
ছবি: প্রতীকী।
কপিঞ্জল তখন একটু চিন্তা করে সেই খরগোশ শীঘ্রগকে বলল, বেশ! তবে তাই হোক! যদি স্মৃতিকেই তুমি প্রমাণ বলে স্বীকার করো তবে এখনই চলো কোনও এক স্মৃতিপাঠকের কাছে। ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষের জ্ঞান যার আয়ত্তে। তার রায়ই হবে চূড়ান্ত। তিনি যাঁর সপক্ষে রায় দেবেন—এই গাছের কোটরটি তারই হবে।
আমি, এক কৌতূহলী পাখি, গাছের ডালে বসে সমস্ত বাক্বিতণ্ডা শুনছিলাম। তাদের স্মৃতিপাঠকের সন্ধানে রওনা হওয়া দেখে ভাবলাম, এমন বিচার প্রক্রিয়া দেখা তো জীবনে সৌভাগ্যের বিষয়, তাই নীরবে ডানা মেলে উড়ে চললাম তাদের পিছনে পিছনে।
পথ ছিল ঘনজঙ্গলে ঢাকা। দুপুরের রোদ পিছনে ফেলে তারা এগিয়ে চলল স্মার্ত পণ্ডিতের খোঁজে। দেখলাম পাশের ঝোপ থেকেই হঠাৎ বেরিয়ে এল তীক্ষ্ণদংষ্ট্র নামের এক ভবঘুরে বনবিড়াল। সে লুকিয়ে সব শুনেছিল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নদীতীরে এক পবিত্র স্থান বেছে নিল। হাতে তুলে নিল কুশাঙ্কুর। তারপর এক পায়ে যোগী তপস্বীদের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে, দু’বাহু আকাশে তুলে, সূর্যের দিকে অনন্তে দৃষ্টি স্থির করে সে শুরু করল ধর্মকথার ঝংকার— “অহো! অসারোঽযং সংসারঃ, ক্ষণভঙ্গুরাঃ প্রাণাঃ, স্বপ্নসদৃশঃ প্রিযসমাগমঃ, ইন্দ্রজালবত্ কুটুম্বপরিগ্রহোঽযম্ – হায়! এ সংসার অসার, প্রাণ ক্ষণভঙ্গুর, প্রিয়জনের মিলন স্বপ্নসম, আত্মীয়পরিজনের স্নেহও ইন্দ্রজালের মতোই মায়াময় ইত্যাদি ইত্যাদি।”
আমি, এক কৌতূহলী পাখি, গাছের ডালে বসে সমস্ত বাক্বিতণ্ডা শুনছিলাম। তাদের স্মৃতিপাঠকের সন্ধানে রওনা হওয়া দেখে ভাবলাম, এমন বিচার প্রক্রিয়া দেখা তো জীবনে সৌভাগ্যের বিষয়, তাই নীরবে ডানা মেলে উড়ে চললাম তাদের পিছনে পিছনে।
পথ ছিল ঘনজঙ্গলে ঢাকা। দুপুরের রোদ পিছনে ফেলে তারা এগিয়ে চলল স্মার্ত পণ্ডিতের খোঁজে। দেখলাম পাশের ঝোপ থেকেই হঠাৎ বেরিয়ে এল তীক্ষ্ণদংষ্ট্র নামের এক ভবঘুরে বনবিড়াল। সে লুকিয়ে সব শুনেছিল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নদীতীরে এক পবিত্র স্থান বেছে নিল। হাতে তুলে নিল কুশাঙ্কুর। তারপর এক পায়ে যোগী তপস্বীদের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে, দু’বাহু আকাশে তুলে, সূর্যের দিকে অনন্তে দৃষ্টি স্থির করে সে শুরু করল ধর্মকথার ঝংকার— “অহো! অসারোঽযং সংসারঃ, ক্ষণভঙ্গুরাঃ প্রাণাঃ, স্বপ্নসদৃশঃ প্রিযসমাগমঃ, ইন্দ্রজালবত্ কুটুম্বপরিগ্রহোঽযম্ – হায়! এ সংসার অসার, প্রাণ ক্ষণভঙ্গুর, প্রিয়জনের মিলন স্বপ্নসম, আত্মীয়পরিজনের স্নেহও ইন্দ্রজালের মতোই মায়াময় ইত্যাদি ইত্যাদি।”
“শোনো হে জীবগণ!”—তার কণ্ঠে গম্ভীর্য ঝরে পড়ল “এই সংসার-মরুভূমির বুকে সবই বালির দানা! স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, মাতা, পিতা—কেউ চিরসাথী নয়। আমরা সবাই অনিত্যের যাত্রী। আমাদের আশেপাশের প্রিয় মুখগুলো শুধুই স্বপ্ন! যে আত্মীয়তার জালে জড়িয়ে আছো, তা মায়ার ইন্দ্রজাল ছাড়া কিছু নয়। আর এই মায়াজালে বন্দী থাকাই তো দুঃখের মূল!”
নদীর জলে সূর্যের প্রতিবিম্ব কাঁপছিল। তীক্ষ্ণদংষ্ট্রের আরও কিছুতা উচ্চ স্বরে বলল— “তত্ ধর্মং মুক্ত্বা নান্যা গতিঃ অস্তি। ধর্ম ছাড়া মুক্তির অন্য কোনও পথ নেই। শরীর এই মাটিতে মিশে যায় আর ধনসম্পদও কারও চিরকাল থাকে না। সবই এই বাতাসে মিলিয়ে যায়! মৃত্যু? সে তো নিঃশব্দ ছায়ার মত চিরসঙ্গী! তার আগমন কখনোই জানান দেয় না। তাই ধর্মচর্চা, পুণ্যসঞ্চয়ই জীবনের একমাত্র সার্থকতা। যে লোক ধর্মকর্ম কিছু না করে নিষ্ফল দিন কাটায়, তার অবস্থা আসলে কামারের ভস্ত্রা বা হাপরের মতো আগুনে ফুঁ দিয়ে যা কেবল লোহাকে পোড়ায় মাত্র। সেই যন্ত্রটির চলার ধরণ অনেকটা একটা জীবন্ত প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতো। যে মানুষ সারাদিনে কোনো ধর্মাচরণ না করে বৃথা দিন কাটায় সে ওই কামারশালার হাপরের মতো নামেই কেবল শ্বাসপ্রশ্বাস নেয় —আসলে সে মৃত।” এক্ষেত্রে ধর্মাচরণ বলতে যে কেবল পুজো-আচ্ছাকেই বোঝানো হয়েছে তা নয়; দান-ধ্যান করা বা নিত্য অধ্যয়ন করাও ধর্মাচরণেরই অংশ।
নদীর জলে সূর্যের প্রতিবিম্ব কাঁপছিল। তীক্ষ্ণদংষ্ট্রের আরও কিছুতা উচ্চ স্বরে বলল— “তত্ ধর্মং মুক্ত্বা নান্যা গতিঃ অস্তি। ধর্ম ছাড়া মুক্তির অন্য কোনও পথ নেই। শরীর এই মাটিতে মিশে যায় আর ধনসম্পদও কারও চিরকাল থাকে না। সবই এই বাতাসে মিলিয়ে যায়! মৃত্যু? সে তো নিঃশব্দ ছায়ার মত চিরসঙ্গী! তার আগমন কখনোই জানান দেয় না। তাই ধর্মচর্চা, পুণ্যসঞ্চয়ই জীবনের একমাত্র সার্থকতা। যে লোক ধর্মকর্ম কিছু না করে নিষ্ফল দিন কাটায়, তার অবস্থা আসলে কামারের ভস্ত্রা বা হাপরের মতো আগুনে ফুঁ দিয়ে যা কেবল লোহাকে পোড়ায় মাত্র। সেই যন্ত্রটির চলার ধরণ অনেকটা একটা জীবন্ত প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতো। যে মানুষ সারাদিনে কোনো ধর্মাচরণ না করে বৃথা দিন কাটায় সে ওই কামারশালার হাপরের মতো নামেই কেবল শ্বাসপ্রশ্বাস নেয় —আসলে সে মৃত।” এক্ষেত্রে ধর্মাচরণ বলতে যে কেবল পুজো-আচ্ছাকেই বোঝানো হয়েছে তা নয়; দান-ধ্যান করা বা নিত্য অধ্যয়ন করাও ধর্মাচরণেরই অংশ।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাম
সেই বেড়াল তীক্ষ্ণদংষ্ট্র কিছুক্ষণ থামল, তার চোখে এক কপট অতীন্দ্রিয় দীপ্তি। তারপর গর্জনের সুরে বললে উঠলো, “জানো কি? যে ধর্মাচরণ করে না, তার জীবন কুকুরের লেজের মতোই নিষ্ফলা! কুকুরের লেজ কি তার পিছনের গোপনাঙ্গকে ঢাকতে পারে? না মাছি-মশা তাড়াতে পারে? ঠিক তেমনই ধর্মহীন মানুষ—সে কেবল নামেই মানুষ, আকৃতিতে মানুষ, কিন্তু আচরণে পশু! হাঁটে, খায়, ঘুমায়, কিন্তু সে আসলে পশুর মতন! সে শুধু বেঁচে থাকে, কিন্তু জীবন ধারণ করে না।”
বেড়াল শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে থাকে— “যেমন ধানের মধ্যে জঙ্গলে জাত পুলাক (বা জঙ্গলি ধান), পক্ষীদের মধ্যে পতঙ্গ, প্রাণীদের মধ্যে মশা—তুচ্ছ ও নিন্দনীয়; তেমনি ধর্মবিমুখ মানুষও তুচ্ছ আর নিন্দনীয়! বৃক্ষের অপেক্ষা বৃক্ষের সার অংশ তার ফুল-ফল যেমন শ্রেষ্ঠ, দেহধারীদের মধ্যে উত্তম-বুদ্ধি যেমন শ্রেষ্ঠ, দুধের থেকে তার সার অংশ—ঘৃত (ঘি) যেমন শ্রেষ্ঠ, সর্ষের খোল থেকে তেল যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি মানুষ্যশরীরধারীর ধর্মকার্যই শ্রেষ্ঠ কার্য! ধর্মকর্মহীন অবিবেকী পুরুষ কেবল মলমূত্র ত্যাগ করে আর নিজের পেট ভরাবার চিন্তায় সারাদিন ঘুরে বেড়ায়! সে একটি পশু ছাড়া কিছুই নয় – যার জন্ম শুধু অন্যের সেবা করার জন্যই হয়!”
পরিশেষে সে বিড়াল-তপস্বী বলল, “ধীর স্থির মনোভাবই মনুষ্যত্বের অলংকার। তাই বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সব সময় সেইজনকেই শ্রদ্ধা করেন, যিনি তাড়াহুড়ো না করে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ধর্মের পথ তো সরল নয়, তা বিপদসংকুল, বহু শাখায় বিভক্ত এবং অনেক সময় অত্যন্ত দ্রুত পাল্টে যায়। তাই ধর্মকর্মে দেরি করা বিপজ্জনক, কারণ অতিরিক্ত দ্বিধা ও জটিল চিন্তা অনেক সময় সঠিক কাজটিকে বিলম্বিত করে দেয়। ফলে, ধর্মবোধকে বুঝতে হলে শুধু শোনা যথেষ্ট নয়, তা মন দিয়ে শ্রবণ করতে হয়, হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। আর একটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে: যা কিছু নিজের জন্য কল্যাণকর নয়, তা অন্যের প্রতিও কখনওই করা উচিত নয়।” সদ্য ধার্মিকের ভেক নেওয়া বিড়াল তীক্ষ্ণদন্তের নাটুকে ধর্মীয় কথাগুলো শেষ পর্যন্ত সেই কপিঞ্জল আর খরগোশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলো। কপটধার্মিক বিড়াল-তপস্বীর কথা শুনে খরগোশ শীঘ্রগ কপিঞ্জলকে বললো, “ওহে কপিঞ্জল! এই তো নদীতীরে ধর্মবাদী এক তপস্বীকে দেখতে পাচ্ছি— ‘তদেনং পৃচ্ছাবঃ’ —এঁনাকে গিয়েই জিজ্ঞাসা করা যাক।”
বেড়াল শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে থাকে— “যেমন ধানের মধ্যে জঙ্গলে জাত পুলাক (বা জঙ্গলি ধান), পক্ষীদের মধ্যে পতঙ্গ, প্রাণীদের মধ্যে মশা—তুচ্ছ ও নিন্দনীয়; তেমনি ধর্মবিমুখ মানুষও তুচ্ছ আর নিন্দনীয়! বৃক্ষের অপেক্ষা বৃক্ষের সার অংশ তার ফুল-ফল যেমন শ্রেষ্ঠ, দেহধারীদের মধ্যে উত্তম-বুদ্ধি যেমন শ্রেষ্ঠ, দুধের থেকে তার সার অংশ—ঘৃত (ঘি) যেমন শ্রেষ্ঠ, সর্ষের খোল থেকে তেল যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি মানুষ্যশরীরধারীর ধর্মকার্যই শ্রেষ্ঠ কার্য! ধর্মকর্মহীন অবিবেকী পুরুষ কেবল মলমূত্র ত্যাগ করে আর নিজের পেট ভরাবার চিন্তায় সারাদিন ঘুরে বেড়ায়! সে একটি পশু ছাড়া কিছুই নয় – যার জন্ম শুধু অন্যের সেবা করার জন্যই হয়!”
পরিশেষে সে বিড়াল-তপস্বী বলল, “ধীর স্থির মনোভাবই মনুষ্যত্বের অলংকার। তাই বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সব সময় সেইজনকেই শ্রদ্ধা করেন, যিনি তাড়াহুড়ো না করে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ধর্মের পথ তো সরল নয়, তা বিপদসংকুল, বহু শাখায় বিভক্ত এবং অনেক সময় অত্যন্ত দ্রুত পাল্টে যায়। তাই ধর্মকর্মে দেরি করা বিপজ্জনক, কারণ অতিরিক্ত দ্বিধা ও জটিল চিন্তা অনেক সময় সঠিক কাজটিকে বিলম্বিত করে দেয়। ফলে, ধর্মবোধকে বুঝতে হলে শুধু শোনা যথেষ্ট নয়, তা মন দিয়ে শ্রবণ করতে হয়, হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। আর একটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে: যা কিছু নিজের জন্য কল্যাণকর নয়, তা অন্যের প্রতিও কখনওই করা উচিত নয়।” সদ্য ধার্মিকের ভেক নেওয়া বিড়াল তীক্ষ্ণদন্তের নাটুকে ধর্মীয় কথাগুলো শেষ পর্যন্ত সেই কপিঞ্জল আর খরগোশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলো। কপটধার্মিক বিড়াল-তপস্বীর কথা শুনে খরগোশ শীঘ্রগ কপিঞ্জলকে বললো, “ওহে কপিঞ্জল! এই তো নদীতীরে ধর্মবাদী এক তপস্বীকে দেখতে পাচ্ছি— ‘তদেনং পৃচ্ছাবঃ’ —এঁনাকে গিয়েই জিজ্ঞাসা করা যাক।”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৪: দিগম্বরী দেবী : ঠাকুরবাড়ির সেরা সুন্দরী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে
বেড়াল তীক্ষ্ণদংষ্ট্রের ভণ্ড সাধুর বেশ, চোখে কৃত্রিম বৈরাগ্যের আবেশ, কণ্ঠে ধর্মের গুরুগম্ভীর বাণী—সব মিলিয়ে এক মোহনীয় ছটায় কপিঞ্জল আর শীঘ্রগকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বেড়ালটির নাটকীয় উপদেশ শেষ হতেই খরগোশটি উৎফুল্ল হয়ে কপিঞ্জলের দিকে ঘুরল। তার চোখে ঝিলিক দিচ্ছিল এক নির্মল বিশ্বাস, যেন মুক্তির পথ পেয়ে গেছে সে। “ওহে কপিঞ্জল!” শীঘ্রগ’র কণ্ঠে উচ্ছ্বাসের তরঙ্গ— “দেখো এই নদীর ঘাটেই দাঁড়িয়ে আছেন এক পরম ধার্মিক তপস্বী!
‘তদেনং পৃচ্ছাবঃ’। চলো, এঁকেই জিজ্ঞাসা করি, ইনি নিশ্চয়ই আমাদের বিবাদের নিষ্পত্তি করে দেবেন।”
কপিঞ্জল নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল সেই কপট ধর্মগুরুর দিকে। তার চোখে ভাসছে সংশয়, মনে জাগছে কৌতূহল আর সতর্কতার এক অদৃশ্য দেয়াল। সে বলল, “এই বিড়াল আমাদের স্বভাবশত্রু! পাখী এবং খরগোশ—দু’ই এদের খাদ্য। তাই দূর থেকেই এঁনার সঙ্গে কথাবার্তা বলাটা ভালো। হঠাৎ করে ব্রত ভেঙে যদি আমাদের দেখে খাওয়ার ইচ্ছে হয় তাহলে বিপদ।”
তখন দূর থেকে তারা দু’জনে বলল, “হে তপস্বী! হে ধর্মোপদেশক! আমাদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ ঘটেছে। আপনি ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী এই বিবাদের মীমাংসা করে দিন। আমাদের মধ্যে যে হীনবাদী বা মিথ্যাপক্ষ বলে প্রতিপন্ন হবে সে আপনার ভক্ষ্য হবে—আপনি তাকে খেতে পারেন।”
‘তদেনং পৃচ্ছাবঃ’। চলো, এঁকেই জিজ্ঞাসা করি, ইনি নিশ্চয়ই আমাদের বিবাদের নিষ্পত্তি করে দেবেন।”
কপিঞ্জল নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল সেই কপট ধর্মগুরুর দিকে। তার চোখে ভাসছে সংশয়, মনে জাগছে কৌতূহল আর সতর্কতার এক অদৃশ্য দেয়াল। সে বলল, “এই বিড়াল আমাদের স্বভাবশত্রু! পাখী এবং খরগোশ—দু’ই এদের খাদ্য। তাই দূর থেকেই এঁনার সঙ্গে কথাবার্তা বলাটা ভালো। হঠাৎ করে ব্রত ভেঙে যদি আমাদের দেখে খাওয়ার ইচ্ছে হয় তাহলে বিপদ।”
তখন দূর থেকে তারা দু’জনে বলল, “হে তপস্বী! হে ধর্মোপদেশক! আমাদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ ঘটেছে। আপনি ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী এই বিবাদের মীমাংসা করে দিন। আমাদের মধ্যে যে হীনবাদী বা মিথ্যাপক্ষ বলে প্রতিপন্ন হবে সে আপনার ভক্ষ্য হবে—আপনি তাকে খেতে পারেন।”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
তীক্ষ্ণদংষ্ট্র বললে, “হে ভদ্রদ্বয়! আপনারা এমন কথা বলবেন না— ‘মা মৈবং বদতম্’। নরক-পথের দ্বার উন্মোচনকারী এইসব হিংসা কর্ম আমি সব ছেড়ে দিয়েছি। কারণ অহিংসাই হলো পরমধর্ম। যুগ যুগ ধর্মবেত্তা সজ্জন মানুষেরা সকলে অহিংসাকেই পরমধর্ম হিসেবে মেনেছেন, তাই জোঁক, ছাড়পোকা বা উকুনের মতন অত্যন্ত স্বল্পকায় প্রাণীদেরও রক্ষা করা উচিত। পণ্ডিতেরা বলেছেন, যে নির্দয় মানুষ হিংস্র-প্রাণীদের হত্যা করে তারাও ভীষণ নরকে পতিত হয় আর অহিংসক নিরীহ প্রাণীদের যারা হত্যা করে তাদের তো কোনো কথাই নেই। শুধু তাই নয়, যে সব যাজ্ঞিকেরা বৈদিক যাগ-যজ্ঞ করতে গিয়ে পশুহত্যা করে তাদের মতোন মূর্খ তো আর দ্বিতীয়টি নেই, কারণ বাস্তবিক অর্থে তারা শ্রুতির কিছুই বোঝেননি।
শ্রুতে কেবল একথাই বলা হয়েছে যে ‘অজৈঃ যষ্টব্যম্’ —অজ অর্থাৎ ছাগল দিয়ে যজ্ঞ করতে হবে। আসলে অজ বলতে সাতবছরের পুরোনো ধান্যকে বোঝায়, কোনও বিশেষ পশুকে নয়, ‘অজা – ব্রীহযঃ তাবত্ সপ্তবর্ষিকাঃ কথ্যন্তে, ন পুনঃ পশুবিশেষাঃ।’ পণ্ডিতেরা বলেন—
বৃক্ষাংশ্ছিত্বা পশুন্ হত্বা কৃত্বা রুধিরকর্দমম্।
যদ্যেব গম্যতে স্বর্গে নরকং কেন গম্যতে।। (কাকোলূকীযম্ ১০৭)
অর্থাৎ গাছ কেটে, পশুহত্যা করে বা কাদায় হত্যালীলার রক্ত লাগিয়ে যদি কেউ বলে এইটাই স্বর্গের পথ। তবে প্রশ্ন জাগে, তবে নরকে যেতে হলে মানুষকে আর কী ভয়ংকর কিছু করতে হবে?
তীক্ষ্ণদংষ্ট্রের ধর্মীয় মুখোশ নিঃসন্দেহে কপটতা। কিন্তু এই নাটকীয় চরিত্রের ভিতরেই ধ্বনিত হয় এক প্রাচীন বিদ্রোহের স্বর — এ যেন খ্রিস্টপূর্ব যুগের সেই বেদবিরোধী প্রতিবাদীদের কণ্ঠস্বর, যারা আমিষাশী আর্য সংস্কৃতি ও নিরামিষবাদী শ্রমণ সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যদি যজ্ঞের নামে বৃক্ষচ্ছেদন, পশুবলি আর রক্তের কর্দমই স্বর্গের পথ হয়, তবে নরক শাস্তির যোগ্য পাপ কী?” —চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধ দার্শনিকদের এই জিজ্ঞাসা আজও প্রাসঙ্গিক।
এই শ্লোকটি নিছক তর্ক নয়; এটি এক তীক্ষ্ণ সামাজিক আয়না। যেখানে পুজোয় পশুবলি বা বন উজাড় করে মন্দির নির্মাণ—সবই ‘ধর্ম’ নামক পবিত্র আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু শ্লোকটি আমাদের ধাক্কা দিয়ে জাগায় —
“স্বর্গের লোভে আমরা যে রক্তপাত-প্রকৃতিদহনে মত্ত, তা কি ধর্ম না ধর্মের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা?”
শ্রুতে কেবল একথাই বলা হয়েছে যে ‘অজৈঃ যষ্টব্যম্’ —অজ অর্থাৎ ছাগল দিয়ে যজ্ঞ করতে হবে। আসলে অজ বলতে সাতবছরের পুরোনো ধান্যকে বোঝায়, কোনও বিশেষ পশুকে নয়, ‘অজা – ব্রীহযঃ তাবত্ সপ্তবর্ষিকাঃ কথ্যন্তে, ন পুনঃ পশুবিশেষাঃ।’ পণ্ডিতেরা বলেন—
যদ্যেব গম্যতে স্বর্গে নরকং কেন গম্যতে।। (কাকোলূকীযম্ ১০৭)
অর্থাৎ গাছ কেটে, পশুহত্যা করে বা কাদায় হত্যালীলার রক্ত লাগিয়ে যদি কেউ বলে এইটাই স্বর্গের পথ। তবে প্রশ্ন জাগে, তবে নরকে যেতে হলে মানুষকে আর কী ভয়ংকর কিছু করতে হবে?
তীক্ষ্ণদংষ্ট্রের ধর্মীয় মুখোশ নিঃসন্দেহে কপটতা। কিন্তু এই নাটকীয় চরিত্রের ভিতরেই ধ্বনিত হয় এক প্রাচীন বিদ্রোহের স্বর — এ যেন খ্রিস্টপূর্ব যুগের সেই বেদবিরোধী প্রতিবাদীদের কণ্ঠস্বর, যারা আমিষাশী আর্য সংস্কৃতি ও নিরামিষবাদী শ্রমণ সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যদি যজ্ঞের নামে বৃক্ষচ্ছেদন, পশুবলি আর রক্তের কর্দমই স্বর্গের পথ হয়, তবে নরক শাস্তির যোগ্য পাপ কী?” —চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধ দার্শনিকদের এই জিজ্ঞাসা আজও প্রাসঙ্গিক।
এই শ্লোকটি নিছক তর্ক নয়; এটি এক তীক্ষ্ণ সামাজিক আয়না। যেখানে পুজোয় পশুবলি বা বন উজাড় করে মন্দির নির্মাণ—সবই ‘ধর্ম’ নামক পবিত্র আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু শ্লোকটি আমাদের ধাক্কা দিয়ে জাগায় —
“স্বর্গের লোভে আমরা যে রক্তপাত-প্রকৃতিদহনে মত্ত, তা কি ধর্ম না ধর্মের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা?”
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৭: অসুস্থ মা সারদার জন্য ভক্তদের উদ্বেগ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
এখানেই জন্ম নেয় এক সেই গভীর দ্বন্দ্বের—জৈবিক সত্যটি মানুষ হলো মাংসাশী প্রাণী। আমাদের ক্যানাইন দাঁত কিংবা অন্ত্রের গঠন—সবই প্রমাণ করে আমরা বিবর্তনের ধারায় শিকারী। খাদ্যশৃঙ্খলে একে অপরকে ভক্ষণ করাই প্রকৃতির নিয়ম আর অহিংসার বাণী হলো তাই চরম আদর্শবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। গৌতম বুদ্ধ যখন বললেন, “সব প্রাণীর প্রতি অহিংসাই পরম ধর্ম” —তা ছিল এক বিপ্লবী দর্শন, যা প্রাণীহত্যাকে ‘অপবিত্র’ ঘোষণা করেছিল।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এই কাহিনিতে বিড়াল তীক্ষ্ণদংষ্ট্র যখন অহিংসার উপদেশ দেয়, তখন তা হাস্যকর হয় কেন? এইখানেই কূটনীতিটা বোঝবার। কারণ এই বিড়াল নিজেই একটি মাংসাশী প্রাণী। তার ধারালো দাঁত, শিকারি স্বভাব প্রকৃতির দেওয়া সত্য। সে যখন যজ্ঞে পশুবলির বিরোধিতা করে, তখন তার সেই মুখোশটাই তাকে ভণ্ড প্রতিপন্ন করে। জগতে এমন ভণ্ড চারিদিকেই আছে যারা নিজেরা মুরগি শিকার করলেও, মন্দিরে সেই মুরগি বলি দেওয়াকেই ‘অপবিত্র’ বলে প্রচার করে। তারাই বাইরে সাধু সাজে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা সকলেই অসাধু—সমাজে সাধুর মুখোশ পরে থাকে মাত্র।
আজকের বিশ্বে এই দ্বন্দ্ব আরও জটিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, একপ্রাণীকে বাঁচতে গেলে অন্যপ্রাণীকে হিংসা করাটা অনিবার্য সত্য। কৃষিকাজেও ফসল রক্ষায় পাখি বা পোকাকে মারতে হয়; চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যেও যে প্রাণীপরীক্ষা, তাতেও হিংসা অনিবার্য। এই পরিস্থিতিতে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে অপ্রয়োজনীয় প্রাণীপীড়ন কিংবা পরিবেশ ধ্বংস—এসব কি ‘ধর্মীয়’ অজুহাতে বৈধ? আসলে সত্যটা হলো যতদিন মানুষ বৃক্ষ কাটবে, প্রাণী হত্যা করবে—ততদিন এই শ্লোক এক তীক্ষ্ণ নৈতিক কম্পাস হয়ে থাকবে, আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে। এই শ্লোক তাই সময়ের গায়ে চিরন্তন এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে— আমরা আসলে কাকে পূজা করছি? ঈশ্বরকে, না রক্তমাখা অভ্যাসকে?—চলবে।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এই কাহিনিতে বিড়াল তীক্ষ্ণদংষ্ট্র যখন অহিংসার উপদেশ দেয়, তখন তা হাস্যকর হয় কেন? এইখানেই কূটনীতিটা বোঝবার। কারণ এই বিড়াল নিজেই একটি মাংসাশী প্রাণী। তার ধারালো দাঁত, শিকারি স্বভাব প্রকৃতির দেওয়া সত্য। সে যখন যজ্ঞে পশুবলির বিরোধিতা করে, তখন তার সেই মুখোশটাই তাকে ভণ্ড প্রতিপন্ন করে। জগতে এমন ভণ্ড চারিদিকেই আছে যারা নিজেরা মুরগি শিকার করলেও, মন্দিরে সেই মুরগি বলি দেওয়াকেই ‘অপবিত্র’ বলে প্রচার করে। তারাই বাইরে সাধু সাজে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা সকলেই অসাধু—সমাজে সাধুর মুখোশ পরে থাকে মাত্র।
আজকের বিশ্বে এই দ্বন্দ্ব আরও জটিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, একপ্রাণীকে বাঁচতে গেলে অন্যপ্রাণীকে হিংসা করাটা অনিবার্য সত্য। কৃষিকাজেও ফসল রক্ষায় পাখি বা পোকাকে মারতে হয়; চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যেও যে প্রাণীপরীক্ষা, তাতেও হিংসা অনিবার্য। এই পরিস্থিতিতে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে অপ্রয়োজনীয় প্রাণীপীড়ন কিংবা পরিবেশ ধ্বংস—এসব কি ‘ধর্মীয়’ অজুহাতে বৈধ? আসলে সত্যটা হলো যতদিন মানুষ বৃক্ষ কাটবে, প্রাণী হত্যা করবে—ততদিন এই শ্লোক এক তীক্ষ্ণ নৈতিক কম্পাস হয়ে থাকবে, আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে। এই শ্লোক তাই সময়ের গায়ে চিরন্তন এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে— আমরা আসলে কাকে পূজা করছি? ঈশ্বরকে, না রক্তমাখা অভ্যাসকে?—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















