শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাম তাঁর বনবাসজীবনে মহামুনি সুতীক্ষ্ণের আশ্রমে কিছুসময় ছিলেন। আবার দীর্ঘদিন পরে অরণ্যবাসের শেষভাগে ফিরে এলেন সেই আশ্রমে। সেখানে অবস্থানকালীন, রাম, মহামুনি সুতীক্ষ্ণকে সবিনয়ে জানালেন, কথাপ্রসঙ্গে তিনি শুনেছেন, এই অরণ্যে মুনিশ্রেষ্ঠ অগস্ত্য বাস করেন। রাম জানেন না, ধীমান মহর্ষির সেই মনোরম আশ্রমটি, এই বিস্তৃত বনভূমির ঠিক কোথায়? ভগবান অগস্ত্যের অনুগ্রহপ্রার্থী রাম, ভাই লক্ষ্মণ এবং সীতার সঙ্গে অগস্ত্যমুনিকে অভিবাদনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারণ রামের প্রবল মনোবাসনা— তিনি স্বয়ং মুনিবরের সেবা করে ধন্য হবেন। ধার্মিক রামের কথা শুনে, প্রীত হয়ে, সুতীক্ষ্ণ মুনি প্রত্যুত্তরে বললেন, তিনি নিজে রাম এমনটাই বলতে চেয়েছেন, রাম যেন লক্ষ্মণ ও সীতাসহ অগস্ত্যমুনির কাছে যান। সৌভাগ্যক্রমে রাম নিজে সেই কথাই বললেন। মহামুনি অগস্ত্য যেখান বাস করেন তার নির্দেশ দিলেন। রাম এই আশ্রমের দক্ষিণে চার যোজন পথ পার হয়ে অগস্ত্যমুনির ভাইয়ের আশ্রমে পৌঁছবেন। সেই স্থলবহুল বনভূমি পিপ্পলী অর্থাৎ অশোকবনে সমৃদ্ধ। বিবিধ ফুল ও পাখির কূজনে মুখরিত সেই রমণীয় বনভূমি, হাঁস, কারণ্ডব ও চক্রবাকবহুল নির্মলজলপূর্ণ বহু সরোবরে পরিপূর্ণ। ঋষির উপদেশ, রাম সেখানে রাত্রিবাস করে, প্রভাতে যেন সেখান হতে যাত্রা করেন।

বনের পাশে দিয়ে দক্ষিণদিকে এক যোজন পথ পার হয়ে অগস্ত্যমুনির আশ্রম। সুতীক্ষ্ণমুনির প্রস্তাব —অগস্ত্যমুনির দর্শনেচ্ছু রাম আজই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। মুনির কথা রামের মনঃপূত হল। তিনি সপরিবারে মুনিকে প্রণাম করে, ভাই ও সীতাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন। রাম বিচিত্র বনশোভা, মেঘতুল্য পর্বত, সরোবর, নদী দেখতে দেখতে সুতীক্ষ্ণ মুনির নির্দেশিত পথে অনায়াসে চলতে শুরু করলেন। আশ্রমের নিকটবর্তী হয়ে সন্তুষ্ট রাম, লক্ষ্মণকে বললেন, এটি নিশ্চয়ই সেই পুণ্যকর্মা অগস্ত্যমুনির ভাইয়ের আশ্রম। কারণ রাম যেমনটি জেনেছেন, এই বনপথে আছে ফল ও ফুলভারে অবনত হাজার হাজার গাছ। বন হতে বাতাসে ভেসে আসছে পিপ্পলীফলের কটুগন্ধ। কোথাও রয়েছে স্তূপীকৃত কাঠ, কোথাও বা দেখা যাচ্ছে ছিন্নভিন্ন কুশঘাস সেগুলি যেন বৈদূর্যমণির মতো দীপ্তিময়। বনমধ্যে আশ্রমের হোমাগ্নির ধোঁয়ার শিখা কালো মেঘের চূড়ার মতো দৃশ্যমান। সেখানে নির্জন ঘাটগুলিতে ব্রাহ্মণগণ স্নান সেরে, নিজেরাই ফুল তুলে, আরাধ্য দেবতাকে উপহার দিচ্ছেন। রাম ভাইকে জানালেন, সুতীক্ষ্ণমুনির নির্দেশানুসারে যেমন শুনেছিলেন, এটি নিশ্চয়ই অগস্ত্যমুনির ভাইয়ের সেই আশ্রম। এই ঋষির ভাই, পুণ্যকর্মা অগস্ত্যমুনি, জনকল্যাণের লক্ষ্যে ব্রাহ্মণদের হত্যাকারী সাক্ষাৎমৃত্যুতুল্য মহাসুর, নিষ্ঠুর, বাতাপি ও ইল্বলকে দ্রুত কষ্টকর শাস্তি দান করেন। এইভাবে তিনি এই দিকটি সকলের আশ্রয়যোগ্য করে
ইল্বল, ব্রাহ্মণরূপ ধারণ করে, শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে,সংস্কৃতভাষায়, ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানাত। সে মেষরূপধারী ভাইকে, (শ্রাদ্ধবিধি অনুসারে) শোধন করে (উৎসর্গ করে), শ্রাদ্ধনির্দিষ্ট কাজের অঙ্গ হিসেবে ব্রাহ্মণদের সেই উৎসর্গকৃত মাংস ভোজন করাত।ব্রাহ্মণদের ভোজনান্তে, ইল্বল,উঁচু গলায় আহ্বান জানাত, বাতাপে নিষ্ক্রমস্বেতি বাতাপি, তুই বেরিয়ে আয়। ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে মেষের মতো শব্দ করে, ব্রাহ্মণদের শরীর ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসতো বাতাপি। স্বেচ্ছারূপধারী, কাঁচামাংসাশী রাক্ষসরা নিত্য হাজার হাজার ব্রাহ্মণদের হত্যা করত। দেবতাদের প্রার্থনায়, মহর্ষি অগস্ত্য সম্পূর্ণ বিষয়টি অনুভব করে,মহাসুরকে ভক্ষণ করলেন। শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হয়েছে তো? এই বলে, রাক্ষস ইল্বল তাঁর হাতে জল দিয়ে যথারীতি ভাইকে আহ্বান জানাল, “বেরিয়ে আয়।” ততঃ সম্পন্নমিত্যুক্ত্বা দত্ত্বা হস্তেঽবনেজনম্। ভ্রাতরং নিষ্ক্রমস্বেতি ইল্বলঃ সমভাষত।। সেই ব্রহ্মণঘাতী রাক্ষস একথা বলতে থাকলে,মুনিশ্রেষ্ঠ ধীমান অগস্ত্য হেসে বললেন, আমি রাক্ষসকে হজম করে ফেলেছি। যমালয়ে গিয়েছে তোর মেষরূপী ভাইটি, তাঁর বের হবার শক্তি কোথায়? কুতো নিষ্ক্রমিতুং শক্তির্ময়া জীর্ণস্য রক্ষসঃ। ভ্রাতুস্তু মেষরূপস্য গতস্য যমসদনম্।। ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে, ইল্বল, সক্রোধে অগস্ত্যমুনিকে উৎপীড়ন করতে শুরু করল। দ্বিজশ্রেষ্ঠর অভিমুখে দ্রুত ধেয়ে গেল সে। প্রদীপ্ততেজা মুনি অগ্নির তুল্য চক্ষুর তেজে তাকে নিঃশেষে দগ্ধ করায় মৃত্যু হল তার। রাম, লক্ষ্মণকে জানালেন, ব্রাহ্মণদের প্রতি অনুকম্পাবশত যিনি এই দুরূহ কাজটি করেছিলেন, তাঁরই ভাইয়ের সরোবর ও বনে সজ্জিত এই আশ্রমটি। লক্ষ্মণের সঙ্গে এমন আলাপচারিতার মাঝে সূর্য অস্তমিত হল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। লক্ষ্মণভাই ও রাম বিধিসম্মত সান্ধ্য উপাসনা সমাপনান্তে, আশ্রমে প্রবেশ করে সেই ঋষিকে প্রণাম জানালেন। মুনি রঘুনন্দনকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। ফলমূল গ্রহণ করে, সেখানেই রাম রাত্রিযাপন করলেন। নিশাবসানে সূর্যোদয় হলে, সেই অগস্ত্য-ঋষির ভাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রণাম করলেন। ঋষির অনুমতি প্রার্থনা করে রাম বললেন, তিনি সুখনিদ্রায় নিশি যাপন করেছেন। রাম আরও জানালেন, সম্প্রতি আপনার গুরুপ্রতিম অগ্রজের দর্শনলাভের ইচ্ছা আমার, আপনার অনুমতি প্রার্থনা করি। আমন্ত্রয়ে ত্বাং গচ্ছামি গুরুং তে দ্রষ্টুমগ্রজম্। অগস্ত্যমুনির ভাই অনুমতি দিলেন গম্যতামিতি
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪১: যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে কেন কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন?

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৩: ডায়মন্ড হারবার, গৌরীর হারিয়ে যাবার দিন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৭ : রাজা সাজা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

সুতীক্ষ্ণমুনির নির্দিষ্ট পথে যাত্রা করলেন রাম। তিনি পথে বন দেখতে দেখতে চললেন। শত শত বনজ তরু যেমন নীবার ধান, পনস (কাঁঠাল), সাল, অশোক, তিনিশ, চিরবিল্ব, মধূক, তিন্দূক (গাব) প্রভৃতি গাছ দেখলেন। রাম আরও দেখলেন, কুসুমিত লতার অগ্রভাগে রয়েছে পুষ্পিত শতসহস্র বন্যতরুরাজি। হাতির শুঁড় মথিত করেছে গাছগুলি, বানরগুলি হয়েছে গাছগুলির শোভা। শত শত মত্ত বিহঙ্গের কূজনে মুখরিত সেই গাছগুলি। কমলনয়ন রাম, নিকটবর্তী ও পিছনে অনুসরণরত, শোভাবর্ধক বীর লক্ষ্মণকে বললেন, এখানের গাছগুলির পাতা যেমন স্নিগ্ধ, মৃগ ও দ্বিজরাও প্রশান্ত। আত্মজ্ঞানী, মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রম বেশি দূরে নয়। যিনি নিজের কর্মফলের জন্য জগতে অগস্ত্য নামে খ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর আশ্রম দেখা যায়, যেখানে মানুষের পরিশ্রমজনিত ক্লান্তি দূর হয়। আশ্রমের হোমাগ্নির ধূম নিয়ত আচ্ছন্ন করে রেখেছে বনভূমি, চীরখণ্ড সমাকীর্ণ রয়েছে সেখানে, হরিণগুলিও সৌম্যদর্শন, পাখির কলরব স্থানটি মুখরিত করেছে। পুণ্যকর্মা মহর্ষি, লোকহিতের কামনায়, বলপ্রয়োগ করে,সাক্ষাৎ মৃত্যুর তুল্য অসুরকে নির্যাতন করেছিলেন। যাঁর ফলে, এই দক্ষিণদিকটি আজ মানুষের আশ্রয় হয়েছে। তাঁর প্রভাবে রাক্ষসরা সন্ত্রস্তদৃষ্টিতে দক্ষিণদিকটিতে আসে না, শুধু দূর হতে স্থানটিকে দেখে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩১: সুন্দরবনের এক অনন্য প্রাণীসম্পদ গাড়োল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৮: আকাশ এখনও মেঘলা

যখন থেকে পূতকর্মা মহর্ষি অগস্ত্য এই দিকে এসেছেন তখন থেকেই নিশাচর রাক্ষসরা শত্রুতা ত্যাগ করে শান্ত হয়েছে। নিষ্ঠুরমতি রাক্ষসদের প্রবেশ দুঃসাধ্য বলে ভগবান অগস্ত্যর নামে দক্ষিণদিকটি ত্রিভুবনে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তাঁর আদেশ পালন করে বিন্ধ্যপর্বত, সূর্যের পথ রুদ্ধ করে,আয়তন বৃদ্ধি করছে না। রাম যেন মুগ্ধতায় আপ্লুত হয়ে বলে চললেন, পৃথিবীতে নিজের লোকপ্রিয় কাজের জন্য বিখ্যাত, নম্র হরিণগুলির সেবাধন্য, রমণীয়, এই সেই দীর্ঘায়ু মহর্ষি অগস্ত্যর আশ্রম। রামের গভীর বিশ্বাস—লোকসমাজে সম্মানীয়,নিত্য সাধুজনের কল্যাণে নিরত, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের মঙ্গল করবেন। এষ লোকার্চ্চিতঃ সাধুর্হিতে নিত্যং রতঃ সতাম্। অস্মানধিগতানেষ শ্রেয়সা যোজয়িষ্যতি।। রাম স্থির করলেন, মহামুনি অগস্ত্যকে অর্চনা করবেন এবং সেখানেই বনবাসের অবশিষ্ট দিনগুলিতে বসবাস করবেন। শেষঞ্চ বনবাসস্য সৌম্য বৎস্যাম্যহং প্রভো। রাম, লক্ষ্মণকে জানালেন, এখানে দেব, গন্ধর্ব, সিদ্ধপুরুষ ও পরম ঋষিগণ, আহারে সংযম পালন করে, নিরন্তর তাঁকে বন্দনা করছেন। মহামুনি অগস্ত্য এমন যে এখানে মিথ্যাবাদী, নিষ্ঠুর, শঠ, নৃশংস ও পাপাচারীরা বেঁচে থাকতে পারে না। রামের সপ্রশংস উক্তি— এখানে দেব, যক্ষ, নাগ এবং পাখিরা ধর্মাচরণের কামনায় আহারে সংযত হয়ে, বাস করেন। এখানে মহাত্মা তপঃসিদ্ধপুরুষরা, পার্থিব শরীর ত্যাগ করে, নতুন দেহ ধারণ করে, সূর্যসম সমুজ্জ্বল বিমানারোহণে স্বর্গলোকে উপনীত হয়েছেন। কল্যাণকামী প্রাণীদের বন্দনাতুষ্ট, দেবতারা, এখানে যক্ষত্ব, অমরত্ব এবং নানা রাজ্য দান করে থাকেন। রাম লক্ষ্মণকে নির্দেশ দিলেন, তাঁরা আশ্রমে এসে পৌঁছেছেন। লক্ষ্মণ আগে প্রবেশ কর। সীতাসহ আমি এসেছি—এই সংবাদ ঋষিকে নিবেদন কর। আগতাঃ স্মাশ্রমপদং সৌমিত্রে প্রবিশাগ্রতঃ। নিবেদয়েহ মাং প্রাপ্তমৃষয়ে সহ সীতয়া।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৪৬: ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী মেয়ে

জ্ঞানী, গুণী, চিন্তাশীল, কল্যাণকামী, শুভাকাঙ্ক্ষী মুনিগণের সান্নিধ্যে রামচন্দ্রের বনবাস, জীবনরসে সমৃদ্ধ হয়েছিল। রাম হয়তো অনুভব করেছিলেন, বনবাসজীবনের রাক্ষসনিধন ছাড়াও অন্যান্য ক্ষত্রিয়সুলভ তৎপরতার পরিবর্তে ক্লেদাক্ত নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষত্রতেজের অবক্ষয় হতে মুক্তির উপায় হল বৈরাগ্যের ধূসররঙে রঞ্জিত মুনিদের তপঃশক্তির প্রাচুর্যমাহাত্ম্য অনুধাবন। মুনিগণের তপঃশক্তি, মনোবল, ক্ষত্রিয়দের বাহুবল হতে কোন অংশেই কম নয়, শুধু উভয়শক্তির প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা। সার্বিক জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মুনিঋষিদের আত্মশক্তি বিধ্বংসী হয়ে ওঠে যখন মানবতা বিপন্ন হয় ঠিক তখন। তাঁদের তেজস্বিতার উৎস সেই আত্মিকশক্তি তাঁরা প্রয়োগ করেন সার্বিক জনকল্যাণে, বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় চ। ক্ষত্রিয়দের বাহুবলে আছে একটু হলেও স্বার্থের আঁশটে গন্ধ।ক্ষত্রিয়সুলভ প্রজাস্বার্থসিদ্ধি ও আত্মশক্তিপ্রতিষ্ঠার তাগিদ। মহর্ষি অগস্ত্যর নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম রামকে মুগ্ধ করেছে, রাম, তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়েছেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৬: সেফ শেলটার

মহর্ষি অগস্ত্য, নরঘাতী রাক্ষস বাতাপি ও ইল্বলকে যথোপযুক্ত শাস্তি দিয়েছিলেন। এ যেন সর্বোচ্চ আদালতের মৃত্যুর সমন। বাতাপি দ্বিচারিতার আশ্রয় নিয়ে, সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করে, মুনি ঋষিদের শ্রাদ্ধোপলক্ষ্যে ভোজনের নিমন্ত্রণ করত। ভোজ্যরূপে পরিবেশন করা হত মাংস। নিমন্ত্রণ ছিল সুস্বাদু মাংসভোজনে প্রলুব্ধ করবার একটি ফাঁদ। ভোজনে পরিবেশিত মেষমাংস ছিল মেষের ছদ্মবেশধারী ইল্বলের ভাই বাতাপির শরীরের মাংস। ভাষা শুনে মুনিঋষিরা বাতাপির নিমন্ত্রণে সাড়া দিতেন। সেটাই হোত তাঁদের মৃত্যুরূপ কাল। মহর্ষি অগস্ত্য, প্রাণঘাতী মিথ্যাচারে অভ্যস্ত, নিষ্ঠুর, দুর্বিনীত, দুই ভাইয়ের নৃশংসতার অবসান চেয়েছিলেন। চরমপন্থীদের মৃত্যু হয়তো এভাবেই হয়। ন্যায়দণ্ডধারী চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বদের আত্মশক্তির কাছে পরাজিত হয়ে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শুভবোধ আত্মস্থ করে অশুভপ্রচেষ্টাকে।যেমন মহর্ষি অগস্ত্য ইল্বলরূপী মেষটির মাংস উদরস্থ করে হজম করে ফেললেন। শুভবোধ অশুভকে গ্রাস করল। এমনটাই ঘটে, যেখানে চরম অপশক্তিকে প্রভাবিত করে নিশ্চিহ্ন করে শুভবোধ। বর্তমান পৃথিবীতে হিংস্র, নিষ্ঠুর,অপপ্রচেষ্টাকে নির্মূল করতে তথাকথিত এই পরিপাকক্রিয়ার প্রয়োজন। নৃশংসতায় প্রভাবিত হয়ে, উদ্দীপনায় ভেসে, পৈশাচিক মারণযজ্ঞে মেতে ওঠা কাম্য নয়। বোধ, চিন্তা, শুভাশুভর স্বচ্ছ ধারণার আলোয় অশুভকে আত্মস্থ করে,নিশ্চিহ্ন করাতেই আছে মানবজীবনের সার্থকতা। এই কারণেই মহর্ষি অগস্ত্য, লোকপ্রিয়, জনকল্যাণে নিরত, প্রবাদপ্রতিম, প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের সম্মান লাভ করেছেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

মহর্ষি অগস্ত্যর নামটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নামমাহাত্ম্যে লুকিয়ে আছে গভীর অর্থ। অগং পর্বতং স্তম্ভয়তি ইতি অগস্ত্যঃ। যিনি পর্বতকে তপস্যার শক্তিতে স্তম্ভিত করেন তিনিই অগস্ত্য। বিন্ধ্যপর্বত তাঁর উচ্চতা দিয়ে সূর্যকে আড়াল করেছিল তখন ঋষি অগস্ত্য তার উন্নত মাথাটি চিরকালের জন্য অবনত করে নিরুদ্দেশযাত্রা করলেন। আমাদের দিলেন চিরবিদায়ের সমার্থক শব্দ ‘অগস্ত্যযাত্রা’। মহর্ষির শর্ত ছিল একটাই, যতদিন না তিনি ফিরে আসছেন ততদিন বিন্ধ্যপর্বত এমন অবনতমস্তক হয়ে থাকবেন। এর অন্তর্নিহিত অর্থ বোধ হয়, ঔদ্ধত্যের কালাপাহাড় ভেঙ্গে ফেলতে, মহত্ত্বের ঐশ্বর্য সমৃদ্ধ মহানের দৃষ্টান্তমূলক আত্মত্যাগ প্রয়োজন। অগস্ত্য ছিলেন অনন্য মানসশক্তিতে বলীয়ান এক ঋষি। এমন মহান ঋষি ছিলেন রামচন্দ্রের অনুপ্রেরণার উৎস। মহর্ষি অগস্ত্যর জীবনালেখ্য, জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এক মহর্ষির মানবিক আত্মশক্তির জয়ঘোষণা। তাই শুভবোধের উজ্জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই কাহিনির আকর্ষণীয়তা আজও আছে। চিরন্তন মানবিকতার বিজয় বার্তা বহন করছে বলেই হয়তো দৃষ্টান্তমূলক এই কাহিনি এখনও চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকর।—চলবে।

* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content