আগের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম যে ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে ট্রলারে চেপে ফেরার সময় হারউড পয়েন্ট জেটিঘাটের কাছাকাছি একটি চরে তিন ধরনের পাখিকে জলে কিছুটা পা ডুবিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছিলাম। সেগুলিকে পরে শনাক্তও করতে পেরেছিলাম। সেই পাখিগুলির মধ্যে একটি ছিল বাটান যার কথা আগেই বিস্তারিত বলেছি। দ্বিতীয় যে পাখিটিকে দেখেছিলাম তার পায়ের রং ছিল হলদেটে সবুজ। আকারেও অন্য দুই প্রকারের থেকে বড়। এরাও পরিযায়ী পাখি।
ইংরেজিতে এদের নাম ‘Greenshank’ বা ‘Common Greenshank’, বাংলায় অজয় হোম নাম লিখেছেন গোত্রা। এই পাখিটিকে স্থানীয় মানুষ কী বলে আমার জানা নেই। গোত্রা, এই নামটা কিন্তু আমি আগে শুনিনি। অজয় বাবুর “চেনা-অচেনা পাখি” বইতেই প্রথম দেখলাম। হিন্দিতে বলে টনটনা বা টিমটিমা। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Tringa nebularia’। এরা বাটানের এক জাতভাই। একই গণের (Order) অন্তর্গত ওরা হল আরেকটি প্রজাতি (Species)। ওই বছরই ডিসেম্বরে যখন আবার ঘোড়ামারায় গিয়েছিলাম তখন দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে অনুরূপ দুটি পাখিকে দেখেছিলাম ধানি ঘাস জন্মানো চরে অল্প জলে লম্বা লম্বা পা ফেলে খাবারের খোঁজ করছে। চিনতে আর অসুবিধা হয়নি। বুঝে গেলাম, সুন্দরবন অঞ্চলে শীতের এই অতিথিরা এখনও যথেষ্ট সংখ্যায় আসে।
ভারতে পরিযায়ী হিসেবে আসা স্যান্ডপাইপার জাতীয় পাখিদের মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড় হল এই গোত্রা। এরা লম্বায় হয় ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার, আর দুদিকে ডানা বিস্তার করলে হয় ৬৮ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার। বেশিরভাগ সময় এদের হাঁটার ভঙ্গি খাড়া। পিঠের উপরের দিকের রং ধূসর। পিঠ ও ডানার পালকের কিনারায় সরু সাদা রেখা দেখা যায়। ডানার পালকের রং অপেক্ষাকৃত গাঢ়। এদের মাথা ঘাড় ও গলার রং হালকা ধূসর। আর তার ওপর খয়েরি রঙের ছোট ছোট ডোরা দাগ দেখা যায়। বুক, পেট ও লেজ সাদা। বুকের দু’পাশে অবশ্য সামান্য ডোরাযুক্ত ছাই রং। যখন এরা ওড়ে তখন লেজের সাদা আচ্ছাদক স্পষ্ট দেখা যায়। এদের চঞ্চুর রং কালচে ধূসর। তবে ডগার দিকের রং প্রায় কালো। এদের চোখ দেখলে মনে হয় কালো গোলাকার চোখের পরিধি বরাবর সাদা রঙের একটা সুন্দর বর্ডার তুলি দিয়ে কেউ এঁকে দিয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এদের পা। সরু লম্বা দুটো পায়ের রং হলদেটে সবুজ। তাই ইংরেজিতে এদের নাম হয়েছে ‘Greenshank’। তবে এতক্ষণ গোত্রার চেহারার যে বর্ণনা দিলাম তা কিন্তু অপ্রজনন ঋতুর চেহারা। সুন্দরবন অঞ্চলে ওরা আসে শীতে যখন ওদের প্রজননের সময় নয়। তখন ওদের এমনই দেখায়। এদের মূল বাসস্থান হল উত্তর ইউরোপ ও উত্তর এশিয়া। প্রজনন ঋতুতে অর্থাৎ ওই অঞ্চলের গ্রীষ্মে ওরা ওই অঞ্চলে থাকে। তখন এদের চেহারা হয় অন্যরকম। তখন পিঠের ওপর দিকটা হয় গাঢ় বাদামি আর কালচে বাদামি রঙের রেখা পিঠ ও ডানা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। পেটের দিকের সাদা রঙের উপরেও তখন দেখা যায় কালচে বাদামি ডোরা। বুকের ওপরে ও ঘাড়েও কালচে বাদামি দাগ ও রেখা দেখা যায়। এই সময় মাথার চাঁদি যদিও সাদা থাকে, অন্যান্য অংশে বাদামি ও কালো রেখা দেখা যায়।
আগেই বলেছি গোত্রা হল সুন্দরবনের শীতকালীন পরিযায়ী পাখি। তবে শুধু সুন্দরবন নয় প্রায় পুরো ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশে এরা পরিযান করে। এদের পছন্দসই জায়গা হল অল্প জল যুক্ত জলাভূমি এলাকা, নদীর চড়া, চর, খাঁড়ি ও সমুদ্রের উপকূল। পুরো সুন্দরবন জুড়ে এই ধরনের এলাকা থাকায় গোত্রাদের সুন্দরবনে যথেষ্ট পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। অল্প জলে লম্বা পা ফেলে এরা খুব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে জলজ পোকামাকড়, ছোটখাট মাছ, কবচি ও কম্বোজ জাতীয় প্রাণী শিকার করে। জলের মধ্যে চঞ্চু ডুবিয়ে শিকার ধরতে বা খুঁজতে দেখা যায়। সময়ে সময়ে পুরো মাথা জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে খাবার খোঁজে। খাবার খোঁজার সময় এরা কিন্তু সোজা সামনের দিকে মাথাটাকে আগুপিছু ঝাঁকায়। তবে খাবার খুঁজতে খুঁজতে যদি কোনও বিপদের গন্ধ পায় তখন মাথাটাকে তুলে ধরে সামান্য উপর নিচ করে আর লেজটাকে ওঠা-নামা করাতে থাকে। ওড়ার সময় গোত্রা বেশ তীব্র শীসধ্বনির মতো ‘টি টি টি টিউ’ বা ‘টিটি টিউ’ বা ‘টিউ টিউ টিউ’ করে ডাকে।
এরা সাধারণত একা বা দুই থেকে পাঁচটি একসাথে ঘোরাফেরা করে। আর যখন পরিযান করে তখন ১৫ থেকে ২০টির এক একটি দল গঠন করে। সুন্দরবন অঞ্চল ওদের উপযোগী খাবারে সমৃদ্ধ হওয়ায় পুরো সময় জুড়ে প্রচুর খাবার খায়। ফলে শরীরে অনেকটা চর্বি জমিয়ে নেয়। তারপর এপ্রিল মাস নাগাদ নিজেদের প্রজননস্থলে ফিরে যাওয়ার জন্য জোট বাঁধে। অবশ্য কিছু কিছু পাখি নাকি সুন্দরবনে সারা বছরই থেকে যায়।
বলাবাহুল্য এরা সবাই প্রজননে অক্ষম গোত্রা। নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যাওয়ার পর মে থেকে জুন মাসের মধ্যে স্ত্রী গোত্রা ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার আগে একটি স্ত্রী ও একটি পুরুষ গোত্রা জোড় বাঁধে। অবশ্য পুরুষ ও স্ত্রী গোত্রা পৃথকভাবে চেনা যায় না। জলা ও স্যাঁতসেতে এলাকা হল গোত্রাদের প্রজননভূমি। জোড় বাঁধা সম্পূর্ণ হওয়ার পর পুরুষ গোত্রা মাটি আঁচড়ে তার উপরে পালক ও আশপাশ থেকে ঘাস পাতা এনে বাসায় বিছিয়ে দেয়। এইরকম একাধিক বাসা পুরুষটি বানায়। স্ত্রী গোত্রা যে বাসাটিকে পছন্দ করে সেখানে সে চারটে ডিম পাড়ে।
ডিমগুলি লালচে হলুদ রঙের হয়, আর তার ওপরে বেগুনি বা বাদামি বা কালচে রঙের ছিট থাকে। এক একটা ডিম লম্বায় হয় প্রায় ৪৪.৩ মিলিমিটার আর চওড়ায় ৩০.৪ মিলিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে পালা করে ডিমে তা দেয়। ২৪ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। স্ত্রী ও পুরুষ গোত্রা উভয়ে মিলেই বাচ্চাকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়। ২৫ থেকে ৩১ দিন বয়স হলে বাচ্চারা উড়তে শেখে।
আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ওরা উত্তর থেকে দক্ষিণে পাড়ি জমায়। দক্ষিণে আমাদের সুন্দরবন এলাকা ওদের বড় প্রিয় জায়গা। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করে ওরা প্রজননের জন্য উপযুক্ত হয়ে মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ আবার ফিরে চলে উত্তরের প্রজননভূমিতে। ওদের এই আসা-যাওয়ার পথের ধারে ওদের দেখে আমাদের মন খুশিতে ভরে ওঠে। যতদিন সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য বজায় থাকবে ততদিন গোত্রারাও নিশ্চয়ই সুন্দরবনে আসবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com