মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

হনু হল চোয়াল, কিংবা চিবুক। হনুমানের মুখের এই অংশগুলির বৈশিষ্ট্যের জন্য তার এমন নাম। তবে আজকের গল্প হনুমানের নয়, ঘোড়ার। আবার সেভাবে দেখতে গেলে ঘোড়ার-ও নয়, রাজার। উন্মার্গগামী রাজার। কীভাবে? তাহলে আগে গল্পটি জেনে নেওয়া যাক।

সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব রাজা ব্রহ্মদত্তের সর্বার্থচিন্তকের পদে আসীন। তাঁর কাজ হল রাজাকে ধর্মার্থবিষয়ে উপদেশ দান। তবে চোরা না শোনে ধর্মের কথা। আর অর্থমনর্থম্, অর্থ-ই অনর্থের কারণ ইত্যাদি বহু শাস্ত্রবচন বর্তমান, তবুও জগতে দুষ্টের দ্বিচারিতাও সুপ্রতুল, দুষ্টের দমন-অধর্মের বিনাশের তত্ত্বটিও সুবিদিত, প্রসিদ্ধ শঠে শাঠ্যমের উপদেশ। এরপরেও শত শতবার ধৌত করলেও অঙ্গারের অক্ষয় মালিন্যের বার্তাও বিপুল সমাজেতিহাসের নিপুণ পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। সেই অভিজ্ঞতা-ই পথ বেঁধে দিয়ে বলে সত্যং বদ, ধর্মং চর। তারপর আরও নির্দিষ্ট করে দেয় তার গতিপথ; জীবনের পালনীয় কর্তব্যধর্মের থেকে উচ্চতর আর কিছু নেই। ধর্মের পরিপালনের পরেই অর্থের অনুধ্যান। এর ব্যত্যয় ঘটলে, বিপরিণাম ঘটলে আসে প্রত্যবায়, পাপ। এছাড়াও সেই সমাজেতিহাস, জীবনবোধ জানাবে প্রজার সার্বিক কল্যাণেই রাজার, শাসকের প্রকৃত সিদ্ধি। ব্যক্তির দুরাচারে উদ্ভুত অনভ্যুদয় ব্যক্তিনিষ্ঠ। কিন্তু, রাজার পাপে বিনষ্টি রাজ্যের, হানি সমষ্টির। তবে এসব তো তত্ত্ব, তর্কের পথে তা দূরবিসারী। বরং বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। কিন্তু গল্প কই?
আছে। গল্প ঘোড়ার কিংবা রাজার। গল্প বিনষ্টির কিংবা অভ্যুদয়ের। গল্প তর্কের কিংবা বিশ্বাসের। গল্প সংক্ষিপ্ত, কিন্তু বিপুল তার দ্যোতনা। যে রাজার ধর্মাধর্মের উপদেশক বোধিসত্ত্ব, সেই রাজার নাম ব্রহ্মদত্ত। তিনি বারাণসীর রাজা। জাতকমালার পাঠকমাত্রেই তাঁকে চেনেন। সেই জন্মে রাজা নিতান্ত অর্থলোলুপ। আর তাঁর একটি দুষ্ট অশ্ব আছে, নাম মহাশোণ। লোভী রাজা আর পাজি ঘোড়া একবিন্দুতে মিলবে কখন? যখন রাজা বোধিসত্ত্বকে একটি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে জনৈক অমাত্যের ওপর সেই ভার ন্যস্ত করলেন। এখন রাজা বিপথগামী হলেন। ধর্মার্থের ক্রমভঙ্গ হল। লোলুপ রাজা ধর্মের ওপরেও স্থান দিলেন অর্থকে। তাই এখন ধর্মের স্থান নিল অধর্ম। আর ক্রমে ক্রমে অর্থের স্থান নেবে অনর্থ, গোচরে-অগোচরে। এই বিচ্যুতি সমষ্টির নায়কের, তাই বিচলন কিংবা বিনষ্টির অভিঘাতও সমষ্টিতেই ন্যস্ত হয়।
আরও পড়ুন:

দোলি হ্যায়!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ

লোভ, রিপুর অঙ্গুলিহেলনেই রাজা উন্মার্গগামী হলেন। উত্তরাপথ থেকে অশ্ব-বণিকরা পাঁচশ’ অশ্ব নিয়ে বারাণসী এলেন বাণিজ্যের অভিপ্রায়ে। রাজপুরুষরা যথারীতি সংবাদ দিল রাজাকে। এতদিন এই অশ্বক্রয়ের দায়িত্ব পালন করতেন বোধিসত্ত্ব। তিনি পণ্যের যথার্থ মূল্য নির্ধারণ করে যথাবিধি সকল দেয় মূল্য কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিতেন। প্রতারিত করতেন না, বাকিও রাখতেন না। এবার লোভী রাজা নতুন এক অমাত্যকে এই দায়িত্ব দিলেন। আর তাকে গোপনে দিলেন কূট পরামর্শ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫০: দণ্ডকারণ্যে শূর্পনখা—একটি নাটকীয় চমক ও দ্বৈতসত্তায় অনন্য রাম

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব

প্রথমে অশ্বের মূল্য স্থির করে নিতে হবে। তারপর সেই দুর্দমণীয় অশ্ব মহাশোণকে কৌশলে সকল অশ্বের মাঝে ছেড়ে দিতে হবে সে বহুদংশনে অশ্বগুলিকে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। তখন সেই দুর্বল অশ্বগুলির দাম নির্ধারিত মূল্যের থেকে কমে যাবে। ব্যস!

সেই মতোই কাজ হল। অমাত্য তার দায়িত্ব পালন করলেন নিতান্ত নিষ্ঠায়। কিন্তু এতে বণিকরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বোধিসত্ত্বের শরণাপন্ন হল। বোধিসত্ত্ব তাঁদের যে পরামর্শ দিলেন তা অনেকটাই যেন শঠের সঙ্গে শঠতা, কাঁটা দিয়ে কণ্টমোচন। তিনি জানতে চাইলেন
“তোমাদের দেশে এমন দুষ্ট অশ্ব নেই?”
“আছে তো। সুহনু তার নাম। অতি উগ্র। অতি উদ্ধত।”
“ তবে তো ভালোই হল। আবার যখন আসবে তখন তাকে সঙ্গে এনো।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

আবার যখন তারা বারাণসীতে বাণিজ্যে এল, সঙ্গে আনলো সেই কূটাশ্ব সুহনুকে। আবার সেই কুনাট্যের পুনরভিনয় ঘটলো রঙ্গমঞ্চে। রাজা বাতায়নপথে দেখতে থাকলেন নতুন অশ্বসম্ভার। মহাশোণকে তাদের মাঝে ছেড়ে দেওয়া হল। বণিকরাও তা দেখে সুহনুকে এগিয়ে দিল। এর ফল কীরকম হল? মারাত্মক? না, ঘোড়াদুটি পরস্পরের গা চাটতে লাগল।

রাজা এসব দেখে বিস্মিত হলেন বড়-ই। তিনি এবার বোধিসত্ত্বের শরণাগত হলেন। দুইটিই কূটাশ্ব, অন্য অশ্বদলের কাছে তারা নিতান্তই উগ্র, নিষ্ঠুর, দংশনপ্রবণ। কিন্তু পরস্পরের সান্নিধ্যে শান্ত হয়ে অঙ্গলেহন করছে! এ আবার কেমন?

বোধিসত্ত্ব জানালেন যে, অশ্বদুটি সমপ্রকৃতির, তাই তাদের এতো সম্প্রীতি। দুজনের ধাতুগত, স্বভাবগত একান্ত সাদৃশ্য আছে। তাই তাদের সমানে সমানে, সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। দুজনেই অতি দুষ্ট, দুর্মতি। দুজনেই রথের রজ্জু নিত্য নষ্ট করে চিবিয়ে। শুধু ঘোড়া কেন, জগতের ঘরে এই রীতি। দুষ্ট-ই দুষ্টের আশ্রয়ভাজন হয়। তাদের তখন একান্ত সাম্যভাব জন্মায়। কেবল শিষ্টেরই সাম্যভাব ও সৌজন্য জন্মায় এমন তো নয়। পাপের পাশেই পাপের অবাধ ছায়াপাত।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬০: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

যিনি রাজা হবেন, নেতা হবেন, শাসক হবেন তাঁর অতিলোভ অন্যায়, পাপ। সেই পাপ অপরাপর পাপের ভারবৃদ্ধি করে কেবল। অন্যের বিত্তহানি করে কি রাজার অর্থলাভ ঘটে? না হে। অধর্মের পথে অনর্থ-ই বাড়ে কেবল। এরপর রাজা শোভনমনস্ক হলেন। সুমতি হলো তাঁর। অশ্বের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হল। বণিকরা যথার্থ মূল্য পেল। হৃষ্ট হয়ে ফিরে গেল। নটে গাছটি মুড়োতে মুড়োতে এই আপাত সৌকুমার্যের নেপথ্যের ছবিটা ধরতে গেলে সুকুমারকে ধরা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না- তাই আজ তিনিই থাকুন শেষে।

“…. পণ্ডিত বললেন—
‘দুটোই বাঁদর, দুটোই গাধা,
রোগা মোটা সমান হাঁদা।
ভণ্ড বেড়াল, পালের ধাড়ি,
লাগাও মুখে ঝাঁটার বাড়ি।
মাথায় মাথায় ঠুকে ঠুকে
চুনকালি দাও দুটোর মুখে॥’


“এই বলে পণ্ডিতমশাই এক টিপ নস্যি নিয়ে, নাকে মুখে গুঁজে, আবার নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লাগলেন।”
“তারপর সেই বাবুরা কি বলল?”
“বাবুরা হাঁ করে বোকার মতো মাথা চুলকোতে চুলকোতে বাড়ি চলে গেল আর ভাবলো পণ্ডিতটা কি বোকা!”… “—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content