বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সন্ধিপুজো।

দেবী সপ্তশতীর মধ্যে সবথেকে বেশি করে মন আকর্ষণকারী অংশ হল দেবী-দূত সংবাদ এবং চণ্ড ও মুণ্ড বধ, যা দেবী মাহাত্ম্যকে শতগুণে বাড়িয়ে তোলে। অহংকার নাশক দৈবী শক্তির জয় লাভ ও আসুরিক শক্তির পরাজয় জ্ঞাপক।

মেধা ঋষি বলছেন, কাশ্যপের ঔরসে ও ভার্যা দনুর গর্ভে শম্ভু ও নিশুম্ভের জন্ম। শম্ভু ও নিশুম্ভ সমস্ত দেবতা, সূর্য, চন্দ্রাদি সকলকে পরাজিত করে, ইন্দ্রের ত্রিলোকাধিপত্য ও যজ্ঞভাগও অধিকার করেন। দেবগণ সমস্ত অধিকার শূন্য ও পরাজিত হলে, স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে অপরাজিতা দেবীকে স্মরণ করেন। দেবী পূর্বে কথা দিয়েছিলেন, বিপদে তাঁকে স্মরণ করলে তৎক্ষণাৎ মহাবিপদ নাশ করবেন। দেবতা সকল হিমালয়ে গিয়ে দেবীর উত্তমরূপে স্তব করেন। বরাহ পুরাণ মতে, জয়া বিজয়া জয়ন্তী ও অপরাজিতা মহিষাসুর যুদ্ধে ব্রহ্মা-বিষ্ণু ও শিবের চোখ থেকে সৃষ্টি বৈষ্ণবী শক্তির সহচরী রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দেবীর প্রীতির জন্য স্তুতি করেন।
সংহার শক্তি, ত্রিকালাতীত সত্তা রূপিণী গৌরী, জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম। দেবীকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। কখনও তিনি বলেন, বৃদ্ধি সিদ্ধিরূপা কল্যাণী, কখনও বা সৃষ্টি খ্যাতি রূপিনী, আবার তিনি কৃষ্ণবর্ণা ধূম্রবর্ণা দেবী দূর্গা। তিনি সকল প্রাণীর মধ্যে মায়া চেতনা বুদ্ধি, নিদ্রা রূপে ক্ষুধা রূপে, ছায়া রূপে, শক্তিরূপে, তৃষ্ণা রূপে ইত্যাদি সমস্ত গুণরূপে বর্তমান। সমস্ত প্রাণী, চতুর্দশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা রূপে তিনিই বিরাজিতা, যিনি পৃথিবী-আদি পঞ্চ মহাভূতের প্রেরয়িত্রী, বিশ্বব্যাপিকা শক্তিরুপা, যিনি চিৎ শক্তিরূপা, সেই দেবীকে পুনঃপুনঃ প্রণাম। দেবতাগণ দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মঙ্গলময়ী পরমেশ্বরীর স্তব স্তুতি করেন যাতে তিনি দেবগণের মঙ্গল বিধান করেন ও বিপদসমূহ দূর করেন।
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প-৪: অপ্রত্যাশিত

দশভুজা : আমার দুর্গা—বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

শম্ভু নিশুম্ভ তপস্যাবলে ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করে বর লাভ করেন যে, দেব ও মানব সকল পুরুষদের দ্বারা অবধ্য হবেন। অযোনিজ ও পুং স্পর্শ ছাড়া স্ত্রী শরীর হতে উদ্ভূতা অলঙ্ঘ্য পরাক্রমী নারীর প্রতি আসক্তবসত কেবল তার দ্বারায় যুদ্ধে নিহত হবেন। ব্রহ্মা, অসুরদেরকে প্রার্থিত বর প্রদান করেন। তখন তাদের শক্তির অহংকার বসত তাদের উপদ্রবে স্বর্গ মর্ত্য অস্থির হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা ও দেবগণ, শিবের নিকট দেবীকে পাঠানোর জন্য প্রার্থনা করেন। মহাদেব রহস্য ছলে ‘কালী’ নামে সম্বোধন করেন। তখন পার্বতী ক্রোধ ভরে গৌরবর্ণা নয় বলে, অপ্রীতিভাজন হয়েছেন মনে করে, গৌতম ঋষি আশ্রমে গিয়ে কঠোর তপস্যা করে নিজের কৃষ্ণবর্ণ ‘কোষ’ ছেড়ে রজোগুণসম্পন্ন, গৌরবর্ণ হয়ে গৌরী নামে প্রসিদ্ধ হন। কোষ পরিত্যাগ করেন বলে দেবী কৌশিকী নামে প্রসিদ্ধ হন। তিনি তখন অতি সুন্দরী ও চন্দ্র তুল্যকান্তি যুক্তা। শিব পুরাণ সংহিতা মতে দেবী পার্বতী বলছেন, ‘আমি যে অতি সুন্দরী অজাত পুং স্পর্শ ছাড়া ও অজেয় কৌশিকী কে সৃষ্টি করেছি, দেবগণ তাকে দেখেনি, এমন কন্যা জগতে পূর্বে হয় নি ও পরেও হবে না।’
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

এরপর শম্ভু নিশুম্ভের অনুচর চণ্ড ও মুণ্ড দেবীর মনোহর মূর্তি ধারিণী কৌশিকী দেবীকে দেখতে পেলেন, তারা শম্ভু নিশুম্ভের কাছে গিয়ে, দেবীর চারু অবয়ব ও সেই দেবীর অঙ্গপ্রভায় চারদিক আলোকিত, তিনি নিশ্চয়ই কোন দেবী পত্নী হবেন ও আপনারই দর্শনযোগ্য ও ভোগ্য ইত্যাদি বলেন। আরও উচ্চ প্রশংসা পূর্বক শম্ভু নিশুম্ভ দের বলেন, ব্রহ্মার দেবযান বিমান, নবনিধি, অম্লান মহাপদ্মের কিঞ্জল্কিনী, বরুণের স্বর্ণছত্র, যমের উৎক্রান্তিদা শক্তি অস্ত্র, বরুণের পাশাস্ত্র, সমুদ্রজাত সকল রত্নরাজি, সবই আপনার হস্তগত।, ‘তবে কেন আপনি এই কল্যাণী স্ত্রী রত্ন কে গ্রহণ করছেন না?’

চণ্ড মুণ্ডের মুখে সকল কথা শুনে শম্ভু, মহাসুর সুগ্রীবকে দূত হিসাবে দেবীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। সুগ্রীব, দেবীর কাছে এসে শম্ভু দ্বারা কথিত সকল কথা বলেন, যাতে দেবী সম্প্রীতির সাথে তাড়াতাড়ি কাছে আসেন। শম্ভু ও নিশুম্ভ রজোগুণসম্পন্ন সেইজন্য তাদের বধের জন্য সত্ত্বগুণপ্রধানা দেবী অম্বিকা অবতারিত হয়েছেন। দূত সুগ্রীব, দেবীর কাছে গিয়ে শম্ভু ও নিশুম্ভের গুণগাথা; ত্রিভুবনের একমাত্র অধিপতি, দেবতাগণের মধ্যে যার আদেশ অপ্রতিহত, ঐরাবত যার হস্তগত, ইন্দ্রাদি দেবগণ, সর্পগণ ও তাদের রত্ন সকল, দ্বৈত্যেশ্বরের অধিকারে। হে দেবী আপনি স্ত্রী রত্ন। যদি আপনি গৃহে আসেন ও শম্ভু নিশুম্ভ কে পতিরূপে গ্রহণ করেন, কারণ শ্রেষ্ঠ বস্তু তাদেরই ভোগের উপযুক্ত।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

তাদেরকে পতিত্বে গ্রহণ করবার জন্য দূত কর্তৃক অভিহিত হলে, দেবী জগদ্ধাত্রী ভদ্রা ভগবতী দুর্গাদেবী এ সমস্ত শুনে গম্ভীর হলেন। হেসে দূতকে বললেন, আমি অল্পবুদ্ধি বসত যে প্রতিজ্ঞা করেছি, যিনি আমাকে সংগ্রামে পরাজিত করবেন তাকে পতীত্বে গ্রহণ করব। সুগ্রীব দেবীকে বলছেন, আপনি অত্যন্ত গর্বিত, সমস্ত দেবতারা যেখানে একযোগে দৈত্য গণের সম্মুখে দাঁড়াতে অসমর্থ্য সেখানে আপনি একাকিনী নারী কীভাবে দাঁড়াবেন?

দূত শুম্ভ নিশুম্ভেরকে এ সব জানালে, দৈত্য সেনাপতি ধূম্রলোচনকে নির্দেশ করলেন, যাতে দেবীকে বলপূর্বক বেঁধে নিয়ে আসে। ধূম্রলোচনকে, হিমাচলে দেবীকে উচ্চস্বরে যাওয়ার জন্য আদেশ করেন না হলে বলপূর্বক নিয়ে যাবেন। এই কথা বলাতে দেবী অত্যধিক রাগে ধূম্রলোচন সামনে আসা মাত্র ভস্মীভূত করে দিলেন। আর সৈন্য সকল দেবীর বাহন সিংহের ভীষণ গর্জন সমস্ত খেয়ে ফেলেন। এই ভাবে ধূম্রলোচন নিহত হয়েছেন শুনে, অসুররাজ, চণ্ড ও মুণ্ডকে আদেশ করেন যেন দেবীকে বলপূর্বক বেঁধে নিয়ে আসার জন্য।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

শম্ভুর নির্দেশে চণ্ড ও মুণ্ড সৈন্যদের সঙ্গে হিমাচলে সিংহের উপর সমাসীন অম্বিকাকে দেখ মাত্র খড়্গ উঠিয়ে দেবীকে ধরতে উদ্ধত হলে দেবীর ভীষণ ক্রোধ থেকে কৃষ্ণবর্ণ ভীষণ বদন কালী সৃষ্টি হল। দেবীর বিচিত্র নর কঙ্কাল মুণ্ডমালা ব্যাঘ্রচর্ম বস্ত্র, অস্থিচর্মমাত্র শরীর, অতি ভীষণ বিরাট মুখ রক্তাক্ত জিভ, ভয়ঙ্কর আরক্ত চোখ, বিকট শব্দে অসুরদেরকে বধ করতে লাগলেন কাউকে, ভক্ষণ, চর্বণ, মর্দন করতে করতে হত্যা করতে লাগলেন। অসুরের সমস্ত সৈন্য মুহূর্ত মধ্যে নিহত হলে চণ্ড মুণ্ড সহজ চক্রাস্ত্র দ্বারা দেবীকে আচ্ছন্ন করলেন। দেবী ভীষণ ক্রোধে অট্টহাস্য করতে লাগলেন। রাগ সূচক ‘হং’ শব্দে দেবী মহা খড়্গ উঠিয়ে চণ্ডের দিকে ধেয়ে এলেন ও চণ্ডের চুল ধরে মাথা কেটে নিহত করেন। চণ্ডের নিহত হতে দেখে মুণ্ড ও রেগে দেবীর দিকে আক্রমণ করলে দেবী একই ভাবে খড়্গ দিয়ে মাথা কেটে দেন।

চণ্ড ও মুণ্ড বধ হয়েছেন দেখে সৈন্য সকল ভয়ে পালিয়ে গেলেন। দেবী, চণ্ড ও মুণ্ডের মাথা দেবী অম্বিকাকে উপহার দিয়ে বলেন, আপনি শম্ভু নিশুম্ভকে বধ করবেন। দেবী অম্বিকা, কালীকে মধুর বাক্য বলেন, চণ্ড মুণ্ডের মাথা উপহার দেওয়ার জন্য আজ থেকে তুমি দেবী চামুণ্ডা নামে প্রসিদ্ধ হবে। শারদীয়া বা বাসন্তী দুর্গা পূজার সময় অষ্টমী ও নবমী সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিট ধরে যে মহত্বপূর্ণ সন্ধিপূজা হয়ে থাকে তা এই দেবী চামুণ্ডার।— চলবে
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content