বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

জাতকমালার এই কাহিনিটির আজ প্রথম পর্ব। সামাজিক পরিসর পরিবর্তিত হয়, দিন বদলায়, কিন্তু “দান” তার অত্যুজ্জ্বল মহিমা নিয়ে অক্ষুণ্ণ থাকে। কঠোপনিষদে নচিকেতার গল্প হোক কিংবা মহাভারতে কর্ণের কাহিনি, অথবা ইতিহাস-পুরাণের নানা আখ্যান উপাখ্যান, দানের প্রসঙ্গ সর্বদাই অন্য এক মাত্রা, মর্যাদা নিয়ে অনন্য।

‘দান’ হল স্বত্ব ত্যাগ। এর তাত্পর্য এতই অমোঘ, অভ্রান্ত যে পাণিনীয় ব্যাকরণে কারক-বিভক্তিতে ‘সম্প্রদান’ একটি পৃথক স্থান পেয়েছে। বৈদিক পঞ্চমহাযজ্ঞের বিধানে জ্ঞানদান, মানুষ ও মনুষ্যেতর জীবের অন্নজলাদির দ্বারা কল্যাণসাধন, গতায়ু পিতৃপুরুষগণের তর্পণ, অতিথিকে আতিথ্যদান অন্তর্ভুক্ত। কালের প্রবাহে বহমান জীবন নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাত্রা ক’রে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে। কর্তব্য, অকর্তব্যের সামাজিক অনুশাসন আর ব্যক্তি-মানুষের স্বকীয় রুচি কিংবা অনুভূতি কখনও একপথে চলে, কখনও ভিন্ন পথে। এখান থেকেই জন্ম নেয় সংঘাত, অনুশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থার মাণদণ্ড, সৃষ্টি হয় বিচ্যুতির নানা ক্ষেত্র।
এমনই এক মাণদণ্ড হল দান, যা সামাজিক কল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় তথা সামাজিক আদর্শের একটি ভিত্তি, যেখানে সাধারণ গৃহস্থ প্রজা থেকে বিত্তশালী বণিক অথবা বৈভবমণ্ডিত নরপতি সকলেই আস্থাশীল হন।

আজও কি দানের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় আছে? এর উত্তর না-হয় পাঠক দেবেন। তবে পণ্যায়িত বিশ্বে একটি পণ্যের সঙ্গে যখন “সম্পূর্ণ বিনামূল্যে” (তার আর্থিক কৌশল যা-ই হোক না কেন) আরেকটি পণ্য ক্রেতার হস্তগত হয়, তার নেপথ্যেও বুঝি সেই মহিমান্বিত দান (নিঃশর্ত নয় অবশ্য) ও দানগ্রহণের ব্যঞ্জনাটুকু থেকে যায়। দানের নেপথ্যে অর্থ ও পরমার্থ দুটিই বিদ্যমান, ধন থেকে জীবন সকলই দানের মাহাত্ম্যে বিশিষ্ট হয়েছে কালে কালে। বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণের শাস্ত্রনির্দিষ্ট কর্তব্যকর্মের মধ্যে দান এবং দানগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়।

দানশীল মানুষ যেমন পৃথক্ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত, তেমন-ই দান করেও হরণ করে নেওয়া কিংবা কার্পণ্য ইত্যাদি দোষ অপযশের কারণ হয়। দরিদ্রের দানশীলতা আর বিত্তবানের স্বভাবকার্পণ্য বিশেষ চর্চিত বিষয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘টেনিদা’র গল্পে এই স্বভাব-কার্পণ্যকে আশ্রয় করে রসসৃষ্টি করেছেন বহুক্ষেত্রেই। একটি কাহিনিতে দেখা যায় জনৈক বৈভবশালী কিন্তু পরজীবী কৃপণ আকস্মিক অর্থব্যয়ের আশঙ্কায় ও শোকে উন্মত্ত হয়ে গেলেন। আরেক সম্পন্ন কৃপণ শিঙি, মাগুর ইত্যাদি মাছ কিনে হাঁড়িতে জাগিয়ে রাখতেন। নিয়মিত সেসব মাছের পাখনার ভগ্নাংশ দিয়েই রেঁধে ফেলতেন মাছের ঝোল। এভাবেই তিনি মাছের ঝোল রান্নার ব্যয়ভার সামলাতেন।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৮: শ্যালক-জাতক—অচিনপাখি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭০: আকাশ এখনও মেঘলা

এ তো হল কার্পণ্যের কথা। সে যাই হোক না কেন, এই জাতককাহিনি আরম্ভ হয়েছে দানমাহাত্ম্যে। শ্রমার্জিত সম্পদে নিঃশর্ত স্বত্বত্যাগ যেমন দাতার উত্তুঙ্গ মহিমাকে প্রতিষ্ঠা দেয় তেমন-ই দানবিমুখ মানুষের স্বভাবগত চরিত্রবৈশিষ্ট্যের প্রতিও কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। সমাজের জন্য কিংবা দেবতার জন্য দান প্রসিদ্ধ, দানের নেপথ্যে বিভিন্ন পারমার্থিক উন্নতি, পুণ্যফললাভের প্রেক্ষাপট থাকে। দান যেমন একটি চর্চিত বিষয়, তেমনই চর্চার কেন্দ্রে থাকে অ-দানের প্রসঙ্গ-ও। বিশেষতঃ, যদি সম্পন্ন ধনাঢ্য মানুষ দানবিমুখ হন। কিন্তু কেন এই বিমুখতা, তার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সন্ধানটুকুও প্রাচীনসাহিত্যের আঁকেবাঁকে জমে থাকে, দানের প্রশংসা, অ-দানের নিন্দা ও দানবিমুখের প্রতি জ্ঞাপিত উপদেশের পাশাপাশি।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯০ : দুই ভাই

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫১: ইরাবতী ডলফিন

জাতকমালার এই কাহিনি সেই নীতির কথা বলে, যা কল্যাণমুখী। তাই এ কাহিনিটির নাম বিড়ালীকৌশিক-জাতক। অহিনকুলের সম্পর্ক যেমন বিদ্বেষমুখী, তেমন-ই বিড়াল ও কৌশিক বা পেঁচার সম্পর্ক-ও সংঘাতদীর্ণ ও পরস্পরবিরোধী। রাতের অন্ধকারে তাদের এই বিরোধ স্ফুট হয়। অন্তর্লোকের নিরালোক অশুভবোধের প্রতীক হল অন্ধকার। যাবতীয় জাগতিক সঙ্কল্প-বিকল্পের কর্তা যে মানবমন সেই অতল মনের নেপথ্যে সত্যাসত্যের দ্বন্দ্ব চলে। এই পরস্পরবিরোধ অতিক্রম করে চেতনাদীপ্ত শুভবোধ জেগে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: রাক্ষস খর ও রামের সংঘাতে, যুদ্ধের বিবিধবার্তা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

পুরাকালে বোধিসত্ত্ব একবার বারাণসীর সম্ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠিকুলে জন্ম নিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি গার্হস্থ্যধর্ম অবলম্বন করলেন, কালক্রমে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর শ্রেষ্ঠিপদ লাভ করলেন। একদিন তাঁর মহাধনরাজি দেখে এক অনুভূতি জেগে উঠল। এই বিপুল ধনসম্পদ তো দৃশ্যমান। কিন্তু যাঁরা এই ধন উত্পাদন করেছেন তাঁরা তো আর নেই। অর্থাৎ, জীবনের স্বস্তি-পুষ্টিবিধানের জন্য যে ধনের আয়োজন, সেই ধনভার থেকে গেছে, নেই তাঁরা, যাঁরা সেই ধনকে অর্জন করেছিলেন বিশেষ প্রয়োজনের পরিপূরণের জন্য। তাহলে এখন এই ধন দান করে দেওয়ার পুণ্যকর্মে রত হলে অশেষ কল্যাণসাধন হয় বৈকী!

সঙ্কল্প-অনুসারে নির্মিত হল দানশালা। সেখানে আমরণ তিনি মহাদান করে গেলেন। মৃত্যুকালে পুত্রকে বলে গেলেন, “দেখো! এই দান যেন কোনওভাবেই বন্ধ না হয়।” দেহান্তে তিনি মহান কর্মফল, অশেষ পুণ্যফলে ইন্দ্রত্ব লাভ করলেন।

আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

তাঁর পুত্রটিও পিতার আদেশ যথাযথ মান্য করে মহাদান অব্যাহত রাখলেন, তিনিও এক মহাদানশীল পুণ্যকর্মারূপে মৃত্যুর পরে দেবপুত্র চন্দ্ররূপে জন্মান্তর পেলেন। মৃত্যুর আগে তিনিও পুত্রকে একই আদেশ দিয়ে গেলেন। তাঁর পুত্রটিও দানশীলতায় সূর্যদেবরূপে জন্মান্তর লাভ করলেন। তাঁর পুত্র-ও পিতৃপুরুষের তুল্য দানশীল হলেন, তিনি জন্মান্তরে হলেন ইন্দ্রসারথি মাতলি, তাঁর পুণ্যকর্মা পুত্র-ও দান-বলে বলীয়ান হয়ে জন্মান্তরে পঞ্চশিখ নামের গন্ধর্ব হলেন।

অর্থাৎ বোধিসত্ত্বরূপী শ্রেষ্ঠী, তাঁর পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র ও বৃদ্ধপ্রপৌত্র দানবীর্যে স্বীয় কর্মানুসারী পুণ্যফল লাভ করলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তারপর। বোধিসত্ত্বরূপী শ্রেষ্ঠীর অতিবৃদ্ধ প্রপৌত্র তাঁর পিতৃপিতামহের তুল্য ঔদার্যের অধিকারী হলেন না। অর্থাৎ পঞ্চশিখ গন্ধর্বরূপে জাত শ্রেষ্ঠীর পুত্রটি অধার্মিক, শ্রদ্ধাবোধহীন নির্মম, নিষ্ঠুরচরিত্রের এক কৃপণ ব্যক্তি হয়ে উঠলেন ক্রমে ক্রমে। সেই শ্রেষ্ঠী তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যমণ্ডিত দানশালা বিচূর্ণ করে দগ্ধ করালেন, কৃপাপ্রার্থী-অর্থী-যাচকদের প্রহার করে তাড়িয়ে দিলেন, জীবনে একবারের জন্যেও সামান্য কিছুও দান করলেন না। তৃণাগ্রে সঞ্চিত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তৈলবিন্দু আহরণ করেও কখনও কোনও হিতৈষণায় প্রবৃত্ত হলেন না আজীবন, আমরণ। সুখের প্রতি অত্যাসক্তিই কি তাঁকে এমন বিদ্বেষপরায়ণ করল নাকি অন্যতর কোনও কারণ-ও ছিল? কেন এমন হলেন ইনি? কী হবে এরপর? দেখা যাবে, পরের পর্বটিতে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content