কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

ধন্য মাণিক্যের রানি কমলা মহাদেবী স্বামীর সঙ্গে সহগামী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী নৃপতিগণের আমলে রানিরা সহমৃতা হয়েছিলেন কিনা ‘রাজমালা’য় অবশ্য সে সম্পর্কে কোনও ইঙ্গিত নেই। তবে পরবর্তী নৃপতিগণের সময়ে সতীদাহের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘রাজমালা’তে। ধন্য মাণিক্যের পর প্রথমে সিংহাসনে বসেন জ্যেষ্ঠ পুত্র ধ্বজ, তারপর কনিষ্ঠ পুত্র দেব মাণিক্য। চন্তাই লক্ষ্মীনারায়ণ গোপনে হত্যা করেছিলেন দেব মাণিক্যকে। তাঁর রানি সহমৃতা হয়েছিলেন। যেমন—
“বিজয় কুমার মাতৃ চন্তাইর কন্যা।
সহগামী হৈল রানি রূপে গুণে ধন্যা।।”
‘রাজমালা’কারগণ অবশ্য দেব মাণিক্যের রানির নাম উল্লেখ করেননি। পুত্র বিজয়ের মাতা হিসেবেই তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ‘রাজমালা’য় ত্রিপুরার অনেক রাজার রানির নাম নেই। কোনও ক্ষেত্রে শুধু পট্ট মহিষীর নামই দেয়া হয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে আবার তাও নেই। যাইহোক, ধন্য মাণিক্যের পর দেব মাণিক্যের রানির ক্ষেত্রে সতী হবার ঘটনা জানা যায়। দেব মাণিক্যের পর পুত্র বিজয় মাণিক্য(১৫৩২-৬৩খ্রিঃ) সিংহাসনে বসেন। তিনিও মধ্যযুগে ত্রিপুরার অন্যতম বীর নৃপতি। সম্রাট আকবরের প্রায় সমসাময়িক এই রাজা তাঁর বিরাট সেনা বাহিনী নিয়ে বঙ্গদেশ অভিযান করেছিলেন। নানা যুদ্ধ-বিগ্রহে জয়লাভ করেছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

হ্যালো বাবু: পর্ব-১৪২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২২

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে

বিজয় মাণিক্যের মৃত্যুর পর রাজার একাধিক রানি সহমৃতা হয়েছিলেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়ের পর সিংহাসনে বসেন পুত্র অনন্ত।কিন্তু অনন্ত মাণিক্য ছিলেন কার্যত তাঁর শ্বশুর গোপীপ্রসাদের হাতের পুতুল। গোপীপ্রসাদ একদিকে রাজ্যের প্রধান সেনাপতি,অপরদিকে রাজার শ্বশুর। তখন সমস্ত ক্ষমতা ছিল তাঁর কুক্ষিগত। দিনে দিনে গোপীপ্রসাদের লোভও বাড়তে থাকে। অঙ্গুলি হেলনে আর পুতুল রাজাকে পরিচালনা নয়, নিজেই রাজা হয়ে সিংহাসনে বসতে হবে। গোপীপ্রসাদ একদিন ষড়যন্ত্র করে নিজ জামাতা রাজা অনন্তকে হত্যা করালেন। এরপর অনন্ত মাণিক্যের মহারানি জয়া মহাদেবী স্বামীর চিতায় ঝাঁপ দিয়ে সতী হতে চাইলেন। কিন্তু পিতা অর্থাৎ সেনাপতি গোপীপ্রসাদের প্রবল বাধাদানে তিনি তাঁর সংকল্প সার্থক করতে পারলেন না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর

১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার সিংহাসনে বসেন অমর মাণিক্য।অমরের রাজত্বকালের প্রায় পুরোটাই ছিল যুদ্ধের উন্মাদনা আর অশান্তিতে পরিপূর্ণ। প্রথম দিকে উপর্যুপরি নানা যুদ্ধে বিজয়ী হলেও শেষে তাঁর করুণ পরিণতি ঘটে। চট্টগ্রাম যুদ্ধে অমর মাণিক্যের বিপর্যয় শুরু হয়।শেষপর্যন্ত তাঁকে রাজধানী পরিত্যাগ করে রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে আশ্রয় নিতে হয়।মনু নদীর তীরে অস্হায়ী রাজপাট স্হাপন করেন অমর মাণিক্য। কিন্তু সেখানেও তাঁকে দুর্ভাগ্য তাড়া করে।এক চক্রান্তের শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেন শ্যালক ছত্রাজিৎকে।দিনে দিনে হতোদ্যম হয়ে পড়েন অমর মাণিক্য। তারপর একদিন তিনি আফিম সেবনে আত্মহত্যা করেন। অমর মাণিক্যের মহিষী অমরাবতী পতির সঙ্গে সহগামিনী হয়েছিলেন বলে ‘রাজমালা’য় উল্লেখ পাওয়া যায়।পরবর্তী রাজাদের সময়কালেও যে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল তা ধারণা করতে অসুবিধা হয় না।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহের কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন আহোম রাজদূত রত্নকন্দলী শর্মা ও অর্জুনদাস বৈরাগী। আহোম রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহের দূত হয়ে তারা ১৭০৯ থেকে ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে তিনবার ত্রিপুরা পরিদর্শনে এসেছিলেন। সে সময়ে ত্রিপুরা রাজ্য, রাজধানী ও রাজপরিবারের নানা বিষয় তারা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। দ্বিতীয় রত্ন মাণিক্যের রাজত্বকালে রাজপরিবারে সতীদাহ সম্পর্কে আহোম দূতদ্বয় উল্লেখ করেছেন-“চম্পক রায়ের স্ত্রীরা স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে রাজার কাছে সহগামী হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। এরপর রাজা চম্পক রায়ের শব আনালেন। মুক্তিঘাটে চিতা তৈরি করিয়ে সহগামী স্ত্রীদের সঙ্গে দাহ করালেন।…”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

দ্বিতীয় রত্ন মাণিক্যকে ষড়যন্ত্র করে সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ঘনশ্যাম বড়ঠাকুর। ঘনশ্যাম মহেন্দ্র মাণিক্য নাম ধারণ পূর্বক সিংহাসনে বসেন। আহোম রাজদূতেরা নিখুঁত ভাবে সেদিনের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সিংহাসনে রাজা বদলের পর রাজপুরুষদের হত্যাকাণ্ড এবং সহমরণের ঘটনাও তারা উল্লেখ করেছেন। রাজা রত্ন মাণিক্যকে হত্যার পর তাঁর চিতা প্রাঙ্গণে রানিদের সহমরণের বর্ণনা আহোম রাজদূতেরা যে ভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন—”…তারপর রত্ন মাণিক্যের ভার্যারা শাশুড়িকে প্রণাম করলেন।শাশুড়িও পুত্রবধূদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বললেন—-‘তোমরা ভাগ্যবান, স্বামীর সঙ্গে যাও।’…রাজা মহেন্দ্র মাণিক্য এক হাজার টাকার আধুলি, সিকি, দুআনি,আনি আধানি দিয়ে পাঠালেন। তারপর রত্ন মাণিক্যের শবকে স্নান করাল,রাজার ভার্যারাও স্নান করলেন। রাজার পাঠানো টাকা-পয়সা গায়ের অলঙ্কারও ব্রাহ্মণদের বিলিয়ন দিলেন। ব্রাহ্মণরা বিধিমতে দাহ করালেন।”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content