কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

এই গল্পের একদিকে যেমন মানুষ, তেমন-ই অন্যদিকে তারা, যারা মানুষ নয়। কিন্তু তারাই এই গল্পের মুখ্যভূমিকায়, তারাই হয়ে ওঠে মানুষের প্রতিভূ। তাই এই গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের, মনুষ্যপ্রকৃতির। তার দুর্দমনীয় স্বভাব ও আত্মজয়ের এই কাহিনির একদিকে মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মবন্ধনের প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে থাকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট জীবন ও প্রবঞ্চনাকুটিল সার্থসিদ্ধির জগতে যথার্থ হিতাকাঙ্ক্ষীর অভ্যুদয় ও আত্মরক্ষার পাঠ।

শাস্ত্র পরামর্শ দেন, আত্মানং সততং রক্ষেত্… আত্মরক্ষার মধ্য দিয়েই আত্মজাগরণের সূত্রপাত। যে অপ্রতিরোধ্য মানবপ্রকৃতি স্বভাবধর্মের অধীন হয়ে নানাবিধ কর্মে তত্পর হয়, সেই আন্তরসত্তা জীবধর্মের অনুকূলে তার মনোগত অভিপ্রায়টি চরিতার্থ করতে চায়। তার সংঘটিত কর্ম শোভন কিংবা অশোভন, সাধু কিংবা কুটিল হয়ে ওঠে কর্মের পরিচয়ে, স্বভাবধর্মের প্রণোদনায়। এর নেপথ্যে থাকে চারিত্রিক গঠন, সামাজিক তত্ত্ব ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি। কাহিনির শেষে যার অভ্যুদয়, সে যেমন আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রেরণাতেই কর্মতত্পর, তেমন-ই যার পরাজয়, যে দুষ্কর্মকারী সেও আত্মরক্ষা কিংবা আত্মপ্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণাতেই চালিত। তবে স্বভাব, জীবধর্ম ও হিতাহিতের সংযোগের পথে নীতিপ্রতিষ্ঠার যথার্থ মানদণ্ডটি ঠিক কি ও কেন? জানাবে এই কাহিনি।

বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে রাজগৃহের সন্নিকটে শালিন্দী নামের একটি ব্রাহ্মণগ্রামে জন্ম নিয়েছেন এক কৃষিজীবী ব্রাহ্মণকুলে। বহুপরিমাণ ভূসম্পদের অধিকারী ছিলেন তাঁরা। অধ্যয়নাদি কর্মেই ব্রাহ্মণের পরিচয় হলেও কালক্রমে দানগ্রহণের অর্জনে তাঁরাও প্রভূত স্থাবর সম্পদের অধিকারী হতেন। গ্রামের উত্তরপূর্ব দিকে মগধরাজ্যে তাঁদের আনুমানিক সহস্র করীস অথবা পঞ্চবিংশ সহস্র বিঘা কৃষিজমি ছিল। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বোধিসত্ত্ব গার্হস্থ্যধর্ম অবলম্বন করে নিত্য-ই সেই ভূমিকর্ষণ, শস্যোত্পাদনের কাজে মনোনিবেশ করলেন।
এমনই একদিন ভৃত্যবর্গের সঙ্গে ক্ষেত্রে গেলেন। তাদের চাষের আদেশ দিয়ে হাত-মুখাদি প্রক্ষালনের জন্য ক্ষেত্রের পার্শ্বদেশ একটি ডোবাতে এলেন। এই ডোবায় একটি সুবর্ণকর্কট থাকতো। তার বাহ্যরূপ যেমন সুন্দর, আন্তরপ্রকৃতি তেমনই শোভন। বোধিসত্ত্ব যখন দন্তকাষ্ঠ দিয়ে দন্তধাবন করছেন, তখন কর্কটটি তাঁর কাছে এল, বোধিসত্ত্ব তাঁকে উত্তরীয়ে স্থাপন করে ক্ষেত্রে ফিরে এলেন। সেখানকার সকল কাজ সম্পন্ন করে গৃহে প্রতিগমনের কালে তাকে আবার ডোবায় নিক্ষেপ করে চলে গেলেন।

এই সুবর্ণকর্কটটি আমাদের কাহিনির মুখ্যভূমিকায় থাকবে। থাকবেন মনুষ্যকুলের প্রতিভূ হয়ে বোধিসত্ত্ব। তাঁর কর্মে অহিংসা ও দাক্ষিণ্য লক্ষ্য করা গেল। সুবর্ণকর্কটের এই রূপ সমাজের নানা স্তরে নিত্য প্রতীয়মান মানুষের-ই এক রূপ। ক্রমে ক্রমে উভয়ের এক প্রগাঢ় মৈত্রী জন্মাল। তার পর থেকে বোধিসত্ত্ব প্রথমেই ডোবায় এসে হাত মুখ ধুয়ে নেন, কর্কটটিকে নিয়ে কাজ দেখতে যান, ফেরার পথে তাকে তার বাসস্থানে রেখে আসেন। এই সৌহার্দ্যবন্ধন সমাজের ভিত্তি, এই আত্মবন্ধনের পথেই আত্মরক্ষা। কীভাবে? দেখা যাক।

এবার কাহিনি বাঁক নেবে। বোধিসত্ত্ব নিয়মিত ক্ষেত্রে যেতেন শস্যোত্পাদনের কাজ দেখাশোনার জন্য। তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর নেত্রদুটি ছিল নিরুপম। তাঁর কৃষিক্ষেত্রের একটি প্রান্তে একটি তালগাছ ছিল। সেই বৃক্ষে একটি নীড়ে এক কাকী থাকত। বোধিসত্ত্বের নেত্রদুটি দেখে তার বড় লোভ হল। সে স্বামীর কাছে তার মনের আকাঙ্ক্ষা জানাল
“ দয়িত! আমার এক সাধ হয়েছে।”
“প্রিয়! বল কী সাধ তোমার।”
“আমার ইচ্ছে করে ওই ব্রাহ্মণের চক্ষুদুটি খাই।”
“এমন দুঃসাধ্য সাধ সর্বনেশে, এ তো ভাল কথা নয়।”

“তোমার মুরোদ আমার জানা আছে, এ তোমার কম্ম নয়, ওই তালগাছের কাছে উইঢিপির মধ্যে এক কালসাপ থাকেন, তাঁকে উপাসনা করে তুষ্ট করো। তিনি দংশন করে ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে তুমি চোখদুটো উপড়ে আনবে।”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬০ : কাকজাতক — ভেবে দেখ মন

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৪: “যোগ্য পাত্র ছাড়া কন্যাদান নয়”— শাস্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে কন্যার সম্মতির জয়

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত

এই পরামর্শ কাকের মনে ধরল। সেদিন থেকে কাকটি কৃষ্ণসর্পের উপাসনায় রত হল। আমাদের গল্পে এই কাকী, কাক ও কালসাপ বহুবিধ মানুষেরই ত্রিবিধ রূপ, যারা নিষ্ঠুরস্বার্থপর, যারা সেই অন্যায় অভীপ্সার অনুমোদক, যারা অনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সম্পাদক। তাদের কী পরিণতি হয়? দেখা যাক।

ক্রমে ক্রমে বোধিসত্ত্বের ক্ষেত্রের শস্য পরিবর্দ্ধিত হল। সেই কর্কটটিও তখন বেশ বড়, পরিণত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কাকটিও বল্মীকস্তুপের পাশে নিবিষ্টমনে উপাসনা করে চলেছে কৃষ্ণসর্পের। দিন যায়। একদিন কৃষ্ণসর্প কাককে প্রশ্ন করল—
“ভদ্র, তুমি অহোরাত্র কি আমার উপাসনা করছো? কেন? বল, কী তোমার অভিপ্রায়, আমি তোমার কী উপকার করতে পারি?”
কাকের অভীষ্ট জেনে কালসাপ তাকে আশ্বস্ত করে। “এ আর এমন কী কথা, তথাস্তু, এই ক্ষেত্রস্বামী চোখ দুটি পাবে।”

পরেরদিন বোধিসত্ত্ব ক্ষেত্রে এলেন। প্রথমেই ডোবায় নেমে মুখ ধুলেন, কর্কটটিকে স্নেহবশতঃ আলিঙ্গন করে উত্তরীয়ে রাখলেন, তারপর প্রবেশ করলেন শস্যক্ষেত্রে। ক্ষেতের ধারে ঘাসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল কালসাপ, সে অতিবেগে ধাবিত হয়ে বোধিসত্ত্বের পায়ে দংশন করল। তারপর দ্রুত বল্মীকস্তুপের দিকে ছুটে গেল আত্মগোপন করতে। বোধিসত্ত্ব নিমেষেই ভূতলে পতিত হলেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর উত্তরীয়ের মধ্য থেকে কর্কটটি লাফিয়ে নেমে এল, সেই মুহূর্তেই কাকটি উড়ে এসে বসল বোধিসত্ত্বের বক্ষদেশের ওপর। তার লক্ষ্য সেই দুটি চোখ।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭২ : শুধু হাসি-খেলা?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৬: কাঠবিড়ালি

পরপর নিমেষের মধ্যে ঘটে গেল সকলকিছু। কাক তখন বোধিসত্ত্বের চোখদুটি উত্পাটন করে নেওয়ার জন্য উদ্যত, কর্কটটি তখনই উপলব্ধি করল “এই কাকের জন্যই আমার মিত্রের বিপদ, একে জব্দ করতে পারলেই সাপটাও আসবে।” নিমেষেই কর্কটের সুপুষ্ট সাঁড়াশির মতো শৃঙ্গের মধ্যে কাকের গলা আটকা পড়ল। প্রবল যন্ত্রণা দিয়ে শেষে একটু শিথিল হল কর্কটের শৃঙ্গ। সেই কাক তখন নিতান্তই বিপর্যস্ত, কাকীর অন্যায় আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে গিয়ে তার প্রাণ বিগতপ্রায়। ত্রাহি মাম্। তখন সে কালসাপকে ডাকতে লাগল, “ বন্ধু! আমাকে ফেলে পালিয়ে গেলে কেন, এই কর্কট আমার প্রাণ বধ করার আগেই আমাকে বাঁচাও গো।”

যে সাপের অনুগ্রহপ্রার্থী শরণাগত ছিল সে একদিন, আজ তাকেই সে মিত্রভাবে সম্বোধন করছে। কিন্তু এই সম্পর্ক নিঃস্বার্থ অনাবিল নয়। তাই তা মৈত্রীবন্ধন কি?
কালসাপ তার বিশাল ফণা উত্থিত করে ছুটে এল কাককে অভয়, আশ্বাস দিতে। নিমেষেই কর্কটের অপর শৃঙ্গের দৃঢ় কালান্তক আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হল। তাকেও বিপুল যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট করে কর্কট শৃঙ্গ একটু শিথিল করল।

কর্কট তো সাপ কিংবা কাকের মাংস খায় না! তবে এমন করে ধরা কেন? কর্কট জানায় “এই ব্যক্তি আমার হিতাকাঙ্ক্ষী, আমাকে যত্নে স্নেহে সাহচর্য দেন। এঁর মৃত্যুতে দারুণ শোকে দগ্ধ হবো, এঁর মৃত্যু আমাকে অসহায় করে দেবে। এখন আমার সুপুষ্ট দেহ দেখে মধুর স্বাদু মাংসের লোভে সকলেই আমাকে মারতে চেষ্টা করবে, মানুষ কিংবা কাক– কেউ রেহাই দেবে না আমাকে।”

কালসাপ ভেবে দেখল, এই আবেগের পথেই কর্কটকে যেন তেন প্রকারেণ প্রবঞ্চিত করে নিজের আর কাকের আত্মরক্ষা করতে হবে। সে জানায় যে, সর্পদষ্ট ব্যক্তির বিষ আহরণ করে তার পুনর্জীবন দান করবে, কিন্তু সাপ আর কাককে দ্রুত ছেড়ে না দিলে বিপদের শেষ থাকবে না, বিষ গাঢ় হলেই প্রাণসংশয়।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

এই পর্যন্ত দেখা গেল, এই কাহিনিটির মূলে পারস্পরিক স্নেহবন্ধনের মৈত্রীভাবনা একদিকে, অন্যদিকে অন্যায় লোভ ও স্বার্থ পরিপূরণের চক্রান্ত। যারা অনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সিদ্ধির জন্য নিরত, তারা কালো রঙের প্রতীকে রূপায়িত। কাক, কাকী ও কালসাপ তিনটিই এই বর্ণসাদৃশ্যে সমপর্যায়ভুক্ত। তাদের স্বভাবধর্ম-ও সমতুল। তারাও যেন মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু তার ভিত্তিমূল স্বার্থ ও আনুগত্যে আবিল ও ক্লেদপূর্ণ। এর পাশেই অপর এক যথার্থ নিঃস্বার্থ মৈত্রীবন্ধন, তাই কর্কট হিরণ্ময়। জগতের সঙ্গে জীবের যে পাঞ্চভৌতিক সম্বন্ধ, সেখানে পঞ্চেন্দ্রিয়ের পথে জগৎ ও জীবের সংযোগ ঘটে। চোখ সেই ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে বিশিষ্ট, তার পথেই প্রত্যক্ষজ্ঞান জন্মায়। নেত্রোত্পাটনে তার বিলক্ষণ হানি ঘটে। ক্ষেত্রস্বামিরূপী বোধিসত্ত্বের নেত্রদুটির উন্মূলন প্রকৃতপক্ষে সহৃদয় সচেতন মানবতার বিপরীতচারী অন্ধ স্বার্থপরতার আস্ফালনের প্রতীক। সুবর্ণকর্কটের প্রচেষ্টায় সেই উন্মূলন প্রতিহত হলে ইতিবাচক বার্তা পরিবেশিত হল।

পাশাপাশি দেখা গেল, আত্মরক্ষা এই কাহিনির অপর একটি অবলম্বন যেখানে কর্কট আত্মরক্ষা করতে চায়, অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে বিপন্ন কাকটিও আত্মরক্ষা করতে চায়। এমন দুষ্কর্মকারী কি শাস্তি পায়? সজ্জন নিষ্কলুষ মানুষ যদি আকস্মিক বিপদে নিমজ্জিত হয় তবে তার কী হয়? কী হওয়া উচিত? বোধিসত্ত্ব তো আত্মরক্ষা করতে পারলেন না, সর্পাঘাতে হতচেতন হলেন। এই কি তাঁর প্রাপ্য ছিল? তিনি কি আত্মরক্ষা করতে পারবেন? দেখা যাক।

কৃষ্ণসর্প জানতো না কর্কট কেমন উপায়কুশল। কৃষ্ণসর্পের অভিপ্রায় সুবর্ণকর্কটের বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। সাপটি নিজের ও কাকের আত্মরক্ষার জন্য পলায়নের পরিকল্পনা করছিল। তাই প্রস্তুত করছিল প্রবঞ্চনার ক্ষেত্র। কর্কট তার শৃঙ্গ এমনভাবে শিথিল করল যাতে সাপটি সঞ্চরণ করতে পারে। কিন্তু দুষ্ট কাকটিকে ছাড়ল না। মুখে বলল, মিত্রের জীবনলাভ ঘটলেই কাক মুক্তি পাবে, যেমন সাপ মুক্তি পাচ্ছে। সে উপায়কুশল। কাকের মুক্তি ঘটলে সে যে আক্রমণে বিপর্যস্ত করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এরমধ্যেই সর্প কর্কটের শৃঙ্গের আকর্ষণে আবদ্ধ থেকেও অনায়াস সঞ্চরণে এগিয়ে গিয়ে হতচেতন বোধিসত্ত্বের দেহস্থ বিষ আহরণ করল। ক্রমে দেহ নির্বিষ হয়ে স্বাভাবিক বর্ণে ফিরে এল। লুপ্তচেতন বোধিসত্ত্ব সংজ্ঞা লাভ করলেন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৩৯: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২০

কূটকৌশলী কর্কট মনে মনে ভেবে দেখল যে শত্রুর শেষ রাখতে নেই। এই দুইটি প্রাণী তার মিত্রের ভাবী বিপন্নতার কারণ হতে পারে। তাই শাণিত তীক্ষ্ণাগ্র অস্ত্রে যেমন কমলমুকুল নিমেষেই ছিন্নমূল হয়, তেমন-ই কর্কটের শৃঙ্গাঘাতে কাক ও সাপ উভয়ের-ই শিরচ্ছেদ ঘটল। কাকী এই সকল ভয়ানক কাণ্ড দেখে দেশান্তরে পালিয়ে গেল।

বোধিসত্ত্ব সর্পটিকে যষ্টির দ্বারা একটি গুল্মে নিক্ষেপ করলেন। কর্কটকে ছেড়ে দিলেন ডোবায়। স্নান করে ফিরে গেলেন শালিন্দী গ্রামে। কর্কটের সঙ্গে তাঁর আত্মবন্ধন আরও দৃঢ় ও ঘনীভূত হয়ে উঠল কালক্রমে।

এই কাহিনিতে সুকৃত ও দুষ্কৃতের জয়-পরাজয়ের পরিচিত চিত্রটি বর্তমান। তবে তাকে অতিক্রম করেও মৈত্রী ও মিত্রনির্বাচনের ক্ষেত্রটি তাত্পর্যপূর্ণ। বোধিসত্ত্ব ও কর্কটের মধ্যে যে স্বাভাবিক মৈত্রী জেগে উঠেছিল তা-ই প্রকৃত। কাক ও সাপের মৈত্রী যথার্থ নয়। সাপ জীবনকে বিপন্ন করেও কাকের প্রাণরক্ষায় এগিয়ে এসেছিল একথা সত্য, তবে তা আত্মবন্ধনের প্রেরণায় নয়, তা নিতান্তই অবিমৃষ্যকারিতা। কর্কটের শক্তিকে তারা দুজনেই উপেক্ষা করেছিল। এই কাহিনি অনাবিল নিঃস্বার্থ ত্যাগকে মহিমান্বিত করেছে, পাশাপাশি জাগিয়ে রেখেছে জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রজীবনে কল্যাণমণ্ডিত অথচ বিচিন্তিত, বিশিষ্ট যাপনকে, যা এখানে মূর্ত হয়েছে উপায়কৌশলের আদর্শে, যা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়ের জীবনকে রক্ষা করে, কল্যাণমুখী করে।

এখানেই প্রাসঙ্গিক আত্মরক্ষার ক্ষেত্রটি। বোধিসত্ত্বের জীবন বিপন্ন হয়েছে নিতান্তই অপরের লালসায়। ধীমান কর্কটের বীর্য ও অসম যুদ্ধে জয়ের পথে তাঁর পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। তাঁর পুনরুজ্জীবনের নেপথ্যে শোকের প্রেক্ষাপট থাকলেও কর্কটের কৃতজ্ঞতা ও ভাবী প্রতিকূল জগতে বোধিসত্ত্বের সস্নেহ পৃষ্ঠপোষণ তার জীবনধারণের সহায় হবে এ এক বড় সত্য। ভুললে চলবে না, বোধিসত্ত্ব একজন বৃহত্ ক্ষেত্রাধিপতি এবং কর্কটের আশ্রয় ওই ডোবাটি তাঁর ক্ষেত্রের নিরাপদ আশ্রয়েই বর্তমান। সেই নিরাপত্তা সুবর্ণকর্কট হারাতে চাইবে না, যার হিরন্ময় বর্ণ তার ঔদার্যের প্রতীক, তার জীবনের মূর্তিমান বিপন্নতাও।

আবার, শাস্ত্রোক্ত “আত্মানং সততং রক্ষেত্” উপদেশটি কাকীর বুঝি অজ্ঞাত ছিল। তাই তুচ্ছ লোভের বশীভূত হয়ে সে তার নিজের জীবন এবং কাক ও সাপকে নষ্ট করেছে। আত্মরক্ষায়, জীবনের সার্বিক পরিপালনে সে নিতান্তই ব্যর্থ হয়েছে। সাপ প্রবঞ্চনা এবং আত্মশক্তিকে আশ্রয় করে নিজের ও কাকের জীবনরক্ষার চেষ্টা করেছে বটে, তবে মিথ্যা ছলনা মহত্ কর্মের পথে অন্তরায় কেবল, তাই তাদের করুণ পরিণতি ঘটেছে।

সমাজজীবনে, রাষ্ট্রজীবনে মানুষ যে অভ্যুদয় আকাঙ্ক্ষা করে, মৈত্রী ও যথার্থ আত্মবন্ধনের পথে তা সাকার হয়। তবে আনাচে কানাচে সুগুপ্ত থাকা নানা বিপন্নতা সেই বন্ধনের পথে বাধা আনে বারবার, উপায়কুশল অথচ সত্যনিষ্ঠ ধীমান মানুষের উদ্যোগ তাকে সেই বিপন্নতা অতিক্রমের শক্তি ও হিরণ্ময় প্রেরণা দেয় যুগে যুগে। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content