
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
পঞ্চবটীবনে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ আশ্রয় নিয়েছেন। হেমন্ত ঋতু সমাগত। গোদাবরী নদীতে স্নানান্তে তাঁরা তিনজন, লক্ষ্মণনির্মিত আশ্রমস্থ পর্ণকুটিরে প্রবেশ করলেন। মহর্ষিগণ তাঁদের সম্মানিত করলেন। পর্ণকুটিরে সুখের আবহে, চিত্রানক্ষত্রযুক্ত চন্দ্রিমার মতো সীতা-সহ অবস্থান করছেন রাম। তিনি, লক্ষ্মণের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিভিন্ন কথাবার্তায় নিরত হলেন। সেই সময়ে সেইখানে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হল এক রাক্ষসী। সে, দশানন রাবণের ভগিনী শূর্পনখা। রামকে দেখে তাঁর কাছে উপস্থিত হল সে। শূর্পনখা রামকে দেখলেন, উজ্জ্বল মহাবাহু রামের পদ্মপাতার মতো নয়ন, তাঁর গমন গজগমনের সমতুল, তিনি জটাজুট ধারণ করে বিরাজমান। এমন সুলক্ষণযুক্ত, মহাপ্রাণ, রাজলক্ষণান্বিত, ইন্দীবরশ্যামবরণ, কন্দর্পতুল্য কান্তিমান, দেবেন্দ্রসম রামকে দেখে রাক্ষসী কামমুগ্ধ হল। রাক্ষসী বিকটবদনা, রামের সুমুখশ্রী, রামের মধ্যদেশ ক্ষীণ, রাক্ষসীর উদর স্ফীত, রামের আয়তক্ষেত্র, রাক্ষসী চক্ষু বিকট, সুকেশ রামের বিপরীত রাক্ষসীর কেশ তাম্রবর্ণ, প্রিয়দর্শন রাম আর রাক্ষসী কুরূপা, সুকণ্ঠস্বরের অধিকারী রাম, রাক্ষসীর রব ভয়ঙ্কর, তরুণ রামের সম্মুখে অতিবৃদ্ধা রাক্ষসী, প্রিয়ভাষী রামের বিপরীতভাষিণী ছিল সেই রাক্ষসী। ন্যায়পরায়ণ রাম, রাক্ষসী দুর্বৃত্তা, রাম প্রিয়দর্শন সেই রাক্ষসী কিন্তু অপ্রিয়দর্শনা।
রামের একেবারেই বিপরীত এমন যে রাক্ষসী, তাঁর শরীরস্থ কামের তারণায়, সে রামকে বলল, জটাধারী তাপসের বেশে, ধনুর্বাণহাতে, সস্ত্রীক এই রাক্ষস-অধ্যুষিত অরণ্যে এসেছেন কেন? আগমনের যথাযথ কারণ বলতে পারবেন কী? কিমাগমনকৃত্যং তে তত্ত্বমাখ্যাতুমর্হসি। রাক্ষসীর কথা শেষ হল। শত্রুদের ত্রাস রামচন্দ্র, সরলমনে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। দেবতুল্য পরাক্রমশালী দশরথ নামে এক রাজা ছিলেন। আত্মপরিচয় দিলেন রাম। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র আমি, সকলে আমায় রাম নামে জানেন। ইনি আমার অনুগত কনিষ্ঠ ভাই, লক্ষ্মণ। আমার এই পত্নী, বিদেহনন্দিনী, সীতা নামে বিশেষভাবে পরিচিতা। আসীদ্দশরথো নাম রাজা ত্রিদশবিক্রমঃ। তস্যাহমগ্রজঃ পুত্রো রামো নাম জনৈঃ শ্রুতঃ।। ভ্রাতায়ং লক্ষ্মণো নাম যবীযান্ মামনুব্রতঃ। ইয়ং ভার্য্যা চ বৈদেহী মম সীতেতি বিশ্রুতা।। রাম জানালেন, পিতামাতার আদেশে, ধর্মাকাঙ্খী রাম ধর্মার্জনের কারণে বনে এসেছেন। তিনি তাঁর বনবাসের কারণ বর্ণনা করে, রাক্ষসীর পরিচয় জানতে চাইলেন, ত্বান্তু বেদিতুমিচ্ছামি কস্য ত্বং কাসি কস্য বা। ত্বং হি তাবন্মনোজ্ঞাঙ্গী রাক্ষসী প্রতিভাসি মে।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?

দোলি হ্যায়!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৫ : সাথী হারা
তোমার কাছে জানতে চাই, তুমি কে? কার দুহিতা? তুমি কার? আমার ধারণা, তুমি কোনও মনোমোহিনী রাক্ষসী। রাম, রাক্ষসীর সেখানে উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলেন। কামার্তা রাক্ষসী তাঁর আগমনের কারণ অকপটে প্রকাশ করলেন। রাক্ষসীর দেওয়া বিবরণ-অনুযায়ী রামের যথাযথ তথ্য শোনা প্রয়োজন। তার নাম শূর্পনখা, সে যথেচ্ছ রূপধারণকারিণী রাক্ষসী। অরণ্যের ত্রাস অতিভয়ঙ্কর এই রাক্ষসী একাকিনী সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। রাক্ষসী নিজের পরিচয় ঘোষণা করল, তোমার কানে এসেছে নিশ্চয়ই যে রাবণ আমার ভাই। এ ছাড়াও সদানিদ্রিত মহাবলী কুম্ভকর্ণ, রাক্ষসতুল্য আচরণবিহীন ধর্মাত্মা বিভীষণ এবং যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যাদের শৌর্য সেই খর ও দূষণ, এরা আমার ভাই। রাবণো নাম মে ভ্রাতা যদি তে শ্রোত্রমাগতঃ। প্রবৃদ্ধনিদ্রশ্চ সদা কুম্ভকর্ণো মহাবলঃ। বিভীষণস্তু ধর্মাত্মা ন তু রাক্ষসচেষ্টিতঃ।। প্রখ্যাতবীর্য্যৌ চ রণে ভ্রাতরৌ খরদূষণৌ।। রাক্ষসী রামের প্রতি তার অনুরাগ ব্যক্ত করল, ভাইদের অমান্য করে, প্রথমদর্শনে রাক্ষসী পুরুষশ্রেষ্ঠ রামকে স্বামীরূপে ভেবেছে। অতঃপর তার পরিণয়ের প্রস্তাব — সে প্রভাবসম্পন্না, স্বেচ্ছায় সব জায়গায় যাওয়ার শক্তি আছে তার। তাই, চিরায় ভব ভর্ত্তা মে সীতয়া কিং করিষ্যসি। সীতাকে নিয়ে কি করবে? বরং চিরকালের জন্যে তুমি আমার স্বামী হও। সে সীতার নিন্দা করে বলল, কদাকারা ও কুরূপা, সে রামের যোগ্যা নয় মোটেও। রাক্ষসীর মতে,সে নিজে রামের সুযোগ্যা স্ত্রী। রাম, সেভাবেই তাকে গ্রহণ করুন। পরিশেষে, রাক্ষসী, সীতা ও লক্ষ্মণের আসন্ন ভবিতব্য কি হবে? সেটি ঘোষণা করল। ইমাং বিরূপামসতীং করালং নির্ণতোদরীম্। অনেন সহ তে ভ্রাত্রা ভক্ষয়িষ্যামি মানুষীম্।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : পর্ব-৫৯: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ
এই বিরূপা, অবিশ্বস্তা এবং কৃশোদরী মানবীকে তোমার ভাই লক্ষ্মণ-সহ খেয়ে ফেলব। তারপরে কামার্ত রাম তার সঙ্গে নানা গিরিশিখরে ও বনভূমিতে বিচরণ করবেন। রাক্ষসীর বক্তব্য শেষ হলে, বাক্-পটু, রাম, সহাস্যে মদিরচক্ষুবিশিষ্টা রাক্ষসীকে বলতে লাগলেন। স্মিত হাসি হেসে কামনার বাঁধনে আবদ্ধা শূর্পনখাকে সুমধুর কথায় তাঁর দাম্পত্যজীবনে প্রিয়স্ত্রী সীতার বিষয়ে জানালেন। শূর্পনখা মজেছে কামনার প্রগাঢ় বাঁধনে। রাম, স্মিত হাসি হেসে শূর্পনখাকে সুমধুর কথায় নিজের দাম্পত্যজীবনের আভাস দিলেন। কৃতদারোঽস্মি ভবতি ভার্য্যেয়ং দয়িতা মম। ত্বদ্বিধানান্তু নারীণাং সুদুঃখা সসপত্নতা।। আমি বিবাহিত। ইনি আমার প্রেয়সী স্ত্রী সীতা। তোমার মতো নারীর সতীনের সঙ্গে সহাবস্থান সত্যই কষ্টকর।তাই রামের বিকল্প প্রস্তাব — এই যে আমার অনুজ লক্ষ্মণ, তিনি চরিত্রবান, প্রিয়দর্শন, কান্তিমান ও শৌর্যবান, তিনি আবার অবিবাহিতও বটে। ভাইটি অকৃতদার, বিবাহে ইচ্ছুক, তরুণ, সুদর্শন। ইনি রূপমাধুর্যে তোমার যোগ্য স্বামী হতে পারেন। অপূর্ব্বো ভার্য্যয়া চার্থী তরুণঃ প্রিয়দর্শনঃ। অনুরূপশ্চ তে ভর্ত্তা রূপস্যাস্য ভবিষ্যতি।। রামের কণ্ঠে যেন পরিহাসের সুর, তাঁর প্রস্তাব-সূর্যকিরণ যেমন মেরুপর্বতকে কামনা করে তেমন বিশালনয়না রাক্ষসী, রামের ভাইটিকে বরণ করে সপত্নীহীন বিবাহিতজীবন যাপন করুন। রামের বক্তব্য শেষ হল। কামনার মুগ্ধতায় আচ্ছন্না রাক্ষসী, রামকে ছেড়ে দিয়ে গেল লক্ষ্মণের কাছে, বলল—তুমি যেমন রূপবান,তোমার রূপের অনুরূপ আমার সৌন্দর্য। নারীশ্রেষ্ঠা আমি তোমার যোগ্যা স্ত্রী। তুমি, আমার সঙ্গে, পরম সুখে, দণ্ডকারণ্যে ঘুরে বেড়াবে। *অস্য রূপস্য তে যুক্তা ভার্য্যাহং বরবর্ণিনী। ময়া-সহ সুখং সর্ব্বান্ দণ্ডকান্ বিচরিষ্যতি।। রাক্ষসীর কথা শুনে, বচনপটু লক্ষ্মণ, একটু হেসে শূর্পনখাকে উপযুক্ত জবাব দিলেন, লক্ষ্মণ নিজে ভাইয়ের সেবক, কমলবর্ণা শূর্পনখা লক্ষ্মণের স্ত্রী হয়ে দাসী হতে চাইছেন কেন? লক্ষ্মণ যে জ্যেষ্ঠ রামের অধীন, তাই তিনি পরাধীন। অমলিন সৌন্দর্যের অধিকারিণী, আয়তনয়না রাক্ষসী বরং, (দাম্পত্যে) সফল হয়েছেন যিনি সেই রামের কনিষ্ঠা স্ত্রী হন। রাম এই বিকৃতরূপিনী, অসতী, ভয়ঙ্করী, নতোদরী, বৃদ্ধাকে ত্যাগ করে রাক্ষসীকেই বরণ করে নেবেন।
যেন প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গের সুরে লক্ষ্মণ বললেন, হে উত্তমবর্ণা, কোনও বিচক্ষণ মানুষ এমন শ্রেষ্ঠ অপরূপ সৌন্দর্য উপেক্ষা করে, মানবীর প্রণয়প্রার্থী হয়? কো হি রূপমিদং শ্রেষ্ঠং সন্ত্যজ্য বরবর্ণিনি। মানুষীষু বরারোহে কুর্য্যাদ্ভাবং বিচক্ষণঃ।। পরিহাসের ভাষা উপলব্ধির মতো অনুভব, ভীষণাকৃতি লম্বোদরী রাক্ষসীর নেই। সে লক্ষ্মণের কথা সত্য বলে মেনে নিল। কামে আত্মহারা, রাক্ষসী, আবার পর্ণকুটিরে সীতার সঙ্গে অবস্থানরত দুর্দ্ধর্ষ রামের কাছে হাজির হল। যেন ক্ষোভের সঙ্গে সে জানালেন, রাম এই কুরূপা অসতী নতোদরী অতি ভয়ানক বৃদ্ধাতে আসক্ত। তাই রাক্ষসীর প্রতি রামের কোন সম্ভ্রমবোধ নেই। রাক্ষসী সদম্ভে ঘোষণা করল,আজ এখনই তোমার চোখের সামনে এই মানবীকে খেয়ে ফেলি, তারপরে না হয়, সতীনশূন্যা হয়ে তোমার সঙ্গে সানন্দে ঘুরে বেড়াব। অদ্যেমাং ভক্ষয়িষ্যামি পশ্যতস্তব মানুষীম্। ত্বয়া সহ চরিষ্যামি নিঃসপত্না যথাসুখম্।।
যেন প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গের সুরে লক্ষ্মণ বললেন, হে উত্তমবর্ণা, কোনও বিচক্ষণ মানুষ এমন শ্রেষ্ঠ অপরূপ সৌন্দর্য উপেক্ষা করে, মানবীর প্রণয়প্রার্থী হয়? কো হি রূপমিদং শ্রেষ্ঠং সন্ত্যজ্য বরবর্ণিনি। মানুষীষু বরারোহে কুর্য্যাদ্ভাবং বিচক্ষণঃ।। পরিহাসের ভাষা উপলব্ধির মতো অনুভব, ভীষণাকৃতি লম্বোদরী রাক্ষসীর নেই। সে লক্ষ্মণের কথা সত্য বলে মেনে নিল। কামে আত্মহারা, রাক্ষসী, আবার পর্ণকুটিরে সীতার সঙ্গে অবস্থানরত দুর্দ্ধর্ষ রামের কাছে হাজির হল। যেন ক্ষোভের সঙ্গে সে জানালেন, রাম এই কুরূপা অসতী নতোদরী অতি ভয়ানক বৃদ্ধাতে আসক্ত। তাই রাক্ষসীর প্রতি রামের কোন সম্ভ্রমবোধ নেই। রাক্ষসী সদম্ভে ঘোষণা করল,আজ এখনই তোমার চোখের সামনে এই মানবীকে খেয়ে ফেলি, তারপরে না হয়, সতীনশূন্যা হয়ে তোমার সঙ্গে সানন্দে ঘুরে বেড়াব। অদ্যেমাং ভক্ষয়িষ্যামি পশ্যতস্তব মানুষীম্। ত্বয়া সহ চরিষ্যামি নিঃসপত্না যথাসুখম্।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
এই বলে, জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো রক্তচক্ষু রাক্ষসী, সক্রোধে, ধেয়ে গেল হরিণ শিশুর মতো নয়ন যাঁর সেই সীতার দিকে, যেন এক মহান উল্কা ছুটে গেল রোহিণীর (চন্দ্রপত্নী) উদ্দেশে। যমের পাশতুল্য রাক্ষসীর গতিবেগ দেখে, মহাবলশালী রাম তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন। ক্ষুব্ধ রাম, লক্ষ্মণকে বললেন— হে সৌম্য লক্ষ্মণ, নিষ্ঠুর অনার্যার সঙ্গে পরিহাস কখনও উচিত কাজ নয়। দেখ, বৈদেহী সীতা (রাক্ষসীর ভয়ে) কোনওমতে বেঁচে আছেন মাত্র। পশ্য বৈদেহীং কথঞ্চিৎ সৌম্য জীবতীম্ রামের অমোঘ নির্দেশ—হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, তুমিই এই বিকৃতাকৃতি অসতী কামপ্রমত্তা, মহোদরী রাক্ষসীকে বিরূপা করতে পার। রামের আদেশমাত্র মহাবল, ক্রুদ্ধ, লক্ষ্মণ, খড়্গ উদ্যত করে, রামের সামনে রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে ফেললেন। ভয়ানকরূপ ধারণ করে, ছিন্ন নাক ও কান-সহ, রাক্ষসী, বিকটশব্দে চিৎকার করতে করতে যেখান থেকে এসেছিল সেই বনে দ্রুত ছুটে পালাল। কুৎসিতা, ভয়ঙ্করাকৃতি, রাক্ষসী, রক্তাক্তশরীরে, বর্ষার মেঘের মতো নানাভাবে ঘোর গর্জন করতে লাগল। ভয়াবহ-আকৃতি রাক্ষসীর দেহ হতে অজস্র রক্তক্ষরণ হতে লাগল। সেই অবস্থায় দুটি হাত তুলে গর্জন করতে করতে সে মহারণ্যে প্রবেশ করল। তারপর যার বিকৃতরূপের মূল কারণ লক্ষ্মণ, সেই রাক্ষসী তখন, জনস্থানে অবস্থানরত রাক্ষসপরিবৃত উগ্রতেজস্বী ভাই খরের সামনে, আকাশ থেকে পড়া বজ্রের মতো ভূপতিত হল।খরের ভগ্নী রাক্ষসী, রক্তাপ্লুতদেহে, ভয় ও মোহবশত বিভ্রান্ত হয়ে, ভাই-সহ সস্ত্রীক রাঘব রামের বনে আগমনবৃত্তান্ত এবং তার নিজের রূপবিকৃতির কাহিনি সবিস্তারে বর্ণনা করল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
দণ্ডকারণ্যের গহনারণ্যে রাক্ষসী শূর্পনখার সঙ্গে রামের দেখা হওয়া ও শূর্পনখার মর্মান্তিক পরিণতি, রামের ঘটনাবহুল জীবনে একটি নাটকীয় চমক। এতদিন বনবাস ছিল অসতর্ক জীবনের। সে জীবন নিজের রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীন রাজপুত্রের নিরাসক্ত বনবাসী তপস্বীর জীবন। সে ছিল মোহমুক্ত, রাজকীয়বন্ধনবিহীন মুক্ত জীবন। মাঝে ভরতের উপস্থিতি, স্থিতধী বনবাসী রামের অযোধ্যার সঙ্গে যোগসূত্রস্থাপনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা, হয়তো রামের নির্মোহ ত্যাগের আদর্শে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। তাই তিনি দূরত্ব চেয়েছিলেন। সেই কারণেই বিঘ্নসঙ্কুল হলেও দণ্ডকারণ্যের বিজন বন ছিল অতি পছন্দের। সেখানেও তাঁর প্রতি রাক্ষসীর রূপমুগ্ধতা তাঁকে যেন অন্য এক রূপে মোহমুগ্ধতায় জড়ানো অপচেষ্টায় পরিণত হল। স্ত্রী সীতা রামের চিরন্তন আশ্রয়। আনন্দরূপ রামের সততার নিশ্চিন্ত নিভৃত গৃহকোণ সীতা। রাক্ষসী শূর্পনখা বাইরের জগতের তথাকথিত শারীরিক সৌন্দর্যের অমোঘ আকর্ষণের প্রতীক। আবহমান কাল ধরে চিরন্তনের কাছে হার মেনেছে বাহ্যিক চটকদার জৌলুস। চিরটা কাল ধরে রক্তাক্ত বে-আবরু শূর্পনখার মতোই পরাজিতের গৌববহীনতায় মেকি প্রেমের মোহ নগ্ন হয়ে মুখ ঢেকেছে লজ্জায়, শুধু পালানোর পথ খুঁজেছে।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাম রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। এ পর্যন্ত তাঁর নারীঘটিত দুর্বলতা দেখা যায়নি। বনবাসে নিজের স্ত্রীর সঙ্গ প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধান্বিত হননি। কামনার তারণা তাঁর মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে— এমন কোন উদাহরণ নেই। সীতার প্রতি কোনও আত্মিক টানের প্রকাশ ঋষিকবির লেখনীতে নেই। অথচ রাম মানুষ, অতিমানব নন, ষড়রিপুর অন্যতম কামনা তাঁকে বশীভূত করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাঁর অতিমানবত্বের প্রকাশ। আবার ঘরোয়া গৃহস্থের আটপৌরে গৃহকোণে অভ্যস্ত সাধারণের মতোই স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণে তাঁর সদাসতর্ক সস্নেহ দৃষ্টি। বনবাসী নিরাসক্ত রাম ও দাম্পত্যপ্রেমে গভীর আসক্ত রামের এই দুই সত্তা। মায়াময় মোহমুগ্ধতা ও চিরন্তনের প্রতি অবিচল আস্থা, এই দুইয়ের টানাপোড়েনের পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাঁকে। পরীক্ষায় তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন, সেই সঙ্গে হয়তো ভাবশিষ্য লক্ষ্মণেরও পরীক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন রাম। বলাবাহুল্য লক্ষ্মণ, দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মায়াময় মোহমুগ্ধতা নেহাতই পরিহাসের বিষয়মাত্র। জীবনে এমন পরিস্থিতির শিকার হন প্রায় প্রতিটি মানুষ। অযাচিত প্রণয়াকর্ষণ, মোহ, মেকি ও সুলভ হৃদয়াবেগের অমোঘ পিছুটান মানুষকে দিকভ্রান্ত করে তোলে, সকলে কি রাম হতে পারেন? না। রামের মানবসত্তা আপামর সাধারণ ভারতীয়ের জীবনাদর্শ আর তাঁর অতিলৌকিক সত্তা শেখায় মোহমুক্তপুরুষ হয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ, সত্যপালনের দৃঢ়তা, দায়বদ্ধবিশ্বস্ততা। লৌকিক অলৌকিকতার মিশ্রণে হৃদয়স্পর্শী রামায়ণ, অমোঘ, চিরন্তন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















