
গুরুদেব বলছিলেন, যা সত্য তাই কি কেবল স্থায়ী!
মৃত্যু তো সত্য। তবে মৃত্যু কি স্থায়ী? হ, তাই। নশ্বর এই জীবন। ক্ষণস্থায়ী। চঞ্চল। ফেনাময় বুদবুদ। গুরুদেবের গলায় ঢেউয়ের মতো শব্দ। চাঁদনি রাতে ডায়মন্ডহারবারের সমুদ্র যেমন গম্ভীর গলায় ডাকে, আকাশের সঙ্গে একলা কথা বলে, ঠিক তেমনি গম্ভীর আর সুন্দর। লালপোলের কিনারে দাঁড়ালে সে কথা শোনা যায়।
তবে থাকবি কী লয়্যা? আত্মার আনন্দটুক। আর কিচ্ছু নয়। পরমে ব্রহ্মণি যোজিত চিত্ত, নন্দতি নন্দতি নন্দত্যেব। বুঝছো তোমরা? পরম ব্রহ্মের সঙ্গে নিজেরে মিলাইয়া লও, মুক্ত করো অচৈতন্যের বাঁধন।
মৃত্যু তো সত্য। তবে মৃত্যু কি স্থায়ী? হ, তাই। নশ্বর এই জীবন। ক্ষণস্থায়ী। চঞ্চল। ফেনাময় বুদবুদ। গুরুদেবের গলায় ঢেউয়ের মতো শব্দ। চাঁদনি রাতে ডায়মন্ডহারবারের সমুদ্র যেমন গম্ভীর গলায় ডাকে, আকাশের সঙ্গে একলা কথা বলে, ঠিক তেমনি গম্ভীর আর সুন্দর। লালপোলের কিনারে দাঁড়ালে সে কথা শোনা যায়।
তবে থাকবি কী লয়্যা? আত্মার আনন্দটুক। আর কিচ্ছু নয়। পরমে ব্রহ্মণি যোজিত চিত্ত, নন্দতি নন্দতি নন্দত্যেব। বুঝছো তোমরা? পরম ব্রহ্মের সঙ্গে নিজেরে মিলাইয়া লও, মুক্ত করো অচৈতন্যের বাঁধন।
সুধারানিও মুক্ত করছিল। মায়ের কোল আঁচলের গিঁট খুলে দুটো পয়সা। এক আর দু’নয়া। বেশ কিছু সিকি আধুলি আছে। ওগুলো নেবে না। সুধা জানে ওই পয়সা ওর মায়ের বেশ কয়েকদিনের সম্বল। ফুটো পয়সায় নীচের দোকান থেকে কিনে আনবে এক ঠোঙা গুড়ের মুড়কি। কোন কাক ভোরে ওই একরত্তি মেয়ে একগাল মুড়ি পাটালি খেয়ে মায়ের সঙ্গে বেরিয়েছে। ডায়মন্ডহারবার স্টেশনে এসে ট্রেনে চেপেছে। শিয়ালদা পৌঁছে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বিবেকানন্দ রোড। ঠিক তার পরেই এই বাড়ি। মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কত কথা। দেখো মা, কি সুন্দর শাড়ির দুকান, একখান শাড়ি লাগবো নাকি মা তোমার? দিদি কইছিল, ওর স্কুলের শাড়ি খান ফুটা, কিনবা?
মা গো, আমাদের সব কয়ডা জামবাটি তুমি তো সুন্দরদার সংসারে দিয়া দিলা, মাত্র দুই খান রাখলা, তাও বাবার খাওনের লিগা, কিনবা নাকি মা? দেখো কত্ত বাসন!
মা গো, আমাদের সব কয়ডা জামবাটি তুমি তো সুন্দরদার সংসারে দিয়া দিলা, মাত্র দুই খান রাখলা, তাও বাবার খাওনের লিগা, কিনবা নাকি মা? দেখো কত্ত বাসন!
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৬: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৬: এক উপেক্ষিতা রাজকন্যার কথা
সুনীতি সুধার হাত চেপে হাঁটবার গতি বাড়িয়ে দিয়েছেন… হুঁ হাঁ না দেখমু…টুকটাক উত্তর ছুঁড়ে দিতে দিতে এগিয়ে চলেছেন দ্রুততায়। তাঁকে আজ অনেকগুলো বিষয়ের সিদ্ধান্ত জেনে নিতে হবে গুরুদেবের কাছ থেকে। অকূল পাথারে কেমন যেন নিঃসঙ্গ ভাসছেন সুনীতি। অথচ তাঁর সবই তো আছে …স্বামী, তিন ছেলে, তিন মেয়ে, এরা তাঁর আত্মজ। সতীন পুত্ররাও আছে, তারাও তাঁর এক্কেবারে নিজের। উচ্চ প্রতিষ্ঠিত দুটি সুপুত্র। আসলে স্বামীর আগের পক্ষ ছিলেন রাজ বংশ। পরমা সুন্দরী, শোনা কথা। তা ছাড়া তেল ছবিতেও দেখেছেন। কোথায় তিনি আর কোথায় সুনীতি।
সুনীতির লম্বা একহারা গড়ন। সরু মুখ। চোখটাও ছোট, সামান্য ভিতরে ঢোকা। ভালো না, একেবারেই চোখে পড়বার মতো কিছু নন সুনীতি। অতি সাদামাটা। লালপেড়ে আটপৌরে শাড়ির মতোই সাধারণ। তবু তাঁর স্বামী বলেন, সুনীতির মধ্যে নাকি শান্তি আছে…দেখলে প্রাণটা জুড়ায়!
কলেজ স্ট্রিট এসে গিয়েছে। বই-খাতা-পেনের দোকান সার দেওয়া। সুতরাং এই জায়গাটুকু তাড়াতাড়ি পেরোতে পারলে সুধা বাঁচে। মায়ের চিন্তা ক্লিষ্ট মুখ দেখে স্বস্তি। ভালোয় ভালোয় মুখ বুজে পেরিয়ে যাওয়া যাক। বইপত্র দেখে মায়ের আবার পাঠশালার কথা মনে পড়লেই মুশকিল। এক দৌড়ে ট্রাম লাইন পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরে গেল সুধারানি।
সুনীতির লম্বা একহারা গড়ন। সরু মুখ। চোখটাও ছোট, সামান্য ভিতরে ঢোকা। ভালো না, একেবারেই চোখে পড়বার মতো কিছু নন সুনীতি। অতি সাদামাটা। লালপেড়ে আটপৌরে শাড়ির মতোই সাধারণ। তবু তাঁর স্বামী বলেন, সুনীতির মধ্যে নাকি শান্তি আছে…দেখলে প্রাণটা জুড়ায়!
কলেজ স্ট্রিট এসে গিয়েছে। বই-খাতা-পেনের দোকান সার দেওয়া। সুতরাং এই জায়গাটুকু তাড়াতাড়ি পেরোতে পারলে সুধা বাঁচে। মায়ের চিন্তা ক্লিষ্ট মুখ দেখে স্বস্তি। ভালোয় ভালোয় মুখ বুজে পেরিয়ে যাওয়া যাক। বইপত্র দেখে মায়ের আবার পাঠশালার কথা মনে পড়লেই মুশকিল। এক দৌড়ে ট্রাম লাইন পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরে গেল সুধারানি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
৫বি, ডিএল রায় স্ট্রিটের তিনতলা বাড়িতে আজ উৎসব। সুদূর বরিশাল থেকে কতদিন পরে গুরুদেব এসেছেন। শ্রীশ্রীমৎ স্বামী করুণানন্দ অবধূত। বসেছেন দোতলার হল ঘরে। তাঁর পায়ের ধুলো নিতে উপচে পড়েছে শিষ্যদের ভিড়। মায়ের হাত ছাড়িয়ে এক ছুটে মূল ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায় সুধা। এ তো ওর চেনা মহল। মোটে এক বছর আগেই ওরা এ বাড়ি ছেড়েছে। আসলে তো এটা তার বাবার বানানো বাড়ি। মা কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করে, মাগো আমরা আবার কবে এখানে আসুম? এ বাড়িতে আমাদের অংশ নাই? চাপা সন্ত্রস্ত স্বরে ধমকে ওঠেন সুনীতি, আহ্ চুপ যা ডেপো মাইয়া… একখান কথা যদি ক’বি তাইলে কখনও ত’রে সাথে আনুম না।
দমে যায় সুধা। মায়ের কথায় বুকটায় খান কয়েক মোচড় লাগে পরপর… গোলাপ কুড়ি ঠোঁট দুটো ফুলে ওঠে বার কয়েক। নিজের জন্য বলেছে নাকি ও? মায়ের অহোরাত্রের সঙ্গী কি সে নয়? মায়ের কষ্টের কথা ভেবেই তো এসব বলা… বেদনাবিধুর মাথা নেমেছে বুকে। ছল ছল দৃষ্টি আনত। নিজের বাড়িকে নিজের বললে মা যে কেন এত রেগে যায় বুঝতেই পারে না। নিজের বাড়ি না হলে কি এ বাড়ির আনাচ-কানাচ এমন নখ দর্পণে দেখতে পেত সে? ওর মতো ক’জন জানে যে বাড়ির পাম্প ঘর কোথায়? সে ঘরে পাম্প চালালে তার গর্জনে দোতলার সিঁড়ির কোন কোন ধাপ কাঁপে!
দমে যায় সুধা। মায়ের কথায় বুকটায় খান কয়েক মোচড় লাগে পরপর… গোলাপ কুড়ি ঠোঁট দুটো ফুলে ওঠে বার কয়েক। নিজের জন্য বলেছে নাকি ও? মায়ের অহোরাত্রের সঙ্গী কি সে নয়? মায়ের কষ্টের কথা ভেবেই তো এসব বলা… বেদনাবিধুর মাথা নেমেছে বুকে। ছল ছল দৃষ্টি আনত। নিজের বাড়িকে নিজের বললে মা যে কেন এত রেগে যায় বুঝতেই পারে না। নিজের বাড়ি না হলে কি এ বাড়ির আনাচ-কানাচ এমন নখ দর্পণে দেখতে পেত সে? ওর মতো ক’জন জানে যে বাড়ির পাম্প ঘর কোথায়? সে ঘরে পাম্প চালালে তার গর্জনে দোতলার সিঁড়ির কোন কোন ধাপ কাঁপে!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ
বাড়ির পিছনে ওই যে মস্ত একটা আকাশমণি গাছ, আফ্রিকায় তার নাম কি কেউ জানে? সুধা জানে। বড়দার কাছে শুনে নিয়েছে, বড়দা ওকেই শুধু বলেছে, ওই গাছের নাম আফ্রিকান টিউলিপ। কেউ কি জানে, সেই গাছে কতগুলো কাকের বাসা, সে বাসায় ক’টা ডিম, ডিম ফুটে ফুটে লাল হাঁ মুখওলা ঘুঘু মাথার ছোট ছোট কাকের ছানারা মায়ের ডানার তলায় কেমন করে থম মেরে বসে…। সবকটা ছিল ওর হাতে গোনা…কে, কবে জন্মালো তারপর একটু বড় হয়ে উড়তে শিখলো। একটা ছানা তো আবার উড়তে গিয়ে উপর থেকে নিচে পড়ে মারা গিয়েছিল। কী মন খারাপ যে হয়েছিল সুধার…কে রেখেছে সে খবর? তারপর দক্ষিণের বারান্দা ঘিরে ওই কনক চাঁপা গাছ। সকাল-সন্ধ্যা গন্ধে ম ম করে। আর ঘন লালচে গোলাপি কাগজে ফুলের ঝাড়। বোগেনভোলিয়া নাকি জানি বলে …আর সাদা কালো বড় বড় খোপওলা ঝকঝকে পাথর মেঝে। মুখ দেখা যায়। সেই খোপে সেফটিপিন ছুঁড়ে ও আর ফুলদি কত একা দোক্কা, কিৎকিৎ খেলেছে।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
হঠাৎ একদিন দেখা গেল সেই বাড়িটা নাকি আর ওদের নয়। যেমন করে একদিন হাতির শুঁড়ে ধোঁয়া উড়িয়ে পৃথিবীর পেটটাকে জরাসন্ধের মতো চিরে পেল্লাই রেলগাড়িতে চেপে ওদেশটাকে ছাড়তে হয়েছিল… সুধারানি অবাক হয়ে ভাবে ঠিক যেন একইরকম। ঠিক অমন আর একখানা রেলগাড়ি… ডিএল রায় স্ট্রিট নামের কলকাতা থেকে ওদের পৌঁছে দিল অন্য আর একটা দেশে…যে দেশটার নাম ডায়মন্ডহারবার, যে গঞ্জটার নাম শ্যামাপল্লী।— চলবে
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















