
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
‘মহাভারত’ এই নামের সঙ্গে যাঁর নাম জড়িত তিনি হলেন রাজা ভরত। রাজা ঈলিনের ঔরসে পত্নী রথন্তরীর পুত্র দুষ্মন্ত। দুষ্মন্ত, বিশ্বামিত্রমুনির কন্যা শকুন্তলাকে বিবাহ করেন। শকুন্তলার গর্ভজাত সন্তান ভরত। ভরতরাজার নামানুসারে ভরতবংশীয় রাজারা এবং এই বংশোদ্ভূত পূর্ববর্তী রাজারাও ‘ভারত’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন।
ভরতজননী শকুন্তলা আশ্রমকন্যা, তাকে বিবাহ করলেন দুষ্মন্ত। এই বিবাহ সম্ভব হল কেমন করে? একদা মৃগয়াবিহারী রাজা দুষ্মন্ত, কণ্বমুনির আশ্রমদ্বারে উপস্থিত হলেন। আশ্রমোপযোগী বিনীতবেশ ধারণ করে, আশ্রমে প্রবেশ করলেন রাজা। শূন্য আশ্রমে মহর্ষি কণ্বের দেখা পেলেন না। রাজা দুষ্মন্ত উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিলেন, ক ইহ? ইতি এখানে কে আছেন?সেই কণ্ঠস্বর শুনে, লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো শ্রীময়ী এক কন্যা তপস্বিনীবেশে আশ্রম হতে বেড়িয়ে এলেন। নীলোৎপলতুল্যকৃষ্ণনয়না সেই কন্যা, রাজা দুষ্মন্তকে দেখে, দ্রুত তাঁকে স্বাগতসম্ভাষণ জানালেন এবং রাজাকে সম্মানিত করলেন। কন্যা, রাজাকে আসন, পাদ্য ও অর্ঘ্য প্রদান করে, রাজার কুশলসংবাদবিষয়ে প্রশ্ন করলেন। তারপরে তিনি, যথারীতি রাজাকে অর্চনা করলেন এবং রাজার আরোগ্যবিষয়ে অবগত হয়ে মৃদুমন্দ হেসে বললেন, কিং কার্য্যং ক্রিয়তামিতি। আমি (আপনার জন্যে) কি করতে পারি? সম্মানিত রাজা, মধুরভাষিণী, সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যাকে দেখে বললেন, তিনি মহান ঋষি কণ্বের সেবা করতে এসেছেন। মহাশয়া, ভগবান্ কণ্ব কোথায় গিয়েছেন? হে সুন্দরি, আমাকে বল। ক্ব গতো ভগবান্ ভদ্রে!তন্মমাচক্ষ্ব শোভনে। শকুন্তলা জানালেন, তাঁর পিতা ফল আহরণ করতে আশ্রমের বাইরে গেছেন।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই, রাজা আশ্রমে উপস্থিত ঋষির দেখা পাবেন।
ভরতজননী শকুন্তলা আশ্রমকন্যা, তাকে বিবাহ করলেন দুষ্মন্ত। এই বিবাহ সম্ভব হল কেমন করে? একদা মৃগয়াবিহারী রাজা দুষ্মন্ত, কণ্বমুনির আশ্রমদ্বারে উপস্থিত হলেন। আশ্রমোপযোগী বিনীতবেশ ধারণ করে, আশ্রমে প্রবেশ করলেন রাজা। শূন্য আশ্রমে মহর্ষি কণ্বের দেখা পেলেন না। রাজা দুষ্মন্ত উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিলেন, ক ইহ? ইতি এখানে কে আছেন?সেই কণ্ঠস্বর শুনে, লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো শ্রীময়ী এক কন্যা তপস্বিনীবেশে আশ্রম হতে বেড়িয়ে এলেন। নীলোৎপলতুল্যকৃষ্ণনয়না সেই কন্যা, রাজা দুষ্মন্তকে দেখে, দ্রুত তাঁকে স্বাগতসম্ভাষণ জানালেন এবং রাজাকে সম্মানিত করলেন। কন্যা, রাজাকে আসন, পাদ্য ও অর্ঘ্য প্রদান করে, রাজার কুশলসংবাদবিষয়ে প্রশ্ন করলেন। তারপরে তিনি, যথারীতি রাজাকে অর্চনা করলেন এবং রাজার আরোগ্যবিষয়ে অবগত হয়ে মৃদুমন্দ হেসে বললেন, কিং কার্য্যং ক্রিয়তামিতি। আমি (আপনার জন্যে) কি করতে পারি? সম্মানিত রাজা, মধুরভাষিণী, সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যাকে দেখে বললেন, তিনি মহান ঋষি কণ্বের সেবা করতে এসেছেন। মহাশয়া, ভগবান্ কণ্ব কোথায় গিয়েছেন? হে সুন্দরি, আমাকে বল। ক্ব গতো ভগবান্ ভদ্রে!তন্মমাচক্ষ্ব শোভনে। শকুন্তলা জানালেন, তাঁর পিতা ফল আহরণ করতে আশ্রমের বাইরে গেছেন।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই, রাজা আশ্রমে উপস্থিত ঋষির দেখা পাবেন।
ঋষির জন্য অপেক্ষমান রাজা দুষ্মন্ত সুতন্বী, কান্তিময়ী, সুহাসিনী অথচ তপস্যা ও সংযমের দরুণ উজ্জ্বলা, রূপবতী ও যৌবনবতী শকুন্তলাকে দেখে বললেন, হে সুন্দরনিতম্বে, আপনি কে? আপনি কার (কন্যা)? কী উদ্দেশ্যে বনে এসেছেন? হে সুন্দরি, এমন রূপগুণান্বিতা আপনার উদয় হয়েছে কোথা হতে? কা ত্বং কস্যাসি সুশ্রোণি!কিমর্থঞ্চাগতা বনম্। এবং রূপগুণোপেতা কুতস্ত্বমপি শোভনে।। রাজা অকপটে জানালেন, দর্শনমাত্র শুভান্বিতা শকুন্তলা, রাজার মনটি হরণ করেছেন। শকুন্তলার সঙ্গে পরিচয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন রাজা। ইচ্ছামি ত্বামহং জ্ঞাতুং তন্মামাচক্ষ্ব শোভনে। মধুর হেসে,শকুন্তলা জানালেন,সকলে মনে করেন, তিনি তপস্বী, ধৈর্য্যবান, ধর্মজ্ঞ, উদারচেতা মহর্ষি কণ্বের কন্যা। সকল লোকের সম্মানিত ভগবান কণ্ব ঊর্দ্ধরেতা। ধর্ম স্বয়ং কর্তব্যচ্যুত হতে পারেন, একজন ব্রতনিষ্ঠ ব্রহ্মচারী কিন্তু নিজ কর্তব্যভ্রষ্ট হন না। কীভাবে সুতনুকা শকুন্তলা তাঁর ঔরসজাতা কন্যা হলেন? রাজার মনে এ বিষয়ে গভীর সংশয় রয়েছে যা হয়তো শকুন্তলা দূর করতে পারেন। সংশয়ো মে মহানত্র তন্মে চ্ছেত্তুমিহার্হসি।। কেন তিনি কণ্বমুনির কন্যা? পূর্বে শকুন্তলা তাঁর জন্মবিষয়ক যা কিছু,শুনেছেন সেই সব বৃত্তান্ত যথাযথ শোনালেন। আশ্রমে সমাগত, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসু কোন এক ঋষির কাছে মহর্ষি কণ্ব, যেভাবে শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত বলেছিলেন, সেটি শকুন্তলা বর্ণনা করলেন।
একদা কঠোর তপস্যায় নিরত,মহান তপস্বী, বিশ্বামিত্র দেবরাজ ইন্দ্রের মনে ভয়ানক উদ্বেগ সৃষ্টি করলেন। তপস্যালব্ধশক্তিতে দীপ্যমান ঋষি তাঁকে স্থানচ্যুত করতে পারেন এই আশঙ্কায় ভীত দেবেন্দ্র মেনকাকে, অপ্সরাদের মধ্যে নিজের দিব্যগুণহেতু বিশিষ্টা মেনকাকে বললেন, হে কল্যাণি, আমার অভীপ্সিত কাজটি কর। যেমন বলছি সেই মতো শোন। শ্রেয়ো মে কুরু কল্যাণি! যত্ত্বাং বক্ষ্যামি তচ্ছৃণু। ঘোর তপস্যারত,সূর্যসম মহাতপস্বী বিশ্বামিত্রবিষয়ে, নিজের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন। ভয়ে কাঁপছে তাঁর মন। দেবরাজ ইন্দ্র, মেনকাকে বিশ্বামিত্রবিষয়ে গুরুদায়িত্বভার অর্পণ করলেন। ব্রতনিষ্ঠ দুর্ধর্ষ তপস্বী কঠোর তপস্যায় নিরত। রাজর্ষি বিশ্বামিত্র যাতে দেবরাজকে আসনচ্যুত করতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে তুমি তাঁকে প্রলুব্ধ কর। তাঁর তপশ্চর্যায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে, আমার প্রিয়কাজটি কর। স মাং ন চ্যাবয়েৎ স্থানাত্তং বৈ গত্বা প্রলোভয়। চর তস্য তপোবিঘ্নং কুরু মে প্রিয়মুত্তমম্।। হে বরাঙ্গনে, রূপযৌবনমাধুর্যে, ছলাকলাসহ স্মিতসম্ভাষণে আকৃষ্ট করে, তাঁকে তপস্যা হতে নিবৃত্ত কর। রূপযৌবনমাধুর্য্য-চেষ্টিতস্মিতভাষণৈঃ। লোভয়িত্বা বরারোহে! তপসস্তং নিবর্ত্তয়।।
একদা কঠোর তপস্যায় নিরত,মহান তপস্বী, বিশ্বামিত্র দেবরাজ ইন্দ্রের মনে ভয়ানক উদ্বেগ সৃষ্টি করলেন। তপস্যালব্ধশক্তিতে দীপ্যমান ঋষি তাঁকে স্থানচ্যুত করতে পারেন এই আশঙ্কায় ভীত দেবেন্দ্র মেনকাকে, অপ্সরাদের মধ্যে নিজের দিব্যগুণহেতু বিশিষ্টা মেনকাকে বললেন, হে কল্যাণি, আমার অভীপ্সিত কাজটি কর। যেমন বলছি সেই মতো শোন। শ্রেয়ো মে কুরু কল্যাণি! যত্ত্বাং বক্ষ্যামি তচ্ছৃণু। ঘোর তপস্যারত,সূর্যসম মহাতপস্বী বিশ্বামিত্রবিষয়ে, নিজের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন। ভয়ে কাঁপছে তাঁর মন। দেবরাজ ইন্দ্র, মেনকাকে বিশ্বামিত্রবিষয়ে গুরুদায়িত্বভার অর্পণ করলেন। ব্রতনিষ্ঠ দুর্ধর্ষ তপস্বী কঠোর তপস্যায় নিরত। রাজর্ষি বিশ্বামিত্র যাতে দেবরাজকে আসনচ্যুত করতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে তুমি তাঁকে প্রলুব্ধ কর। তাঁর তপশ্চর্যায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে, আমার প্রিয়কাজটি কর। স মাং ন চ্যাবয়েৎ স্থানাত্তং বৈ গত্বা প্রলোভয়। চর তস্য তপোবিঘ্নং কুরু মে প্রিয়মুত্তমম্।। হে বরাঙ্গনে, রূপযৌবনমাধুর্যে, ছলাকলাসহ স্মিতসম্ভাষণে আকৃষ্ট করে, তাঁকে তপস্যা হতে নিবৃত্ত কর। রূপযৌবনমাধুর্য্য-চেষ্টিতস্মিতভাষণৈঃ। লোভয়িত্বা বরারোহে! তপসস্তং নিবর্ত্তয়।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর
মেনকা স্বীকার করলেন অমিততেজস্বী ভগবান বিশ্বামিত্র, তিনি কঠোরতপস্বীও বটে, তিনি যে কোপনস্বভাব ঋষি, এই তথ্য ভগবান ইন্দ্রের অজ্ঞাত নয়। মেনকার উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, সেই মহাত্মার তেজ, তপস্যা, ক্রোধের প্রকোপে, আপনিও উদ্বেগ বোধ করেন, আমি কেন উদ্বিগ্ন হব না? তেজসস্তপসশ্চৈব কোপস্য চ মহাত্মনঃ। ত্বমপ্যুদ্বিজসে যস্য নোদ্বিজেয়মহং কথম্।। মেনকা, বিশ্বামিত্রের শক্তিমত্তার বৃত্তান্ত ও উদাহরণ একে একে বর্ণনা করতে লাগলেন। মহাত্মা বশিষ্ঠের পুত্রদের বিয়োগান্তক পরিণতির কারণ বিশ্বামিত্র। রাজর্ষি বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় হয়েও বলপূর্বক ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। তিনি স্নানাদিশৌচকর্মের জন্যে দুর্গম ও প্রভূতজলে পূর্ণ নদী সৃষ্টি করেছিলেন, যে পবিত্রনদীটি পৃথিবীতে কৌশিকী নামে অভিহিত। পুরাকালে মতঙ্গ অর্থাৎ ত্রিশঙ্কু ব্যাধ হয়েও, দুর্গত অবস্থায় উপনীত এই মহাত্মার পত্নীদেরকে ভরণপোষণ করেছিলেন। দুর্ভিক্ষের অবসানে বিশ্বামিত্রমুনি আশ্রমে ফিরে এসে নদীটির ‘পার’ এই নামকরণ করলেন। সন্তুষ্টচিত্তে স্বয়ং বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুকে যাজন করলেন। দেবরাজও বিশ্বামিত্রমুনির ভয়ে সোমরস পান করতে গিয়েছিলেন। শ্রবণানক্ষত্রযুক্ত নতুন নক্ষত্রলোক ক্রুদ্ধ মহর্ষির বিনির্মাণ।
ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠর শাপ হতে রাজর্ষি বিশ্বামিত্র কীভাবে মুক্ত করবেন আমায়? — গুরুর দ্বারা অভিশপ্ত এমন আশঙ্কিত ত্রিশঙ্কুকে আশ্রয় দিলেন কৌশিক বিশ্বামিত্র। দেবতারা যখন যজ্ঞাঙ্গগুলি অবজ্ঞাবশত বিনষ্ট করেলেন তখন মহাতেজস্বী বিশ্বামিত্র যজ্ঞাঙ্গসমূহ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে নিয়ে এসেছিলেন। মেনকা জানালেন, এ হেন যাঁর কাজকর্ম তাঁর প্রতি আমি উদ্বেগ বোধ করি। এতানি যস্য কর্ম্মাণি তস্যাহং ভৃশমুদ্বিজে। তিনি যে ত্রিলোক নিঃশেষে দগ্ধ করেছিলেন, তাঁর পদদলিতা ধরণী কম্পিত হয়েছিল,মহামেরু হ্রস্ব হয়েছিল, সহসা দিকগুলি আবর্তিত হয়েছিল, এই সবকিছুই ঘটেছিল ঋষি বিশ্বামিত্রের তেজের প্রকোপে। ক্রুদ্ধ মহর্ষি বিশ্বামিত্র যেন আমায় দগ্ধ না করেন, সেই মর্মে আমাকে আদেশ করুন। যথাসৌ ন দহেৎ ক্রুদ্ধস্তথাজ্ঞাপয় মাং বিভো!। সেই তেজোযুক্ত,প্রদীপ্ত অগ্নিতুল্য এবং জিতেন্দ্রিয় বিশ্বামিত্রমুনিকে মেনকার মতো নারী কি করে স্পর্শ করবেন? যাঁর মুখে অবস্থান করেন অগ্নি, নয়নতারায় রয়েছেন সূর্য ও চন্দ্র, জিহ্বা যাঁর যমসম? যম, সোম, মহর্ষিগণ, বসাধ্যগণ, বিশ্বেদেবগণ ও বালখিল্যঋষিগণ পর্যন্ত যাঁর ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, কেমন করে মেনকার মতো নারী তাঁর ভয়ে আশঙ্কিত হবেন না?
ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠর শাপ হতে রাজর্ষি বিশ্বামিত্র কীভাবে মুক্ত করবেন আমায়? — গুরুর দ্বারা অভিশপ্ত এমন আশঙ্কিত ত্রিশঙ্কুকে আশ্রয় দিলেন কৌশিক বিশ্বামিত্র। দেবতারা যখন যজ্ঞাঙ্গগুলি অবজ্ঞাবশত বিনষ্ট করেলেন তখন মহাতেজস্বী বিশ্বামিত্র যজ্ঞাঙ্গসমূহ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে নিয়ে এসেছিলেন। মেনকা জানালেন, এ হেন যাঁর কাজকর্ম তাঁর প্রতি আমি উদ্বেগ বোধ করি। এতানি যস্য কর্ম্মাণি তস্যাহং ভৃশমুদ্বিজে। তিনি যে ত্রিলোক নিঃশেষে দগ্ধ করেছিলেন, তাঁর পদদলিতা ধরণী কম্পিত হয়েছিল,মহামেরু হ্রস্ব হয়েছিল, সহসা দিকগুলি আবর্তিত হয়েছিল, এই সবকিছুই ঘটেছিল ঋষি বিশ্বামিত্রের তেজের প্রকোপে। ক্রুদ্ধ মহর্ষি বিশ্বামিত্র যেন আমায় দগ্ধ না করেন, সেই মর্মে আমাকে আদেশ করুন। যথাসৌ ন দহেৎ ক্রুদ্ধস্তথাজ্ঞাপয় মাং বিভো!। সেই তেজোযুক্ত,প্রদীপ্ত অগ্নিতুল্য এবং জিতেন্দ্রিয় বিশ্বামিত্রমুনিকে মেনকার মতো নারী কি করে স্পর্শ করবেন? যাঁর মুখে অবস্থান করেন অগ্নি, নয়নতারায় রয়েছেন সূর্য ও চন্দ্র, জিহ্বা যাঁর যমসম? যম, সোম, মহর্ষিগণ, বসাধ্যগণ, বিশ্বেদেবগণ ও বালখিল্যঋষিগণ পর্যন্ত যাঁর ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, কেমন করে মেনকার মতো নারী তাঁর ভয়ে আশঙ্কিত হবেন না?
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল
মেনকা আর্জি জানালেন, আপনি আদেশ করেছেন তাই ঋষির কাছে কী আমি না যেতে পারি? হে দেবরাজ আপনি আমার সুরক্ষাবিষয়ে চিন্তা করুন,যাতে সুরক্ষিত হয়ে আমি সেখানে বিচরণ করতে পারি। ত্বয়ৈবমুক্তা চ কথং সমীপমৃষের্ন গচ্ছেয়মহং সুরেন্দ্র!। রক্ষাঞ্চ মে চিন্তয় দেবরাজ! যথা ত্বদর্থং রক্ষিতাহং চরেয়ম্।। মেনকার প্রস্তাব ছিল—দেবেন্দ্রর অনুগ্রহে,বায়ুদেব যেন নৃত্যক্রীড়ারতা মেনকার অঙ্গ হতে পর্যাপ্তপরিমাণে বস্ত্র হরণ করেন, মন্মথ কামদেব যেন তাঁর এই কাজে সহায়ক হন। যখন মেনকা, মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে প্রলুব্ধ করবেন, তখন যেন বন হতে সুরভিত বায়ু প্রবাহিত হয়। ইন্দ্র তেমনই ব্যবস্থা করলেন। অতঃপর মেনকা কৌশিক বিশ্বামিত্রের আশ্রমের উদ্দেশ্যে চললেন।
মেনকার অনুরোধে ইন্দ্র সর্বদা গতিশীল বায়ুকে মেনকার সহযাত্রী হওয়ার জন্য আদেশ দিলেন। মেনকা ও বায়ু,উভয়ে প্রস্থান করলেন। সুন্দরী, ভীরু, মেনকা, তপোবলে পাপমুক্ত তথাপি তপস্যারত আশ্রমস্থ বিশ্বামিত্রকে দেখতে পেলেন। মেনকা,মহর্ষিকে অভিবাদন করে,তাঁর সমীপে নৃত্য শুরু করলেন। বায়ু, মেনকার চন্দ্রপ্রভাসম (সূক্ষ্ম,স্বচ্ছ ও শুভ্র) বেশ অপসারিত করলেন।বায়ুকে ভর্ৎসনারতা মেনকা সলজ্জভাবে দ্রুত বস্ত্রটি কুড়িয়ে নিতে গেলেন, তখন অগ্নিসমতেজস্বী রাজর্ষি বিশ্বামিত্র, নগ্নদেহে সঙ্কটাপন্না, অনিন্দিতা মেনকাকে দেখতে থাকলেন। বস্ত্রের জন্যে আকুল,ব্যতিব্যস্ত মেনকা, তাঁর যৌবনকালের অনির্বচনীয়বয়সোচিত সৌন্দর্য নগ্নতাহেতু প্রকটিত হয়েছে,এই অবস্থায়, মহর্ষি তাঁকে দেখতে থাকলেন। মেনকার রূপের প্রাচুর্য দেখে,রাজর্ষি বিশ্বামিত্র,কামাতুর হয়ে উঠলেন। যাঁর অভিপ্সীত লক্ষ্য ব্রাহ্মণত্ব সেই রাজর্ষি বিশ্বামিত্র, মেনকার অন্তরঙ্গ সঙ্গসুখে আসক্ত হলেন। মহর্ষি মেনকাকে আমন্ত্রণ জানালেন, সেই অনিন্দিতা সুন্দরী মেনকাও স্বেচ্ছায় সম্মতিসূচক সাড়া দিলেন। তখন দুজনে সেখানে দীর্ঘকাল বিহার করলেন। যদৃচ্ছাক্রমে রমণরত উভয়ের যেন একটি দিনের সময়সীমা অতিবাহিত হচ্ছে, এমনভাবে সহস্র বৎসর অতিক্রান্ত হল।
মেনকার অনুরোধে ইন্দ্র সর্বদা গতিশীল বায়ুকে মেনকার সহযাত্রী হওয়ার জন্য আদেশ দিলেন। মেনকা ও বায়ু,উভয়ে প্রস্থান করলেন। সুন্দরী, ভীরু, মেনকা, তপোবলে পাপমুক্ত তথাপি তপস্যারত আশ্রমস্থ বিশ্বামিত্রকে দেখতে পেলেন। মেনকা,মহর্ষিকে অভিবাদন করে,তাঁর সমীপে নৃত্য শুরু করলেন। বায়ু, মেনকার চন্দ্রপ্রভাসম (সূক্ষ্ম,স্বচ্ছ ও শুভ্র) বেশ অপসারিত করলেন।বায়ুকে ভর্ৎসনারতা মেনকা সলজ্জভাবে দ্রুত বস্ত্রটি কুড়িয়ে নিতে গেলেন, তখন অগ্নিসমতেজস্বী রাজর্ষি বিশ্বামিত্র, নগ্নদেহে সঙ্কটাপন্না, অনিন্দিতা মেনকাকে দেখতে থাকলেন। বস্ত্রের জন্যে আকুল,ব্যতিব্যস্ত মেনকা, তাঁর যৌবনকালের অনির্বচনীয়বয়সোচিত সৌন্দর্য নগ্নতাহেতু প্রকটিত হয়েছে,এই অবস্থায়, মহর্ষি তাঁকে দেখতে থাকলেন। মেনকার রূপের প্রাচুর্য দেখে,রাজর্ষি বিশ্বামিত্র,কামাতুর হয়ে উঠলেন। যাঁর অভিপ্সীত লক্ষ্য ব্রাহ্মণত্ব সেই রাজর্ষি বিশ্বামিত্র, মেনকার অন্তরঙ্গ সঙ্গসুখে আসক্ত হলেন। মহর্ষি মেনকাকে আমন্ত্রণ জানালেন, সেই অনিন্দিতা সুন্দরী মেনকাও স্বেচ্ছায় সম্মতিসূচক সাড়া দিলেন। তখন দুজনে সেখানে দীর্ঘকাল বিহার করলেন। যদৃচ্ছাক্রমে রমণরত উভয়ের যেন একটি দিনের সময়সীমা অতিবাহিত হচ্ছে, এমনভাবে সহস্র বৎসর অতিক্রান্ত হল।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা
বিশ্বামিত্রের মনে কোনও চিন্তার উদয় হল না। হিমালয়ের সানুদেশে,রমণীয় মালিনী নদীতীরে, মুনি বিশ্বামিত্র,মেনকার গর্ভে শকুন্তলার জন্ম দিলেন। মেনকা কৃতকার্য হলেন। তাঁর উদ্দেশ্য সফল হল। বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ হল। মালিনী নদীর সমীপে মেনকা সদ্যজাত সন্তানটিকে পরিত্যাগ করে, দেবরাজ ইন্দ্রের সভায়, সত্বর হাজির হলেন। সিংহ ও বাঘে সমাকীর্ণ,সেই জনহীন বনে, শায়িতা এক সদ্যজাতিকা। তাকে দেখে পাখিরা তাকে ঘিরে রাখল। বনে, মাংসলোভী, মাংসাশী, বাঘ প্রভৃতি প্রাণীরা বালিকাটির প্রতি হিংস্র না হয়ে ওঠে, তাই পাখিরা, মেনকার কন্যাকে রক্ষা করছিল। স্নানার্থে গমনকালে মহর্ষি কণ্ব নির্জন বনে, পক্ষিবেষ্টিতা শায়িতা সেই কন্যাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে, কন্যার আসনে অধিষ্ঠিত করলেন।
এ সবকিছুই মহর্ষি কণ্ব, শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শুনতে আগ্রহী,জনৈক ব্রাহ্মণের কাছে বর্ণনা করেছিলেন যখন, শকুন্তলা সেই বৃত্তান্ত জেনেছিলেন। সেই বৃত্তান্তটির অনুপুঙ্খ বর্ণনা শকুন্তলার থেকে শুনছেন দুষ্মন্ত।
মহর্ষি কণ্ব বললেন, শাস্ত্রে আছে, শরীর দিয়েছেন যিনি, প্রাণদাতা যিনি ও যাঁর অন্ন ভোগ করা হয়েছে ক্রমান্বয়ে এই তিনজন পিতা নামে অভিহিত হন। মহর্ষি কণ্ব, বিজন অরণ্যে শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষিপরিবেষ্টিত হয়ে রক্ষিতকন্যাটির নামকরণ করলেন ‘শকুন্তলা’। নির্জ্জনে তু বনে যস্মাচ্ছকুন্তৈঃ পরিবারিতা। শকুন্তলেতি নামাস্যাঃ কৃতঞ্চাপি ততো ময়া।। আশ্রমে সমাগত শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণেচ্ছু ব্রাহ্মণকে কণ্বমুনি জানালেন, এই কারণেই শকুন্তলাকে আমার কন্যা বলে জানবেন। অনিন্দ্যা, শকুন্তলাও আমায় পিতা বলেই মনে করে থাকে। এবং দুহিতরং বিদ্ধি মম বিপ্র! শকুন্তলাম্। শকুন্তলা চ পিতরং মন্যতে মামনিন্দিতা।।
শকুন্তলা রাজা দুষ্মন্তকে জানালেন,শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্তবিষয়ে মহর্ষি এমন তথ্যই জানিয়েছিলেন। তাই, হে নরেন্দ্র,আমায় কণ্বের এমন কন্যা বলেই জেনে রাখুন। সুতাং কণ্বস্য মামেবং বিদ্ধি ত্বং মনুজাধিপ!। শকুন্তলার কাছে পিতা অজ্ঞাত,তাই কণ্বকেই তিনি পিতা বলে মনে করেন।শকুন্তলা জানালেন, কণ্বকথিত জন্মবৃত্তান্তটি যেমনটি শুনেছেন সেটিই তিনি রাজাকে বললেন। ইতি তে কথিতং রাজন্!যথাবৃত্তং শ্রুতং ময়া।
এ সবকিছুই মহর্ষি কণ্ব, শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শুনতে আগ্রহী,জনৈক ব্রাহ্মণের কাছে বর্ণনা করেছিলেন যখন, শকুন্তলা সেই বৃত্তান্ত জেনেছিলেন। সেই বৃত্তান্তটির অনুপুঙ্খ বর্ণনা শকুন্তলার থেকে শুনছেন দুষ্মন্ত।
মহর্ষি কণ্ব বললেন, শাস্ত্রে আছে, শরীর দিয়েছেন যিনি, প্রাণদাতা যিনি ও যাঁর অন্ন ভোগ করা হয়েছে ক্রমান্বয়ে এই তিনজন পিতা নামে অভিহিত হন। মহর্ষি কণ্ব, বিজন অরণ্যে শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষিপরিবেষ্টিত হয়ে রক্ষিতকন্যাটির নামকরণ করলেন ‘শকুন্তলা’। নির্জ্জনে তু বনে যস্মাচ্ছকুন্তৈঃ পরিবারিতা। শকুন্তলেতি নামাস্যাঃ কৃতঞ্চাপি ততো ময়া।। আশ্রমে সমাগত শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণেচ্ছু ব্রাহ্মণকে কণ্বমুনি জানালেন, এই কারণেই শকুন্তলাকে আমার কন্যা বলে জানবেন। অনিন্দ্যা, শকুন্তলাও আমায় পিতা বলেই মনে করে থাকে। এবং দুহিতরং বিদ্ধি মম বিপ্র! শকুন্তলাম্। শকুন্তলা চ পিতরং মন্যতে মামনিন্দিতা।।
শকুন্তলা রাজা দুষ্মন্তকে জানালেন,শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্তবিষয়ে মহর্ষি এমন তথ্যই জানিয়েছিলেন। তাই, হে নরেন্দ্র,আমায় কণ্বের এমন কন্যা বলেই জেনে রাখুন। সুতাং কণ্বস্য মামেবং বিদ্ধি ত্বং মনুজাধিপ!। শকুন্তলার কাছে পিতা অজ্ঞাত,তাই কণ্বকেই তিনি পিতা বলে মনে করেন।শকুন্তলা জানালেন, কণ্বকথিত জন্মবৃত্তান্তটি যেমনটি শুনেছেন সেটিই তিনি রাজাকে বললেন। ইতি তে কথিতং রাজন্!যথাবৃত্তং শ্রুতং ময়া।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’
বিখ্যাত ভরতবংশীয়দের পূর্বসূরী ভরতের জন্মবৃত্তান্তবর্ণনাপ্রসঙ্গে তাঁর পিতা দুষ্মন্ত ও ভরতমাতা শকুন্তলার মিলনবৃত্তান্তের অবতারণা। সুবিখ্যাত পুরুবংশের উত্তরাধিকারী দুষ্মন্ত মৃগয়ার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন বনে। ঘটনাচক্রে মহর্ষি কণ্বের আশ্রমদ্বারে উপস্থিত হলেন দুষ্মন্ত।মৃগয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য, বিনোদনের জন্যে বন্য প্রাণীদের হত্যা।আশ্রমকন্যার মনোহরণের মধ্যে আছে রাজার বিনোদনের চরিতার্থতা, এ এক অন্যরকম মৃগয়া। বন্যহরিণী সরল, অবোধ, নিষ্ঠুর বহির্জগতের অভিঘাতবিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিতা। তাকে তবু নাগরিকজীবনের বিনোদনচরিতার্থের মাধ্যম হতে হয়। মৃগয়া সেই মাধ্যম। প্রাণহরণের মধ্যে আছে নিছক বিনোদনের আনন্দ।
বন্যপ্রাণিদর্শনে আছে আনন্দ, কিন্তু হত্যায় আছে মানুষের অন্তর্নিহিত চিরন্তন পাশববৃত্তির প্রবণতা। অনিন্দ্যসুন্দরী শকুন্তলাকে দেখে প্রথমদর্শনেই তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যে রাজা আকৃষ্ট হয়েছেন। এখানেই তিনি থেমে যেতে পারতেন। রাজা দুষ্মন্ত সাধারণের মতোই অক্লেশে দর্শনের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছেন, দর্শনাদেব হি শুভে!ত্বয়া মেঽপহৃতং মনঃ। সুন্দরী, দর্শনমাত্রই তুমি আমার মনটি হরণ করেছে। আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার রূপমাধুরীতে তপশ্চর্যায় কৃচ্ছ্রসাধনের কাঠিন্য নেই, আছে বন্যহরিণীর নিষ্পাপ সৌন্দর্যের স্নিগ্ধতা। রাজারা বহুবল্লভা। তাঁরা বহুপত্নীক। রাজা দুষ্মন্তের পূর্বপুরুষ ভরতবংশীয়রা এর ব্যতিক্রম নন। রাজার পক্ষে বৈবাহিক সম্বন্ধস্থাপনে কোনও বাধা নেই। এ পর্যন্ত রাজা দুষ্মন্তর আচরণ, প্রচলিত রাজকীয় পরম্পরার অনুসারী। মৃগয়ার ছলে বন্যহরিণীর মতো কোমলপ্রাণা, পেলবা ও সুহাসিনী, মধুরভাষিণীর হৃদয়হরণে বাধা কোথায়? এও এক ধরণের মৃগয়াচ্ছলে বিনোদন নয় কী?
রাজা মনে মনে সন্দেহপ্রবণ হয়েছেন। কারণ, এই আশ্রমে বেমানান,অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারিণী, শকুন্তলা হয়তো বহিরাগতা কোনও নারী কিংবা মহর্ষি কণ্বের আত্মজা। পরক্ষণেই রাজার মনে হয়েছে, মহর্ষি কণ্ব ঊর্দ্ধরেতা ঋষি,আজীবন ব্রহ্মচর্যে নিরত, নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী। শকুন্তলা তাঁর ঔরসজাতা কন্যা হতে পারেন না।
বন্যপ্রাণিদর্শনে আছে আনন্দ, কিন্তু হত্যায় আছে মানুষের অন্তর্নিহিত চিরন্তন পাশববৃত্তির প্রবণতা। অনিন্দ্যসুন্দরী শকুন্তলাকে দেখে প্রথমদর্শনেই তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যে রাজা আকৃষ্ট হয়েছেন। এখানেই তিনি থেমে যেতে পারতেন। রাজা দুষ্মন্ত সাধারণের মতোই অক্লেশে দর্শনের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছেন, দর্শনাদেব হি শুভে!ত্বয়া মেঽপহৃতং মনঃ। সুন্দরী, দর্শনমাত্রই তুমি আমার মনটি হরণ করেছে। আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার রূপমাধুরীতে তপশ্চর্যায় কৃচ্ছ্রসাধনের কাঠিন্য নেই, আছে বন্যহরিণীর নিষ্পাপ সৌন্দর্যের স্নিগ্ধতা। রাজারা বহুবল্লভা। তাঁরা বহুপত্নীক। রাজা দুষ্মন্তের পূর্বপুরুষ ভরতবংশীয়রা এর ব্যতিক্রম নন। রাজার পক্ষে বৈবাহিক সম্বন্ধস্থাপনে কোনও বাধা নেই। এ পর্যন্ত রাজা দুষ্মন্তর আচরণ, প্রচলিত রাজকীয় পরম্পরার অনুসারী। মৃগয়ার ছলে বন্যহরিণীর মতো কোমলপ্রাণা, পেলবা ও সুহাসিনী, মধুরভাষিণীর হৃদয়হরণে বাধা কোথায়? এও এক ধরণের মৃগয়াচ্ছলে বিনোদন নয় কী?
রাজা মনে মনে সন্দেহপ্রবণ হয়েছেন। কারণ, এই আশ্রমে বেমানান,অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারিণী, শকুন্তলা হয়তো বহিরাগতা কোনও নারী কিংবা মহর্ষি কণ্বের আত্মজা। পরক্ষণেই রাজার মনে হয়েছে, মহর্ষি কণ্ব ঊর্দ্ধরেতা ঋষি,আজীবন ব্রহ্মচর্যে নিরত, নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী। শকুন্তলা তাঁর ঔরসজাতা কন্যা হতে পারেন না।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
শকুন্তলা জানেন রাজর্ষি বিশ্বামিত্র এবং স্বর্গের অপ্সরা মেনকা, তাঁর পিতা ও মাতা তপস্যারত বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় গভীরতা, তাঁর অধ্যবসায়,নিষ্ঠা, ধৈর্য্য, ব্রাহ্মণত্বে উত্তরণের সাধনায় ঐকান্তিক প্রচেষ্টা,ক্ষমতাবান দেবরাজ ইন্দ্রের মনে ভয় সৃষ্টি করেছিল যেমন সামাজিক পরিমণ্ডলে আর পাঁচটা প্রভাবশালী ক্ষমতাবান, অপর কোন শক্তিমানের উত্থানে শঙ্কিত হয়ে ওঠে ঠিক তেমনই হল দেবরাজের মানসিক অবস্থা। কেন এই অস্থিরতা? ক্ষমতা হারিয়ে গদিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায়, অভিজাত ও আভাজনে কোন প্রভেদ নেই। দেবরাজ ইন্দ্র ও বর্তমান ভরতবংশীয়দের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মানসিকতায় কোন পার্থক্যই হয়তো নেই। ক্ষমতাদখলের লিপ্সা বোধ হয় আবহমান কালের আদিম মানুষ হতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভরমানুষ, সকলের মধ্যেই চিরকাল স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। যুগে যুগে, কূটচক্রান্তে ক্ষমতাবান শক্তির হাতিয়ার হয়েছে নারী। মেনকাও দেবরাজ ইন্দ্রের বলির পাঁঠা হয়েছেন। ইন্দ্র মেনকার রূপ ও যৌবনের সৌন্দর্যকে ব্যবহার করেছেন। আজও নারী এই ব্যবহৃত সামগ্রীর পর্যায়ভুক্ত, ক্ষমতাসীন পুরুষের কার্যসিদ্ধির হাতিয়ার। অবস্থানগত দিক দিয়ে সে যুগে ও আধুনিক যুগে এই ব্যবহৃত নারীর উদাহরণ কম নয়। বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিতে, তাঁকে পথভ্রষ্ট করতে দেবরাজের প্রচেষ্টা, সমর্থনযোগ্য কি না, সেটি বিতর্কিত বিষয়। প্রশ্ন হল, মেনকার প্রতি দেবরাজের অনুরোধের যৌক্তিকতা।
মিথের আড়ালে একটি মহাভারতীয় যুগধর্ম যেন পরিস্ফুট হয়েছে। দেবরাজ এর উদ্দেশ্য, মেনকার মতো রূপযৌবনসম্পন্না নারীর মূলধন, তাঁর সুকোমল ব্যবহার, সস্মিত মধুর বচন যা কিছু,সব তিনি যেন একজন ব্রতচারীকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে ব্যবহার করেন—নারীর যৌবনের সৌন্দর্যময় শক্তির এই অপব্যবহার তখন ছিল আজও আছে। অপরিমিত তেজস্বী মহর্ষি বিশ্বামিত্রের মুখোমুখি হতে শঙ্কিতা মেনকা, তবু দেবরাজ ইন্দ্রের আজ্ঞাবহ আশ্রিতা মেনকা, সেই প্রজ্বলিত সাক্ষাৎ আগুনে হাত বাড়িয়েছেন শুধু রক্ষকের প্রতি দায়বদ্ধতা পালনের তাগিদে। শাসকের অস্তিত্বের সঙ্কট উপস্থিত হলে শাসক তখন মরিয়া, তাঁর আচরণ বিধিসম্মত কি না? এ বোধ তখন কাজ করে না। দেবরাজ হয়তো, তখন সমালোচনা এড়িয়ে যেতে পারেন না, যেমন পারেন না একই কাজে যুক্ত আধুনিকযুগের কোন প্রশাসক।নিজেদের অগোচরেই আমরা আধুনিক কোন শাসকের সঙ্গে সমধর্মিতার নিরিখে দেবরাজকেও, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে থাকি। বোধ করি, যুগান্তরেও মহাভারতীয় কাহিনির অপূর্ব সাযুজ্যময়তায় এমন সম্ভব হয়ে ওঠে।—চলবে।
মিথের আড়ালে একটি মহাভারতীয় যুগধর্ম যেন পরিস্ফুট হয়েছে। দেবরাজ এর উদ্দেশ্য, মেনকার মতো রূপযৌবনসম্পন্না নারীর মূলধন, তাঁর সুকোমল ব্যবহার, সস্মিত মধুর বচন যা কিছু,সব তিনি যেন একজন ব্রতচারীকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে ব্যবহার করেন—নারীর যৌবনের সৌন্দর্যময় শক্তির এই অপব্যবহার তখন ছিল আজও আছে। অপরিমিত তেজস্বী মহর্ষি বিশ্বামিত্রের মুখোমুখি হতে শঙ্কিতা মেনকা, তবু দেবরাজ ইন্দ্রের আজ্ঞাবহ আশ্রিতা মেনকা, সেই প্রজ্বলিত সাক্ষাৎ আগুনে হাত বাড়িয়েছেন শুধু রক্ষকের প্রতি দায়বদ্ধতা পালনের তাগিদে। শাসকের অস্তিত্বের সঙ্কট উপস্থিত হলে শাসক তখন মরিয়া, তাঁর আচরণ বিধিসম্মত কি না? এ বোধ তখন কাজ করে না। দেবরাজ হয়তো, তখন সমালোচনা এড়িয়ে যেতে পারেন না, যেমন পারেন না একই কাজে যুক্ত আধুনিকযুগের কোন প্রশাসক।নিজেদের অগোচরেই আমরা আধুনিক কোন শাসকের সঙ্গে সমধর্মিতার নিরিখে দেবরাজকেও, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে থাকি। বোধ করি, যুগান্তরেও মহাভারতীয় কাহিনির অপূর্ব সাযুজ্যময়তায় এমন সম্ভব হয়ে ওঠে।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















