শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

 

১০. ব্রাহ্মণ, চোর আর পিশাচের কাহিনি

কোনও এক জনপদে বাস করতেন দ্রোণ নামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। অন্যের দেওয়া দানের ওপর নির্ভর করেই অতি কষ্টে তাঁর দিন গুজরান হতো। ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস যে, জীবনে কোনওদিন ভালো পোশাক, গায়ে মাখার সুগন্ধি, গলায় পরার বরমাল্য বা সামান্য একটু তৃপ্তিদায়ক পানীয় তাঁর জোটেনি। দারিদ্র্যের কশাঘাতে তাঁর চেহারা হয়েছিল বড়ই করুণ। রুক্ষ মাথার চুল পিঠ অবধি লোটানো, গালভর্তি অবিন্যস্ত দাড়ি-গোঁফ, হাতের নখগুলো অস্বাভাবিক বড় আর সারা শরীর রোমে ঢাকা। বছরের পর বছর ধরে শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষার রোদ-জল-ঝড় সহ্য করতে করতে তাঁর শরীরটা একেবারে হাড্ডিসার ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

ব্রাহ্মণের এই নিদারুণ কষ্ট দেখে একদিন এক যজমানের বড্ড দয়া হল। তিনি দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে দান করলেন দুটি সুন্দর বাছুর। সেই বাছুর দুটিই হয়ে উঠল ব্রাহ্মণের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা ও নয়নের মণি। নিজে না খেয়ে, এর-ওর কাছ থেকে চেয়েচিন্তে ঘাস, পাতা, এমনকি ঘি-তেল জোগাড় করে তিনি বাছুর দুটিকে পরম মমতায় খাওয়াতে লাগলেন। ব্রাহ্মণের নিবিড় যত্নে কিছুদিনের মধ্যেই বাছুর দুটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট ও নাদুসনুদুস হয়ে উঠল। কিন্তু ওই যে কথায় আছে, কারও পৌষ মাস তো কারও সর্বনাশ! ব্রাহ্মণের সেই নাদুসনুদুস বাছুর দুটির ওপর নজর পড়ল এক ধূর্ত চোরের। সে মনে মনে ফন্দি আঁটল, “যাই হোক না কেন, এই ব্রাহ্মণের বাছুর দুটোকে আমি চুরি করবই।”

যেমন ভাবা তেমন কাজ। একদিন ঘোর অমাবস্যার রাতে একটি শক্ত দড়ি বগলে নিয়ে চোর পা বাড়াল ব্রাহ্মণের বাড়ির দিকে। চারদিক নিঝুম, জনপ্রাণী নেই। কিন্তু মাঝরাস্তায় পৌঁছতেই হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড! চোরের সামনে এসে দাঁড়াল এক বিকট দর্শন মূর্তি। তাকে মানুষ না বলে দৈত্য বা রাক্ষস বলাই শ্রেয়। তার চেহারা দেখে ভয়ে চোরের রক্ত জল হয়ে যাওয়ার জোগাড়!

মুখের দু’পাটিতে দাঁতগুলো সব ফাঁকা ফাঁকা অথচ ছুরির মতো তীক্ষ্ণ, নাকটা অস্বাভাবিক টিকালো, আর চোখের দু’পাশ রক্তবর্ণ! শরীর এতটাই হাড়গিলে যে চামড়ার তলা দিয়ে শিরা-উপশিরাগুলো সব দড়ির মতো ফুলে বেরিয়ে আছে। সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে থাকা সেই তোবড়ানো গালের মূর্তিটির মাথার চুল আর দাড়ি—ঠিক যেন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের মতো পিঙ্গল বর্ণের।
সব মিলিয়ে সে এক অতি ভয়ঙ্কর রূপ! ঘোর অমানিশা, নির্জন পথ, আর মাঝরাতে এমন এক বিকট দর্শন মূর্তি চোখের সামনে হঠাৎ উদয় হতে দেখে চোরের তো তখন আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়! ভয়ে তার হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে, আর দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক করে কাঁপছে সে। অতিকষ্টে অনেক সাহস সঞ্চয় করে, কাঁপা কাঁপা গলায় সেই ভয়াল মূর্তিকে সে জিজ্ঞাসা করল—“হে মহাশয়! কো ভবান্? — কে আপনি?”
সেই ভয়ানক মূর্তি তখন মেঘগম্ভীর স্বরে রাতের নৈঃশব্দ্য চিরে উত্তর দিল, “আমার নাম সত্যবচন। আমি এক ব্রহ্মরাক্ষস। এবার তোমার পরিচয় নিবেদন করো।”

স্বয়ং ব্রহ্মরাক্ষস! নাম শুনেই চোরের পিলে চমকে যাওয়ার উপক্রম। তবুও সে কাঁচুমাচু হয়ে ভয়ে ভয়ে একেবারে সত্যি কথাটিই বলে ফেলল, “আজ্ঞে, আমি এক সামান্য চোর। আমার নাম ক্রূরকর্মা। ওই দরিদ্র ব্রাহ্মণের আদরের বাছুর দুটিকে আজ রাতে আমি চুরি করতে চলেছি।”
চোরের এই অকপট কথা শুনে ব্রহ্মরাক্ষস যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হল। তার মেঘগম্ভীর মুখে এক চিলতে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে ভারী গলায় বলল, “ওহে ভদ্র! তাহলে তো দেখছি আমরা একই পথের পথিক! আমি একজন ‘ষষ্ঠাহ্নকালিক’—অর্থাৎ দিনের ষষ্ঠভাগে বা এই সন্ধ্যাকালে আমি আহার করি। এখন আমার ভোজনেরই নির্দিষ্ট সময়। চলো তবে, আজ রাতে ওই ব্রাহ্মণকেই তবে উদরস্থ করবো। এ তো বেশ ভালোই হলো! আমাদের দু’জনেরই গন্তব্য যখন এক, তখন একই জায়গায় একসঙ্গে দুজনের কাজ বেশ অনায়াসেই হাসিল হবে।”

সব মিলিয়ে সে এক অতি ভয়ঙ্কর রূপ! নির্জন রাস্তার মাঝখানে মধ্যরাতেএমন মূর্তি দেখে চোরের তো তখন আত্মারাম খাঁচাছাড়া।ভয়ে ভয়ে সে তখন সেই ভয়ানকদর্শী মূর্তিমান ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞাসা করলো, “কো ভবান্‌? —কে আপনি?”

সেই ভয়ানকদর্শী মেঘগম্ভীর স্বরে বলল, “আমার নাম সত্যবচন। আমি এক ব্রহ্মরাক্ষস। আপনার পরিচয় নিবেদন করুন”

চোরটি বলল, “আমি এক সামান্য চোর। আমার নাম ক্রুরকর্মা। দরিদ্রব্রাহ্মণের গাভী দু’টোকে চুরি করতে এসেছি।”

রাক্ষস কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “ওহে ভদ্র! আমি একজন ষষ্ঠাহ্নকালিক— দিনের ষষ্ঠভাগে, মানে এই সন্ধ্যা কালে আমি খাই। এটাই আমার খাওয়ার সময়। চলো তবে সেই ব্রাহ্মণকেই তবে আজ ভোজন করা যাবে। এটা বেশ ভালোই হল আমাদের দু’জনেরই একই জায়গায় একসঙ্গে কাজ মিটবে।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : এই ভাষাতেই করি গান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৮: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

চোর ক্রূরকর্মা তো ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু তার সামনে রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ব্রহ্মরাক্ষস’ বস্তুটি আসলে কী সেটা এখন জেনে নেওয়া দরকার।পঞ্চতন্ত্রের গল্পকার বিষ্ণুশর্মা কেবল পাঠকদের মনে ভয় বা শিহরণ জাগানোর জন্যই এই চরিত্রের আমদানি করেননি; বরং এই ভয়ংকর রূপের আড়ালে তিনি নিপুণভাবে বুনে দিয়েছেন তৎকালীন সমাজের এক গভীর নৈতিক সতর্কবার্তা। হিন্দু পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ব্রহ্মরাক্ষস হলো এক অভিশপ্ত সত্তা—পণ্ডিতের আত্মা আর পিশাচের দেহের এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর মেলবন্ধন। মনু মহারাজ বলেছেন (১২.৬০):
সংযোগং পতিতৈর্গত্বা পরস্যৈব চ যোষিতম্ ।
অপহৃত্য চ বিপ্রস্বং ভবতি ব্রহ্মরাক্ষসঃ।।


অর্থাৎ, মনু এখানে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি নীতিভ্রষ্ট হয়ে অসাধু সঙ্গ, নারীঘটিত পাপ এবং বিদ্বান বা সজ্জনের সম্পদ হরণ করার মতো গর্হিত অপরাধ করে, তবে কর্মফলের শাস্তিস্বরূপ তাকে মৃত্যুর পর এই ভয়ংকর পিশাচযোনি বা ব্রহ্মরাক্ষস হতে হয়। এটি মূলত সমাজের উচ্চস্তরের মানুষদের নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে এক কঠোর শাস্ত্রীয় অনুশাসন।ফলে জন্মগতভাবে উচ্চবর্ণ এবং উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও, কেবল ভ্রষ্টাচারের কারণে শাস্তিস্বরূপ তাঁদেরকে এই ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে হতো।

তাই এদের চেহারা হাড্ডিসার, গায়ের শিরা-উপশিরা দৃশ্যমান, চুল-দাড়ি জ্বলন্ত আগুনের মতো পিঙ্গল আর দাঁত তীক্ষ্ণ হলেও, এরা কিন্তু সাধারণ ভূত-প্রেতের মতো মূর্খ নয়। পিশাচ হলেও এরা পূর্বজন্মের সমস্ত শাস্ত্রজ্ঞান, বেদমন্ত্র এবং পাণ্ডিত্য সম্পূর্ণ মনে রাখে। মজার বিষয় হলো, নরখাদক হলেও পঞ্চতন্ত্রের এই রাক্ষস ‘সত্যবচন’ কিন্তু ভারী নিয়মনিষ্ঠ! সে নিজেই চোরকে গর্বভরে জানাল যে সে ‘ষষ্ঠাহ্নকালিক’—অর্থাৎ শাস্ত্রের নিয়ম মেনে দিনের ষষ্ঠভাগেই কেবল সে আহার করে, যথেচ্ছভাবে নয়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ

এই অদ্ভুত নিয়মনিষ্ঠা আসলে তার সেই পূর্বজন্মের ব্রাহ্মণ্য-সংস্কারেরই রেশ। প্রাচীন ভারতের নাট্যমঞ্চে বা লোককথার আখ্যানে এভাবেই পণ্ডিত ও পিশাচের দ্বৈতসত্তাকে তুলে ধরে সমাজকে এক প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দেওয়া হতো—জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকার পেলেই হবে না, তার ধর্মসম্মত প্রয়োগ না করলে পণ্ডিতের পরিণতিও রাক্ষসের চেয়ে কম ভয়ংকর হয় না।সংস্কৃত সাহিত্য ঘাঁটলে দেখা যায়, ব্রহ্মরাক্ষসরা অনেক সময় পথচারীদের পথ আটকে কঠিন শাস্ত্রীয় প্রশ্ন বা ধাঁধা জিজ্ঞেস করত। সঠিক উত্তর দিতে পারলে তারা পথ ছেড়ে দিত, আর না পারলে ঘাড় মটকে খেত! একাদশ শতাব্দীতে সোমদেব ভট্ট রচিত কথাসরিত্সাগরে একাধিক ব্রহ্মরাক্ষসের গল্প রয়েছে, যেখানে নায়করা নিজেদের বুদ্ধি ও সাহসের জোরে এদের পরাজিত করে বা এদের সাহায্য লাভ করে। লোকসংস্কৃতির গবেষকরা জানেন যে, আজও কেরল ও কর্ণাটকের বেশ কিছু প্রাচীন মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে ‘ব্রহ্মরাক্ষস’-এর জন্য আলাদা ছোট বেদী থাকে। মূল দেবতাকে পুজো দেওয়ার আগে তাঁদের শান্ত করার জন্য সেখানে প্রদীপ বা নৈবেদ্য দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা পূজার কাজে কোনো বিঘ্ন না ঘটান।

যাই হোক, শাস্ত্রজ্ঞ অথচ নরখাদক এমন এক অদ্ভুত পিশাচের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সামান্য চোর ক্রূরকর্মা তো পড়ল মহা ফাঁপরে। দুজনের গন্তব্য এক হলেও, উদ্দেশ্য যে সম্পূর্ণ আলাদা!
অতঃপর, ঘোর অন্ধকারের বুক চিরে পিশাচ আর চোর—এই দুই অদ্ভুত সঙ্গী চুপিচুপি এসে উপস্থিত হলো সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের পর্ণকুটিরের বাইরে। চারদিক নিস্তব্ধ, ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দুজনেই ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করতে লাগল মোক্ষম সময়ের জন্য। বেশ কিছুক্ষণ পর কুটিরের ভেতর থেকে ব্রাহ্মণের নাক ডাকার শব্দ ভেসে এল। ক্লান্ত, দুর্বল ব্রাহ্মণ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

আর যায় কোথায়! সুযোগ বুঝে ব্রহ্মরাক্ষস তার বিকট জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে, পা টিপে টিপে সেই ঘুমন্ত ব্রাহ্মণকে ভক্ষণ করার জন্য এগোতে শুরু করল।
রাক্ষসকে এগোতে দেখেই চোর ক্রূরকর্মার চক্ষু চড়কগাছ! সে শশব্যস্ত হয়ে রাক্ষসের পথ আগলে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরে মশাই! করেন কী? করেন কী? হে ভদ্র, এ তো আপনি ঠিক করছেন না! আগে আমি ওই হৃষ্টপুষ্ট বাছুর দুটোকে দড়ি দিয়ে বেঁধে চুপিচুপি সরিয়ে ফেলি, তারপর আপনি বরং একেবারে নিশ্চিন্তে ওই ব্রাহ্মণটিকে ভক্ষণ করবেন।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪০: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বুনো শুয়োর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

ব্রহ্মরাক্ষস ঘাড় নেড়ে তার জ্বলন্ত চোখ দুটি পাকিয়ে বলল, “না বাপু, সেটি কোনও মতেই হবে না! গোরু দুটোকে চুরি করতে গিয়ে তুমি যদি কোনও আনাড়িপনা করো আর তারা যদি হঠাৎ ডেকে ওঠে? তাতে যদি ব্রাহ্মণের কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়? তাহলে তো আমার সব চেষ্টাই বৃথা হয়ে যাবে। আমার নৈশভোজের সাধটাই মাটি হবে!”

এদিকে চোর ক্রূরকর্মাও সহজে ছাড়বার পাত্র নয়! নিজের ‘পেশাগত’ স্বার্থে ঘা লাগতেই তার ভেতর থেকে রাক্ষসের সমস্ত ভয় কর্পূরের মতো উবে গেল। সে পালটা যুক্তি দিয়ে বলল, “আর তুমি যখন ওর ঘাড় মটকে রক্ত খেতে যাবে, তখন যদি কোনো গণ্ডগোল হয়? ওই ব্রাহ্মণ যদি যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে জেগে ওঠে, তাহলে তো আমারও চুরি করা মাথায় উঠবে! আমারও তো সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই আমি বলছি শোনো, আগে আমি বাছুর দুটোকে অপহরণ করব, তারপর তুমি ওই ব্রাহ্মণকে নিয়ে যা খুশি তাই কোরো।”

অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, চোর এবার আর সেই ভয়ংকর ব্রহ্মরাক্ষসকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে সমানে সমানে তর্ক করতে শুরু করল। স্বার্থের সংঘাতে পড়ে সম্মান দেওয়ার পাঠ চুকে গেল। এতক্ষণের সেই ‘আপনি-আজ্ঞে’র খোলস ছেড়ে সোজা ‘তুমি’তে নেমে এসে দুজনের মধ্যে রাতের অন্ধকারে রীতিমতো তুমুল ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়ে গেল।
চোর বলে— “আগে আমি বাছুর চুরি করব!”আর রাক্ষস বলে— “না! আগে আমি ব্রাহ্মণের ঘাড় মটকাব!”

রাতের সেই নিস্তব্ধ প্রহর চিরে দুজনের এই তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা আর গলাবাজিতে শেষমেশ যা হওয়ার ঠিক তাই হল। সেই হইচই আর প্রবল আওয়াজে কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল দরিদ্র ব্রাহ্মণ দ্রোণের।

ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন ব্রাহ্মণ। চোখ কচলাতে কচলাতে দরজার দিকে তাকাতেই তাঁর রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার জোগাড়! তিনি দেখলেন, তাঁর কুটিরের সামনে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দুই অদ্ভুত মূর্তি—যাদের মধ্যে রীতিমতো তুমুল ঝগড়া চলছে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

ব্রাহ্মণকে জেগে উঠতে দেখেই চোর প্রমাদ গুনল। সে বুঝল, এবার চুরি করা তো দূর, নিজের প্রাণ নিয়ে ফেরা দায়। তাই সে তড়িঘড়ি সাধু সাজার ভান করে ব্রহ্মরাক্ষসকে দেখিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ওহে ব্রাহ্মণ! সাবধান! এই যে ভয়ংকর মূর্তিটিকে দেখছেন, এ হলো এক জলজ্যান্ত ব্রহ্মরাক্ষস! এ আপনার কাঁচা রক্ত পান করতে আর আপনাকে জ্যান্ত ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যেই আজ রাতে এখানে এসেছে!”

চোরের এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখে ব্রহ্মরাক্ষস কি আর চুপ থাকে? সেও পালটা মেঘগম্ভীর স্বরে গর্জন করে উঠল, “ওহে ব্রাহ্মণ! এর কথা শুনে একেও তুমি খুব একটা সাধু-সন্ন্যাসী ভেবো না! এই ব্যাটা আসলে এক আস্ত চোর! তোমার ওই সাধের বাছুর দুটোকে আজ রাতে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এ এখানে এসে জুটেছে!”

দু’জনের এই অদ্ভুত কাঁদা-ছোঁড়াছুঁড়ি দেখে ব্রাহ্মণের তো চক্ষু চড়কগাছ! তিনি বুঝলেন, একদিকে প্রাণঘাতী রাক্ষস, অন্যদিকে সর্বস্বান্ত করতে আসা চোর—দুটোই মহা বিপদ। কিন্তু তিনি তো শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ। তাই বিপদ বুঝে কালবিলম্ব না করে তিনি একমনে তাঁর ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করতে লাগলেন। উচ্চস্বরে শুরু করলেন পবিত্র স্তোত্র ও মন্ত্রোচ্চারণ।

ব্রাহ্মণের সেই ইষ্টমন্ত্রের তেজ আর আধ্যাত্মিক শক্তিতে ব্রহ্মরাক্ষসের তখন ত্রাহি ত্রাহি রব! পবিত্র মন্ত্রের আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে সেই ভয়ংকর পিশাচ তখনই অন্ধকারের মধ্যে প্রাণভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল।

রাক্ষস তো পালাল। ব্রাহ্মণ দেখলেন, এবার শুধু চোরটাই বাকি! মন্ত্র পড়া থামিয়ে তিনি ঘরের কোণ থেকে তুলে নিলেন এক মস্ত বড় ও মজবুত লাঠি। তারপর রুদ্রমূর্তি ধারণ করে তেড়ে গেলেন সেই চোরের দিকে। জুতসই লাঠির বাড়ি পড়ার আগেই চোর বুঝল, আজ আর বাছুর চুরির আশা নেই। তাই নিজের পিঠ বাঁচাতে সেও সেখান থেকে চোঁ-চোঁ দৌড় দিল।
আর এভাবেই, কেবল চোর আর রাক্ষসের নিজেদের বিবাদের কারণেই ব্রাহ্মণের প্রাণ এবং তাঁর বাছুর—দুটোই রক্ষা পেয়ে গেল।—চলবে।
 

১০ম কাহিনি সমাপ্ত

* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content