শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) প্রজনন ঋতুতে গুলিন্দা বাটান। (ডানদিকে) পায়ে ট্যাগ লাগানো গুলিন্দা বাটান খাবার সংগ্রহরত। ছবি: সংগৃহীত।

ডিসেম্বর মাসের শেষে স্কুলে সাধারণত দু-চার দিন ছুটি থাকে। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়ে যাওয়ার পর শিক্ষক হিসেবে আমরাও কিছুটা চাপমুক্ত হয়ে যাই। আর তাই তখন প্রকৃতিটাকে একটু গভীরভাবে দেখার জন্য কখনো কখনো আশেপাশে সকালে বা বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়ি। বছর দুয়েক আগে এমনই একদিন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য মুড়িগঙ্গা নদীর পূর্ব তীর। উদ্দেশ্য নদীর তীর বরাবর কিছুটা পথ সাইকেলে সওয়ারী হয়ে কিছু উদ্ভিদ ও পাখি দেখা। সম্বল বলতে পকেটে একখানা মোবাইল। প্রসাদপুর গ্রাম এলাকার মধ্যে দিয়ে নদীর তীর বরাবর দক্ষিণ মুখে এগিয়ে চলেছি। তখন নদীতে ভাটার টান শুরু হয়েছে। নজরে এল একটা পাখি অল্প জলে খুব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে তার লম্বা চঞ্চুটা দিয়ে জলের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত খাবার খুঁজছে। মনে হল প্রতি সেকেন্ডে একবার বা দেড় সেকেন্ডে একবার করে জলে চঞ্চু ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে। সঙ্গে দ্রুত পদচারণা। সামনে, ডাঁয়ে, বাঁয়ে অনবরত হেঁটে চলেছে। থমকে দাঁড়ালাম। ব্যাপারখানা দেখতেই হচ্ছে। প্রায় ৩০ সেকেন্ড একটানা ওইভাবে খাবার খোঁজার পর মাথা তুলে এক সেকেন্ডের জন্য এদিক-ওদিক দেখে নিল কোনও বিপদ আছে কিনা। বুঝল বিপদ নেই। শুরু হল আবার খাবার খোঁজা। প্রায় ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড খাবার খোঁজার পর আবার মাথা তুলে দেখে নিল। ভাবলাম এবার একটা ছবি তোলার জন্য প্রস্তুতি নেব। মোবাইল বার করে জুম করে দেখলাম মোটেই ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে না। আরো কিছুটা এগোনো দরকার। ৩০-৪০ ফুট এগিয়ে গিয়ে আবার মোবাইল তাক করলাম। পাখিটা যে বেশ ভীতু এবং সতর্ক বুঝতে পারলাম। অনেকটা কাছাকাছি হওয়ায় চেহারাটা ভালোভাবে নজরে আসছিল। দেখলাম কুচকুচে ও চকচকে কালো চঞ্চুটা বেশ লম্বা আর নিচের দিকে সামান্য বাঁকা। কুচকুচে কালো পা দুটোও যেন দেহের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা। কিন্তু যেই মোবাইলটা তাক করেছি, ও বুঝে গেল বিপদ সমাসন্ন। সঙ্গে সঙ্গে উড়ে চলে গেল আমি যে দিক থেকে এসেছিলাম সেই দিকে।
এইরকম পাখি আমি বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জে আগেও দেখেছি। মনে হল সেইসব পাখিই হবে। তবে উড়ে যাওয়ার সময় স্পষ্ট দেখলাম লেজের ওপরে বেশ চওড়া সাদা রঙের ‘V’ আকৃতির ব্যান্ড। আর দুই ডানার প্রান্তেও সাদা রঙের চওড়া স্পষ্ট ব্যান্ড। মনে হল এটা তো আগে দেখিনি। তাহলে কি এরা আমার আগে দেখা হুইমব্রেল বা ছোট গুলিন্দা নয়, কিংবা জৌরালিও নয়? আগের বহু লেখাতেই বলেছি এসব ক্ষেত্রে আমার প্রথম ভরসা হল ‘বার্ডস অফ ইন্ডিয়া’। না, সেখানে এদের খোঁজ পেলাম না। পরবর্তী ভরসা ‘চেনা অচেনা পাখি’। কিন্তু সেখানে খুঁজতে গিয়ে রীতিমতো নাজেহাল হলাম, কারণ ঠিক মেলাতে পারছিলাম না। স্টুয়ার্ট বেকারের লেখা “The Fauna of British India” বই খুঁজেও আশাপ্রদ কিছু পেলাম না। অবশেষে স্মরণ করতেই হল ‘Google’ বাবাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলাম। ইংরেজিতে এর নাম হল ‘Curlew Sandpiper’। পরিযায়ী এই পাখিগুলি সুন্দরবন অঞ্চলে আসে। আমার দেখার সাথে বর্ণনার চমৎকার মিল পেলাম। আর সন্দেহ রইল না। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Calidris ferruginea’। দেখলাম এই পাখিটির কোনো বাংলা নাম নেই। ‘চেনা অচেনা পাখি’ বইতে শ্রদ্ধেয় অজয় হোম অবশ্য এই পাখিটির নাম রেখেছেন গুলিন্দা বাটান। প্রবাদপ্রতিম পক্ষীবিদের দেওয়া নাম অস্বীকার করার স্পর্ধা আমার মত এক নগণ্য প্রকৃতিপ্রেমিকের নেই। সুতরাং এই নামটি আমিও বজায় রাখলাম।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

গুলিন্দা বাটানরা নাকি সাইবেরিয়া অঞ্চলের পাখি। সুদূর উত্তরের তুন্দ্রা অঞ্চল এদের মূল বাসস্থান। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে এরা নাকি ভারতে পরিযায়ী হয়ে আসতে শুরু করে। অবশ্য শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশ পাকিস্তান মালদ্বীপ শ্রীলংকা ইত্যাদি দেশেও এরা আসে এবং সমুদ্র উপকূলে, খাঁড়িতে ও চড়ায় এদের সমগোত্রীয় অন্যান্য পাখিদের সাথে মিলেমিশে থাকতে দেখা যায়। অবশ্য আমি একটা গুলিন্দা বাটানকেই দেখেছিলাম। ঝগড়া করে দল থেকে একা বেরিয়ে এসেছিল কিনা কে জানে! নাকি অন্যরা ওকে একঘরে করে দিয়েছে? বইতে দেখলাম এরা নদী ও সমুদ্রের তীর ছাড়াও কাছাকাছি থাকা বাদা ও ধানজমিতেও খাবারদাবার সংগ্রহ করে। কাছাকাছি বাদা ও ধানজমির তো অভাব নেই। হয়তো আমার দেখা গুলিন্দা বাটানটি কাছাকাছি ধানক্ষেতের দিকেই উড়ে গেছে যেখানে ওদের অন্যান্য সঙ্গীসাথীরা রয়েছে। গুলিন্দা বাটান হল ছোট আকারের পরিযায়ী পাখি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

আগেই বলেছি, এদের বিশেষত্ব হল তিনটি যা সমগোত্রীয় অন্য পাখিদের থেকে একে আলাদা করে চিনে নিতে সাহায্য করে।। প্রথমটি হল লম্বা কালো রঙের নিচের দিকে বাঁকানো চঞ্চু। দ্বিতীয়টি হল লম্বা কালো রঙের পা। আর তৃতীয়টি হল ওড়ার সময় লেজের ওপরে ও ডানার প্রান্তে সাদা ব্যান্ড। এরা লম্বায় হয় ১৮ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার, আর ডানা বিস্তার করলে ৩৮ থেকে ৪১ সেন্টিমিটার। গড় ওজন ৪৪ থেকে ১১৭ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম হয়। শীতকালে যখন সুন্দরবন অঞ্চলে বা গ্রীষ্মমন্ডলে এরা আসে তখন এদের অপ্রজনন ঋতু। এই সময় এদের চেহারায় তেমন চাকচিক্য থাকে না। দেহের উপরের দিকের রঙ হয় হালকা ধূসর বাদামি আর নিচের দিকে রঙ সাদা। বুকের কাছে সাদার ওপরে সরু সরু বাদামি রেখা দেখা যায়। মাথার চাঁদির রং অনেকটা পিঠের মতোই হলেও গাল ও থুতনির রং হালকা ধূসর। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় চোখের ওপরে সাদা রঙের একটা ভ্রু রয়েছে। আর চোখ ও চঞ্চুর মাঝে কিছুটা অংশ গাঢ় বাদামি।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) দল বেঁধে খাবার সংগ্রহ গুলিন্দা বাটানের। (মাঝখানে) গুলিন্দা বাটানের ডিম। (ডানদিকে) ছানাসহ মা গুলিন্দা বাটান। ছবি: সংগৃহীত।

প্রজনন ঋতুতে এরা দেখতে কেমন হয় তা স্বচক্ষে না দেখলেও ছবিতে দেখেছি। এই সময় এদের পিঠের রঙে ইটের মতো বা মরিচার মতো বা তামাটে ছোপ দেখা যায়। এক নজরে দেখলে মনে হবে ধূসর কালো ও তামাটে রঙের ছোপওয়ালা পিঠ। ডানার প্রান্তের পালকেও কালো, সাদা ও তামাটে রঙের লম্বাটে ডোরা দেখা যায়। পেটের রঙও হয়ে যায় তামাটে বা মরিচা লাল। অবশ্য মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণে সাদা পালকও উঁকি দেয়। মাথা ঘাড় গাল গলা বুক সর্বত্রই ইট বা মরিচা রঙা বা তামাটে পালকের আধিক্য দেখা যায়। এদের বিজ্ঞানসম্মত নামের প্রজাতি ফেরুজিনিয়া নামকরণের পেছনে রয়েছে এই রঙের উপস্থিতি। ল্যাটিন শব্দে ফেরুজিনিয়া মানে হল লোহার মরিচা।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

গুলিন্দা বাটানদের প্রধান খাদ্য হল জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি কবচি গোষ্ঠীর প্রাণী। কাদার মধ্যে লম্বা চঞ্চু ঢুকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত এরা খাবার খোঁজে। কখনো কখনো এদের শামুক এবং জলজ উদ্ভিদ নোনা শাকের (Salicornia brachiata) বীজ খেতেও দেখা যায়। তবে যে সব এলাকায় প্রচুর চিংড়ি পাওয়া যায়, সেখানে এদের আধিক্য দেখা গিয়েছে। আর সুন্দরবন অঞ্চল যে চিংড়ি প্রধান এলাকা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই হয়তো এখানে এদের আনাগোনা বেশি। শীতের শেষে গরম বাড়তে শুরু করলেই ওরা ফিরতে শুরু করে ওদের প্রজননভূমিতে অর্থাৎ সাইবেরিয়া অঞ্চলে। এপ্রিল মাসের মধ্যেই প্রায় সবাই ফিরে যায়। ফেরার আগে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করে শরীরে প্রভূত পরিমাণ চর্বি জমিয়ে নেয় যাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় শক্তির কোনও অভাব না ঘটে। শুধু তাই নয়, প্রজননের উপযুক্ত হয়ে উঠতেও ওদের উপকূলীয় অঞ্চলের খাবার দাবার খুবই উপযোগী।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৪ : প্রতিদ্বন্দ্বী-গণশত্রু: অন্তর্লোকের অ্যানাটমি

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

জুন থেকে আগস্ট মাস হল ওদের প্রজননকালীন সময়। এই সময় পুরুষ পাখিরা স্ত্রী পাখিদের সামনে উড়তে উড়তে নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে যাতে স্ত্রী পাখি তার দিকে আকৃষ্ট হয়। জোড় বাঁধার পর স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে মিলে কোনও জলাভূমির প্রান্তে কিংবা শুকনো ঘাসযুক্ত অঞ্চলের মাটিতে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী পাখি বাসায় ৩-৪টি ডিম পাড়ে। কালচে বাদামি ছোপযুক্ত ডিম। স্ত্রী গুলিন্দা বাটান একা প্রায় ১৯ থেকে ২০ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। বাচ্চাদের লালন-পালনের দায়িত্ব মা পাখির। ১৪ থেকে ১৬ দিন বাচ্চারা মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকে। তারপর তারা স্বাধীনভাবে খাবার দাবার সংগ্রহ করতে শুরু করে।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) উড়ন্ত গুলিন্দা বাটান। (ডানদিকে) অপ্রজনন ঋতুতে গুলিন্দা বাটান। ছবি: সংগৃহীত।

সুন্দরবন অঞ্চলে এদের এখনও অন্যান্য পরিযায়ী পাখিদের সাথে দেখা গেলেও আইইউসিএন (IUCN) কিন্তু জানাচ্ছে যে এরা বিপন্ন পাখি। সুন্দরবন অঞ্চল এদের জন্য এখনও নিরাপদ এবং খাদ্য সমৃদ্ধ এলাকা। তাই আজও এদের দেখতে পাই। কিন্তু আমরা বর্তমান প্রজন্মের মানুষ সুন্দরবনকে রক্ষা করতে আন্তরিকভাবে কতটা সক্রিয় তা নিয়ে আমার সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। সুন্দরবন তার স্বাভাবিকতা হারালে গুলিন্দা বাটানেরাও যে সুন্দরবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে কথা বলাবাহুল্য।—চলবে।

* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content