
(বাঁদিকে) হাট্টিমা। (ডানদিকে) হাট্টিমার ডিম। ছবি: সংগৃহীত।
মাসখানেক আগের কথা। স্কুল থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরছি টোটোতে চেপে। আমার চিরকালের স্বভাব হল পথে হাঁটা কিংবা সাইকেল চালানোর সময় হোক কিংবা কোনও গাড়িতে চেপে যাওয়ার সময় হোক রাস্তার সঙ্গে সঙ্গে চোখ থাকে রাস্তার আশেপাশে। আমাদের টোটো তখন করবাড়ি বাস স্টপেজ সবেমাত্র অতিক্রম করেছে। বাস রাস্তার পশ্চিম দিকে রয়েছে মাঝারি আকারের একটি মাঠ। আগে ঝোপ-জঙ্গল ছিল। এখন এখানে অধিকাংশ সময় স্থানীয় ছেলেরা ফুটবল খেলে। শীতকালে এখানে মনসা পুজো ও সেই উপলক্ষে গাজনগান বা যাত্রানুষ্ঠান হয়। মাঠের পশ্চিম দিক বরাবর উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত প্রায় মজে যাওয়া ঘিয়াবতী খাল।
এই খালটি যে সুদূর অতীতে ছিল প্রবল স্রোতস্বিনী ঘিয়াবতী নদী তা আমার বহু লেখাতেই উল্লেখ করেছি। বর্ষাকাল হওয়ায় এই সময় ওই মাঠে তেমন একটা খেলাধুলো হয় না। ফলে জল-কাদা জমা মাঠ ভর্তি সবুজ ঘাস। সেই ঘাস খাওয়ানোর জন্য আশেপাশের গৃহস্থরা তাদের গোরু ও ছাগল মাঠে খুঁটি পুঁতে দড়ি বেঁধে চরতে দেয়। ফলে মাঠে প্রচুর গোবক আনাগোনা করে। পাশে ঘিয়াবতী খাল কচুরিপানায় ভর্তি। পানার উপরে ডাহুক ও জলপিপিদের প্রতিদিনই ঘোরাফেরা করতে দেখি। ৩০ বছর এই পথেই আমার যাতায়াত। ফলে এইসব দৃশ্য আমার আর নজর কাড়ে না। কিন্তু সেদিন হঠাৎ আমার চোখটা আটকে গেল। মনে হল অন্যরকম দুটো পাখি সেই মাঠে গোরুদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো মাঠ অতিক্রম করতে টোটোতে কয়েক সেকেন্ড লেগেছে কিন্তু তার মধ্যেই আমার দৃষ্টি আমাকে নিশ্চিতভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে এ পাখি আগে আমি দেখিনি। তবে ভালোভাবে বুঝতে গেলে আমাকে আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্কুল থেকে ফেরার সময় আবারও টোটোয় চেপে ফিরছিলাম। মিটিং ছিল বলে ওইদিন স্কুল থেকে বেরোতে দেরি হয়েছিল। সেই জায়গায় এসে তাকালাম কিন্তু পাখিগুলোকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম হয়তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে বলে আস্তানায় ফিরে গিয়েছে।
এই খালটি যে সুদূর অতীতে ছিল প্রবল স্রোতস্বিনী ঘিয়াবতী নদী তা আমার বহু লেখাতেই উল্লেখ করেছি। বর্ষাকাল হওয়ায় এই সময় ওই মাঠে তেমন একটা খেলাধুলো হয় না। ফলে জল-কাদা জমা মাঠ ভর্তি সবুজ ঘাস। সেই ঘাস খাওয়ানোর জন্য আশেপাশের গৃহস্থরা তাদের গোরু ও ছাগল মাঠে খুঁটি পুঁতে দড়ি বেঁধে চরতে দেয়। ফলে মাঠে প্রচুর গোবক আনাগোনা করে। পাশে ঘিয়াবতী খাল কচুরিপানায় ভর্তি। পানার উপরে ডাহুক ও জলপিপিদের প্রতিদিনই ঘোরাফেরা করতে দেখি। ৩০ বছর এই পথেই আমার যাতায়াত। ফলে এইসব দৃশ্য আমার আর নজর কাড়ে না। কিন্তু সেদিন হঠাৎ আমার চোখটা আটকে গেল। মনে হল অন্যরকম দুটো পাখি সেই মাঠে গোরুদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো মাঠ অতিক্রম করতে টোটোতে কয়েক সেকেন্ড লেগেছে কিন্তু তার মধ্যেই আমার দৃষ্টি আমাকে নিশ্চিতভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে এ পাখি আগে আমি দেখিনি। তবে ভালোভাবে বুঝতে গেলে আমাকে আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্কুল থেকে ফেরার সময় আবারও টোটোয় চেপে ফিরছিলাম। মিটিং ছিল বলে ওইদিন স্কুল থেকে বেরোতে দেরি হয়েছিল। সেই জায়গায় এসে তাকালাম কিন্তু পাখিগুলোকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম হয়তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে বলে আস্তানায় ফিরে গিয়েছে।
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার জন্য লোকাল বাসে উঠেছি। আসলে যে যান পাই তাতেই উঠে পড়ি স্কুলে যাওয়ার তাড়ায়। বাসে সিট না পেলেও বাসের রড ধরে দাঁড়ালাম বাসের ডানদিকে যাতে জানালা দিয়ে ওই মাঠের দিকে নজর দিতে পারি। ময়নাপাড়া বাস স্টপেজ পেরোতেই আমি একটু ঝুঁকে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। বাসটা টোটোর থেকে অনেক দ্রুত মাঠ অতিক্রম করল। কিন্তু ওই এক দুই সেকেন্ডের মধ্যেই আমি নিশ্চিত হলাম গতকালের দেখা পাখি দুটি আজও রয়েছে। স্কুলে ফিরে আমার মাথার মধ্যে পাখি দুটোর ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগল। বিকেলে স্কুল ছুটির পর আবার টোটোতেই ফিরতে হবে যাতে পাখিগুলোকে একটু ভালোভাবে দেখা যায়। অবশ্য পাখিগুলো যে আমাকে দেখা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে। না, হতাশ হলাম না। বরং আমার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। পাখি দুটোকে এবার বেশ ভালোভাবে দেখতে পেলাম। আর সঙ্গে দেখলাম দুটো ছানাও আছে। পাখি দুটোর রঙ ও আকৃতি মোটামুটি স্পষ্টভাবেই এবার বুঝতে পারলাম।
দেখা তো হল। কিন্তু পরিচয়? বাড়িতে পৌঁছানো পর্যন্ত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল এই চিন্তা। এই পাখি আমি চোখে দেখিনি কিন্তু ছবিতে মনে হয় একাধিকবার দেখেছি। এমনিতেই আমার স্মৃতিশক্তি বেশ কম। তাই কোথায় দেখেছি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না।
বাড়ি ফিরে যথারীতি সালিম আলির শরণাপন্ন হলাম। তাঁর লেখা বইতে পাখিদের অনেক রঙিন ছবি দেওয়া রয়েছে। একটি ছবি দেখে মনে হল আমার দেখার সাথে অনেকটা মিলে যাচ্ছে। যদিও সমস্ত ছবি হাতে আঁকা, তাও মনে হল। পৌঁছে গেলাম ছবির বর্ণনায়। দেখলাম ইংরেজি নাম ‘Red wattled lapwing’, আর বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Vanellus indicus’। হিন্দিতে এর নাম তিত্তিরি বা তেতুরী, আর বাংলায় টিট্রিভ বা টিটিপাখি। মনটা বেশ খুশি হল পাখিটিকে চিনতে পারায়। এবার আমার গন্তব্য অজয় হোমের “চেনা অচেনা পাখি”। পেয়েও গেলাম। সাদাকালো ফটো রয়েছে যা অবিকল আমার দেখা পাখির মতো। ইংরেজি ও বিজ্ঞানসম্মত নাম মিলে গেল। মিলে গেল দুটো বাংলা নামও। তবে অজয় বাবু শিরোনাম হিসেবে যে বাংলা নাম ব্যবহার করেছেন সেটি দেখেই মনে পড়ে গেল সুকুমার রায়ের কথা।অজয়বাবু নাম দিয়েছেন—হাট্টিমা।
“হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম,
তাদের খাড়া দুটো শিং,
তারা হাট্টিমাটিম টিম”।
দেখা তো হল। কিন্তু পরিচয়? বাড়িতে পৌঁছানো পর্যন্ত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল এই চিন্তা। এই পাখি আমি চোখে দেখিনি কিন্তু ছবিতে মনে হয় একাধিকবার দেখেছি। এমনিতেই আমার স্মৃতিশক্তি বেশ কম। তাই কোথায় দেখেছি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না।
বাড়ি ফিরে যথারীতি সালিম আলির শরণাপন্ন হলাম। তাঁর লেখা বইতে পাখিদের অনেক রঙিন ছবি দেওয়া রয়েছে। একটি ছবি দেখে মনে হল আমার দেখার সাথে অনেকটা মিলে যাচ্ছে। যদিও সমস্ত ছবি হাতে আঁকা, তাও মনে হল। পৌঁছে গেলাম ছবির বর্ণনায়। দেখলাম ইংরেজি নাম ‘Red wattled lapwing’, আর বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Vanellus indicus’। হিন্দিতে এর নাম তিত্তিরি বা তেতুরী, আর বাংলায় টিট্রিভ বা টিটিপাখি। মনটা বেশ খুশি হল পাখিটিকে চিনতে পারায়। এবার আমার গন্তব্য অজয় হোমের “চেনা অচেনা পাখি”। পেয়েও গেলাম। সাদাকালো ফটো রয়েছে যা অবিকল আমার দেখা পাখির মতো। ইংরেজি ও বিজ্ঞানসম্মত নাম মিলে গেল। মিলে গেল দুটো বাংলা নামও। তবে অজয় বাবু শিরোনাম হিসেবে যে বাংলা নাম ব্যবহার করেছেন সেটি দেখেই মনে পড়ে গেল সুকুমার রায়ের কথা।অজয়বাবু নাম দিয়েছেন—হাট্টিমা।
তারা মাঠে পাড়ে ডিম,
তাদের খাড়া দুটো শিং,
তারা হাট্টিমাটিম টিম”।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

দশভুজা : আমার দুর্গা—বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

অন্য পূজা: ভি বালসারা আমাকে প্রথম হিন্দুস্থান রেকর্ডসে নিয়ে গিয়েছিলেন : সরোজ বড়ুয়া
পাখিগুলো মাঠেই বাসা বানায় ও সেখানে ডিম পাড়ে। পড়ে দেখলাম। কিন্তু শিং তো নেই। মনে হয় চোখের দু’পাশ থেকে সাদা রঙের যে দুটো ডোরা দাগ রয়েছে ওটাকেই হয়তো সুকুমার রায় শিং-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন কিংবা পাখিটার মাথায় কল্পনার শিং গজিয়ে ছড়াটি লিখেছেন। এই তাহলে সুকুমার রায়ের হাট্টিমা পাখি। কিন্তু মনে হল ‘Birds of India’-র অনুবাদ ‘সাধারণ পাখি’ বইয়ের সূচিপত্রে অন্য এক জায়গায় হাট্টিমা নামটা নজরে পড়েছে। সন্দেহ নিরসন করার জন্য ‘সাধারণ পাখি’ বইটির সূচিপত্রে গেলাম। দেখি আমার দেখা ঠিক। হাট্টিমা নামে যে পাখিটির কথা এখানে বলা হয়েছে তা ভিন্ন পাখি। যদিও দুটি পাখির মধ্যে বেশ মিল রয়েছে তাও আকৃতিগতভাবে ও গোত্রের নিরিখে তারা আলাদা। ধন্ধে পড়লাম নাম নিয়ে – কোনটি ঠিক? হাট্টিমা নাম নিয়েই যত গন্ডগোল!
একই জায়গায় দু’দিনে তিনবার দেখার পর ইচ্ছে হল, একবার পাখিগুলোর ছবি তোলার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল স্কুলে যাওয়ার সময় তাড়া থাকে। আবার ফেরার সময় অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। কাছাকাছি বাড়ি এমন এক অনুজ সহকর্মীকে বললাম পাখিটার ব্যাপারে, আর ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলাম। সে বেচারা চেষ্টা করল ঠিকই কিন্তু জলপিপির ছবি তুলে আমাকে দেখাল। বুঝলাম উদ্যোগ নিজেকেই নিতে হবে। কিন্তু তার পরের দিন থেকেই টানা দু’দিন প্রবল বৃষ্টি হল। জল থই থই চতুর্দিক। আর সেই মাঠ জলে টইটম্বুর। সেই হাট্টিমা কিংবা ট্রিটিভ বা টিটিপাখি যে নামই হোক না কেন তার ফটো তোলার চেষ্টা করা তো দূর আর দেখাই মিলল না। তবে আমি হাল ছাড়লাম না। নিশ্চিত আবার ওদের দেখতে পাব। এভাবেই কাটছিল।
একই জায়গায় দু’দিনে তিনবার দেখার পর ইচ্ছে হল, একবার পাখিগুলোর ছবি তোলার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল স্কুলে যাওয়ার সময় তাড়া থাকে। আবার ফেরার সময় অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। কাছাকাছি বাড়ি এমন এক অনুজ সহকর্মীকে বললাম পাখিটার ব্যাপারে, আর ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলাম। সে বেচারা চেষ্টা করল ঠিকই কিন্তু জলপিপির ছবি তুলে আমাকে দেখাল। বুঝলাম উদ্যোগ নিজেকেই নিতে হবে। কিন্তু তার পরের দিন থেকেই টানা দু’দিন প্রবল বৃষ্টি হল। জল থই থই চতুর্দিক। আর সেই মাঠ জলে টইটম্বুর। সেই হাট্টিমা কিংবা ট্রিটিভ বা টিটিপাখি যে নামই হোক না কেন তার ফটো তোলার চেষ্টা করা তো দূর আর দেখাই মিলল না। তবে আমি হাল ছাড়লাম না। নিশ্চিত আবার ওদের দেখতে পাব। এভাবেই কাটছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
৬-৭ দিন পর হঠাৎই নজরে এল, রায়বাড়ি বাস স্টপেজের পাশে বাসরাস্তার পশ্চিম দিকে একটা ধানজমির ঠিক পরে যে ঘাসভর্তি বাঁধ রয়েছে তার ওপরে একটা সেই পাখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। জায়গাটা কিন্তু সেই ঘিয়াবতী খালের লাগোয়া। আগের জায়গা থেকে এই জায়গাটির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। সুতরাং এরা নিশ্চিত ভিন্ন পাখি। মনটা আরও খুশিতে ভরে উঠল এই ভেবে যে এরা কাছাকাছি বিভিন্ন জায়গাতেই ছড়িয়ে রয়েছে। এবার আর দেরি নয়, ছবি তোলার চেষ্টা করতেই হবে। সেই দিনই ফেরার সময় ঠিক করলাম রায়বাড়ি স্টপেজে যদি দেখতে পাই তবে টোটো থেকে নেমে পড়ব। দেখতে পেলাম এবং নেমেও পড়লাম। তারপর মোবাইলের ক্যামেরা তাক করে এগিয়ে গেলাম ঘিয়াবতী খালের পাড়ে। স্থির হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে চতুর্দিক দেখছিল সে। তখনও দূরত্ব অনেকটাই। বিপদ আঁচ করল। আর তারপরেই ‘হাট-টিটিটি হাট-টিটিটি’ শব্দ করে দৌড়ে পাশের ঝোপে লুকিয়ে পড়ল। আমার আর ছবি তোলা হল না। তবে এটুকু বুঝে গেলাম যে অজয়বাবু ‘হাট্টিমা’ নাম ভুল কিছু লেখেননি। এই পাখিদের আওয়াজ থেকেই মনে হয় এমন নাম। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম পাখিটিকে তার এই অদ্ভুত ডাকের জন্য ‘হাট্টিটি’ নামেও ডাকা হয়। তবে ‘হাট্টিমা’ নামটি বেশি পছন্দসই হওয়ায় আমি অজয়বাবুর দেওয়া নামটাই ব্যবহার করলাম।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ
হাট্টিমা পাখি চেনা খুব সহজ। সরু লম্বা টিঙটিঙে পা-ওয়ালা পাখিগুলোর মাথা, ঘাড্, চিবুক ও গলা কুচকুচে কালো। দু’চোখের পেছন থেকে বেশ চওড়া সাদা রঙের পটি ঘাড়ের দুদিক দিয়ে নেমে এসে ডানার সামনে দিয়ে পেটের সাদা রঙের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। কালো ও সাদার এই অদ্ভুত কনট্রাস্ট হাট্টিমার রূপলাবণ্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আরও একটি অঙ্গ হাট্টিমাকে অনন্য করে তুলেছে। উপরের চঞ্চুর গোড়ায় টুকটুকে লাল রঙের মাংসল উপাঙ্গ দুই চোখের দিকে এগিয়ে গিয়ে চোখের চারপাশে লাল রঙের বলয় তৈরি করেছে। এই মাংসল উপাঙ্গকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Wattle’, আর তাই ইংরেজিতে এর নাম ‘Red wattled lapwing’। পিঠের উপর দিকের রঙ তামাটে বা খয়েরি। চঞ্চুর গোড়ার দিকের রং লাল হলেও আগার দিকের রঙ কালো। চোখের রং গাঢ় বাদামি। সরু পাগুলো উজ্জ্বল হলুদ রঙের, তবে নখের রং কালো। এরা লম্বায় হয় ৩০-৩৫ সেন্টিমিটার আর দুদিকে ডানা ছড়ালে তার বিস্তার হয় ৭৫-৮৫ সেন্টিমিটার। পায়ের কথা আগেই বলেছি, লম্বায় প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার। এজন্যই এরা লম্বা লম্বা পা ফেলে জলা জায়গা বা ঘন ঘাস জমির উপর দিব্যি হাঁটতে বা ছুটতে পারে। এদের ওজন হয় ১৮০-২৬০ গ্রাম।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
সুন্দরবন তো বটেই, ভারতসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশেই হাট্টিমা উপস্থিত। মধ্য এশিয়ার কিছু দেশেও এদের পাওয়া যায়। উন্মুক্ত জলা জায়গা, নদীর তীর, ঘাসজমি, কৃষিজমি ইত্যাদি জায়গায় এদের অবাধ বিচরণ। যেখানেই জলের উৎস রয়েছে তার আশেপাশেই এদের দেখা যাবে। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়। তবে খুবই ভীতু স্বভাবের পাখি। সবসময় আশেপাশে বিপদ আছে কিনা সে ব্যাপারে সতর্ক থাকে। এদের ওড়ার গতিবেগ মন্থর হলেও লম্বা লম্বা পা ফেলে যেমন দ্রুত হাঁটতে পারে তেমনই বিপদ বুঝলে অত্যন্ত দ্রুত যে লুকিয়ে পড়তে পারে সে তো নিজেই দেখেছি। এরা সাধারণত জলপিপি, বক, ডাহুক ইত্যাদি জলচর পাখিদের সাথে ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করে। তবে বাচ্চাদের নিয়ে যখন ঘোরে তখন বিপদ বুঝলে সেই প্রাণীকে তাড়া করে যায়। আর বিপদ বুঝলে ‘হাট টি টি টি’ বা ‘টিটিটি হাট’ শব্দ করে ডাকে। ইংরেজিতে মজা করে এমন শব্দের জন্য এই পাখির আরও নাম দেওয়া হয়েছে “Did he do it” বা “Pity to do it” পাখি।

(বাঁদিকে) ডিমে তা দিতে উদ্যত হাট্টিমা। (ডানদিকে) হাট্টিমার ছানা। ছবি: সংগৃহীত।
এরা ঘাসের মধ্যে থেকে পিঁপড়ে, শুয়োপোকা, ফড়িংসহ নানা পোকামাকড় ছোট শামুক, চিংড়ি, কেঁচো ইত্যাদি খায়। খাদ্য সংগ্রহ করার প্রধান সময় সকাল ও বিকেল হলেও কখনও কখনও মেঘলা দুপুরে বা জ্যোৎস্নালোকিত রাতে খাবার খুঁজতে দেখা যায়। খাবার শিকার করার সময় এরা লম্বা চঞ্চুকে শিকারের দিকে বাগিয়ে ধরে ছুটে যায়। মার্চ মাস থেকে সেপ্টেম্বর হল এদের প্রজনন ঋতু।
এই সময় এরা মাটির মধ্যে ছোট্ট একটা গর্ত করে, আর গর্তের প্রান্ত বরাবর কাদার দলা, ছাগলের মল বা ছোট নুড়ি সাজিয়ে নেয়। সাধারণত জলের উৎসের কাছাকাছি বাসা বানায়। হাট্টিমা স্ত্রী-পুরুষ জোড় খুব স্থায়ী। স্ত্রী হাট্টিমা বাসার মধ্যে ৩-৪টি ধূসর রঙের ডিম পাড়ে। ডিমের ওপরে কালচে ছোপ থাকে। প্রায় ২৮ দিন স্ত্রী ও পুরুষ পালা করে তা দেয়। একজন যখন তা দেয় অন্যজন তখন পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে এলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন-পালনের ভার উভয়েই বহন করে। গরমের সময় এরা কাছাকাছি জলাশয় থেকে বুক ও পেটের পালক ভিজিয়ে এনে ডিম ঠান্ডা করে ও বাচ্চাদের জল খাওয়ায়। এদের ডিম ও বাচ্চার গায়ের রং আশেপাশের পরিবেশের সাথে এমন ভাবে মিশে যায় যে সহজে শত্রুদের দৃষ্টিগোচর হয় না। যদি কোনও প্রাণীর থেকে মনে হয় যে তাদের বাচ্চা বা ডিমের বিপদ রয়েছে তাহলে হিংস্রভাবে তাড়া করে যায়। এমনকি ঠোক্কর করে দিতেও ছাড়ে না।
হাট্টিমাদের সবচেয়ে বড় বিপদ হল সুন্দরবনে জলাভূমি হ্রাস আর জলতল বৃদ্ধি। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এদের স্বাভাবিক বাসস্থান যেমন কমেছে, বাসা করার জায়গাও কমেছে। বিভিন্ন মাংসাশী পাখি আর সাপ হল এদের প্রধান শত্রু। যদিও আই.ইউ.সি.এন-এর তালিকায় এরা বিপন্ন নয় তবুও এদের সংখ্যা যে কমেছে এবং সুন্দরবনের সর্বত্র যে এরা নেই তা একপ্রকার নিশ্চিত। নইলে যে জায়গাগুলোতে সম্প্রতি এদের দেখতে পেলাম কেন গত ৩০ বছরে এরা আমার নজরে পড়েনি? তবে এটা ভেবেও তৃপ্তি পাচ্ছি যে এদের সংখ্যা হয়তো আবার বাড়ছে। হয়তো এরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান খুঁজে পাচ্ছে সুন্দরবনের বসতি এলাকায়।
— চলবে
এই সময় এরা মাটির মধ্যে ছোট্ট একটা গর্ত করে, আর গর্তের প্রান্ত বরাবর কাদার দলা, ছাগলের মল বা ছোট নুড়ি সাজিয়ে নেয়। সাধারণত জলের উৎসের কাছাকাছি বাসা বানায়। হাট্টিমা স্ত্রী-পুরুষ জোড় খুব স্থায়ী। স্ত্রী হাট্টিমা বাসার মধ্যে ৩-৪টি ধূসর রঙের ডিম পাড়ে। ডিমের ওপরে কালচে ছোপ থাকে। প্রায় ২৮ দিন স্ত্রী ও পুরুষ পালা করে তা দেয়। একজন যখন তা দেয় অন্যজন তখন পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে এলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন-পালনের ভার উভয়েই বহন করে। গরমের সময় এরা কাছাকাছি জলাশয় থেকে বুক ও পেটের পালক ভিজিয়ে এনে ডিম ঠান্ডা করে ও বাচ্চাদের জল খাওয়ায়। এদের ডিম ও বাচ্চার গায়ের রং আশেপাশের পরিবেশের সাথে এমন ভাবে মিশে যায় যে সহজে শত্রুদের দৃষ্টিগোচর হয় না। যদি কোনও প্রাণীর থেকে মনে হয় যে তাদের বাচ্চা বা ডিমের বিপদ রয়েছে তাহলে হিংস্রভাবে তাড়া করে যায়। এমনকি ঠোক্কর করে দিতেও ছাড়ে না।
হাট্টিমাদের সবচেয়ে বড় বিপদ হল সুন্দরবনে জলাভূমি হ্রাস আর জলতল বৃদ্ধি। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এদের স্বাভাবিক বাসস্থান যেমন কমেছে, বাসা করার জায়গাও কমেছে। বিভিন্ন মাংসাশী পাখি আর সাপ হল এদের প্রধান শত্রু। যদিও আই.ইউ.সি.এন-এর তালিকায় এরা বিপন্ন নয় তবুও এদের সংখ্যা যে কমেছে এবং সুন্দরবনের সর্বত্র যে এরা নেই তা একপ্রকার নিশ্চিত। নইলে যে জায়গাগুলোতে সম্প্রতি এদের দেখতে পেলাম কেন গত ৩০ বছরে এরা আমার নজরে পড়েনি? তবে এটা ভেবেও তৃপ্তি পাচ্ছি যে এদের সংখ্যা হয়তো আবার বাড়ছে। হয়তো এরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান খুঁজে পাচ্ছে সুন্দরবনের বসতি এলাকায়।
— চলবে
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















