রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

দণ্ডকারণ্যের শ্বাপদসঙ্কুল,রাক্ষসদের অধ্যুষিত, গভীরে, রাক্ষস বিরাধের মুখোমুখি হলেন রাম। বিরাধ হিংস্র আস্ফালন করে, সীতাকে ছিনিয়ে নিল। তাঁর শারীরিক অভিব্যক্তি ছিল ভয়ঙ্কর। স রামং লক্ষ্মণঞ্চৈব সীতাং দৃষ্ট্বা চ মৈথিলীম্। অভ্যধাবৎ সুসংক্রুদ্ধঃ প্রজাঃ কাল ইবান্তকঃ।। যমের মতো ধেয়ে এল সেই ক্রুদ্ধ রাক্ষস। মৈথিলীকে ক্রোড়ে তুলে নিল সে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিভ্রান্ত, হতচকিত রাম সর্বহারার বেদনাবোধে আচ্ছন্ন হলেন। অতীতের কষ্ট, বিমাতার অভীষ্ট সিদ্ধির সাফল্য, তাঁর নিজের অনভিপ্সীত বনবাস, সর্বোপরি স্ত্রী সীতা এখন রাক্ষসের কবলে, তার আয়ত্তাধীন এবং আক্রান্ত। লক্ষ্মণের কাছে আকুল হয়ে মনোবেদনা ব্যক্ত করলেন রাম। লক্ষ্মণ, শোকাকুল জ্যেষ্ঠর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুললেন।

সমগ্র অরণ্যে সাড়া জাগিয়ে চিৎকার করে উঠল রাক্ষস বিরাধ। পৃচ্ছতো মম হি ব্রূতং কৌ যুবাং ক্ব গমিষ্যথঃ। আমি প্রশ্ন করছি—বল্, তোরা কে,যাবি কোথায়?রা মের মুখমণ্ডল ক্রোধে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। সদর্পে ঘোষণা করলেন মহাতেজস্বী রাম, ইক্ষ্বাকুকুলে তাঁর জন্ম। ক্ষত্রিয়বৃত্তিধারী তাঁরা দুজনে সম্প্রতি বনবাসী হয়েছেন। ত্বান্তু বেদিতুমিচ্ছাবঃ কস্ত্বং চরসি দণ্ডকান্। তোর কাছে জানতে চাই, দণ্ডকবনে বিচরণকারী, তুই কে? সত্য যাঁর শক্তির উৎস সেই রামের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে বিরাধ আত্মপরিচয় দিলেন, হে রঘুকুলোদ্ভব রাজন্, তোকে বলছি, আমি জবের পুত্র, আমার মা, শতহ্রদা। আমাকে পৃথিবীর সব রাক্ষস আমায় বিরাধ নামেই ডেকে থাকে। পুত্রঃ কিল জবস্যাহং মাতা মম শতহ্রদা। বিরাধ ইতি মামাহুঃ পৃথিব্যাং সর্ব্বরাক্ষসাঃ।।
বিরাধ তাঁর অপরিসীম শক্তিমত্তার কারণ বিশদে জানাল। তপস্যাবলে সে ব্রহ্মার প্রসাদধন্য হয়েছে। বিরাধ অস্ত্র দ্বারা অবধ্য, অভেদ্য, তাই তাকে কেউ ছিন্নভিন্ন করতে পারে না। বিরাধ সদম্ভে ঘোষণা করল, যদি আমার হাত থেকে বাঁচতে চাস, তবে এই নারীর আশা ছেড়ে, যেখানে থেকে এসেছিস, সেখানে, শিগগিরি পালা। উৎসৃজ্য প্রমদামেনামনপেক্ষৌ যথাগতম্।ত্বরমাণৌ পালায়েথাং ন বাং জীবিতমাদদে।। ক্রোধে রক্তচক্ষু রাম, বিকটাকৃতি, পাপাচারী বিরাধের উদ্দেশে,গর্জে উঠলেন। তুই নীচ, তোকে ধিক্কার দিই, হীন উদ্দেশ্য তোর, নিশ্চিত মৃত্যুকে খুঁজে বেড়াচ্ছিস তুই। যুদ্ধ চাইছিস তো? অপেক্ষা কর, আমি বেঁচে থাকতে তোর আর নিস্তার নেই। ক্ষুদ্র ধিক্ ত্বান্তু হীনার্থং মৃত্যুমন্বেষসে ধ্রুবম্। রণে প্রাপ্স্যসি সন্তিষ্ঠ ন মে জীবন্ বিমোক্ষ্যসে।। তৎক্ষণাৎ ধনুক প্রস্তুত করে রাম শাণিত তীর, লক্ষ্যে স্থির করলেন।

গুণযুক্ত ধনুকে সাতটি শর যোজনা করলেন রাম। ময়ূরপুচ্ছযুক্ত শরগুলি ছিল গরুড় ও বায়ুতুল্য মহাবেগবান। সেই অগ্নিসদৃশ,পু চ্ছবিশিষ্ট, তীরগুলি বিরাধের শরীর ভেদ করে ,রুধিরাপ্লুত হয়ে ভূমিতে গিয়ে পরল। বিদ্ধ অবস্থায় বৈদেহী সীতাকে নামিয়ে রেখে, শূল উদ্যত করে, বিরাধ, সক্রোধে রাম ও লক্ষ্মণের দিকে ধেয়ে গেল। ভয়ানক চিৎকারকারী রাক্ষস, ইন্দ্রের ধ্বজের মতো শূলটি ধারণ করে,মু খটি বিস্তৃত করেছিল। তার শোভা হল, যমতুল্য। তখন দুই ভাই,রাম ও লক্ষ্মণ, কালান্তক যমতুল্য বিরাধের প্রতি অবিরত দীপ্তশরসমূহ নিক্ষেপ করতে লাগলেন। সেই শরবিদ্ধ রুদ্ররূপধারণকারী রাক্ষস, হেসে মুহূর্তকাল অপেক্ষা করল, তারপরে (যেন তাচ্ছিল্যসহকারে) হাই তুলল। হাইতোলাকালীন দ্রুতগামী বাণগুলি তার শরীর থেকে খসে পড়ল। বরলাভহেতু রাক্ষস বিরাধের প্রাণরক্ষা হল। শূল তুলে ধরে সে, রাঘবদ্বয়ের দিকে ধেয়ে গেল। অস্ত্রধারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রাম, দুইটি শর‍ নিক্ষেপ করে, গগনস্পর্শী বজ্রতুল্য অগ্নিসদৃশ সেই শূল, ছিন্ন করলেন। রামের বহ্নিমান শরে ছিন্ন শূলটি, বজ্রাহত মেরুপর্বতের প্রস্তরখণ্ডের মতো ভূপতিত হল।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩১: শ্রেষ্ঠ স্থপতি ও প্রকৌশলী ময়দানবের কৃতজ্ঞতার ঋণশোধ

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৬: এক উপেক্ষিতা রাজকন্যার কথা

রাম ও লক্ষ্মণ দ্রুত তুলে নিলেন দুটি খড়্গ। খড়্গদুটি যেন দংশনোদ্যত দুই কৃষ্ণ সর্প।তাঁরা বিরাধের দিকে ধেয়ে গিয়ে সবলে আঘাত করতে লাগলেন। আহত বিরাধ, রুদ্ররূপে, দুই সুগঠিত বাহু দিয়ে, নির্ভীক, দুই পুরুষশ্রেষ্ঠ, ভাইকে তুলে নিয়ে প্রস্থান করতে সচেষ্ট হলেন। রাম রাক্ষসের অভিপ্রায় অনুমান করে, লক্ষ্মণকে বললেন,রাক্ষস তাঁদের দুজনকে এই পথে বহন করে নিয়ে যাক। যথা চেচ্ছতি সৌমিত্রে তথা বহুতু রাক্ষস। অয়মেব হি নঃ পন্থা যেন যাতি নিশাচর।। হে সুমিত্রানন্দন, রাক্ষস যেথায় যেতে ইচ্ছুক, সেখানেই আমাদের নিয়ে যাক। নিশাচর রাক্ষসের গন্তব্য পথটিই হবে আমাদের পথ। সেই মহাবলশালী, গর্বোদ্ধত, রাক্ষস, বলদর্পে রামলক্ষ্মণ যেন দুই বালক এমনই অবলীলায় তাঁদের তুলে নিল কাঁধে। এই অবস্থায় সে প্রবলভাবে চিৎকার করতে করতে গহনারণ্য অভিমুখে চলল। ঘনমেঘতুল্য সেই নিবিড় বনটি ছিল বিবিধ মহীরুহসমন্বিত, সেটি ছিল বিভিন্ন পাখিদের বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। শৃগাল ও হিংস্র শ্বাপদে সমাকীর্ণ ছিল সেই বন।

রঘুকুলোদ্ভব দুই ভাই,রাম ও লক্ষ্মণকে, হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে এক রাক্ষস —এই দৃশ্য দেখে, দেবী সীতা তাঁর দুই সুকোমল বাহু তুলে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন। লক্ষ্মণ-সহ, দশরথপুত্র, সত্যনিষ্ঠ, চরিত্রবান, পবিত্র রামকে হরণ করছে এক বীভৎসাকৃতি রাক্ষস। অসহায় সীতা আকুল আকুতি জানালেন, বাঘ, নেকড়ে এই হিংস্র শ্বাপদরা আমায় খেয়ে ফেলবে যে। হে রাক্ষসশ্রেষ্ঠ, দুই ককুৎস্থবংশীয় সন্তানকে ছেড়ে আমায় তুমি হরণ কর। প্রণাম জানাই তোমায়। মাং বৃকা ভক্ষ্যয়িষ্যন্তি শার্দ্দূলদ্বীপিনস্তথা। মাং হরোৎসৃজ্য কাকুস্থৌ নমস্তে রাক্ষসোত্তম।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

সীতার আর্তি শুনে দুই বীর, রামলক্ষ্মণ সেই দুরাত্মা রাক্ষসকে বধ করতে সত্বর উদ্যোগ নিলেন। লক্ষ্মণ, ভয়ঙ্কর রাক্ষসের বামবাহু ভেঙ্গে দিলেন,রাম দ্রুতবেগে ভাঙ্গলেন রাক্ষসের দক্ষিণ বাহু। বাহু ভগ্ন হওয়ায়, রাক্ষস অবসন্ন হয়ে সংজ্ঞা হারাল। মেঘবরণ রাক্ষস, বজ্রাঘাতহীন পর্বতের মতো, তৎক্ষণাৎ ভূলুণ্ঠিত হল।রামলক্ষ্মণ, রাক্ষসকে মুষ্টি, বাহু, পা দ্বারা আঘাত করতে লাগলেন। বারংবার রাক্ষসকে উঠিয়ে মাটিতে নিষ্পেষিত করতে লাগলেন। বহুশরবিদ্ধ, খড়্গাঘাতে জর্জরিত, রাক্ষস কিন্তু নানাভাবে মাটিতে পিষ্ট হয়েও মরল না। নিতান্তই অবধ্য পর্বতাকৃতি রাক্ষসকে দেখে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অভয়দাতা শ্রীমান রাম বললেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, তপঃশক্তিবলে অবধ্য এই রাক্ষস। যুদ্ধে অস্ত্রাঘাতে এই রাক্ষসকে অবদমিত করা সম্ভব নয়, একে প্রোথিত করা যেতে পারে। তপসা পুরুষব্যাঘ্র রাক্ষসোঽয়ং ন শক্যতে।শস্ত্রেণ যুধি নির্জেতুং রাক্ষসং নিখনাবহে।।

রাম লক্ষ্মণকে নির্দেশ দিলেন, এই মারাত্মক বলশালী রাক্ষস ও হাতির জন্য যেমন গর্ত আবশ্যক, তেমনই সুগভীর গর্ত এই অরণ্যে খনন করা হোক। প্রদরঃ খন্যতামিতি গর্ত খনন কর—লক্ষ্মণকে এই কথা বলে, বিরাটের কণ্ঠ পদদলিত করে দাঁড়ালেন, শক্তিমান রাম। রামের কথা শুনে বিরাধ,বিনীত ভাষায় তাঁকে বলল, ইন্দ্রতুল্য বলশালী রাম। যাঁর হাতে সে হত হয়েছে, অজ্ঞতাবশতঃ সে পূর্বে রামকে চিনতে পারেনি। এখন সে জেনেছে, দেবী কৌশল্যা এই সুসন্তানের জননী। বিরাধ, মহাসৌভাগ্যবতী বৈদেহী সীতা ও মহাযশস্বী লক্ষ্মণকে জেনেছে।বিরাধ তার প্রকৃত পরিচয় জানাল, অভিশাপজনিত কারণে সে এই ভীষণাকৃতি রাক্ষসদেহে প্রবেশ করেছে। সে তুম্বুরু নামে গন্ধর্ব। কুবের তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। কুবেরকে তুষ্ট করায় তিনি বলেছিলেন, যখন দশরথপুত্র রাম যুদ্ধে তাঁকে হত্যা করবেন, তখন প্রকৃতরূপ ফিরে পেয়ে তিনি আবার স্বর্গে যাবে। যদা দাশরথী রামস্ত্বাং বধিষ্যতি সংযুগে। তদা প্রকৃতিমাপন্নো ভবান্ স্বর্গং গমিষ্যসি।। অভিশাপের কারণ আরও বিশদে বর্ণনা করল সেই রাক্ষস, অপ্সরা রম্ভার প্রতি আসক্তির জন্যে তিনি যথাসময়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তাই ধনাধিপতি কুবের রুষ্ট হয়ে এই অভিশাপ দিয়েছিলেন। বিনয়াবনত রাক্ষসের কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের ভাষা ছিল—তব প্রসাদান্মুক্তোঽহমভিশাপাৎ সুদারুণাৎ।ভুবনং স্বং গমিষ্যামি স্বস্তি বোঽস্তু পরন্তপ।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩১: শ্রেষ্ঠ স্থপতি ও প্রকৌশলী ময়দানবের কৃতজ্ঞতার ঋণশোধ

হে শত্রুহন্তা, আপনার অনুগ্রহে এই নিদারুণ অভিশাপ হতে আমি মুক্ত হলাম। আমি নিজের স্থানে ফিরে যাব। আপনার কল্যাণ হোক।রাক্ষস বিরাধ,সুপরামর্শ দিল, এখান থেকে অর্দ্ধযোজন দূরে সূর্যসম তেজস্বী প্রভাবশালী ধর্মাত্মা মহর্ষি শরভঙ্গ বাস করেন। রাক্ষসকে গর্তে নিক্ষেপ করে, রাম অবিলম্বে সেখানে যান,মহর্ষি তাঁর মঙ্গল করবেন। প্রাণহীন রাক্ষসদের গর্তে সমাহিত হওয়াই সনাতন ধর্ম।গর্তে যারা সমাহিত হয় সেই রাক্ষসরা সনাতন লোক লাভ করে। শরাহত বিরাধ, কাকুৎস্থ রামকে এই কথা বলে, দেহত্যাগ করে, স্বর্গগমনে উদ্যোগী হল। রাম, লক্ষ্মণকে আদেশ দিলেন, বিশালাকৃতি হাতির উপযুক্ত গর্ত, ওই ভয়ঙ্কর রাক্ষসের জন্য খনন করা হোক। প্রদরঃ খন্যতামিতি গর্ত খনন কর, লক্ষ্মণকে আদেশ দিয়ে রাম, রাক্ষসের কণ্ঠ পদদলিত করে সেই ভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন। মহাকৃতিবিশিষ্ট রাক্ষসের পাশে, খনিত্র দিয়ে, গর্ত প্রস্তুত করলেন লক্ষ্মণ।

বিরাটের কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে, রাম, সেই শঙ্কুকর্ণ মহারবে চিৎকারকারী,যু দ্ধে কঠোর দুর্দম রাক্ষসকে গর্তে নিক্ষেপ করলেন। রণক্ষেত্রে বিজয়ী, তৎক্ষণাৎ শৌর্যপ্রকাশে উদ্যত,যুদ্ধে স্থিরচিত্ত,রাম ও লক্ষ্মণ, দু’জনে আনন্দসহকারে, ভীতিপ্রদ শব্দরত বিরাধকে সজোরে গর্তে নিক্ষেপ করলেন।শা ণিত অস্ত্রাঘাতে সেই মহারাক্ষস অবধ্য, এটি জেনে দুই মহাবীর মনস্থির করে, গর্তে নিক্ষেপ করে, তাকে হত্যা করলেন। রাক্ষস বিরাধ স্বয়ং রামের হাতে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয় মনে করেছিল, কারণ সে নিজের মৃত্যুর কারণ হন রাম — এটি তার কাঙ্খিত ছিল।তাই বনচারী রাক্ষস রামকে জানিয়েছিল, *ন মে বধঃ শস্ত্রকৃতো ভবেদিতি। কোনও অস্ত্র আমায় বধ করতে পারবে না। তাঁর বক্তব্য শুনে, রাম তাঁকে গর্তে নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।গর্তে নিক্ষিপ্ত মহাবলশালী রাক্ষসের তারস্বরে চিৎকারধ্বনিতে বন নিনাদিত হয়ে উঠল। রামলক্ষ্মণ বিরাধকে গর্তে নিক্ষেপ করে,সন্তুষ্ট হলেন। মহারণ্যে শঙ্কাহীন দুজন আনন্দিত হয়ে, গগনস্থিত চন্দ্র ও সূর্যের মতো প্রতিভাত হলেন।

দণ্ডকারণ্যের গহনারণ্যে রাক্ষস বিরাধের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেন রাম। অরণ্যবাসে এ পর্যন্ত রাম কোনও বিরোধিতার সম্মুখীন হননি। এই প্রথম তাঁরা, রাক্ষসের আক্রমণের শিকার হলেন। সীতাকে রামের সুরক্ষার বন্ধন থেকে ছিনিয়ে নিল এক রাক্ষস।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

আত্মবিশ্বাসের চিঁড় ধরাবার জন্য এই অতর্কিত আক্রান্ত হওয়ার, হয়তো প্রয়োজনীয়তা ছিল। প্রথমে ভেঙ্গে পড়লেও পরমুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন রাম। রাক্ষসের ঔদ্ধত্য, তাঁর রাজরক্তে উন্মাদনা জাগিয়ে তুলেছে।রাম সদম্ভে ঘোষণা করেছেন তাঁর রাজকীয় পরিচিতি। এই ব্যক্তি পরিচয়, রাক্ষস বিরাধকে অবদমিত করতে পারেনি।রাম যখন রাক্ষসের উদ্দেশ্য কী? জানতে চেয়েছেন,অদম্য বিরাধ, তার পিতামাতার নাম ও রাক্ষসদের কাছে তার বিরাধ নামের পরিচয়, নির্ভীকভাবে তুলে ধরেছেন।সে জানিয়েছে, ব্রহ্মার আশীর্বাদধন্য বিরাধ স্বয়ং অস্ত্রাঘাতে অবধ্য। পরস্ত্রীকে হরণকারী বিরাধের ঔদ্ধত্য মাত্রা অতিক্রম করেছে, যখন সে সীতার ওপরে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং রামকে দ্রুত পালিয়ে যেতে উপদেশ দিয়েছে। উদ্দেশ্য অসৎ হলে শুভ শক্তিরও, অশুভ ব্যবহার, বোধ হয় কোথাও স্বীকৃত হয় না। তাই ব্রহ্মার বলে অবধ্য বিরাধের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়েছে।

রামের শাণিত শর রক্তাক্ত করে তুললেও বিরাধের প্রাণ, হরণ করতে পারেনি।আরোপিত শক্তিমত্তায় অনেক সময়েই অশুভকে প্রতিহত করা যায় না। তার জন্যে প্রয়োজন আত্মশক্তির উদ্বোধন। রাক্ষসের নিক্ষিপ্ত অস্ত্র শূলটিকে, অস্ত্র প্রয়োগ করে রাম প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি কিন্তু রাক্ষসকে নির্মূল করতে পারেননি। তাঁর খড়্গাঘাত, বিরাধকে আহত করেছে, কিন্তু ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি রাক্ষসের আত্মবিশ্বাস বিনষ্ট করতে পারেনি। এমন কি প্রবলবিক্রমে সে দুই বীরশ্রেষ্ঠ ভাইকে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে, অপহরণ করতে প্রয়াসী হয়েছে। সীতার আকুল আকুতি, বোধ হয় দুই ভাইয়ের বীর সত্তা জাগিয়ে তুলেছে। শারীরিক শক্তির মোকাবিলা হয়তো দৈহিক শক্তির প্রয়োগেই সম্ভব।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাক্ষসের দুই বাহু ভেঙ্গে দিয়ে তার শক্তির উৎস বাহুবলকেই যেন প্রকারান্তরে ধ্বংস করেছেন দশরথপুত্র রঘুকুলোদ্ভব দুই শক্তিমান বীর। অস্ত্রবল থেকে পেশীশক্তির প্রভাব অনেক বেশি, এটি যেন প্রমাণিত হল আবার। কণ্ঠ নিষ্পেষণ, মুষ্টি, বাহু, পা য়ের সাহায্যে আঘাত, কোনওভাবেই রাক্ষসের মৃত্যু হল না। কার্যত শক্তিহীন রাক্ষসের প্রাণহরণের জন্যেই, রাম মাটির বিশালগর্তে তাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিরাধ তার অন্তিম পরিণতি জেনে নত হয়েছে।তাঁ র পরমগতি যে রামের হাতেই সম্ভব,সে কথা সবিনয়ে ঘোষণা করেছে। একদা গন্ধর্বরূপধারী তুম্বুরুর, পতনের মূল কারণ ছিল নারীর প্রতি আসক্তি।

গন্ধর্ব তুম্বুরুর অপ্সরা রম্ভার প্রতি আসক্তি, তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করেছিল,তিনি অভিশাপগ্রস্ত হয়েছিলেন। দণ্ডকারণ্যে পরস্ত্রী সীতাকে হরণ করে রাক্ষস, কামাসক্তির পরিচয় দিলেন আবার। বিরাধরূপে তিনি আবারও সেই একই ভুল করলেন। বিরাধের অন্তিম পরিণতি কার্যকর করতে রামের সিদ্ধান্ত হয়তো আপাতদৃষ্টিতে নৃশংস বলে মনে হতে পারে। গর্তে নিক্ষিপ্ত রাক্ষসের আর্তচিৎকার বনভূমি সচকিত করে তুলেছিল। যদিও বিরাধ, রামের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল কারণ এর মাধ্যমে সে রাক্ষসের নিষ্ঠুরসত্তা হতে মুক্ত হতে চেয়েছিল। এ ছাড়া বোধ হয় আর কোন উপায় ছিল না। মাটিই যে শেষ আশ্রয়।পঞ্চভূতে বিলীন হওয়াই, যে কোনও প্রাণময় সত্তার চরম পরিণতি যে।

বিরাধের সঙ্গে রামের সংঘর্ষ, যেন রামায়ণের মূল ঘটনা, রাক্ষস ও নরোত্তম রামের যুদ্ধের, প্রতিচ্ছবি, একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছায়াছবি। রামের সঙ্গে বিরাধ রাক্ষসের সম্মুখযুদ্ধের এই বিবরণ যেন সীতাহরণ,রাবণবধের একটি ছোট সংস্করণ। কখনও দৈবশক্তিও হার মানে মানুষের পেশীশক্তির কাছে। কোন দৈবপ্রতিনিধি নন,মানুষই সব অসাধ্য সাধন করতে পারেন।তাই অবতার রাম নন, রক্তমাংসে গড়া মহর্ষি বাল্মীকির মানসপুত্র মানুষ রাম, অশুভ শক্তি প্রতিহত করতে সক্ষম হন।দৈব ও মানুষের মেলবন্ধনে ঋষিকবির বিনির্মাণ — মানুষ রাম,নরশ্রেষ্ঠ রাম।— চলবে
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content