
(বাঁদিকে) রাতের আঁধারে বাঘরোল। (ডান দিকে) সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘরোলের ছানা। ছবি সংগৃহীত।
বাঘরোল নামটার সঙ্গে আমার পরিচয় আশৈশব যদিও প্রাণীটির সঙ্গে পরিচয় অনেক পরে। ছোটবেলায় সন্ধ্যে হলে ঠাকুমার মুখে সুন্দরবন অঞ্চলের নানা ভীতিপ্রদ গল্প শুনতাম। তাতে যে অনেক জল মেশানো বা রং চড়ানো থাকতো পরে বুঝেছি। আসলে রং না চড়লে গল্প ঠিক জুতসই হয় না। আর আগেকার দিনের দাদু ঠাকুমারা সে ব্যাপারে ছিলেন বেশ সিদ্ধহস্ত। তো সেই নানা গল্পের মধ্যে অন্যতম ছিল বাঘরোলের গল্প। একটা গল্প তো সাড়ে পাঁচ দশক পরেও স্পষ্ট এখনও মনে পড়ে। সন্ধে হলেই আশেপাশে খড়ির জঙ্গলের মধ্যে নাকি দেখা যেত দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা লক্ষ্য রাখত কোন বাড়ির দাওয়ায় সদ্যোজাত বাচ্চাকে শোয়ানো আছে কিংবা বাচ্চা জন্মেছে এমন কোনও বাড়ির দরজা সন্ধ্যার পর খোলা আছে। তারা নাকি যখনই এমন সুযোগ পেত মুহূর্তের মধ্যে বাচ্চাকে মুখে করে তুলে নিয়ে পালাত।
এমন ঘটনা সত্যি ঘটত কিনা আমার এখন সন্দেহ জাগে। তবে পুরোপুরি অবিশ্বাস করারও কোনও কারণ নেই। কারণ বাঘরোল মাংসাশী প্রাণী। এরা খাটাশের মত হাঁস-মুরগি নিয়মিত শিকার করে। আবার খাটাসের থেকে আকারে বড়সড় হওয়ায় সদ্যোজাত বাচ্চা কে মুখে করে তুলে নিয়ে যাওয়া আদৌ অসম্ভব নয়। ঠাকুমার মুখে এই গল্প শোনার পর সন্ধ্যে হলেই গা ছমছম করত। আমার শৈশবে দেখেছি আমাদের পুকুরপাড়ে নলখাগড়ার জঙ্গল ছিল। নলখাগড়াকেই গ্রামের লোকজনকে খড়ি কাঠির গাছ বলতে শুনেছি। এটা সঠিক বলত কিনা আমার জানা নেই। যখন পানের বরজে ব্যবহারের জন্য পাকাটির প্রচলন সুন্দরবন অঞ্চলে হয়নি তখন পান গাছ বেয়ে তোলার জন্য ওই নলখাগড়া বা খড়িকাঠি ব্যবহার করা হত। অনেকে শরকাঠিও বলত। সে যাই হোক ওই জঙ্গলের মধ্যে দু’চোখ জ্বলা প্রাণীকে রাতে বহুবার দেখেছি। সেটা খাটাস হতে পারে, গন্ধগোকুল হতে পারে, শেয়াল হতে পারে কিংবা বাঘরোল। কিন্তু সবার আগে বাঘরোলের কথাই মাথায় আসত। অসম্ভব এক ভীতি মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল বাঘরোল সম্বন্ধে। কিন্তু স্বচক্ষে সেই সময় কোনওদিন জীবিত বাঘরোল দেখিনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২০ : চারুলতা-মহানগর — বীক্ষণযন্ত্র

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৭: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৬
বাঘরোল দেখার প্রথম সুযোগ এল ১৫-১৬ বছর আগে। এক প্রাক্তন ছাত্র ফোন করে বলল যে তাদের পাড়ায় চিতাবাঘের মতো দেখতে ডোরাকাটা একটা জন্তুকে কয়েকজন লোক পিটিয়ে মেরেছে। জন্তুটা নাকি বেশ কিছুদিন ধরে এলাকায় হাঁস-মুরগি, ছাগল ইত্যাদি নিয়ে পালাচ্ছিল। সেই জন্তুটাকে কোথাও পুঁতে বা নদীতে ভাসিয়ে দিতে না বললাম। স্কুল থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পৌঁছে গেলাম অকুস্থলে আধঘন্টা হেঁটে। তখন মোবাইল ফোনে ক্যামেরা ছিল না, ফলে মৃত জন্তুটির ছবি তোলার সুযোগ পাইনি। যাইহোক, প্রথম চোখে দেখলাম। আগে এদের ছবি দেখেছি এবং এদের সম্বন্ধে পড়েওছি। জন্তুটার আকার প্রায় একটা বড়সড় হুলো বেড়ালের দ্বিগুণ। রীতিমতো গাট্টাগোট্টা চেহারা। সারা গা ঘন কিন্তু ছোট ছোট কর্কশ লোমে ঢাকা। গায়ের রং হরিদ্রাভ-ধূসর আর তার ওপরে কালো ছোপ। নাক থেকে শুরু করে দুটো চোখের সামনে দিয়ে মাথার পেছন পর্যন্ত লম্বালম্বি ধূসর ও কালো দুটো ডোরা দাগ বিস্তৃত। বাঘরোল চেনার এটাই সব থেকে ভালো বৈশিষ্ট্য।
কালো ডোরা দাগ দুটো থাকে দু’পাশে বাইরের দিকে আর ধূসর ডোরা দুটো থাকে ভিতরের দিকে। দু’দিকের ডোরা দাগের মধ্যবর্তী অংশের লোমের রং কালো ছিটযুক্ত হরিদ্রাভ-ধূসর। আবার তার উপরেও ছোট ছোট এলোমেলো কালো দাগ রয়েছে। চোখের দু’পাশে গালের ওপরেও রয়েছে দুদিকে দুটো কালো ডোরা দাগ যার মধ্যবর্তী অংশের লোমের রং হলদেটে ধূসর। চোখের নিচে যেখানে মেয়েরা কাজল পরে ঠিক সেই জায়গায় এদের সাদা রঙের দাগ যেন দেখে মনে হয় সাদা রঙের কাজল পরেছে! ভ্রু-এর সামনের দিকে নাক সংলগ্ন অংশেও রয়েছে সাদা দাগ।
কালো ডোরা দাগ দুটো থাকে দু’পাশে বাইরের দিকে আর ধূসর ডোরা দুটো থাকে ভিতরের দিকে। দু’দিকের ডোরা দাগের মধ্যবর্তী অংশের লোমের রং কালো ছিটযুক্ত হরিদ্রাভ-ধূসর। আবার তার উপরেও ছোট ছোট এলোমেলো কালো দাগ রয়েছে। চোখের দু’পাশে গালের ওপরেও রয়েছে দুদিকে দুটো কালো ডোরা দাগ যার মধ্যবর্তী অংশের লোমের রং হলদেটে ধূসর। চোখের নিচে যেখানে মেয়েরা কাজল পরে ঠিক সেই জায়গায় এদের সাদা রঙের দাগ যেন দেখে মনে হয় সাদা রঙের কাজল পরেছে! ভ্রু-এর সামনের দিকে নাক সংলগ্ন অংশেও রয়েছে সাদা দাগ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
এদের মুখমণ্ডল দেহের তুলনায় আনুপাতিকভাবে বিড়ালের থেকে বড়। এই ব্যাপারটাও নজরে পড়ার মতো। কান দুটো আবার তুলনামূলকভাবে ছোট। কানের পিছন দিকে কালো বর্ডারের মাঝে রয়েছে সাদা দাগ। জলে যখন এরা ডোবে তখন যাতে কানে জল ঢুকে না যায় সেজন্য কানের ছিদ্র বন্ধ করে দিতে পারে। বিড়াল, বাঘ ইত্যাদির মতো এদেরও রয়েছে একটা লম্বা লেজ, আর লেজের শেষপ্রান্তে কালো বলয়। তবে লেজটার দৈর্ঘ্য দেহের অর্ধেকের তুলনায় কম অর্থাৎ একটু ছোট। এদের সামনের পা তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট। সামনের পায়ে নখরগুলির মাঝে সামান্য পাতলা চামড়া থাকায় জলে সাঁতার কাটতে সুবিধা হয়। আর নখর সম্পূর্ণ ভেতরে ঢুকিয়ে নিতে পারে না, অনেকটা বঁড়শির মতো বেরিয়ে থাকে। এতে জলের মধ্যে মাছ শিকার করতে সুবিধা হয়। পুরুষ বাঘরোলদের ওজন স্ত্রীদের তুলনায় কিছুটা বেশি। পুরুষদের আনুমানিক ওজন হয় ৮.৫ থেকে ১৬ কেজি এর মধ্যে, আর স্ত্রীদের ওজন হয় ৫.১ থেকে ৬.৮ কেজির মধ্যে। আমি যে মৃত বাঘরোলটি দেখেছিলাম সেটি ছিল পুরুষ এবং আনুমানিক ওজন ছিল প্রায় ১০ কেজি।

(বাঁদিকে) বাঘরোল। (ডান দিকে) সুন্দরবনে শিকারের অপেক্ষায় বাঘরোল। ছবি সংগৃহীত।
বাঘরোলের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘Felis viverrinus’। ইংরেজিতে এদের বলে ‘Fishing cat’। ইংরেজি নামেই বোঝা যায় এরা প্রধানত মাছশিকারি বিড়াল জাতীয় প্রাণী। তাই এদের মেছোবিড়ালও বলা হয়। খাটাস, গন্ধগোকুলের জাতভাই এরা। তবে বাঘের বাচ্চার সাথে এদের আকারের বেশ কিছুটা মিল থাকায় হয়তো মেছো বিড়ালের পরিবর্তে বাঘরোল নামটা বেশি প্রচলিত হয়েছে।
বাঘরোলদের প্রধান খাদ্য মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি। সবচেয়ে প্রিয় খাবার মাছ, আর তাই এদের সাঁতার কাটার উপযোগী পা যেমন রয়েছে, গা যাতে বেশি না ভিজে যায় সেই জন্য জল ও তাপমাত্রা প্রতিরোধী ঘন লোমের বিশেষ ধরনের দুটি স্তরে বিন্যাস রয়েছে। জলজ প্রাণী ছাড়াও পাখি, ইঁদুর, খরগোশ, পোকামাকড়, এমনকি গৃহস্থের হাঁস-মুরগি, ছাগল ছানা ইত্যাদি শিকার করতে পারে। নদী, খাঁড়ি, জলাভূমি, পুকুর সমৃদ্ধ সুন্দরবন তাই বাঘরোলদের জন্য খাবারের সমৃদ্ধ উৎস। জীবন্ত প্রাণী ছাড়াও এরা ভাগাড়ে ঘুরে মৃত পশুর মাংস খেত বলেও শোনা যায়। বাঘরোলরা সম্পূর্ণরূপে নিশাচর। খাবারের সন্ধানে নিজের আস্তানা ছেড়ে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। শক্তপোক্ত চেহারা হওয়ায় অনেক সময় ধরে একই গতিবেগে দৌড়াতেও পারে। তবে ভাগাড়ে মৃত জন্তুর অঢেল মাংস পেয়ে খেতে খেতে অনেক সময় এরা ভুলে যায় ভোরের আলো ফুটে গেছে। আর তখনই মানুষের নজরে পড়ে যায়। আমি যে মৃত বাঘরোলটিকে দেখেছিলাম সেটিকে নাকি গ্রামের লোকজন ওভাবেই তাড়া করে পিটিয়ে মেরেছে। এরা সাধারণত একা একা ঘোরাফেরা করে, আর ফেরোমন নামক উদ্বায়ী হরমোন ছিটিয়ে দিয়ে নিজেদের এলাকাকে চিহ্নিত করে। সেই এলাকায় অন্য বাঘরোলের প্রবেশ নিষেধ।
বাঘরোলদের প্রধান খাদ্য মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি। সবচেয়ে প্রিয় খাবার মাছ, আর তাই এদের সাঁতার কাটার উপযোগী পা যেমন রয়েছে, গা যাতে বেশি না ভিজে যায় সেই জন্য জল ও তাপমাত্রা প্রতিরোধী ঘন লোমের বিশেষ ধরনের দুটি স্তরে বিন্যাস রয়েছে। জলজ প্রাণী ছাড়াও পাখি, ইঁদুর, খরগোশ, পোকামাকড়, এমনকি গৃহস্থের হাঁস-মুরগি, ছাগল ছানা ইত্যাদি শিকার করতে পারে। নদী, খাঁড়ি, জলাভূমি, পুকুর সমৃদ্ধ সুন্দরবন তাই বাঘরোলদের জন্য খাবারের সমৃদ্ধ উৎস। জীবন্ত প্রাণী ছাড়াও এরা ভাগাড়ে ঘুরে মৃত পশুর মাংস খেত বলেও শোনা যায়। বাঘরোলরা সম্পূর্ণরূপে নিশাচর। খাবারের সন্ধানে নিজের আস্তানা ছেড়ে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। শক্তপোক্ত চেহারা হওয়ায় অনেক সময় ধরে একই গতিবেগে দৌড়াতেও পারে। তবে ভাগাড়ে মৃত জন্তুর অঢেল মাংস পেয়ে খেতে খেতে অনেক সময় এরা ভুলে যায় ভোরের আলো ফুটে গেছে। আর তখনই মানুষের নজরে পড়ে যায়। আমি যে মৃত বাঘরোলটিকে দেখেছিলাম সেটিকে নাকি গ্রামের লোকজন ওভাবেই তাড়া করে পিটিয়ে মেরেছে। এরা সাধারণত একা একা ঘোরাফেরা করে, আর ফেরোমন নামক উদ্বায়ী হরমোন ছিটিয়ে দিয়ে নিজেদের এলাকাকে চিহ্নিত করে। সেই এলাকায় অন্য বাঘরোলের প্রবেশ নিষেধ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)
পুরুষ বাঘরোলদের মধ্যে বহুগামীতা দেখা যায়। অর্থাৎ একটি পুরুষ একাধিক স্ত্রী বাঘরোলের সঙ্গে যৌন মিলন করতে পারে। স্ত্রী বাঘরোল একরকম শব্দ করে পুরুষদের আকৃষ্ট করে। প্রধানত: জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস এদের প্রজননকাল হলেও বছরের অন্যান্য সময়ও এদের প্রজনন হতে পারে। জলাশয়ের আশেপাশে ঘন ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে এরা বাচ্চাদের লালন পালন করার জন্য আস্তানা গাড়ে। নলখাগড়ার জঙ্গলই এদের আস্তানার জন্য সবথেকে বেশি পছন্দের জায়গা। বাঘরোলদের গর্ভাবস্থা প্রায় দু’মাস স্থায়ী হয়। স্ত্রী বাঘরোল একবারে দুটি বা তিনটি বাচ্চার জন্ম দেয়। তবে একটি বা চারটি বাচ্চার জন্ম দিতেও দেখা গেছে। জন্মের সময় বাচ্চাদের ওজন থাকে প্রায় ১৭০ গ্রাম। জন্মের ১৬ দিন পর বাচ্চাদের চোখ ফোটে, আর ৫৩ দিন পর মাছ, মাংস ইত্যাদি খেতে শেখে। পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠতে এরা সময় নেয় প্রায় ৯ মাস। আর ১ বছর ৩ মাস বয়সে এরা যৌন ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
শুধু সুন্দরবন নয়, ভারতের অন্যান্য উপকূলীয় জায়গা থেকেও বাঘরোলরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। অথচ তথ্য বলছে আজ থেকে ৬০/৭০ বছর আগেও ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে বাঘরোল পাওয়া যেত। আর সুন্দরবন অঞ্চলে যে প্রচুর বাঘরোল ছিল তার প্রত্যক্ষদর্শী তো আমার ঠাকুমাই। এখন যে সামান্য পরিমাণ বাঘরোল বেঁচে রয়েছে তাদের মূলতঃ সুন্দরবনের সংরক্ষিত জঙ্গল এলাকাতেই দেখা যায়। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো জনবসতি সংলগ্ন ঝোপ-জঙ্গলেও রয়ে গিয়েছে দু’চারটি বাঘরোল।

(বাঁদিকে) সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘরোল। (ডান দিকে) শিশু বাঘরোল। ছবি সংগৃহীত।
কিন্তু কেন এরা এত দ্রুত হারিয়ে গেল সুন্দরবনের বেশিরভাগ এলাকা থেকে? যেহেতু এদের প্রধান খাদ্য হল মাছ তাই যতদিন সুন্দরবনে জনবসতি গড়ে ওঠেনি ততদিন সুন্দরবনের নদী, খাঁড়ি, খাল, বিলের মাছের ওপর পূর্ণ অধিকার ছিল বাঘরোল, ভোঁদড় ইত্যাদি মাছখেকো স্তন্যপায়ীর। কিন্তু সুন্দরবন অঞ্চলে জঙ্গল হাসিল করে জনবসতি গড়ে ওঠার সাথে সাথে সেই মাছে ভাগ বসাল মানুষ। পাশাপাশি ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রাম ও শহর গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওরা হারাতে লাগল ওদের বাসস্থান। খাদ্যাভাবে গৃহস্থের হাঁস-মুরগি ছাগলছানা আর ভাগাড়ের মাংসের দিকে পড়ল ওদের নজর। কিন্তু এখন গৃহস্থ হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করে সুরক্ষিত খাঁচায়। ছাগল, ভেড়া চাষ হয় না বললেই চলে। চাষির গোয়ালে এখন আর গোরু দেখতে পাওয়া যায় না। চাষির জমি কর্ষণ করে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার। আর তাই ভাগাড়ও মৃতপশুহীন। তার ওপর মানুষের নিরর্থক আক্রোশের শিকার হয়ে ওদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যে বাঘরোলরা টিকবে কী করে? আর তাই আই ইউ সি এন ওদের বিপন্ন প্রজাতি (Vulnerable) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমরা যদি প্রকৃতির এই সুন্দর প্রাণীটির প্রতি একটু সদয় না হই তাহলে সুন্দরবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে ওরা খুব বেশি সময় নেবে না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















