
সুকুমার রায়কে নিয়ে বানানো একটি তথ্যচিত্রে উৎপল দত্ত।
সুকুমার রায় তথ্যচিত্রের একটি দৃশ্যে দেখা যায় এক পণ্ডিতমশাইকে। নেপথ্যে প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্যশিক্ষার দ্বন্দ্ব। হযবরলতেও এই দ্বন্দ্ব আছে। প্রসঙ্গটি বিতর্কিত। এ যেন সুকুমার রায়ের কবিতার সেই “খিলখিল্লির মুল্লুকেতে থাকত নাকি দুই বেড়াল/ একটা শুধােয় আরেকটাকে, “তুই বেড়াল, না মুই বেড়াল?”
আসলে দুজনেই বেড়াল। দুটি শিক্ষা ব্যবস্থাই আসলে দুটি পৃথক সিস্টেম, ইতি-নেতি দুটিতেই আছে। কিন্তু কোনওটিকেই আত্তীকরণ করতে না পারলে কেমন হয়? আসুন, আমরা দেখে নিই সেই স্যারকে, থুড়ি পণ্ডিতমশাইকে।
আসলে দুজনেই বেড়াল। দুটি শিক্ষা ব্যবস্থাই আসলে দুটি পৃথক সিস্টেম, ইতি-নেতি দুটিতেই আছে। কিন্তু কোনওটিকেই আত্তীকরণ করতে না পারলে কেমন হয়? আসুন, আমরা দেখে নিই সেই স্যারকে, থুড়ি পণ্ডিতমশাইকে।
পাঠশালা ছাত্রের প্রশ্নের উত্তরে পণ্ডিতমশাই জানাচ্ছেন ‘I go up, We go down’ এর অর্থটি ঠিক কী। জানাচ্ছেন একেবারে প্রাচ্যবিদ্যার আঙ্গিক থেকে। নাটক ঝালাপালা, পণ্ডিতমশাই উত্পল দত্ত তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গীতে ছাত্রকে জানান—
‘আই’— ‘আই’ কিনা চক্ষুঃ, ‘গো—গয়ে ওকারে গো গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ ‘আপ্’ কিনা আপঃ সলিলং বারি অর্থাৎ জল—গরুর চক্ষে জল—অর্থাৎ কিনা গরু কাঁদিতেছে- কেন কাঁদিতেছে—না উই গো ডাউন’, কিনা ‘উই’ অর্থাৎ যাকে বলে উইপোকা- ‘গো ডাউন’, অর্থাৎ গুদোমখানা— গুদোমঘরে উই ধরে আর কিছু রাখলে না—তাই না দেখে, ‘আই গো আপ্ গরু কেবলি কান্দিতেছে” (ঝালাপালা থেকে উদ্ধৃত)
‘আই’— ‘আই’ কিনা চক্ষুঃ, ‘গো—গয়ে ওকারে গো গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ ‘আপ্’ কিনা আপঃ সলিলং বারি অর্থাৎ জল—গরুর চক্ষে জল—অর্থাৎ কিনা গরু কাঁদিতেছে- কেন কাঁদিতেছে—না উই গো ডাউন’, কিনা ‘উই’ অর্থাৎ যাকে বলে উইপোকা- ‘গো ডাউন’, অর্থাৎ গুদোমখানা— গুদোমঘরে উই ধরে আর কিছু রাখলে না—তাই না দেখে, ‘আই গো আপ্ গরু কেবলি কান্দিতেছে” (ঝালাপালা থেকে উদ্ধৃত)
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?
নাটকের পুরো সংলাপটিই দৃশ্যায়নে ব্যবহৃত। “গৌ গাবৌ গাবঃ” বলার পর “ইত্যমরঃ” বলার ভঙ্গীতে যে প্রচ্ছন্ন হাস্যরস আছে তাতে অহেতুক তথ্যসূত্রের ভারবহনের প্রতি ব্যঙ্গ আছে, স্বাভাবিকতার যে ব্যাঘাত তার প্রতি আছে বিদ্রুপ। গুরুমশাই যে ইংরাজি জানেন তা তাঁকে প্রমাণ করতেই হবে। গুরু হবেন সর্বজ্ঞ, সকল কিছুই জানবেন। সুকুমারমতি ছাত্রকে মূর্খ ভেবে তাকে অবজ্ঞা করার এই গলদের জায়গাটা পরিচালক দেখাতে চাইছেন। বিদেশি ভাষা কিংবা ইংরাজির প্রয়োজনীয়তাকে অতিক্রম করে তার অভ্রান্ত হয়ে ওঠায় যে অসঙ্গতি এখানে সেটিই মূল প্রতিপাদ্য। “ন ঘরকা ন ঘাটকা”, “ঘরেও নহে পারেও নহে” হয়ে চলার যে দৈন্য তা বুঝি এখানে প্রোজ্জ্বল। একের উন্নতি, বহুর, সমষ্টির অবনমনের দুনিয়ায় পণ্ডিতমশায়ের ব্যাখ্যা যে চমত্কৃতির সৃষ্টি করে তা আপাত হাস্যকর, ইংরেজি-সংস্কৃত মেশানো ইং-সংটি অদ্ভুত এক ননসেন্স খেয়ালরসের আধার হলেও এর মূল ভাবটি হাসির নয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার
দেশীয় বা পাশ্চাত্য যেকোনো শিক্ষার মূল লক্ষ্য যে চেতনার জাগরণ তা এই সমষ্টির অবনমনে আদৌ হয়েছে কি? আজও তাই সমান প্রাসঙ্গিক সুকুমার রায়ের এই সৃজন ও সত্যজিৎ রায়ের দৃশ্যায়নটি। ভাষা প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে মোহের বন্ধনে আটকা পড়লে এমন দৃশ্যের জন্ম হয় যেখানে গুরুমশাই মনে করেন তাঁকে বৈদগ্ধ্য ও পাণ্ডিত্য দেখাতেই হবে যে বিষয়টি তিনি জানেন না, তিনি জানেন না এটাও সমধিক লুকোনোর প্রয়োজন আছে। আর ইংরাজি ভাষার প্রতি অক্ষম আকর্ষণের সূত্রটি বিস্তার করে করে যে তত্ত্বটি উঠে আসে তা বিচিত্র, গুদোমখানায় উইপোকা ধরেছে বলেই খাদ্যাভাবে গরুর চোখে জল। এই জল শিক্ষাব্যবস্থার গ্লানি, ওই গরু সুকুমারমতি ছাত্রের অজ্ঞতাকে মূর্খতায় নামিয়ে আনার প্রতীকটুকু। “অপরাজিত” চলচ্চিত্রে স্কুলে ইন্সপেক্টর আসার দিনে এই গরুটিই বুঝি অনেক অনুযোগ নিয়ে বিদ্যালয়ের দ্বারদেশে প্রতীক্ষা করছিলো “গুরু” আসার অপেক্ষায়। গতপর্বে তাকে আমরা দেখেছি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
গুদাম সঞ্চয়ের ক্ষেত্র, জ্ঞান বিতরণের বিষয়। স্বার্থকেন্দ্রিক সঞ্চয় ব্যক্তিকে উন্নত করে, সম্পন্ন করে, যেমনটা কাঙালের ধন চুরি করে রাজা হয়ে উঠতে হয়। এই অন্তঃসারশূন্যতাই গরুর চোখে জলের এই আশ্চর্য ননসেন্স রসে সিক্ত হয়ে উঠেছে। শক্তিমানের ভাষার প্রতি এই আনুগত্যের পাশেই শুষ্ক পাণ্ডিত্যের পরিসর, যা অশ্বডিম্ব ছাড়া কিছুই প্রসব করেনি দুনিয়ায়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু
পণ্ডিতমশায়ের ব্যাখ্যায় সকল বিদেশি শব্দ, তার অর্থ, তার বাক্যভঙ্গী সংস্কৃতায়িত হয়। সংস্কৃতভাষার শব্দ ও পদগঠনের অন্তরে যে শক্তি আছে তার যৌক্তিক ক্ষেত্রটির সন্ধান এখানে নেই, সম্ভবতঃ পণ্ডিতমশায়ের তা অধিগত নয়, কিন্তু বিদেশিভাষায় পারদর্শিতা দেখানোর আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি, যেকোনো নতুন জ্ঞানকে গতানুগতিকতার, বিশ্বাসের মোড়কে বেঁধে আত্মশ্লাঘাকে খানিক পুষ্ট করার, পরোক্ষে নবীনকে উপেক্ষা করার যে যে দুর্দমনীয় প্রচেষ্টা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় আছে তার অসাধারণ চিত্রায়ণ এই “আই গো আপ উই গো ডাউনের” দৃশ্যে সঞ্চিত। যে শিক্ষার ছবি এখানে দেখানো হয়েছে তা হীরক রাজার আনুগত্যপ্রিয় আকাঙ্ক্ষা ও তার গভীরে বয়ে চলা ভীষণ এক সর্বনেশে মুখ আর সার্বিক অজ্ঞতার থেকে অন্যতর নয়। উদয়ন পণ্ডিত কি করতেন পাঠশালায়? প্রতিদ্বন্দ্বীর শিক্ষিত যুবকের গড়ে ওঠা জীবনবোধ ও সমাজদর্শন কোন্ পাঠশালা থেকে জেগে ওঠে? পরের পর্বে আমরা চোখ রাখব সেখানেই।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















