কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

জাতকের গল্প গুলি আমাদের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ জীবনাদর্শ থেকে উচ্চতর জীবনবোধে উত্তীর্ণ করে। দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম, ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণায় জারিত আপাত সত্য, মিথ্যা, ভ্রান্তি, বিচ্যুতি, দ্বেষ কিংবা সংঘর্ষের পরেও যে শাশ্বত অনুভূতি ও উপলব্ধির ক্ষেত্রটি থাকে, জাতকমালার কাহিনীগুলি তার কাছেই পৌঁছে দিতে চায় তার পাঠক কিংবা শ্রোতাকে। জাতকের এই জগৎ তাত্ত্বিক নয়, প্রায়োগিক।
তত্ত্ব যে কথা বলে না, শেখায় না জীবনকে সেই সব অনুভূতি ও আঘাতের সামনে এনে ফেলে জাতককথা। ঊষর ভূমি যেমন কঠিন অস্ত্রের আঘাতে ফলবতী হয়, এ বুঝি তেমনই। জাতকের চরিত্রগুলি সুখী হয়েও সুখী নয়, প্রকৃত সুখকে সে অন্বেষণ করে। দুঃখভারে যে আনত, সে দুঃখকে অতিক্রম করতে চায়। যে ঈর্ষাকুটিল সে ধ্বস্ত হয়। যে অপাপবিদ্ধ সে বিপন্ন হয়েও শেষে জিতে যায়। যে মূর্খ, অপরিণামদর্শী সে আহত হয়। যে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বিভ্রান্ত-বিচলিত তার তমোময়ী জীবনরজনী পূর্ণিমাতিথির দিব্য উপলব্ধির
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৩: বকজাতক : শঠে শাঠ্যং

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১০: ভুতুম প্যাঁচা

অমলিন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। মানুষ জন্মায়, তার দেহ জৈবিক নিয়মে পরিণত হয়, ধ্বস্ত-ও হয় একদিন। একদিন রিক্ত ক্ষেত্রে শস্যের মতো নুয়ে পড়ে যে শরীরী জীবন, তার পরিণতি, বিকাশ জাগতিক নিয়মে ঘটে। কিন্তু সত্তার উন্মোচন ঘটে কি?

আজকের কাহিনিটি এক কচ্ছপের। কচ্ছপের আবেগসর্বস্ব মোহান্ধ মন্থরতা তাকে বিনষ্ট করেছিল।

বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বারাণসীতে এক কুম্ভকার হয়ে জন্মে তাঁর বৃত্তির দ্বারা পরিবারের প্রতিপালন করেন। তখন নদীর অনতিদূরেই এক প্রকাণ্ড হ্রদ ছিল। অত্যধিক বর্ষণে নদী ও হ্রদ একাকার হয়ে যেত। জল কমে গেলে তারা পুনরায় পৃথক্ হয়ে যেত। কুম্ভকার এই হ্রদ থেকে মাটি সংগ্রহ করে মৃণ্ময় দ্রব্য প্রস্তুত করতো। মাছ, কচ্ছপ ইত্যাদি জলবাসী প্রাণীরা বিপদের আগাম বার্তা পায়। তারা পরিমিত বর্ষণ কিংবা অনাবৃষ্টির আভাস পায়। সেবার সেই হ্রদের অধিবাসীরা এমন ভাবী অনাবৃষ্টির আভাস পেয়েছিল আগেই। যখন নদী ও হ্রদ একাকার হয়েছিল জলভারে, তখন তারা সেই হ্রদ ত্যাগ করে নদীতে চলে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

কেবল যায়নি কচ্ছপটি। সে তার জন্মস্থল, তার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের আশ্রয়ভূমি, তার পিতৃপুরুষের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমিটিকে ত্যাগ করতে চায়নি কোনওমতেই। ক্রমে এল খর গ্রীষ্ম, নিদাঘসন্তপ্ত দুর্দিন। সেই হ্রদটি জলহীন হয়ে এল ক্রমে ক্রমে।

কুম্ভকার যেখান থেকে মাটি সংগ্রহ করতো, সেই স্থান থেকে মাটি তুলে নেওয়ায় সৃষ্টি। হয়েছিল গর্ত। কচ্ছপ সেই গর্তে আশ্রয় নিল। সে গর্তটিকে হয়তো নিরাপদ ভেবেছিল। অবিলম্বে তার সেই ভ্রান্তি ঘুচে গেল। কুম্ভকার আবার এল মাটির সন্ধানে। শুষ্ক মাটির বুকে কোদালের আঘাত করে করে মাটি সংগ্রহ করতে লাগল। এই সময়েই কোদালের ভীষণ আঘাতে সেই কচ্ছপের অস্থি বিদীর্ণ হল। সে মৃত্যুমুখে পতিত হল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

মৃত্যুর আগে সে তার ত্রুটি, ভ্রান্তি উপলব্ধি করে কুম্ভকাররূপী বোধিসত্ত্বকে একটি দামী উপদেশ দিল। মোহের বশে এই হ্রদ, ওই কর্দম আঁকড়ে পড়ে থেকেই তার জীবন বিপন্ন হল। বনভূমিও যদি সুখদায়ক হয়, তবে সে-ই যোগ্য বাসস্থান, সে-ই প্রকৃত জন্মভূমি। যে স্থানে অকল্যাণ, যেখানে প্রাণরক্ষা পায় না তা নিতান্তই পরিত্যজ্য। কেবল মূর্খ ব্যক্তিই তাকে আপন ভেবে মোহাবিষ্ট হয়।

কুম্ভকার গ্রামে ফিরে গিয়ে সেই মৃত কচ্ছপটিকে দেখিয়ে সকল কথা বিশদে জানালো। উপদেশ দিল এমন ভ্রান্তি তাদের যেন না হয়।
কিন্তু এই কাহিনিটি কি নিতান্তই ভূমিকেন্দ্রিক, মাটি-পাথর, ইঁট-কাঠের বস্তুনিষ্ঠ বাসস্থানের মোহ ও মোহভঙ্গের কাহিনি কেবল এটি?
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

না। বোধিসত্ত্ব তাঁর প্রতিবেশীদের জাগতিক উদাহরণ সামনে রেখে উপদেশ দিয়ে জানালেন যে, রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শের সুখে আক্রান্ত ইন্দ্রিয়গুলির মোহে, পরিজন, বিত্ত কিংবা শক্তির তৃষ্ণায় অত্যাসক্তি বর্জনীয়। এই আসক্তি জীবনকে অচিরেই বিনষ্ট করবে। বোধিসত্ত্ব কৌশলে এই উপলব্ধির সম্মুখীন করলেন সমাগত জনবৃন্দকে। তত্ত্ব এই অনুভূতি জাগাতে পারে না, কেবল অভিজ্ঞতাই মানুষকে ঋদ্ধ করে। এই কাহিনির পাঠক উপলব্ধি করবেন অনিত্যতাকে। কোনও কিছুই যে জগতে অভ্রান্ত নয়, চূড়ান্ত নয় সেই সত্যবোধ জাগবে। যা এককালে অপরিহার্য, কালে কালে তা-ই পরিহার করতে হতে পারে এই সত্যবুদ্ধিটুকুর উদয় ঘটবে। কিন্তু তারপরেই সবিস্ময়ে পাঠক আবিষ্কার করবেন যে, এই ভূমি আসলে সেই পরিসর যেখানে আবাদ করলে সোনা ফলে। কিন্তু সেই পরের জায়গা পরের জমিনে গড়ে তোলা খেলাঘরটি আশ্রয় দেয়, কিন্তু ংঔঅখণ্ডংঃঔ কর্তৃত্ব দেয় না। ওই জীবন-জমিনের মালিক, নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিমানুষ নয়, তাই জীবনের প্রতি শরীরী অত্যাসক্তি তাকে সম্পন্ন নয়, বিপন্ন-ই করে। এই জাতককথা সেই নির্মোহ নিরাসক্ত জীবনানুভূতির উপদেশ দেয়।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content