমের পরিণত ব্যক্তিত্ব এবং তনুজার তারুণ্যের সংমিশ্রণ ছবিতে একটি আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।

ছবি : সংগৃহীত।
তবে তাঁদের প্রেমের সম্পর্ককে খুব গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রেম হিসেবে দেখানো হয়নি। ছবির মূল উদ্দেশ্য ছিল হালকা মেজাজে প্রেম, ভুল পরিচয় ও হাস্যরসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ফলে প্রেমের বিকাশও অনেকটা দ্রুত। সমকালীন বিনোদনমূলক চলচ্চিত্রের দৃষ্টিতে এটি কার্যকর হলেও আধুনিক দর্শকের কাছে প্রেমের সম্পর্কটি কিছুটা অপর্যাপ্ত বা অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উত্তম ও তনুজার পর্দার উপস্থিতি ছবির আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। শিল্পীসত্তা বনাম পারিবারিক প্রত্যাশা। ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্পীসত্তার স্বাধীনতার প্রশ্ন। প্রশান্ত একজন ধনী পরিবারের সন্তান। তার সামনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা এবং সামাজিক মর্যাদা সবই রয়েছে। কিন্তু সে সংগীতকে ভালোবাসে। তার কাছে গান শুধু শখ নয়, আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই অবস্থানটি আজকের সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক তরুণ-তরুণীকে এখনও নিজের পছন্দের পেশা এবং পরিবারের প্রত্যাশার মধ্যে দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। প্রশান্তের সংগ্রাম তাই কেবল ষাটের দশকের একটি চলচ্চিত্রের সমস্যা নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সামাজিক বাস্তবতা।
তবে ছবিটি এই সমস্যাকে ভারী বা দার্শনিক করে তোলেনি। বরং হাস্যরস ও রোমান্টিকতার মাধ্যমে সহজভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছে। এটাই ছবির সাফল্য।
এরপর আসি সংগীত প্রসঙ্গে যা ছিল ‘দেয়া নেয়া’র প্রাণ। ‘দেয়া নেয়া’র সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ এর সংগীত। সংগীত পরিচালনা করেছেন শ্যামল মিত্র এবং গীতিকার ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ছবিটির গানগুলি আজও বাঙালির স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
শ্যামল মিত্রের সুর ছবির গল্প ও চরিত্রের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশে গেছে। বিশেষ করে ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’, ‘মাধবী মধুপে হলো মিতালী’, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’—এই গানগুলি শুধু ছবির জনপ্রিয়তা বাড়ায়নি, পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরস্মরণীয় গানের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে।
সংগীতের দিক থেকে ছবিটির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। উত্তম কুমারের জন্য শ্যামল মিত্রের কণ্ঠ ব্যবহার এই ছবির মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উত্তম ও তনুজার পর্দার উপস্থিতি ছবির আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। শিল্পীসত্তা বনাম পারিবারিক প্রত্যাশা। ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্পীসত্তার স্বাধীনতার প্রশ্ন। প্রশান্ত একজন ধনী পরিবারের সন্তান। তার সামনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা এবং সামাজিক মর্যাদা সবই রয়েছে। কিন্তু সে সংগীতকে ভালোবাসে। তার কাছে গান শুধু শখ নয়, আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই অবস্থানটি আজকের সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক তরুণ-তরুণীকে এখনও নিজের পছন্দের পেশা এবং পরিবারের প্রত্যাশার মধ্যে দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। প্রশান্তের সংগ্রাম তাই কেবল ষাটের দশকের একটি চলচ্চিত্রের সমস্যা নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সামাজিক বাস্তবতা।
তবে ছবিটি এই সমস্যাকে ভারী বা দার্শনিক করে তোলেনি। বরং হাস্যরস ও রোমান্টিকতার মাধ্যমে সহজভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছে। এটাই ছবির সাফল্য।
এরপর আসি সংগীত প্রসঙ্গে যা ছিল ‘দেয়া নেয়া’র প্রাণ। ‘দেয়া নেয়া’র সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ এর সংগীত। সংগীত পরিচালনা করেছেন শ্যামল মিত্র এবং গীতিকার ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ছবিটির গানগুলি আজও বাঙালির স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
শ্যামল মিত্রের সুর ছবির গল্প ও চরিত্রের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশে গেছে। বিশেষ করে ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’, ‘মাধবী মধুপে হলো মিতালী’, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’—এই গানগুলি শুধু ছবির জনপ্রিয়তা বাড়ায়নি, পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরস্মরণীয় গানের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে।
সংগীতের দিক থেকে ছবিটির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। উত্তম কুমারের জন্য শ্যামল মিত্রের কণ্ঠ ব্যবহার এই ছবির মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়।
আরও পড়ুন:

সংস্কৃত দিবস

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
গানের ব্যবহার কেবল দৃশ্যের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়; গানগুলি চরিত্রের আবেগ, প্রেম ও শিল্পীসত্তার প্রকাশ ঘটায়। হাস্যরসের ব্যবহারও ছবিটির আঙ্গিক পরিসীমা নির্ণয় করেছে। ‘দেয়া নেয়া’কে শুধুমাত্র প্রেমের ছবি বললে ভুল হবে। ছবির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হাস্যরস। বিশেষ করে নায়কের পরিচয় গোপন করা, নতুন নাম গ্রহণ, ধনী পরিবারের বাড়িতে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে থাকা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা—এসব থেকেই কৌতুকের জন্ম হয়েছে।
এখানে হাস্যরস কখনও অতিরিক্ত বা অশ্লীল হয়ে ওঠেনি। পরিস্থিতিনির্ভর কৌতুকই ছবির প্রধান শক্তি। ফলে ছবিটি একই সঙ্গে পারিবারিক এবং রোমান্টিক বিনোদন হিসেবে কাজ করেছে।
পার্শ্বচরিত্রের গুরুত্বও ছবিটির মূল শর্ত। ‘দেয়া নেয়া’র সাফল্যের পিছনে পার্শ্বচরিত্রগুলিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, ছায়া দেবী, তরুণ কুমার, লিলি চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পী ছবির জগতকে পূর্ণতা দিয়েছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি সান্যালের অমৃতলাল মজুমদার চরিত্র এবং কমল মিত্রের বি কে রায় চরিত্র কাহিনির দুই ভিন্ন সামাজিক পরিসরকে প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে রয়েছে ঐতিহ্য ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
তরুণ কুমারের উপস্থিতি ছবির হাস্যরস ও বন্ধুত্বের দিকটি আরও শক্তিশালী করেছে। পরিচালনা ও চিত্রনাট্যর দ্বৈত গতিতে ছবির সমকালীনতা বারবার যাচাই হয়েছে। সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ছবিটি গতিশীল এবং সহজবোধ্য হয়েছে। বিধায়ক ভট্টাচার্যের কাহিনি ও চিত্রনাট্যের মূল শক্তি হলো একটি সাধারণ প্রেম ও পরিচয়-বিভ্রান্তির গল্পকে একাধিক স্তরে নিয়ে যাওয়া।
এখানে হাস্যরস কখনও অতিরিক্ত বা অশ্লীল হয়ে ওঠেনি। পরিস্থিতিনির্ভর কৌতুকই ছবির প্রধান শক্তি। ফলে ছবিটি একই সঙ্গে পারিবারিক এবং রোমান্টিক বিনোদন হিসেবে কাজ করেছে।
পার্শ্বচরিত্রের গুরুত্বও ছবিটির মূল শর্ত। ‘দেয়া নেয়া’র সাফল্যের পিছনে পার্শ্বচরিত্রগুলিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, ছায়া দেবী, তরুণ কুমার, লিলি চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পী ছবির জগতকে পূর্ণতা দিয়েছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি সান্যালের অমৃতলাল মজুমদার চরিত্র এবং কমল মিত্রের বি কে রায় চরিত্র কাহিনির দুই ভিন্ন সামাজিক পরিসরকে প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে রয়েছে ঐতিহ্য ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
তরুণ কুমারের উপস্থিতি ছবির হাস্যরস ও বন্ধুত্বের দিকটি আরও শক্তিশালী করেছে। পরিচালনা ও চিত্রনাট্যর দ্বৈত গতিতে ছবির সমকালীনতা বারবার যাচাই হয়েছে। সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ছবিটি গতিশীল এবং সহজবোধ্য হয়েছে। বিধায়ক ভট্টাচার্যের কাহিনি ও চিত্রনাট্যের মূল শক্তি হলো একটি সাধারণ প্রেম ও পরিচয়-বিভ্রান্তির গল্পকে একাধিক স্তরে নিয়ে যাওয়া।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৪: গোখরো
চিত্রনাট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো নায়কের পরিচয় নিয়ে দর্শক সবসময় অবগত থাকে, কিন্তু নায়িকা থাকে অজ্ঞ। ফলে দর্শক জানে এমন একটি সত্য, যা অন্য চরিত্ররা জানে না। এই নাটকীয় পদ্ধতি হাস্যরস ও উত্তেজনা দুটিই তৈরি করে। তবে বর্তমান সময়ের বিচারে চিত্রনাট্যের কিছু অংশ সরল এবং সুবিধাবাদী মনে হতে পারে। বিশেষ করে প্রেমের বিকাশ ও চরিত্রগুলির মানসিক পরিবর্তন আরও বিস্তৃতভাবে দেখানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ষাটের দশকের জনপ্রিয় বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র হিসেবে এই সরলতা ছবিটির গ্রহণযোগ্যতারই অংশ।
ক্যামেরা ও দৃশ্যায়ন প্রসঙ্গে বলা যায় কানাই দে-র চিত্রগ্রহণ, ছবির সময়কালকে যথাযথভাবে ধারণ করেছে। সাদা-কালো ফ্রেমে ষাটের দশকের শহুরে ও পারিবারিক পরিবেশের একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। গাড়ি, বাড়ি, পোশাক এবং শহুরে জীবনযাত্রার বিভিন্ন উপাদান ছবিটিকে তার সময়ের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর দৃশ্যগুলি ছবির ভিজ্যুয়াল আকর্ষণ বাড়িয়েছে। উত্তম কুমারের ব্যক্তিগত জীবনেও গাড়ি চালানোর প্রতি আগ্রহ ছিল বলে ছবিটি নিয়ে স্মৃতিচারণায় এই দিকটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
ছবির সামাজিক প্রেক্ষাপটও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের বাংলা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে আধুনিকতার যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, ‘দেয়া নেয়া’ তার একটি হালকা প্রতিফলন। একদিকে রয়েছে ধনী শিল্পপতির পরিবার, ব্যবসায়িক সাফল্য ও পারিবারিক কর্তৃত্ব; অন্যদিকে রয়েছে গান, রেডিও, আধুনিক পোশাক, গাড়ি, শহুরে জীবন এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
শুচি চরিত্রটিও এই পরিবর্তনের প্রতীক। সে কেবল নায়কের প্রেমে পড়া একটি সাধারণ চরিত্র নয়; তার মধ্যে রয়েছে নিজের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। অন্যদিকে প্রশান্তের চরিত্রে শিল্পীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে ছবিটি সরাসরি সামাজিক বক্তব্য না দিয়েও তার সময়ের পরিবর্তনশীল সমাজকে ধারণ করেছে।
ছবিটির এতকিছু গুণ থাকলেও সীমাবদ্ধতার পরিমাণ কম নয়। একটি চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে তার সীমাবদ্ধতাগুলিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, নায়ক-নায়িকার প্রেমের বিকাশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত। শুচি অভিজিতের কণ্ঠে আকৃষ্ট হলেও মানুষ হিসেবে অভিজিৎকে চেনে না। আবার হৃদয় হরণকে সে প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করার মতো যথেষ্ট মানসিক প্রস্তুতিও গল্পে খুব বেশি দেখা যায় না। এই দিকটি আধুনিক দর্শকের কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
ক্যামেরা ও দৃশ্যায়ন প্রসঙ্গে বলা যায় কানাই দে-র চিত্রগ্রহণ, ছবির সময়কালকে যথাযথভাবে ধারণ করেছে। সাদা-কালো ফ্রেমে ষাটের দশকের শহুরে ও পারিবারিক পরিবেশের একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। গাড়ি, বাড়ি, পোশাক এবং শহুরে জীবনযাত্রার বিভিন্ন উপাদান ছবিটিকে তার সময়ের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর দৃশ্যগুলি ছবির ভিজ্যুয়াল আকর্ষণ বাড়িয়েছে। উত্তম কুমারের ব্যক্তিগত জীবনেও গাড়ি চালানোর প্রতি আগ্রহ ছিল বলে ছবিটি নিয়ে স্মৃতিচারণায় এই দিকটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
ছবির সামাজিক প্রেক্ষাপটও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের বাংলা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে আধুনিকতার যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, ‘দেয়া নেয়া’ তার একটি হালকা প্রতিফলন। একদিকে রয়েছে ধনী শিল্পপতির পরিবার, ব্যবসায়িক সাফল্য ও পারিবারিক কর্তৃত্ব; অন্যদিকে রয়েছে গান, রেডিও, আধুনিক পোশাক, গাড়ি, শহুরে জীবন এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
শুচি চরিত্রটিও এই পরিবর্তনের প্রতীক। সে কেবল নায়কের প্রেমে পড়া একটি সাধারণ চরিত্র নয়; তার মধ্যে রয়েছে নিজের পছন্দ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। অন্যদিকে প্রশান্তের চরিত্রে শিল্পীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে ছবিটি সরাসরি সামাজিক বক্তব্য না দিয়েও তার সময়ের পরিবর্তনশীল সমাজকে ধারণ করেছে।
ছবিটির এতকিছু গুণ থাকলেও সীমাবদ্ধতার পরিমাণ কম নয়। একটি চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে তার সীমাবদ্ধতাগুলিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, নায়ক-নায়িকার প্রেমের বিকাশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত। শুচি অভিজিতের কণ্ঠে আকৃষ্ট হলেও মানুষ হিসেবে অভিজিৎকে চেনে না। আবার হৃদয় হরণকে সে প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করার মতো যথেষ্ট মানসিক প্রস্তুতিও গল্পে খুব বেশি দেখা যায় না। এই দিকটি আধুনিক দর্শকের কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?
দ্বিতীয়ত, পরিচয়-বিভ্রান্তির ওপর চিত্রনাট্যের নির্ভরতা বেশি। একবার দর্শক যখন বুঝে যায় প্রশান্ত, অভিজিৎ এবং হৃদয় হরণ একই ব্যক্তি, তখন গল্পের পরিণতি অনেকটাই অনুমেয় হয়ে যায়। তৃতীয়ত, পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্বটি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা যেত। প্রশান্ত কেন সংগীতকে এত ভালোবাসে, তার শিল্পীসত্তার বিকাশ কীভাবে হয়েছে—এসব বিষয় আরও বিস্তৃত হলে চরিত্রটি আরও গভীরতা পেত।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাগুলি ছবির সামগ্রিক আনন্দকে নষ্ট করে না। কারণ ছবিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দর্শককে আনন্দ দেওয়া এবং সংগীত, প্রেম ও হাস্যরসের মাধ্যমে একটি মনোরম চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা তৈরি করা। বক্স অফিস সাফল্য ও জনপ্রিয়তায় ‘দেয়া নেয়া’ তো তখন ‘শোলে’। ‘দেয়া নেয়া’ মুক্তির পর বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ছবিটির সাফল্যের ক্ষেত্রে সংগীতের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল এবং এটি দীর্ঘদিন দর্শককে আকৃষ্ট করেছিল।
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। তাঁর সঙ্গে নতুন বাংলা নায়িকা তনুজার জুটি এবং শ্যামল মিত্রের সুর—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় ছবিটিকে দর্শকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে। ছবিটির জনপ্রিয়তা পরবর্তী সময়েও অটুট থাকে। এমনকি ২০২৩ সালের ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দেয়া নেয়া’ উদ্বোধনী ছবি হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে ছবিটির গুরুত্ব কেবল তার সময়ের বাণিজ্যিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও এটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাগুলি ছবির সামগ্রিক আনন্দকে নষ্ট করে না। কারণ ছবিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দর্শককে আনন্দ দেওয়া এবং সংগীত, প্রেম ও হাস্যরসের মাধ্যমে একটি মনোরম চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা তৈরি করা। বক্স অফিস সাফল্য ও জনপ্রিয়তায় ‘দেয়া নেয়া’ তো তখন ‘শোলে’। ‘দেয়া নেয়া’ মুক্তির পর বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ছবিটির সাফল্যের ক্ষেত্রে সংগীতের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল এবং এটি দীর্ঘদিন দর্শককে আকৃষ্ট করেছিল।
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। তাঁর সঙ্গে নতুন বাংলা নায়িকা তনুজার জুটি এবং শ্যামল মিত্রের সুর—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় ছবিটিকে দর্শকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে। ছবিটির জনপ্রিয়তা পরবর্তী সময়েও অটুট থাকে। এমনকি ২০২৩ সালের ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দেয়া নেয়া’ উদ্বোধনী ছবি হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে ছবিটির গুরুত্ব কেবল তার সময়ের বাণিজ্যিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও এটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক।

ছবি : সংগৃহীত।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
‘দেয়া নেয়া’কে যদি আজকের চলচ্চিত্রের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তাহলে এর কাহিনির সরলতা, প্রেমের দ্রুত বিকাশ এবং পরিচয়-বিভ্রান্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছুটা পুরনো বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটি চলচ্চিত্রের মূল্যায়ন কেবল আধুনিক বাস্তবতার মানদণ্ডে করা উচিত নয়। তার সময়, সমাজ, চলচ্চিত্রভাষা এবং দর্শকের রুচির কথাও বিবেচনা করতে হয়।
সেই দৃষ্টিতে ‘দেয়া নেয়া’ একটি অত্যন্ত সফল বাংলা চলচ্চিত্র। এর কাহিনি সহজ, কিন্তু আকর্ষণীয়; অভিনয় স্বাভাবিক, কিন্তু স্মরণীয়; সংগীত মধুর, কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী; আর উত্তম কুমার ও তনুজার জুটি ছবিটিকে দিয়েছে এক বিশেষ রোমান্টিক আবেদন।
সবচেয়ে বড় কথা, ছবিটি বিনোদনের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে—মানুষ কি নিজের পছন্দের জীবন বেছে নিতে পারে? পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত কীভাবে মিটবে? একজন শিল্পীর কাছে শিল্পের মূল্য কতটা? এই প্রশ্নগুলি ছবির গল্পের গভীরে নিঃশব্দে উপস্থিত।
উপসংহার
সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, ‘দেয়া নেয়া’ শুধু উত্তম কুমার ও তনুজার একটি জনপ্রিয় প্রেমের ছবি নয়; এটি ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিকতা, সংগীত, হাস্যরস এবং তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার এক সুন্দর দলিল।
উত্তম কুমারের প্রশান্ত-অভিজিৎ-হৃদয় হরণ চরিত্রের বহুমাত্রিক অভিনয়, তনুজার প্রাণবন্ত শুচি, শ্যামল মিত্রের কালজয়ী সংগীত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের গান এবং সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ-সরল পরিচালনা মিলিয়ে ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্থায়ী আসন পেয়েছে।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি বদলেছে, অভিনয়ের ধরন বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু ভালো গান, স্বাভাবিক অভিনয়, সুন্দর রোমান্টিকতা এবং আন্তরিক বিনোদনের আকর্ষণ কখনও পুরনো হয় না। সেই কারণেই ষাট বছরেরও বেশি সময় পরে আজও ‘দেয়া নেয়া’ দেখলে উত্তম কুমারের হাসি, তনুজার তারুণ্য এবং শ্যামল মিত্রের সুর বাঙালিকে নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
‘দেয়া নেয়া’ তাই নিছক একটি পুরনো ছবি নয়—এটি উত্তম যুগের বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল স্মারক।তথ্যগতভাবে ছবিটি ১৯৬৩ সালের, এবং তনুজার বাংলা চলচ্চিত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা; পরবর্তীতে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর আরও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়।—চলবে।
‘দেয়া নেয়া’কে যদি আজকের চলচ্চিত্রের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তাহলে এর কাহিনির সরলতা, প্রেমের দ্রুত বিকাশ এবং পরিচয়-বিভ্রান্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছুটা পুরনো বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটি চলচ্চিত্রের মূল্যায়ন কেবল আধুনিক বাস্তবতার মানদণ্ডে করা উচিত নয়। তার সময়, সমাজ, চলচ্চিত্রভাষা এবং দর্শকের রুচির কথাও বিবেচনা করতে হয়।
সেই দৃষ্টিতে ‘দেয়া নেয়া’ একটি অত্যন্ত সফল বাংলা চলচ্চিত্র। এর কাহিনি সহজ, কিন্তু আকর্ষণীয়; অভিনয় স্বাভাবিক, কিন্তু স্মরণীয়; সংগীত মধুর, কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী; আর উত্তম কুমার ও তনুজার জুটি ছবিটিকে দিয়েছে এক বিশেষ রোমান্টিক আবেদন।
সবচেয়ে বড় কথা, ছবিটি বিনোদনের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে—মানুষ কি নিজের পছন্দের জীবন বেছে নিতে পারে? পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত কীভাবে মিটবে? একজন শিল্পীর কাছে শিল্পের মূল্য কতটা? এই প্রশ্নগুলি ছবির গল্পের গভীরে নিঃশব্দে উপস্থিত।
উপসংহার
সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, ‘দেয়া নেয়া’ শুধু উত্তম কুমার ও তনুজার একটি জনপ্রিয় প্রেমের ছবি নয়; এটি ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিকতা, সংগীত, হাস্যরস এবং তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার এক সুন্দর দলিল।
উত্তম কুমারের প্রশান্ত-অভিজিৎ-হৃদয় হরণ চরিত্রের বহুমাত্রিক অভিনয়, তনুজার প্রাণবন্ত শুচি, শ্যামল মিত্রের কালজয়ী সংগীত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের গান এবং সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ-সরল পরিচালনা মিলিয়ে ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্থায়ী আসন পেয়েছে।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি বদলেছে, অভিনয়ের ধরন বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু ভালো গান, স্বাভাবিক অভিনয়, সুন্দর রোমান্টিকতা এবং আন্তরিক বিনোদনের আকর্ষণ কখনও পুরনো হয় না। সেই কারণেই ষাট বছরেরও বেশি সময় পরে আজও ‘দেয়া নেয়া’ দেখলে উত্তম কুমারের হাসি, তনুজার তারুণ্য এবং শ্যামল মিত্রের সুর বাঙালিকে নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
‘দেয়া নেয়া’ তাই নিছক একটি পুরনো ছবি নয়—এটি উত্তম যুগের বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল স্মারক।তথ্যগতভাবে ছবিটি ১৯৬৩ সালের, এবং তনুজার বাংলা চলচ্চিত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা; পরবর্তীতে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর আরও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















