গত শীতে জানুয়ারি মাস নাগাদ ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে ট্রলারে চেপে হারউড পয়েন্ট জেটিঘাটে ফিরছিলাম। তখন বিকেল প্রায় চারটে। ভাঁটা শুরু হয়ে গিয়েছে। হারউড পয়েন্ট জেটির অদূরে জেগে উঠেছে কয়েকটি চর। আর সেই চরে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জলে পা ডুবিয়ে অনেক পাখি চরছে। কিছুদিন হল একটা বাইনোকুলার কিনেছি। বাইরে বেরোলে সেটি আমার সঙ্গেই থাকে। সুতরাং বাইনোকুলারে চোখ রাখলাম। দেখলাম অন্তত তিনটে জাতের পাখি মিলেমিশে খাবার সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। পাখিগুলোর চেহারা মোটামুটি ভালোই বোঝা গেল। এক নজরে দেখলে পার্থক্য করা বেশ মুশকিল। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তবেই পাখিগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য বোঝা যায়।
দুই ধরনের পাখির মধ্যে মিল অনেকটা বেশি। পার্থক্য ধরা পড়ে পায়ের রঙে। এক ধরনের পাখির পায়ের রং হালকা কমলা বা লাল, আর আরেক ধরনের পাখির পায়ের রং হলদেটে সবুজ। তৃতীয় যে ধরনের পাখি দেখলাম, প্রথমে মনে হয়েছিল ছোট গুলিন্দা। কিন্তু এদের তো ছোট গুলিন্দার মাথার চাঁদিতে তিলকের মতো যে সাদা দাগ থাকে তা নেই। তাছাড়া ছোট গুলিন্দার থেকে এদের আকারও বড়। বাড়ি ফিরে “বার্ডস অফ ইন্ডিয়া” এবং “চেনা অচেনা পাখি” বই দুটি খুলে চেনার চেষ্টা করতে লাগলাম। চেষ্টা বৃথা গেল না। তিনটে পাখিকেই শনাক্ত করতে পারলাম। এদের মধ্যে প্রথমে যে পাখিটির উল্লেখ করেছি সেই পাখিটি নিয়েই আলোচনা করব।
বাংলায় এই পাখিটির নাম হল বাটান। ইংরেজিতে নাম ‘Spotted Redshank’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Tringa erythropus’। বাটান পাখিটি হল সুন্দরবনের অন্যতম পরিযায়ী পাখি। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস হল সুন্দরবন অঞ্চলে এদের পরিযানের সময়। এদের মূল বাসস্থান হল উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়া, রাশিয়া এবং সাইবেরিয়া। এটা হল এদের প্রজননের অঞ্চল। যখন ওই অঞ্চলে প্রবল শীত তখন অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ক্রান্তীয় অঞ্চলে ওরা পরিযান করে। আর ওদের পরিযানের স্থান হল ভারত উপমহাদেশসহ পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং মধ্য ও উত্তর আফ্রিকা। সুন্দরবন অঞ্চল জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়ায় এখানে পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বাটানদের উপযুক্ত পরিবেশ সুন্দরবনের নদী ও খাঁড়ির চরে, সমুদ্র সৈকতে, অগভীর জলাভূমিতে পাওয়া যায়। তাই যথেষ্ট পরিমাণে বাটানদের উপস্থিতি রয়েছে সুন্দরবনে।
এই সময় স্ত্রী ও পুরুষ নির্বিশেষে এদের পিঠের দিকের রং হয় হালকা ধূসর বা ধূসর বাদামি। মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের পিছন দিকের রং ও ধূসর। লেজের রং বাদামি ধূসর এবং প্রান্তের দিকে সাদা রেখা দেখা যায়। তবে পেট ও লেজের নিচের রঙ সাদা। গলা ও বুকের রং হালকা ধূসর। চোখে কনীনিকা ঘিরে সাদা রঙের একটা সরু বলয় বোঝা যায়। তবে উপরের চঞ্চুর গোড়া থেকে একটা সাদা ডোরা দাগ উভয় চোখের ভ্রু পর্যন্ত প্রসারিত। এদের চঞ্চুর রং আগার দিকে ধূসর হলেও গোড়ার দিকে হালকা লাল বা কমলা রঙের হয়। আর ওদের পা ও আঙুলের রঙ হয় হালকা কমলা-লাল। নখের রঙ কালচে বাদামি।
সুন্দরবন অঞ্চলে উপস্থিত বাটানের এই হল রূপ। তবে ওরা যখন উত্তরে ওদের প্রজননভূমিতে অবস্থান করে তখন ওদের রূপ অনেকটাই পাল্টে যায়। তখন ওদের পালকের রঙ হয়ে যায় প্রায় কালো, আর সেই কালো পালকের উপর থাকে সাদা ছিট। নিচের চঞ্চুর গোড়ার দিকের রং হয় গাঢ় লাল আর আগার দিকের রঙ কালো। তখন পায়ের রঙ হয় আরো উজ্জ্বল লালচে কমলা। অপরিণত বাটানদের লেজ, পিঠ ও ডানার রঙ অপ্রজনন ঋতুর বাটানের মতো হলেও সাদার আধিক্য থাকে। পরিণত বাটান লম্বায় হয় প্রায় ২৯ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার, আর ডানা বিস্তার করলে দুই ডানা মিলিতভাবে ৫৯ থেকে ৬৬ সেন্টিমিটার বিস্তৃত হয়। এদের ওজন হয় ১২০ থেকে ২০০ গ্রাম। ওড়ার আগে বা ওড়ার সময় এরা “টিই-য়ে টিই-য়ে টিই-য়ে” শব্দ করে ডাকে।
এদের প্রিয় খাদ্য হল ছোট কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক, জলজ পোকামাকড় ও ছোটো মাছ। জলের মধ্যে কিছুটা পা ডুবিয়ে টলমল পায়ে হেঁটে হেঁটে ওরা খাবার শিকার করে। কাদা বা জলের মধ্যে লম্বা চঞ্চুটা ঢুকিয়ে ওরা খাবার খোঁজে। অনেক সময় জলের ধারে ছুটে গিয়ে শিকার ধরতেও দেখা যায়। আবার কখনও কখনও বেশি জলের মধ্যে পুরো মাথা ডুবিয়ে দিয়েও খাবার খোঁজে। পক্ষিবিদ অজয় হোম এদের কখনও কখনও হাঁসের মতো জলে ভেসে সাঁতার কাটতে কাটতে মাথা জলের নিচে ডুবিয়ে দিয়ে পেছনটা উপরদিকে তুলে ধরতে দেখেছেন। যদিও আমি এ দৃশ্য দেখিনি। এদের একা বা কয়েকটি মিলে খাবার শিকার করতে দেখা যায়। তবে অন্য পরিযায়ী জলচর পাখিদের মাঝে মিশে থাকতেও দেখা যায়, যেমনটা আমি দেখেছিলাম।
আগেই বলেছি, সুন্দরবন অঞ্চল কিংবা এশিয়া ও আফ্রিকা এদের প্রজননস্থল নয়। উত্তর গোলার্ধের তৈগা ও তুন্দ্রা অঞ্চল এদের প্রজননস্থল। জলের উৎসের কাছাকাছি এরা মাটির উপর আঁচড়ে সামান্য গর্ত করে তার উপর ঘাস-পাতা বা মস বিছিয়ে দেয়। তারপর স্ত্রী বাটান ৩-৪টি ডিম পাড়ে। ডিমের আকার পাখির তুলনায় বেশ বড়ো মনে হয়। কিছু বাটানকে নাকি কাশ্মীরে প্রজনন করতে দেখা গেছে। এদের ডিম লম্বায় প্রায় ৪৬ মিমি ও চওড়ায় প্রায় ৩২ মিমি। এদের স্ত্রী ও পুরুষের জোড় দীর্ঘস্থায়ী। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে বাসা বানানোয় অংশ নেয়। তা-ও দেয় দুজনে। ২৩-২৫ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে বাবা ও মা বাটান বাচ্চার দেখভাল করে। যদিও বাচ্চা উড়তে পারার আগেই মা তাদের ছেড়ে চলে যায়।
সুন্দরবনে এদের কোনও সঙ্কট আছে বলে শুনিনি। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে সমুদ্রের জলস্তর যেভাবে বাড়ছে তাতে বাটানদের ভবিষ্যতে খাদ্যসঙ্কট হতে পারে। সুন্দরবন অঞ্চলে বায়ু ও জলদূষণও ওদের সুন্দরবনবিমুখ করে দিতে পারে। সুন্দরবনের অন্যতম এই অতিথিকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com