
শ্রীরামকৃষ্ণ।
আমাদের লক্ষ্য আনন্দ লাভ, স্বরূপ উপলব্ধি। অর্থ নয়, সম্পত্তি নয়, সুখও নয়, দুঃখও নয়। অর্থ বা সম্পদের প্রাপ্তির ইচ্ছার মূল লক্ষ্য, আনন্দ। কিন্তু আমাদের চক্ষু-আদি ইন্দ্রিয় সকল বহির্মুখী বিষয়ের ভোগের কারণে ক্ষণিকের সুখে মত্ত হয়ে পড়ে। অন্তরে বিষয় ব্যতীত আনন্দের ভান্ডার রয়েছে। শরীরের বহির্ভাগে ভগবান যেন ইন্দ্রিয়গুলি খোদাই করে বসিয়ে দিয়েছেন।
“পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভুঃ তস্মাৎ পরাঙ্ পশ্যতি নান্তরাত্মন্। …” [কঃউঃ২৷১৷১] সে কারণে ইন্দ্রিয় সকল স স বিষয়ের দিকে সর্বদা ছুটে চলেছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের বিষয়ের ভোগে যে সুখ আসে আবার তা দুঃখে পরিবর্তিত হয়ে যায়। জীবাত্মা তার ফল ভোগ করতে থাকে।
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮৪: জগৎ আপনার, কেউ পর নয়: মা সারদা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২০: সত্য ও ন্যায় পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, তবে? ঔজ্জ্বল্য বেশি কার?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬১: রাস্তায় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেলে দুর্গতির কোনও সীমা থাকবে না
যতক্ষণ ইন্দ্রিয় সকল বহিঃমুখ থাকে, ততক্ষণ জীবাত্মা আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না। এই দুর্লভ মনুষ্য জন্ম লাভ করেও কটু-অম্ল ফল খেতে খেতে শরীরের পতন হয়। “আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।। ইন্দ্রিয়াণি হয়ানাহু বিষয়াংস্তেষু গোচরান্, আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুঃ মনীষিণঃ।। যস্ত্ববিজ্ঞানবান্ ভবত্য-যুক্তেন মনসা সদা, তস্যোন্দ্রিয়াণ্যবশ্যানি দুষ্টাশ্বা ইব সারথেঃ।।” [কঃউঃ ১|৩|৩-৫]
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২২: মহর্ষির নির্দেশে ঘণ্টা বাজত জোড়াসাঁকোয়

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৫: মা সারদার সাধুভক্তি
যে শরীর রূপ রথের রথস্বামী জীবাত্মা, বুদ্ধি সারথি, মনকেই লাগাম বলে জানবে। জ্ঞানীগণ ইন্দ্রিয় সমূহকে অশ্ব ও ইন্দ্রিয় ভোগ্য বিষয় সমূহকে অশ্বগণের গমনের পথ বলে যানেন। তাঁরা শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন সংযুক্ত জীবাত্মাকেই ভোগকর্তা বলে জানেন। শরীর রূপ রথ বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে, জীবাত্মা ভিন্ন ভিন্ন দেহ পরিক্রমা করে পরম শান্তি, আনন্দ লাভের আশায়; কখনও সুখময় কখনো দুঃখময় পথে পরিক্রমা করে নিজের গন্তব্য স্থলের দিকে এগোতে থাকে, যতক্ষণ না রথী জীবাত্মা নিজের স্বরূপ উপলব্ধি না করছে, এ পরিক্রমা চলতে থাকে। ইন্দ্রিয় ঘোড়াগুলি ততক্ষণ সংযত হতে পারে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিষয়ের প্রতি আসক্তি না যায়, ততক্ষণ মনের পরিক্রমা চলতে থাকে। “চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্ দৃঢ়ম্। তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বয়োরিব সুদুষ্করম্।।” [গীতা ৬|৩৪]
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২১: খেলা শুরুর প্রস্তুতি
অর্জুন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে বলছেন, মন অতি চঞ্চল, প্রবল এবং শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপ উৎপাদক। একে বিষয় বাসনা হতে নিবৃত্ত করা অতিশয় কঠিন। সেই জন্য এর নিরোধ, আকাশস্থ বায়ুকে পাত্রবিশেষে আবদ্ধ করার মতো দুঃসাধ্য মনে করা হয়। শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন সংযুক্ত জীবাত্মাই ভোগ কর্তা। কিন্তু রথের সারথি, বুদ্ধি, অসমায়িত মনের সহিত সর্বদা যুক্ত থাকায় বিবেকহীন হয়। তার সঙ্গে সংযুক্ত ইন্দ্রিয় সকল দুষ্টু অশ্বগণের মতো দুর্দমনীয় হয়। বুদ্ধি সারথির শুদ্ধত্ব ও বিচার প্রখরতা রথ কে সংযত করতে পারে। শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের মধ্য দিয়ে বিবেক জাগ্রত হলে শুদ্ধিকরণ হয়। “এবং বুদ্ধে পরং বুদ্ধ্বা সংস্তভ্যত্মানমাত্মনা, জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্।।” [গীতা৩|৪৩]
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৩: দুর্জনের সম্মান, সাধুর জন্য ফাঁদ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৬: বাজ
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, শুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা মনকে সমাহিত করে, দ্রষ্টা পরমাত্মা কে এই রূপ জেনে অজ্ঞানমূলক দুর্জয়শত্রু কাম কে, জ্ঞান দ্বারা বিনাশ কর। ইন্দ্রিয় সংযম পূর্বক আত্মজ্ঞান লাভ করলে তখন কাম বাসনা জয় করা সম্ভব হয়। কামের আশ্রয় দেহ ইন্দ্রিয়, সকলের থেকে আত্মা পৃথক—এই জ্ঞান যত দৃঢ় হবে, তত কামের প্রভাব কমবে। দেহবুদ্ধিই বাসনা সকলের মূল কারণ। বাসনা যত ক্ষীণ হবে বুদ্ধির শুদ্ধিকরণ হবে। “আত্মৈক্যবোধেন বিনাপি মুক্তিঃ ন সিধ্যতি…।।” [বিবেকচূড়ামণিঃ ৬] তমো ও রজোগুণাতীত, সত্ত্বগুণে আরূঢ় হলে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন হবে। তখন একমাত্র রথের যাত্রা সম্পূর্ণ হবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।


















