
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
চিতারোহণের যন্ত্রণা সম্পর্কে তিনি রমণীকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেন। সতী তখন একটি প্রদীপ আনতে বললেন এবং তাঁর একটি আঙুল প্রজ্বলন্ত প্রদীপ শিখায় স্হির ভাবে ধরে রাখলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আঙুলটি দগ্ধ হয়ে একেবারে অঙ্গারে পর্যবসিত না হয় ততক্ষণ তিনি আঙুলটি অগ্নিশিখা থেকে সরালেন না। সতীর চোখেমুখেও সামান্য ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না। ম্যাজিস্ট্রেট-সহ উপস্থিত সবাই এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। শ্মশান শয্যার যন্ত্রণা যে রমণীকে স্পর্শ করবে না এটা বোঝাবার জন্যই তিনি তাঁর আঙুলটি সকলের সামনে দগ্ধ করলেন। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট সতীকে পতির শবদেহের সঙ্গে শ্মশান শয্যার অনুমতি দিলেন।
এটি একটি ব্যতিক্রমী বিচ্ছিন্ন ঘটনাও হতে পারে। সদ্য বিধবা স্ত্রীকে জোর জবরদস্তি করে স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও বিস্তর ঘটেছে। যবদ্বীপ, চিন ও ইউরোপের নানা দেশে সহমরণের প্রথা থাকলেও অন্যান্য দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পত্নীকে কোনও না কোনও ভাবে বধ করে স্বামীর শবের সঙ্গে সমাহিত করা হত। ভারতের হিন্দুদের সতীদাহ প্রথা অর্থাৎ পতির শবের সঙ্গে পত্নীর দেহ জীবন্ত দগ্ধ করার প্রথা আর কোথাও দেখা কিছু পুরাণে সতীদাহ মহৎ কাজ হিসেবে বর্ণিত হলেও সব পুরাণ এ ব্যাপারে এক অবস্থান নেয়নি। প্রাচীন ধর্মসূত্র ও স্মৃতিগ্রন্হগুলিতে সতীদাহ সর্বজনীন ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। যেমন মনুস্মৃতি বিধবাকে সংযমী জীবন যাপনের কথা বলেছে,চিতায় আত্মাহুতি নয়। বৈদিক সাহিত্যেও সতীদাহের সুস্পষ্ট বিধান নেই। সংহিতার শ্লোক নিয়ে আবার বিতর্কও আছে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪০: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২১

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক
আধুনিক বৈদিক গবেষকদের অধিকাংশের মতে, ঋগ্বেদে সতীদাহ বাধ্যতামূলক বলে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সতীদাহ মূল বৈদিক ধর্মের বিধান নয়। পরবর্তী সময়কালের সামাজিক বিকাশের ফলশ্রুতি হিসেবে সতীদাহ প্রথার প্রচলন বলে অনেকে মনে করেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গুপ্তোত্তর যুগ থেকে এর বেশি উল্লেখ দেখা যায়। মধ্যযুগে কিছু অঞ্চলে তা বিস্তার লাভ করে।বিশেষত রাজপুত সমাজ ও বাংলার কিছু উচ্চবর্ণীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এর বহুল প্রচলনের কথা কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৭: ধেড়ে ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৩ : পিঞ্জরে অচিন পাখি
যাইহোক, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের রেনেসাঁস পর্বে সতীদাহ প্রথা রদের জন্য রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক ভারতে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ইংরেজ কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা জারির পরও এই প্রথা যে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল এমনটা বলা যায় না। দেশীয় রাজ্য ত্রিপুরাতেও আরও দীর্ঘদিন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পর আরও প্রায় ছয় দশক অব্যাহত ছিল এই কুপ্রথা। অবশেষে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের চাপে ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহ প্রথা নিবারণে নিষেধাজ্ঞা প্রচার করেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৮ : মহাপুরুষ—কাল আজ পরশু

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
এবার ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথার কথায় আসা যাক। এ ক্ষেত্রে ‘রাজমালা’ সূত্রে ধন্য মাণিক্যের রানি কমলা মহাদেবীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা ষোড়শ শতকের প্রথম দিকের কথা। ধন্য মাণিক্য (১৪৯০-১৫১৫ খ্রিঃ) ত্রিপুরার এক বীর নৃপতি ছিলেন। তাঁর আমলে ত্রিপুরার রাজ্যসীমা অনেক বিস্তৃত হয়েছিল। গৌড়াধিপতি হুসেন শাহ বার কয়েক ত্রিপুরা আক্রমণ করেন তাঁর সময়কালে। কিন্তু রাজার বীর সেনাপতি রায় কয়চাগ গৌড় বাহিনীর আক্রমণ ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত
ত্রিপুরার সৈন্য বাহিনী গৌড় সুলতানের কামান অধিকার করে নিয়ে আসে। ধন্য মাণিক্য ত্রিপুরার পূর্ব প্রান্তে কুকিদের পরাজিত করে ব্রহ্মদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন রাজ্যের পূর্ব সীমা। চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে গৌড়, আরাকান ও ত্রিপুরার মধ্যে অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ ঘটেছে। ধন্য মাণিক্য এক সময় মগ বাহিনীকে পরাস্ত করে আরাকানেরও কিছু অংশ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ধন্য মাণিক্যের অনেক কীর্তি আজও অক্ষয় হয়ে আছে ত্রিপুরায়। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে উদয়পুরে মাতা ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম কীর্তি। ধর্মপ্রাণ এই রাজা ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির ছাড়াও উদয়পুরে মহাদেব মন্দির ও রত্নপুরে চতুর্দ্দশ দেবতা মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। রাজা তাঁর রানি কমলা মহাদেবীর নামে কৈলারগড়ে কমলাসাগর নামে একটি বিরাট জলাশয় খনন করিয়েছিলেন। ধন্য মাণিক্যের প্রচারিত মুদ্রাতেই প্রথম ‘ত্রিপুরেন্দ্র’ অর্থাৎ ত্রিপুরার রাজা কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















