শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

মহর্ষি কণ্বের পালিতাকন্যা শকুন্তলাকে গান্ধর্ববিবাহবিধি অনুসারে বিবাহ করে নিজের রাজধানীতে ফিরে গিয়েছেন রাজা দুষ্মন্ত।তিনি মহর্ষির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে শকুন্তলার বিশ্বাস উৎপাদন করে, তাঁর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন। রাজধানীতে প্রস্থানের সময়ে শকুন্তলাকে মিথ্যা স্তোকবাক্যে ভুলিয়ে, বলেছিলেন, প্রেষয়িষ্যে তবার্থায় বাহিনীং চতুরঙ্গিণীম্।

তোমার জন্য চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দেব। রাজার মনে ছিল, মহর্ষি কণ্ববিষয়ে দুশ্চিন্তা। শকুন্তলার বিষয়ে তিনি হয়তো আর বিন্দুমাত্র ভাবেননি। মহর্ষি কাশ্যপ কণ্ব আশ্রমে ফিরে অলৌকিকশক্তিবলে কন্যার বিবাহবৃত্তান্ত জেনে, পাত্র দুষ্মন্তর ভূয়সী প্রশংসা করলেন, বিবাহে অকুণ্ঠ সমর্থন জানালেন তিনি। যথাকালে শকুন্তলা, অতি সুন্দর এক পুত্রের জননী হলেন। মহর্ষি কণ্বের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হল। শক্তিশালী রাজোচিত লক্ষণান্বিত বালকটির পিতার কাছে যাবার সময় হয়েছে এবার।

মহর্ষির নির্দেশানুসারে শিষ্যরা শকুন্তলাকে পৌঁছে দিলেন রাজগৃহে। বিবাহের শর্তানুযায়ী শকুন্তলা স্বপুত্রের জন্য, রাজা দুষ্মন্তের সিংহাসনের উত্তরাধিকার দাবি করলেন। রাজা সরাসরি শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। শকুন্তলার স্মৃতি মনে জাজ্বল্যমান অথচ ভান করলেন এ বিষয়ে যেন তিনি কিছুই জানেন না। শকুন্তলা, লজ্জিতা চরম লাঞ্ছিতা মনে করলেও তপোবনের শিক্ষানুসারে অর্জিত ক্রোধ সংযত করলেন। এক মুহূর্ত বক্তব্যবিষয়ে চিন্তা করে, দুঃখে, রাগে স্বামীর প্রতি নিজের ক্ষোভ ব্যক্ত করলেন। আপনি সবকিছু জেনেও একটুও শঙ্কিত না হয়ে সাধারণ মানুষ যেমন বলে থাকেন, তেমন করে কেন এমন বলছেন, “আমি তো (এ বিষয়ে) জানিনা?” জানন্নপি মহারাজ! কস্মাদেবং প্রভাষসে। ন জানামীতি নিঃশঙ্কং যথান্যঃ প্রাকৃতো জনঃ।।
রাজা মনে মনে নিশ্চয়ই জানেন শকুন্তলা সত্য বলছেন, না মিথ্যা বলেছেন। সৎসাক্ষীর মতো শুভ সত্যকথা বলুন, নিজেকে অসম্মানিত করবেন না। কল্যাণং বদ সাক্ষ্যেণ মাত্মানমবমন্যথাঃ। যিনি নিজের ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধ আচরণ করেন, নিজের প্রকৃত স্বরূপ লুকিয়ে রেখে তিনি নিজেকে চোর প্রতিপন্ন করে থাকেন। রাজা নিজেকে অদ্বিতীয় মনে করছেন।হৃদয়ের গভীরে সর্বদ্রষ্টা চিরপুরাতন, সর্বজ্ঞ, মননশীল জীবাত্মার অস্তিত্বসম্বন্ধে জানেন না তিনি? যিনি সব পাপীর পাপকর্মবিষয়ে অবহিত, তাঁর কাছে রাজা পাপ করছেন। যো বেদিতা কর্ম্মণঃ পাপকস্য তস্যান্তিকে ত্বং বৃজিনং করোষি।

মানুষ পাপ করে কিন্তু সে মনে করে, কেউ আমার পাপসম্বন্ধে জানেন না। অন্তর্যামী জীবাত্মা এবং দেবতারা তাঁকে জানেন। সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, ভূমি, জল, হৃদয়, যম, দিবা, রাত্রি, প্রাতঃসন্ধ্যা ও সান্ধ্যকালীন সন্ধ্যা এবং ধর্ম, এনারা মানুষের সব বৃত্তান্ত জানেন। ব্যক্তির কর্মের সাক্ষী,অন্তরস্থিত ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ জীবাত্মাকে যিনি, (সৎকর্মদ্বারা) সন্তুষ্ট রাখেন, বৈবস্বত যম স্বয়ং সেই কর্মহেতু তাঁর সমস্ত দুষ্ট কর্ম দূর করে থাকেন। যে দুরাত্মার দুষ্কৃতিবিষয়ে (অসৎকর্মাদিবিষয়ে) ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ জীবাত্মা সন্তুষ্ট নন, পাপী সেই পুরুষকে, যম যাতনা দিয়ে থাকেন। যিনি অবমাননা করে নিজেকে অন্যরূপ প্রতিপন্ন করেন, দেবতারা তাঁর জন্যে কল্যাণকর নন, কারণ তাঁর প্রকৃত স্বরূপ প্রমাণিত নয়। শকুন্তলা অভিযোগ করলেন, রাজা, শকুন্তলার মতো স্বয়ং উপস্থিত পতিব্রতা স্ত্রীকে, যিনি সম্মানীয়া অথচ যাঁকে রাজা অসম্মানিতা করছেন। সভায় কেন প্রাকৃতজনের মতো আমায় উপেক্ষা করছেন? আপনি কী শুনতে পাচ্ছেন? আমার এই সব কথা শূন্যে রোদন নয় তো? কিমর্থং মাং প্রাকৃতবদুপপ্রেক্ষসি সংসদি। ন খল্বহমিদং শূন্যে রৌমি কিং ন শৃণোষি মে।।

এবারে প্রত্যক্ষ বাচিক আক্রমণের পালা,শকুন্তলার কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা, রে দুষ্মন্ত, যদি আমার প্রার্থনানুসারে কথা না রাখেন তবে আপনার মাথাটি শতখণ্ডে বিদীর্ণ হবে। যদি মে যাচমানায়া বচনং ন করিষ্যসি। দুষ্মন্ত! শতধা মূর্দ্ধা ততস্তেঽদ্য স্ফুটিষ্যতি।। পুত্রের মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্য বর্ণনা করলেন শকুন্তলা। পুরাণাভিজ্ঞ ক্রান্তদর্শীরা বলেন, পতি, ভার্যার ভিতরে প্রবেশ করে আবার জন্ম নিয়ে থাকেন। সেই কারণেই পত্নীর অন্য নাম ‘জায়া’। যে পুরুষ বৈদিকসংস্কারসম্পন্ন তপস্যার তেজ হতে জন্ম নেয় যে, সেই তাঁর সন্তান।সন্তানাদি পূর্ববর্তী প্রয়াত পূর্বপুরুষদের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৬: চিত্রকূটে রামচন্দ্রের প্রতি তপস্বীদের অনাস্থাপ্রকাশ এবং অত্রিপত্নী অনসূয়ার উপদেশের কোনও প্রাসঙ্গিকতা আছে?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৮: রাখে হরি, মারে কে?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন

পুং নামক নরক হতে পিতাকে রক্ষা করেন পুত্র, তাই তার নাম ‘পুত্র’—এমনটাই বলে থাকেন স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা। ভার্যার সম্মান কেন? তিনিই ভার্যা যিনি গৃহকর্মে সুদক্ষা, যিনি সন্তানবতী, পতি-অন্তঃপ্রাণ এবং পতিব্রতা। ভার্যা, মানুষের অর্ধাঙ্গিনী, তিনিই পরম বন্ধু, তিনি ত্রিবর্গ অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কামের মূল, তিনিই পরিত্রাণের কারণ। পত্নীবান, ক্রিয়াশীল, সপত্নীক, গৃহস্থ, যাঁদের স্ত্রী আছে, তাঁরাই আনন্দে থাকেন, তাঁরাই শোভা পেয়ে থাকেন। নির্জনে পত্নী মধুরভাষিণী বান্ধবী, তাঁরাই ধর্মকার্যে পিতা, পীড়িত হলে তারাই জননী। সংসারের দুরূহ অরণ্যপথে পান্থজনের বিশ্রামস্থান তিনিই। যাঁর পত্নী আছেন, সেই পুরুষ বিশ্বাসযোগ্য। তাই ভার্যা পরমাশ্রয়। যাঁরা পতিব্রতা স্ত্রী তাঁরা, দুর্গম পথের একাকী যাত্রী প্রয়াত স্বামীর নিরন্তর অনুগমন করে থাকেন। প্রথমে প্রয়াতা ভার্যা পতির প্রতীক্ষায় থাকেন, স্বামী পূর্বে মৃত হলে সাধ্বী স্ত্রী তাঁর অনুসরণ করেন। পাণিগ্রহণের আবশ্যকতা আছে, এই কারণেই পতি, ইহলোকে ও পরলোকে ভার্যাকে লাভ করে থাকেন।

পণ্ডিতরা বলেন, মানুষ নিজে নিজেকেই (পত্নীগর্ভে) জন্ম দেন, সেই কারণে তিনি পত্নীকে পুত্রের জননীকে মায়ের মতো দেখে থাকেন। ভার্যাতে জাত পুত্রকে দর্পণে প্রতিবিম্বিত নিজের প্রতিচ্ছবিরূপে দেখে,জন্মদাতা পিতা, স্বর্গত পুণ্যবান মানুষের মতোই আনন্দিত হন। মনোবেদনায় ও রোগে পীড়িত মানুষ, দগ্ধ হতে হতে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ঘর্মাক্ত ব্যক্তির অবগাহন স্নানের আনন্দসুখ অনুভব করেন। রতি, প্রীতি ও ধর্ম স্ত্রীলোকের আয়ত্তাধীন দেখে, অতি ক্রুদ্ধ মানুষ, নারীর প্রতি কোনও অপ্রিয় কাজ করেন না। নারী নিজের চিরন্তন পবিত্র জন্মস্থান, নারী বিনা ঋষিদেরও সন্তানোৎপাদনসামর্থ্য নেই। পিতার কোলে আশ্রয় নিয়ে, ধূলিধূসরদেহে, পুত্র যখন পিতার শরীর আলিঙ্গন করে, তার থেকে বেশি (প্রাপ্তি) আর কিছু আছে কী? সেই আপনি,স্বেচ্ছায় উপস্থিত পুত্রকে কটাক্ষে নিরীক্ষণ করে কেন অবমাননা করছেন? স ত্বং স্বয়মভিপ্রাপ্তং সাভিলাষমিমং সুতম্। প্রেক্ষমাণং কটাক্ষেণ কিমর্থমবমন্যসে।। পিঁপড়ে পর্যন্ত নিজের ডিম ভেঙ্গে ফেলে না, প্রতিপালন করে থাকে, নিজে ধর্মজ্ঞ হয়ে নিজের পুত্রকে রাজা কেন পরিপালন করবেন না?
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা/পর্ব-৩১

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

বসন,নারী ও জলের সুখস্পর্শ ততটা নয়, যতটা সুখের, পুত্রের স্পর্শ। দ্বিপদ প্রাণীদের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, চতুষ্পদ প্রাণীদের মধ্যে গরু, গুরুজনদের মধ্যে গুরু শ্রেষ্ঠ, স্পর্শানুভূতি যাদের আছে তাদের মধ্যে পুত্রের পরশ সর্বোত্তম। এই প্রিয়দর্শন পুত্রকে আলিঙ্গন করে,স্পর্শ করুন রাজা। এই পৃথিবীতে পুত্রের স্পর্শ হতে প্রিয়তর কিছু নেই। গর্ভাবস্থা হতে তিন বৎসরকাল পূর্ণ হল, শকুন্তলা একে জন্ম দিয়েছেন। রাজার বিচ্ছেদজনিত দুঃখ বিনাশ করেছে পুত্রটি। ত্রিষু বর্ষেষু পূর্ণেষু প্রজাতাহমরিন্দম! ইয়ং কুমারং রাজেন্দ্র! তব শোকবিনাশনম্।। পুত্রের প্রসবসময়ে অন্তরিক্ষ হতে ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল, পুরুবংশীয় এই কুমার শতসংখ্যক অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠান করবে। মানুষ গ্রামান্তরে যাওয়ার সময়ে, স্নেহবশতঃ পুত্রকে কোলে নিয়ে মস্তকের আঘ্রাণ নিয়ে থাকেন। পুত্রদের জাতকর্মানুষ্ঠানের সময়ে বেদে উল্লিখিত মন্ত্রোচ্চারণ করেন,তাও রাজার জানা আছে। পুত্রের প্রতি আশীর্বাণী উচ্চারণ করলেন শকুন্তলা, প্রতিটি অঙ্গ হতে তেমনই হৃদয় হতে তুমি জন্ম নিয়েছে। পুত্র নামধারী তুমি যে আমার আত্মা, তুমি শত শরৎ বেঁচে থাক। অঙ্গাদঙ্গাৎ সম্ভবসি হৃদয়াদধিজায়সে। আত্মা বৈ পুত্রনামাসি স জীব শরদঃ শতম্।।

এই কুমার রাজার অঙ্গ হতে জাত। এক পুরুষ হতে অন্য পুরুষটির জন্ম হয়েছে। তাই সরোবরের নির্মল জলে প্রতিফলিত দ্বিতীয় আত্মারূপে রাজার পুত্রটিকে দেখা কর্তব্য। যেমন গার্হপত্য অগ্নি হতে আহবনীয় অগ্নির উৎপত্তি তেমন রাজা হতে পুত্রটির জন্ম, এক রাজাই দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছেন। রাজার সঙ্গে নিজের মিলনের বৃত্তান্ত রাজার স্মরণে আনলেন শকুন্তলা। মৃগয়ার উদ্দেশে ধাবিত রাজা মৃগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, শকুন্তলার পিতার আশ্রমে কুমারী শকুন্তলাকে পেয়েছিলেন। অপ্সরাদের মধ্যে প্রধান হলেন, উর্বশী, পূর্ব্বচিতি, সহজন্যা, মেনকা, বিশ্বাচী ও ঘৃতাচী। তাঁদের মধ্যে, ব্রহ্মা যাঁর উৎপত্তির কারণ, সেই মেনকা নামে অপ্সরা, স্বর্গ হতে পৃথিবীতে এসে, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে শকুন্তলার জন্ম দেন। সেই অবিশ্বস্তা অপ্সরা মেনকা, হিমালয়ের সমতলে, পরের সন্তানের মতো আমাকে পরিত্যাগ করে চলে যান। সা মাং হিমবতঃ প্রস্থে সুষুবে মেনকাপ্সরাঃ। অবকীর্য্য চ মাং যাতা পরমাত্মজমিবাসতী।।

শকুন্তলা জন্মান্তরে গুরুতর মন্দ কাজ করেছেন নিশ্চয়ই। তাই শিশু-অবস্থায় বন্ধুজন এবং সম্প্রতি রাজা, শকুন্তলাকে পরিত্যাগ করেছেন। তোমার স্বেচ্ছাচারিতার ফলে পরিত্যক্ত আমি নিজের আশ্রমে ফিরে যাব। নিজের পুত্র, এই বালকটিকে কিন্তু আপনি ত্যাগ করতে পারেন না। কামং ত্বয়া পরিত্যক্তা গমিষ্যামি স্বমাশ্রমম্। ইমন্তু বালং সংত্যক্তুং নার্হস্যাত্মজমাত্মনা।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৮: নীতি কেবল মুখোশ, রাজনীতির মূল হল কৌশল আর ছলনা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

দুষ্মন্ত চরম তাচ্ছিল্যসহকারে বললেন, শকুন্তলার গর্ভজাত পুত্রটির কথা তাঁর স্মরণে নেই। নারীরা অসত্যভাষিণী, কে শকুন্তলার কথায় আস্থা রাখবে? শকুন্তলার জননী, মেনকা নিষ্ঠুর, বেশ্যা, যিনি হিমালয়ে পরিত্যক্তনির্মাল্যের মতোই শকুন্তলাকে ছুঁড়ে ফেলেছেন। শকুন্তলার পিতা সেই বিশ্বামিত্র? তিনি ক্ষত্রিয় হয়েও নির্দয়। তিনি ব্রাহ্মণত্বের লিপ্সায় কামনার বশবর্তী হয়েছেন।দুষ্মন্তের ভাষায় যেন ব্যঙ্গের সুর।অপ্সরাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা মেনকা ও মহর্ষিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা বিশ্বামিত্র শকুন্তলার মাতা ও পিতা। তাঁদের সন্তান হয়ে কেন সে বারবণিতার ভাষায় কথা বলছেন? রে দুষ্টতাপসি, যে কথায় বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব,বিশেষ করে আমার সম্মুখে সেই কথা উচ্চারণ করতে একটুও লজ্জা হচ্ছে না তোমার?তুমি এখনই চলে যাও। অশ্রদ্ধেয়মিদং বাক্যং কথয়ন্তী ন লজ্জসে। বিশেষতো মৎসকাশে দুষ্টতাপসি! গম্যতাম্।।

রাজা যেন সম্পর্কের সাযুজ্য খুঁজে পাচ্ছেন না—সেই উগ্রস্বভাব মহর্ষি বা কোথায়,কোথায় বা সেই অপ্সরা মেনকা, আর দীনহীনা তাপসীর বেশধারিণী এই নারীই বা কোথায়? সন্দিগ্ধ রাজার প্রশ্ন, তোমার এই বৃহদাকৃতি বালক পুত্রটি, স্বল্পসময়ের মধ্যেই শালকাঠের স্তম্ভসদৃশ দীর্ঘ হল কি করে? অতিকায়শ্চ তে পুত্রো বালোঽতিবলবানয়ম্। কথমল্পেন কালেন শালস্তম্ভ ইবোদ্গতঃ।। শকুন্তলার জন্মের কারণ মেনকা,অতি নীচস্বভাবা, শকুন্তলাও বেশ্যার মতো কথা বলছেন। স্বেচ্ছাচারিণী মেনকা কামাসক্তা হয়ে শকুন্তলার জন্ম দিয়েছেন।হে তাপসি, অলক্ষ্যে ঘটে যাওয়া সবকিছু যা তুমি আমায় বলছ, সেগুলি আমি স্মরণ করতে পারছি না।তাই তুমি স্বেচ্ছায় চলে যাও। সর্ব্বমেতৎ পরোক্ষং মে যত্ত্বং বদসি তাপসি!। নাহং ত্বামভিজানামি যথেষ্টং গম্যতাং ত্বয়া।।

রাজা দুষ্মন্তের অসম্মানজনক প্রত্যাখ্যানের উত্তরে মহর্ষি কণ্বের পালিতা আশ্রমকন্যা শকুন্তলা, তাঁর আশ্রমবাসের পরিশীলিত শিক্ষানুসারে সংযতভাষায় রাজাকে বোঝাতে শুরু করলেন। রাজা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সাধারণের ধর্ম তাঁর নয়।আধুনিক যুগে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়, যাঁরা বিশিষ্ট, অনন্য, প্রশাসনিক পদাধিকারী তাঁরা সাধারণের প্রতিনিধি হলেও, তাঁদের আচরণেও হয়তো সীমাবদ্ধতা থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে যে কোন মহিলার প্রতি কামার্ত আচরণ করা তাঁদের শোভা পায় না। ন্যায়বিচারার্থীর মতোই, কাঠগড়ায় অসৎসাক্ষ্যের অভিযোগে রাজাকে কালিমালিপ্ত করতে একটুও দ্বিধান্বিত হননি শকুন্তলা। রাজার দ্বিচারিতার, ভণ্ডামির আবরণ ফাঁস করেছেন আশ্রমকন্যা শকুন্তলা। আধুনিকা স্পষ্টভাষিণী মহিলার কণ্ঠে তিনি রাজাকে দোষারোপ করে বলেছেন, যোঽন্যথা সন্তমাত্মানমন্যথা প্রতিপাদ্যতে।কিং তেন ন কৃতং পাপং চৌরেণাত্মাপহারিণা।।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

নিজের স্বরূপকে আড়াল রাখাও একরকম চৌর্যবৃত্তির নামান্তর। এই তস্করবৃত্তি আত্মস্বরূপ- অপহরণের দায়ে, অভিযুক্ত রাজা পাপী লোকের মতোই হয়তো শাস্তিযোগ্য—শকুন্তলা এই কথাই বলতে চেয়েছেন। মহাভারতের যুগে রাজতন্ত্রে, সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদাধিকারীর দণ্ডদাতা কেউ ছিলেন না। তাই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে শুধুই। আধুনিক যুগে প্রশাসনিক এমন ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে বহু নারীর আবেদনের সপক্ষে বিচারালয়ের দণ্ডাদেশ অনুসারে প্রশাসনিক পদচ্যুতি ও তার দরুণ সাজা বিরল উদাহরণ নয়। তবে সরলা বহু নারী বিচারার্থী হয়ে বিচারালয়ে পৌঁছতেই পারেন না। তাঁরা স্পষ্টভাষায় নিজের এবং সন্তানের অধিকার, দাবি করতেও হয়তো পারেন না। সমাজ তাঁদের ঘৃণ্য মনে করে, অবজ্ঞার অনাদরের অন্ধকারে নির্বাসিত হন তাঁরা।

মহর্ষি কণ্বের শিক্ষায় যাঁর বড় হয়ে ওঠা, তাঁর কাছে মানুষের মধ্যে অন্তর্লীন জীবাত্মার ধারণাটি স্পষ্ট। তাই পাপপুণ্যের ধারণাটি স্পষ্ট করতে প্রয়াসী হয়েছেন শকুন্তলা। সকলের অগোচরে কৃত পাপ,সে তো পাপ ছাড়া কিছু নয়। এই সত্যিটা আকাশ ,বাতাস, অন্তঃরীক্ষ, অন্তরালবর্তী দেবতারা সকলেই জানেন। জীবাত্মার মধ্যে রয়েছে মানুষের সুপ্ত বিবেকচেতনা। যম যিনি সংযত করেন সকলকে, তিনি সেই অসংযত দুষ্কর্মের শাস্তি দিয়ে থাকেন,সেটি বোধ হয় মনোবেদনাসম যমযন্ত্রণা। আত্মস্বরূপ গোপন করা, আত্ম—অবমাননার একটি রূপ। কারণ রাজা নিজেই নিজেকে অবিশ্বাস করে, ছদ্ম আবরণে মুখ লুকিয়েছেন। দেবতারাও তাঁর হিতাকাঙ্খী নন।শকুন্তলার যুক্তি— যোঽবমন্যাত্মনাত্মানমমন্যথা প্রতিপদ্যতে। ন তস্য দেবাঃ শ্রেয়াংসো যস্যাত্মাপি ন কারণম্।।

নিজের রাজকীয় উদারতা পরিহার করে, প্রতারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন রাজা। এ যে রাজকীয় স্বাভিমানবোধের অসম্মান। দুরাত্মা, প্রতারকের কাছে কোনও সঙ্গোপনে কৃত দুষ্কর্মের সাক্ষ্য গ্রাহ্য নয়। নারী হলে তো কথাই নেই। এক তুড়িতে প্রতারিতা নারীদের বক্তব্য উড়িয়ে দিতে,লম্পটদের কাছে এক লহমাই যথেষ্ট। এখানে সাধারণ একজন অকথিত ধর্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন রাজা দুষ্মন্ত। মহাভারতকার হয়তো ভরতবংশীয় রাজা দুষ্মন্তের প্রতি সৌজন্যবশত সোজাসুজি তকমাটি আরোপ করতে পারেননি। হাজার হলেও বংশগতিরক্ষায় মহর্ষি বেদব্যাসেরও অবদান আছে যে।তাই তাঁর ইচ্ছাপূরণের জন্যেই হয়তো শকুন্তলা পরিপূর্ণ সভায় রাজাকে অসম্মান করেননি। রাজা বলে দুষ্মন্তের এই দুষ্কর্মটি ধর্ষণের ব্যতিক্রম নয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

শকুন্তলা,পুত্রের রাজস্থানের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, পুত্রের মাহাত্ম্য কীর্তন বর্ণনা করলেন। পিতার ভূমিকা সম্বন্ধে, রাজাকে সচেতন করেছেন তিনি। পুত্রের জন্মে, পিতা ও মাতার সমান অবদান, এ যে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত স্বীকৃত সত্য। বংশধারার গতিকে অব্যাহত রাখে পুত্র। হায়, পুত্রের মায়ের অর্থাৎ ভার্যা শকুন্তলার দৈহিক সৌন্দর্যোপভোগের আনন্দের পরে, সেই ছায়াশীতল আশ্রয়টি ক্ষণিকের পরিত্যক্ত তরুচ্ছায়ার মতোই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন রাজা দুষ্মন্ত। পুত্রের ব্যক্তিত্বের দর্পণে নিজেকে দেখে আত্ম-আবিষ্কারের আনন্দে মেতে ওঠেন পিতা। পুত্রের সুখস্পর্শের আন্তরিক ইচ্ছা যাঁর নেই তিনি কেমন পিতা? পিতা যখন চরম অনাদরে,সুন্দর বালকটির শালস্তম্ভসদৃশ উচ্চতাবিষয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁর পিতা হওয়ার যোগ্যতা আছে কী? নেহাৎ নিজের পুত্রের রাজকীয় উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠায় অনমনীয়া, তেজস্বিনী, শকুন্তলার রক্তে হয়তো ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের নিজের লক্ষ্য পূরণের অদম্য জেদ ও উদ্যম রয়েছে। তাই আবারও মৃগয়াবিহারী আগন্তুক রাজার কণ্বাশ্রমে আগমনবৃত্তান্ত স্মরণ করেছেন। নিজের রক্তের উত্তরাধিকার অকপটে ঘোষণা করেছেন আবার।

শকুন্তলার জননী মেনকা, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার সৃষ্টি। তিনি সাধারণ অপ্সরামাত্র নন। পিতা, বিখ্যাত ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র,যিনি ক্ষত্রিয় হতে বহু প্রচেষ্টা ও তপস্যার ফলে ব্রাহ্মণত্বে উন্নীত হয়েছিলেন। শৈশবে মাতৃত্বের অবমাননা করে অপ্সরা মেনকা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন,সে কাহিনি তাঁকে আজও দুঃখ দেয়, সেই ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন সরলা শকুন্তলা। পরিত্যক্ত হওয়াই যেন তাঁর পূর্বজন্মকৃত কোন পাপের ফল বলে মেনে নিয়েছেন তিনি। শকুন্তলা নিজের পত্নীত্বের অধিকার অসম্মানজনক, এটি বুঝে, সেই অধিকারবোধ থেকে সরে এসেছেন। তিনি কিন্তু পুত্রের পিতৃত্বের অধিকারের দাবি হতে এক চুলও সরে আসেননি। মায়েরা বোধ হয় এমনি হন। এ বিষয়ে আধুনিকা ও প্রাচীনা কোন মায়েতেই ভেদ নেই কোন।

রাজা শকুন্তলার বিখ্যাত পিতামাতার ঐতিহ্যের গৌরব নস্যাৎ করতে এক মুহূর্ত সময় নেননি। শকুন্তলার সরল স্বীকারোক্তি, ছুঁড়ে ফেললেন তিনি। যাঁরা পাঁকে ভরা পথে পা রাখেন তাঁদের বোধ হয় কাদা ঘাঁটাতেই আনন্দ। তাই রাজা দুষ্মন্ত মেনকার আচরণে দুরভিসন্ধির গন্ধ পেয়েছেন,মহর্ষি বিশ্বামিত্রের সৎপ্রচেষ্টাকে হেয় করতে বিন্দুমাত্র গ্লানিবোধ করেননি। রাজার বিবেচনায় ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণত্বলিপ্সু ও মেনকার সঙ্গে সঙ্গমের কারণে একজন কামুক পুরুষমাত্র আর কিছু নন। এই দীনা শকুন্তলা হয়তো রাজার অনুগ্রহপ্রার্থিনী হওয়ার দরুণ রাজা ছদ্ম সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, শকুন্তলা, কী পিতামাতার গৌরবময় উত্তরাধিকারের যোগ্যা?

এই সবকিছু রাজা বলছেন সজ্ঞানে এবং তাঁর কোন স্মৃতি নষ্ট হয়নি। তাই এই দুর্বিনীত রাজার প্রগল্ভতা ক্ষমার অযোগ্য, সাধারণের মতোই তাঁর অপরাধ দণ্ডনীয়। আধুনিক বিচারব্যবস্থায় তাঁর এই জন্যে নির্দিষ্ট হত সুদীর্ঘ কারাবাস ও ক্ষতিপূরণ ধার্য হোত বিচারপ্রার্থিনী শকুন্তলার জন্য। কিন্তু সময় দ্বাপরযুগ, রাজতন্ত্র বর্তমান, রাজাধীন বিচারব্যবস্থায় রাজার এই ঔদ্ধত্যপ্রকাশ।মহাভারতকার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস মরমী মহাকাব্যকার। তাই শকুন্তলার প্রতি অবিচারের প্রতিবিধান আছে, আছে শুধু সময়ের অপেক্ষা। তা না হলে, ভরতের উদ্ভব হবে কীভাবে? ভরতবংশীয়দের ইতিকথা লেখা হবে কী করে?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content