
মা সারদা।
বাগবাজারে শ্রীমার আঙিনার মাথার আকাশ আজ থমথমে, বর্ষার মেঘের মতো। শরৎ মহারাজ মা সারদাকে সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসার যে সুবন্দোবস্ত করেছিলেন, এমনকি দৈব প্রতিকার, স্বস্ত্যয়নাদিরও অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেল। চিকিৎসারত ডাক্তার ও কবিরাজদের দর্শন দিয়ে ধন্য করে মা সারদা ১৩২৭ সনে বা ১৮৪২ শকাব্দে, ১৯২০ সালের একুশে জুলাই, বাংলার চৌঠা শ্রাবণে মঙ্গলবার রাত দেড়টার সময় তাঁর বাড়ি উদ্বোধনে মানবীলীলা সম্বরণ করলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পর তাঁর ভক্ত কমলা ঘোষ স্বপ্নে দেখেন যে শ্রীমা তাকে বলছেন, ‘বৌমা, আমার কায়া গিয়েছে, ছায়ার মতন তোমাদের সঙ্গেই আছি’। আর তার পরের বছরেই শ্রী’ম দেবীপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে উমেশবাবুকে লিখেছিলেন, ‘সেদিন স্বপ্নে দেখলাম মা বলছেন, তুমি আমার দেহত্যাগ যা দেখেছিলে, সে দেহ মায়িক, এই দেখ আমি সেইরকমই রয়েছি’। শ্রীমার একজন সন্ন্যাসী সন্তান বলেছেন, ‘কলকাতায় মার বাড়ির খুব কাছে থেকেও শেষের দিকে অনেকদিন তাঁকে দর্শন করতে যাইনি। শুধু একদিন মহারাজের দেওয়া দুটি আম নিয়ে তাঁকে দিয়েছিলাম। এরপর মা দেহ রাখলেন আর মহারাজেরও শরীর গেল। নিজেকে নিরাশ্রয় মনে হল।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৯: মা সারদার কাছের সেবিকাবৃন্দ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৬: ঠাকুরবাড়ির কন্যা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বন্দুক উঁচিয়ে জমিদারি-কাজে বের হতেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক
এই রকম অবস্থায় একদিন রাতে মা একজনকে দেখা দিয়ে বললেন, আমার নাম নিয়ে, ‘সে তোমার কাছে আছে, তুমি ওকে দেখো। ও বড় অভিমানী, আমাকে ভাবে আমি নিষ্ঠুর। ও জানে না, ঠাকুর পর্যন্ত আমাকে দয়াময়ী বলতেন। এই কথা বলে মা খুব কাঁদতে কাঁদতে আবার বললেন, ওর এই অভিমানের জন্যে আমার যে কত কষ্ট হয় তা সে একেবারেই বোঝে না। মা যাকে এই স্বপ্ন দিয়েছিলেন সে আমার ইহজীবনের একমাত্র বন্ধু’। শ্রীমার দেহ রাখার পরের দিন তাঁর পবিত্রদেহ সুগন্ধিফুল, চন্দন ও মালায় সাজিয়ে সাধুভক্তরা নৌকা করে বেলুড়মঠে নিয়ে যান। সেখানে গঙ্গাতীরে শ্রীমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৪: কচ্ছপজাতক: মোহ যারে এসে ধরে
এই সময় এমন এক ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ দিয়েছেন সেখানে উপস্থিত শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দ মহারাজজি যার কোন ইহজাগতিক ব্যাখ্যা নেই। শ্রীমার চিতা জ্বলছে, ঠিক ওই সময়েই দেখা গেল যে, গঙ্গার অপরপারে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এমন বৃষ্টি যে, ঘরবাড়ি, গাছপালা কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে সেই বৃষ্টি গঙ্গার মাঝ বরাবর অবধি ধেয়ে এল। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। এবার তবে বৃষ্টি এপারেও হানা দেবে। তখন শবদাহের কি হবে? দেখা গেল যে, দাহকার্য সম্পন্ন না হওয়া অবধি বৃষ্টি গঙ্গার মাঝ বরাবরই বন্দি হয়ে রইল। আর বেলুড়মঠে তখন খটখটে রোদ।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৯: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন অম্বিকা চক্রবর্তী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?
দাহকার্য শেষ হলে স্বামী নির্মলানন্দ ঘড়া নিয়ে গঙ্গানদী থেকে জল ভরে এনে শরৎ মহারাজকে দিয়ে বললেন, ‘আপনিই প্রথম জল দিন’। শরৎ মহারাজ জল দেবার পরই চিতা নেভানোর জন্য অন্যরা জল আনতে গঙ্গায় গেলেন। তবে আর জলের দরকার হল না। শরৎ মহারাজের জল দেবার পরই এপারেও ধারাবর্ষণ শুরু হল। চিতার আগুন নিভল। যেন মনে হল, পরমাপ্রকৃতির লীলাবসানে প্রকৃতির অন্তিম অঞ্জলি। মা সারদার মানবীলীলার অবসানও এই ভাবে দিব্য মহিমায় দীপ্যমান হয়ে রইল। সেবছরই সেখানে শ্রীমায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরের মধ্যে গঙ্গাভিমুখী মা সারদার প্রতিমা স্থাপিত হয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৫: কতদিন পরে এলে
এই বিষয়ে স্বামীজি বলতেন, ‘সবার আগে চাই মায়ের মঠ’। স্বামীজীর ইচ্ছা ছিল, ‘মাকে কেন্দ্র করে গঙ্গার পূর্বপারে মেয়েদের জন্য একটি মঠ স্থাপন করতে হবে। এই মঠে যেমন ব্রহ্মচারী সাধু সব তৈরি হবে, ওপারে মেয়েদের মঠেও তেমনি ব্রহ্মচারিণী সাধ্বী সব তৈরি হবে’। স্বামীজির ইচ্ছা পূর্ণ করে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাতীরে প্রথমে ‘শ্রীসারদা মঠ’ আর পরে ১৯৮১ সালে মন্দির সহ নাটমন্দির নির্মিত হয়। মা সারদা এই মন্দিরে নিত্যপূজিতা অধিষ্ঠাত্রীদেবীরূপে তাঁর আসনে বিরাজ করছেন। আর এই পুণ্য মাতৃতীর্থের পাশ দিয়ে সুরনদী গঙ্গা যেন শ্রীমার ভক্তসন্তানদের জন্য বিগলিত করুণারূপী অমৃতধারা হয়ে অবিরাম বয়ে চলেছে। মা সারদার কথা লিখতে গিয়ে কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে—‘আমি যদি জন্ম নিতেম মা সারদার কালে। ধন্য হত জীবন মম দর্শন তাঁর পেলে’।< strong >শেষ
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।/strong>


















