
ছবি : প্রতীকী।
জাতকমালার এই কাহিনিটি মহাভারতেও দেখা যায়। কাহিনির চরিত্রগুলিতে শেয়াল ও ইঁদুরদের দেখা গেলেও, গাথাংশে বিড়ালের উল্লেখ বর্তমান। তাই এই কাহিনির নাম বিড়ালের নামানুসারেই। আরেকটু গভীরে গিয়েও বিষয়টি ভেবে দেখা যায়, তবে তার আগে গল্পটি দেখা যাক। বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে মূষিকরূপে জাত হয়েছেন। তাঁর আয়তন ছিল বৃহৎ, শত শত মূষিকবেষ্টিত হয়ে তিনি অরণ্যের এক বিবরে বাস করতেন।
এই কাহিনিতেও প্রতারক শেয়াল আবির্ভূত হবে। কোথাও তারা অনুগ্রহপ্রার্থীর ছলে আসে, কোথাও মনে জাগিয়ে তুলতে চায় সমবেদনা, কোথাও আবার শ্রদ্ধাস্পদ হয়ে ওঠে। এই গল্পের ধূর্ত শেয়ালটি মহান সাধুর রূপে ধরবে। তাকে দেখে মনে জেগে ওঠা ভক্তিভাব কীভাবে তিরোহিত হবে? কীভাবে উন্মোচিত হবে তার প্রকৃত রূপ?
এই কাহিনিতেও প্রতারক শেয়াল আবির্ভূত হবে। কোথাও তারা অনুগ্রহপ্রার্থীর ছলে আসে, কোথাও মনে জাগিয়ে তুলতে চায় সমবেদনা, কোথাও আবার শ্রদ্ধাস্পদ হয়ে ওঠে। এই গল্পের ধূর্ত শেয়ালটি মহান সাধুর রূপে ধরবে। তাকে দেখে মনে জেগে ওঠা ভক্তিভাব কীভাবে তিরোহিত হবে? কীভাবে উন্মোচিত হবে তার প্রকৃত রূপ?
শৃগাল অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে ওই মূষিকশ্রেণী দেখে মনে মনে লুব্ধ হল, ইঁদুরের মাংসের লোভ পেয়ে বসল তাকে। তখন সে পেতে বসল এক প্রতারণার ফাঁদ। ইঁদুরের গর্তের অনতিদূরে সে তিনটি পা শূন্যে রেখে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বায়ুভক্ষণ করতে লাগল। এই যেমনটা আজ-ও সমাজের আনাচে কানাচে দেখা যায়, দেশে-দেশে, বিদেশে প্রবাসে, আন্তর্জাতিক আন্তর্জালিক জগতে।
মূষিকরূপী বোধিসত্ত্ব এই সময় আহার্যান্বেষণে গর্তের বাইরে বেরিয়ে এলেন। শৃগালকে দেখে
তাঁর মনে একপ্রকার শ্রদ্ধার ভাব জাগল, মনে হল ইনি অতি সদাচারসম্পন্ন কেউ হবেন।
— “মহাশয় আপনার নাম কি?”
— “আমার নাম ধার্মিক।”
— “মহাশয়, আপনি কেন ভূমিতে কেবল এক পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন?”
— “আমি চারটি পা ভূমিতে রাখলে পৃথিবী সে-ভার বহন করতে পারবে না বাপু!”
— “আপনি অমন মুখ হাঁ করে আছেন কেন?”
— “আমি তো অন্নভোজী নই, বায়ু ভক্ষণ করে বেঁচে থাকি।”
— “এমনভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছেন কেন মহাশয়?”
— “সূর্যপ্রণাম করছি।”
মূষিকরূপী বোধিসত্ত্ব এই সময় আহার্যান্বেষণে গর্তের বাইরে বেরিয়ে এলেন। শৃগালকে দেখে
তাঁর মনে একপ্রকার শ্রদ্ধার ভাব জাগল, মনে হল ইনি অতি সদাচারসম্পন্ন কেউ হবেন।
— “মহাশয় আপনার নাম কি?”
— “আমার নাম ধার্মিক।”
— “মহাশয়, আপনি কেন ভূমিতে কেবল এক পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন?”
— “আমি চারটি পা ভূমিতে রাখলে পৃথিবী সে-ভার বহন করতে পারবে না বাপু!”
— “আপনি অমন মুখ হাঁ করে আছেন কেন?”
— “আমি তো অন্নভোজী নই, বায়ু ভক্ষণ করে বেঁচে থাকি।”
— “এমনভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছেন কেন মহাশয়?”
— “সূর্যপ্রণাম করছি।”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৩: শৃগাল-জাতক—তঞ্চক

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬৩: আকাশ এখনও মেঘলা

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৮৮ : নেকলেস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৪: শূর্পনখার কাহিনিতে, ষড়রিপুর প্রভাব, এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত নয় কী?
বোধিসত্ত্বের প্রতীতি জন্মালো এই যে, এই শৃগাল এক অপূর্ব সাধুজন। সেই থেকে সকল মূষিক অনুচরদের নিয়ে তিনি সকাল-সন্ধ্যা সেই মহাপুরুষকে প্রণতি জানাতে আসতেন। প্রণামান্তে যখন দলটি ফিরে যেত, তখন সর্বশেষের ইঁদুরটিকে শেয়াল অতি সত্বর মুখে স্থাপন করে খানিক চিবিয়ে খানিক গিলে নিয়ে দ্রুত মুখ মুছে এমন নির্বিকার ভাব করে থাকতো, যেন কিছুই জানে না সে। আপনার আশে পাশে এমনটা দেখতে পান কি? এভাবেই দিন কেটে যেতে লাগল, যেমন আজ-ও কাটে।
ক্রমে ক্রমে ইঁদুররা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। তাদের সন্দেহ জাগল, যখন তাদের মনে হল যে, বিবরে ইঁদুরের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান যেন! আগে গর্তে ঠেসাঠেসি করে থাকতে হতো, এখন কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে! তারা বোধিসত্ত্বকে জানালো সবকিছু।
ক্রমে ক্রমে ইঁদুররা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। তাদের সন্দেহ জাগল, যখন তাদের মনে হল যে, বিবরে ইঁদুরের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান যেন! আগে গর্তে ঠেসাঠেসি করে থাকতে হতো, এখন কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে! তারা বোধিসত্ত্বকে জানালো সবকিছু।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৯ : শুধু মনুভ্যালি নয়, কৈলাসহরের চা বাগান কালীশাসনও বিপ্লবী তৎপরতার সাক্ষী

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৭ : দুই সহোদরার সখি সংবাদ (২)
বোধিসত্ত্ব মনে মনে বিশ্লেষণ করে দেখলেন এই দলক্ষয়ের কারণ। তাঁর সন্দেহ হল। শেয়াল নয়তো? মনে মনে ভাবলেন, এর আশু সমাধান আবশ্যক। তিনি এক উপায় স্থির করলেন। পরের দিন শৃগালকে প্রণাম করে ফেরার পথে বোধিসত্ত্ব থাকলেন সকলের শেষে। তিনি শেয়ালের অঙ্গভঙ্গীর দিকে লক্ষ্য রেখেছিলেন। শৃগাল তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই তিনিও লম্ফ দিয়ে শেয়ালের কণ্ঠনালীতে দংশন করলেন। বললেন, “বুঝেছি তুমি যথার্থ ব্রতপরায়ণ নও। তোমার এই ধার্মিকরূপ কেবল প্রাণিঘাতের জন্য।” এরপর অনতিবিলম্বে শৃগালের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল। তারপর?
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬১ : গোবিন্দ সোরেন দ্য গ্রেট

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
তারপর পিলপিল করে পালে পালে ইঁদুরের দল ছুটে এসে নিমেষে সেই ধর্মকঞ্চুক শৃগালের মাংস ভক্ষণ করে তাকে অদৃশ্য করে দিল। তবে হ্যাঁ, এর আগে যারা প্রথমের দিকে থাকতো, তারাই প্রাণে বাঁচতো। এখানেও তার ব্যত্যয় ঘটলো না। যারা প্রথমে এলো, তারাই শেয়ালের মাংস পেল। পরে এল যারা, তারা আর কিছুই পেলো না। এজন্যই হয়তো বলে, শুভস্য শীঘ্রম্। আগে এলে বাঘে খাওয়ার প্রশ্ন-ই নেই। বাঘ কোথায়? বরং বাঘের মাসি আছেন। কেননা, মূষিকরূপী বোধিসত্ত্ব জানতেন, প্রকাশ্যে ধর্মের ধ্বজাধারী কিন্তু গোপনে পাপাচারী প্রবঞ্চকের মুখে মধু, মনে বিষ। এ হল বিড়ালব্রতলক্ষণ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— বালিকাঠা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
এখানে শেয়াল সেই বিড়ালতপস্বী। ধূর্তের কাপট্য আর শাঠ্য পদে পদে। তারা ধর্মহীন, জীবনের বৃহত্তর আচরণীয় কর্মের প্রতি তারা শ্রদ্ধা নেই, কেবল আসক্তি আছে স্বার্থে ও পরার্থের হানিতে। দুর্জন কখনও কখনও প্রকাশ্যেই দুরাত্মা হয়ে থাকে। তাদের স্বরূপ প্রকাশিত থাকে সর্বদা। অন্য আরেক প্রকার আত্মগোপন করে থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। এরা বুঝি আরও মারাত্মক। এরা পয়োমুখ বিষফোঁড়ার তুল্য দুষ্ট ও পরিত্যজ্য। রাজনীতির তত্ত্বে বিভ্রান্তি কিংবা ভেদনীতি এদের একমাত্র অস্ত্র, সেই ভ্রম কেটে গেলে এরা হীনবল হয়। মূষিকদের বিবর যখন বাসের জন্য প্রশস্ত হচ্ছিল, তখন সেখানে স্থানাভাব ছিল না হয়তো, কিন্তু সেই আপাতঃ ইতিবাচকের পথেই জন্ম নিচ্ছিল “নেতি”। ইঁদুরের এই স্বাচ্ছন্দ্যে কোনও আরাম হয় কীনা বলা কঠিন, তবে মানুষের দিব্যি হয় বটে। ঘেঁষাঘেঁষি ঠেসাঠেসির পরিবর্তে জেগে ওঠা স্বাচ্ছন্দ্য-ই জানিয়েছিল অশনি সংকেতটি। আজকের মানুষ গুহাজীবন পার হয়ে উন্নততর সভ্যতার দুনিয়ায় বাঁচে। তার বিবরজীবন শেষ হলেও, বিবরের পাশের বিড়ালতপস্বী দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। প্রাসাদবাসীর হৃদ্কন্দরে সেই সংকেত পৌঁছোয় কি? —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















