বুধবার ১৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

একদিন বারাণসী নগরের তোরণদ্বারে দুটি কাক বসে আছে। একটি অবিমৃষ্যকারী, স্বভাবচপল। অপরটি স্থিতধী। রাজপুরোহিত তোরণদ্বার অতিক্রম করে নদীতে গেলেন। সেখানে স্নান সমাপন করে গায়ে দিলেন গন্ধবিলোপন, ধারণ করলেন মাল্য ও মহার্ঘ্য বস্ত্র। শুদ্ধদেহে তিনি ফিরতে লাগলেন রাজপুরীর দিকে। চপল কাকটি অপরটিকে বলল, “আমি ওর গায়ে বিষ্ঠা ত্যাগ করব ভাবছি।” স্থিতধী কাকটি বলল, “ওরে! অমন দুর্বুদ্ধি ভাল না। এই ব্রাহ্মণ ক্ষমতাধর, ইচ্ছে করলে কাকবংশ উজাড় করে দেবে।” চপল কাক প্রত্যুত্তর করে, “কিন্তু আমি যা ভাবি তা-ই করি যে!”
“কর, কিন্তু ধরা পড়বি”এই বলে অন্য কাকটি উড়ে গেল। ব্রাহ্মণ তখন তোরণের নিম্নদেশ অতিক্রম করছেন। ওপর থেকে পুষ্পমাল্যের মতো কাকবিষ্ঠা এসে পড়ল তাঁর গায়ে। ক্রোধে তাঁর অঙ্গ জ্বলে গেল। সেই থেকে কাকজাতির ওপর রাজপুরোহিতের একরকম জাতক্রোধ জন্ম নিল।

দ্বিপ্রহর। রৌদ্রতপ্ত দিন। দাসী গোলার ধান রোদে দিয়ে পাহারা দিচ্ছে আর ঘুমে ঢুলছে। সেই সুযোগে এক দীর্ঘরোম ছাগল এসে ধান খাচ্ছে, আর দাসী জেগে উঠলেই পালাচ্ছে। বারবার তিনবার এমন হল। দাসীর তন্দ্রা ছুটে গেলেই ছাগল পালায়, তারপর সুযোগ বুঝে আবার আসে। দাসী ভাবল, “এমন চললে তো বেশিরভাগ ধান ছাগলের পেটে যাবে, তাতে সমূহ ক্ষতি। তার চেয়ে এক উপায় করা যাক।”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৯: বিড়ালীকৌশিক-জাতক —অতি ইচ্ছার সঙ্কট

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯২ : শিউলি বাড়ি

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৩: আকাশ এখনও মেঘলা

দাসী এবার একটি প্রজ্বলিত মশাল হাতে নিয়ে ঘুমের ভান করতে লাগল। ছাগলটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আবার। দাসী তাকে মশাল দিয়ে আঘাত করল। ছাগলের রোমরাশি জ্বলে উঠল। সে উপশমের জন্য দ্রুত ছুটে গেল রাজার হস্তিশালার পাশের তৃণকুটিরে। এবার সেখানেও আগুন জ্বলে উঠল দপ করে। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল হস্তিশালায়। রাজার হাতিগুলি সেই আগুনে এমন দগ্ধ হল যে, রাজবৈদ্যরা তাদের আরোগ্য ঘটাতে পারলেন না। রাজা রাজপুরোহিতকে ডেকে জানতে চাইলেন আরোগ্যের উপায়। রাজপুরোহিত দেখলেন এই তো সুযোগ বটে। বললেন, “আরোগ্যের উপায় আছে বৈকী! ওষুধ আছে। কাকবসা দরকার।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৩: রাজসূয় মহাযজ্ঞের প্রস্তুতিপর্বে পাণ্ডবদের দিগ্বিজয় যেন রাজনীতির আনুগত্য-আদায়ের পাঠ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৫: চামচিকা

বসা হল মাংসজাত দেহস্থ ধাতুবিশেষ। রাজার আদেশে চতুর্দিকে কাকমেধ শুরু হল কাকবসার জন্য। চারিদিকে কেবল মৃত কাকের স্তুপ, কিন্তু কাকবসা পাওয়া গেল না। বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে কাকরূপে জন্ম নিয়েছেন। তিনি আশি হাজার কাক-বেষ্টিত হয়ে এক শ্মশানবনে বাস করতেন। একটি কাক তাঁর শরণাগত হয়ে এই মহাবিপত্তির বার্তা জানাল। তিনি ভাবলেন, জ্ঞাতিগণের এই বিপদকালে তাঁকেই উদ্যোগ নিতে হবে, আর অন্য কেউ এই ভয় থেকে রক্ষা করতে পারবে না যে!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৩: স্মৃতিশাস্ত্রের রক্তচক্ষু বনাম এক স্নেহশীল পিতা: মূষিক-কন্যার বিবাহ-উপাখ্যান

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

মৈত্রীপারমিতা স্মরণ করে কাকরূপী বোধিসত্ত্ব বাতায়নের পথে প্রবেশ করে রাজাসনের নিম্নদেশে আত্মগোপন করলেন। এক রাজভৃত্য তাঁকে ধরতে ছুটে এল, কিন্তু রাজা নিষেধ করলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার মৈত্রীপারমিতা স্মরণ করে তিনি আত্মপ্রকাশ করলেন। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলেন সিংহাসনের তলদেশ থেকে। রাজাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন রাজধর্ম।

কেমন হয় যথার্থ রাজধর্ম? প্রজাপালনে স্বেচ্ছাচারের কোনও ভূমিকা নেই। স্বেচ্ছাচারবর্জিত প্রজাপালন হল রাজধর্ম। সেই রাজধর্ম পালন করার পথে যেকোন-ও কাজ তন্ন-তন্ন করে বিচার করে তবেই তা বাস্তবায়িত করতে হবে। তবেই সেটি হয়ে উঠবে কর্তব্য। রাজা অকর্তব্যকে পরিহার করে চলবেন সর্বতোভাবেই। অকর্তব্যের পথে জাগে মহাভয়, মৃত্যুভয়। রাজপুরোহিত তো শত্রুতার বশবর্তী হয়ে মিথ্যাচার করেছেন। কাকের মাংসে আয়ুর্বেদকথিত বসা তো থাকে না হে!
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭০ : চার্চ হাসপাতালের সেই সকাল

রাজা প্রসন্ন হলেন। ছন্নচেতন রাজা প্রবোধিত হলেন। তিনি সোনার ভদ্রপীঠে সসম্মানে বসিয়ে সেই কাকপ্রবরের পাখায় শতপাক, সহস্রপাক তেল মাখিয়ে দিলেন। সোনার থালায় খাওয়ালেন রাজভোগ্য অন্ন-পানীয়। পর্যাপ্ত আহারে মহাসত্ত্বের খেদ ক্রমে ক্রমে বিগত হল। তাঁকে তৃপ্ত দেখে রাজা জানতে চাইলেন, “কাকের দেহে বসা নেই কেন?”

কাকপ্রবর জানিয়েছিলেন যে, কাকের হৃদয় সর্বদাই উদ্বিগ্ন, সকলেই তাকে শত্রু মনে করে বুঝি। এই উদ্বেগ, এই প্রতিকূলতাই কাকের শরীরে “বসা” জন্ম নিতে দেয় না। বোধিসত্ত্ব এবার রাজার কাছে সকল প্রাণীর জন্য অভয় প্রার্থনা করলেন। রাজা অভয় দিলেন, কাকদের জন্য প্রভূত আহার্যের ব্যবস্থা করালেন। প্রতিদিন নানাবিধ মধুর রসসিক্ত তণ্ডুল কাকগণের আহারের জন্য ব্যবস্থিত হল, মহাসত্ত্ব কাকপ্রবরের জন্য রাজভোগের অংশ ধার্য হল।

এ কাহিনি কেবল কাকের জন্য নয়। ভয়, অভয় ও ভয়হেতুর যাথার্থ্যবিচার এখানে মুখ্য। অনুপুঙ্খ বিচার না করে অভীষ্ট বিষয়ে রত হলে তার শূন্যগর্ভ স্বরূপটি যথাকালে প্রকাশিত হয়। তাতে ভয় জেগে ওঠে। যথাযথ বিচারে প্রকৃত স্বরূপটি জানা যায়। সেই শুদ্ধজ্ঞান-ই অভয়ে উত্তীর্ণ করতে পারে কেবল। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content